📄 বাইতুল্লাহর এই চাবি এক সময় আমার হাতেই দেখবে
ইসলাম-পূর্বকালেও কাবা ঘরের সেবাকে এক বিশেষ মর্যাদার কাজ মনে করা হত। এ কাজের জন্য যারা নির্বাচিত হত তারা গোটা সমাজ তথা জাতির মাঝে সম্মানিত ও বিশিষ্ট বলে পরিগণিত হতো। জাহেলিয়াতের আমলে পেছনের হজ্জের মৌসুমে পানি পান করানোর দায়িত্ব ছিল মহানবী (সাঃ) এর চাচা আব্বাস (রাঃ) এর উপর। একে বলা হত ‘সেকায়া’। এ কাজের জন্য আরও কিছু সেবার দায়িত্ব এবং আরও অন্য চাচা আবু তালেবের উপর এবং কাবা ঘরের চাবি কাছে রাখা এবং যথাসময়ে তা খুলে দেয়া ও বন্ধ করার ভার ছিল উসমান ইবনে তালহার উপর।
এ ব্যাপারে স্বয়ং উসমান ইবনে তালহা তাঁর ভয় এই যে, জাহেলিয়াতের যুগে আমরা সোমবার ও বৃহস্পতিবার কাবা ঘরের দরজা খুলে দিতাম এবং মানুষ তাতে প্রবেশ লাভের সৌভাগ্য অর্জন করত। হিয়রতের পূর্বে একবার মহানবী (সাঃ) কাবার ভেতরে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করলেন। উসমান ইবনে তালহা তাঁকে ভেতরে প্রবেশে বাধা দিলেন এবং অত্যন্ত কর্কশ ভাষায় প্রকাশ করলেন। মহানবী (সাঃ) অত্যন্ত ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতার সাথে অমারিক কার্যকলাপসমূহ সহ্য করে নিলেন।
অতঃপর বললেন, হে উসমান! হয়তো তুমি এক সময় এই চাবি আমার হাতেই দেখতে পাবে। তখন যাকে ইচ্ছা এই চাবি অর্পণ করার অধিকার আমারই থাকবে। উসমান ইবনে তালহা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললো, যেদিন কুরাইশরা অপমানিত, অসহায় হয়ে পড়বে (সাঃ) বললেন, না, না। বরং তখন কুরাইশরা সম্মানিত হবে, তারা হবে যথাৰ্থ সম্মানে সম্মানিত। এ কথা বলতে বলতে তিনি বাইতুল্লাহর ভিতরে তশরীফ নিয়ে গেলেন। (উসমান বলেন,) অতঃপর আমি যখন আমার মনের ভেতর অনুসন্ধান করলাম তখন আমার যেন নিশ্চিত বিশ্বাস হয়ে গেল যে, তিনি যা কিছু বলেছেন, তা অবশ্যই ঘটবে। সে মুহূর্তে আমি মুসলমান হয়ে যাবো সকল প্রকার নিন্দনীয়। কিন্তু আমি আমার সম্প্রদায়ের কঠোর মনোভাবের কারণে সংকল্প বাস্তবায়িত করতে পারলাম না।
অতঃপর মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সেখানে নামাজ আদায়ের পর মহানবী (সাঃ) উসমানকে ডেকে বাইতুল্লাহর চাবি চাইলেন। আমি তা সবিনয়ে পেশ করে দিলাম।
কোন কোন বর্ণনায় আছে, মক্কা বিজিত হলে উসমান ইবনে তালহা বাইতুল্লাহর উপরে উঠে গেলেন। তখন হযরত আলী (রাঃ) মহানবী (সাঃ) এর নির্দেশ পালনার্থে তার নিকট থেকে জোরপূর্বক চাবি ছিনিয়ে নিয়ে হজ্জ (সাঃ) এর হাতে অর্পণ করলেন। যাহোক, বাইতুল্লাহর প্রবেশ ও এর সেখানে নামাজ আদায়ের পর মহানবী (সাঃ) যখন বাইরে বেরিয়ে এলেন তখন পুনরায় সে চাবি আমার হাতেই ফিরিয়ে দিলেন এবং বললেন, এই নাও, এখন থেকে এ চাবি কেয়ামত পর্যন্ত তোমার বংশধরদের হাতেই থাকবে। অন্য যে কেউ তোমাদের হাত থেকে এ চাবি ফিরিয়ে নিতে চাইবে সে হবে জালিম, অত্যাচারী।
উসমান ইবনে তালহা বললো, উসমান! আমি যা বলিতেছিলে তখন আপনি আমার সে কথাটি মনে হলো পেল ফিরতের পূর্বে যা তিনি আমাকে বলেছিলেন যে, “হয়তো এ চাবি একদিন আমার হাতেই দেখতে পাবে।” তখন আমি নিদর্শন করলাম, নিঃসন্দেহে আপনি আল্লাহর বাণী বাস্তবায়নকারী হয়েই। আর তখনি আমি কালেমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেলাম। (তাফসীরে মারিফুল কুরআন)।
📄 রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর স্মরণ ও সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়বে
আল্লাহ তায়ালা বলেন, আর তোমার জন্য তোমার জিকিরের আওয়াজ বুলন্দ করে দিয়েছি।” (সূরা ইনশিরাহঃ ৪)
এ আয়াতটি এমন এক সময় অবতীর্ণ হয়েছিল যখন কেউ একথা চিন্তাই করতে পারত না যে, এ ব্যক্তির সাথে মাত্র গুটি কয়েক লোক রয়েছে এবং মক্কা নগরীতেই যাওয়া সীমাবদ্ধ, সে ব্যক্তির আওয়াজ কিভাবে সমগ্র দুনিয়া बुलंद হয়ে এবং যেমন করে তার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়তে পারে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর বড় সাহেবযাদা ছিলেন কাসেম (রাঃ)। তার ছোট হযরত যায়নাব (রাঃ), তার ছোট হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) তারপর তিন মেয়ে উম্মে কুলসুম (রাঃ) হযরত ফাতেমা (রাঃ) এবং রুকাইয়া (রাঃ)। হযরত যয়নবের (রাঃ) এর পরে হযরত আবদুল্লাহ্ (রাঃ) ইন্তেকাল করেন। এ কথা শুনে কুরাইশ নেতা আস ইবনে ওয়ায়েল বলে, তাঁর বংশ খতম হয়ে গেল। এখন তিনি ‘আবতার’ বা ছিন্নমূল। তাঁর কোন পুত্র সন্তান নেই যে, তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়ে তাঁর দুনিয়া থেকে মুছে যাবে। তখন তোমরা তাঁর থেকে নিশ্চিন্ত লাভ করবে। হুজুর (সাঃ) এর পুত্র শোকে কাতর সময় তাঁর চাচা আবু লাহাব, আবু জাহেল এবং আরও অনেকে এ ধরণের বিদ্রূপের পরিচয় দেয়। নবুওয়াতের প্রাথমিক পর্যায়ে নবী করীম (সঃ) চরম প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন। গোটা জাতি তাঁকে নির্মূল করতে উঠে পড়ে লাগে। তাঁর মুষ্টিমেয় সঙ্গী সাথীদের সাফল্যের কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা এ অবস্থায় তার নবীকে (সঃ) এ সুসংবাদ দিলেন এবং आश्चर्यजनकভাবে তা বাস্তবায়িত করলেন।
নবী (সঃ) স্মরণ ও সুখ্যাতি আজ যুগের পর যুগ শোহনার কাজ তিনি স্বয়ং নবী দুশমনদের দ্বারাই শুরু করালেন। মক্কার কাফেরগণ নবী (সঃ) কে বিপদে ফেলার জন্য যে পন্থা অবলম্বন করেছিল তার মধ্যে একটি ছিল এই যে, হজ্জের মৌসুমে গোটা আরবের লোক মক্কায় পৌঁছাতো, তখন কাফেরদের এক একটি প্রতিনিধি দল হাজীদের শিবিরে শিবিরে হাজির হতো। তাদেরকে সতর্ক করে দিয়ে বলতো, মুহাম্মদ নামে একটি মারাত্মক লোক মক্কায় এদের এমন এমন যাদ করতে। পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করেছে। সুতরাং তার থেকে সাবধান হয়ে থাকবে। এ ধরণের প্রচারণা দ্বারা তারা ঐসব লোকের কাছেও রাসূলের হাক্ব ও জিয়ারত বা কোন ব্যবসা উপলক্ষে মক্কায় আসতো। এভাবে যদিও তারা নবীপাক (সঃ) এর কুৎসা উটনা করতো যে তাঁর দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দিতে পারতো না। কিন্তু ফল হল উল্টো যে, আরবের গ্রামে-গঞ্জে অতি সহজেই তাঁর নাম পৌঁছে যায়। এভাবে দুশমনেরা তাঁর নাম মক্কার নির্ভুত স্থান থেকে সারা দেশের সকল গোত্রের কাছে পৌঁছে দেয়। তারপর তারা স্বাভাবিকভাবেই জানতে চাইতো, সে লোকটি কে, কি বলে, কেমন লোক সে, কারা তার যাদুর দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে এবং যাদের কোন ধরণের প্রতিক্রিয়া তাদের উপর পড়ছে।
মক্কার কাফেরদের প্রচারণা যতই বাড়ছিল, মানুষের মনে প্রথম जिज्ञासा বাড়ছিল। এ जिज्ञासा ও ঔৎসুক্যের ফলে নবীপাক (সঃ) এর চরিত্র ও তাওহীদ-আখিরাত সম্পর্কে জানতে পারলো। তারা কুরআন শুনে পেয়েছিল এবং নবীপাক (সঃ) শিক্ষা সম্পর্কে জানতে পারলো। তারা জীবন ধারণ করলো যে, যে জিনিসকে জাদু বলা হচ্ছে তা আসলে সাধারণ আদর্শবাদীদের জীবন ধারার চেয়ে সাধারণ সৃষ্টিতে হচ্ছে। এর ফলে নবীর কুৎসা তাঁর সুখ্যাতিতে পরিণত হতে লাগলো। তারপর হিজরতের পূর্বে অবস্থা এমন হল যে, দূর ও নিকট আরবের গোত্রগুলো এমন একটিও ছিল না যার মধ্যে কেউ না কেউ ইসলাম গ্রহণ করেনি এবং যাদের মধ্যে কিছু লোক নবী (সঃ) ও তাঁর দাওয়াতের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়েছিল। এ হচ্ছে হুজুর (সঃ) এর চচা গুলুন্দর হওয়ার প্রথম পর্যায়।
অতঃপর হিজরতের পর দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়। এ সময় একদিকে মুনাফিক দল, ইহুদী এবং সমগ্র আরবের মুশরিকরা নবী (সঃ) এর বিরোধিতায় উঠেপড়ে লেগেছিল। অপরদিকে মদীনার নবীর ইসলামী রাষ্ট্র রায়াহটিত, চারিত্রিক পবিত্রতা, সুন্দর সমাজ ব্যবস্থা, ন্যায়পরায়ণতা, উদার হস্তে দান, গরীবদের প্রতিদান, দরিদ্রের সংবর্দ্ধনা, সৌন্দর্য ও ন্যায়-কারবারের সততা প্রভৃতির অবদান অনুপম তুলনামূলক তুলনা করা যাচ্ছিল যে মানুষের হৃদয় জয় করছিল। নবী (সাঃ) এর নেতৃত্বে ধ্রুবতারা এমন একটি সমাজ ও জাতীয়তাবাদ তৈরি হয়েছিল যে, তারা তাদের নিয়ম শৃংখলা, ধার্মিক জীবন ও মৃত্যুর প্রতি উপেক্ষা, যুদ্ধের মাঝেও চারিত্রিক সীমারেখা রক্ষার মাধ্যমে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমান করতে আনন্দ প্রদান করেন যে, সমগ্র আরব তাদের বশ্যতা স্বীকার করে নেয়। দশ বছরের মধ্যে হুজুর (সঃ) এর চচা ও মহিমা এতোটা প্রবল হলো যে, বিরোধীরা যে দিকে তাকে বদনাম করার জন্য সর্ব শক্তি নিয়োগ করেছিল, সে দেশের সর্বশ্রেণির আকাশ-বাতাস মুখরিত করে ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ্’ বাণী গুঞ্জরিত হতে থাকলো।
অতঃপর তৃতীয় পর্যায় শুরু হল খেলাফতে রাশেদার যুগ থেকে; যখন নবী (সঃ) এর নাম সারা দুনিয়ায় बुलंद হয়ে লাগলো। এর ধারাবাহিকতা আজ পর্যন্ত বেড়েই চলছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত বেড়েই চলবে। আজ দুনিয়ায় এমন কোন স্থান নেই যেখানে মুসলমানদের কোন বসতি নেই এবং যেখানে পাঁচবার আযানের মাধ্যমে উচ্চ স্বরে, মুহাম্মদ (সঃ) এর রিসালাতের ঘোষণা করা হয় না, নামাযের মধ্যে নবীর (সাঃ) প্রতি দরূদ পড়া হয় না এবং জুমআর খুতবায় তাঁকে স্মরণ করে মহৎ কামনা করা হয় না। বছরের মধ্যে আজ এমন কোন দিন এবং দিনের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে এমন কোন সময় নেই-যখন দুনিয়ার কোথাও না কোথাও নবীপাক (সঃ) এর মোবারক জিকির হয় না।
ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেক মুসলমান সারা জীবনে লক্ষ-কোটিবার নবী (সঃ) এর প্রতি দরূদ পড়ে থাকে। এমন কোন দিন যায় না যেদিন তার মুখ থেকে নবীর (সঃ) এর মঙ্গল কামনায় সালাম প্রেরণ করা হয় না। বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের মুখে প্রতি মুহূর্তে কোটি কোটি বার তাঁর মোবারক নাম উচ্চারিত হচ্ছে। হাজার বছর ধরে এ নাম মানুষের সাথে উচ্চারিত হচ্ছে এবং পৃথিবীর ইতিহাসে এমন আশ্চর্যজনক খুঁজে পাওয়া যাবে না যার নাম এতবার স্মরণ করা হয়।
আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীসে নবী (সঃ) বলেছেন, জিব্রাইল আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমার এবং আপনার রব জিজ্ঞাসা করেন, কিভাবে তিনি আপনার নাম ও জিকির বুলন্দ করেন। নবী (সঃ) বলেন, আল্লাহই তা’আলা ভাল জানেন। জিব্রাইল বলেন, আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, যখন আমার জিকির করা হয় তখন আমার সাথে তোমার (নবীর) নাম জিকির করা হয়।
পরবর্তীকালের গোটা ইতিহাস সাক্ষী দিচ্ছে যে, একথা অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়েছে।
📄 কুরাইশদের হাতে শাসন ক্ষমতা থাকবে
আমর ইবনুল আস (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীস। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “আলমদ সব অবস্থায় কুরাইশগণ কিয়ামত পর্যন্ত জনগণের নেতৃত্বের দায়িত্বে দিবে।”(তিরমিযী)
অপর এক বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন যে, যতদিন কুরাইশগণ তাদের চরিত্র উন্নত রাখবে এবং সাম্রাজ্যিকভাবে দ্বীনের কাজ বরণ করতে থাকবে আর তাদের মধ্যে যদি দু’জন লোকও সত্যের জন্য সংগ্রামী পাওয়া যায়, তাহলে শাসন ক্ষমতা তাদের হাতেই থাকবে।
নবী (সঃ) এর একথা একটা সত্য ছিল যে, তার পরে কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত ইতিহাসে তার সত্যতার প্রমাণ পেশ করতে থাকে। খেলাফতে রাশেদার যুগে চারজন খলিফা, এ গোত্রেই সর্বরাহ করে। তাদের বিজয়ের কোন নেতৃত্ব সারা বিশ্বে তখন ছিল না। অতঃপর এ গোত্রই প্রসিদ্ধ উমাইয়া শাসন কায়েম করে। এ গোত্রই আব্বাসীয় শাসনের পতন করে। স্পেনে বিরাট মুসলিম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা এবং মিশরে ফাতেমীয় শাসন প্রতিষ্ঠা এ গোত্রেরই অবদান।
📄 উয়াইস করনী আসবে
উমর (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলতে শুনেছিঃ ইয়ামেনের সাহায্যকারী দলের সাথে উয়াইস ইবনে আমের নামক এক ব্যক্তি তোমাদের কাছে আসবে। সে মুদার গোত্রের উপগোত্র ‘করণ’ বংশের লোক। তার কুষ্ঠরোগ হবে এবং তা সে শুকিয়ে যাবে, তার এক দিরহাম পরিমাণ জ্ঞাতীও। তার মা জীবিত আছে এবং সে তার খুবই অনুগত। সে যদি (আল্লাহর উপর ভরসা করে) কোন কিছুর শপথ করে আল্লাহ তা পূরণ করে দেন। যদি তুমি তাকে দিয়ে তোমার অপরাধ ক্ষমার জন্য দুয়া করার সুযোগ পাও তবে তাই করবে। (মুসলিম)
সাহেয়তত ভাবিত হযরত উয়াইস ইবনে আমের সম্পর্কে মুসলিম শরীফে আরও কিছু হাদিসের বর্ণনা রয়েছে। হযরত উমর (রাঃ) এবং উসাইর ইবনে আমর (রাঃ) থেকে যেগুলো বর্ণিত হয়েছে। যার সার সংক্ষেপ হলোঃ
ইয়ামেন থেকে উয়াইস নামে এক উত্তম লোক মদীনায় আসবে। সে অত্যন্ত বুজুর্গ লোক। তার কুষ্ঠ রোগ হবে। আল্লাহর কাছে রোজগীরের দোয়া করলে আল্লাহ তার রোজগীতি দান করবেন। তবে এক দিরহাম পরিমাণ স্থানে তার চিহ্ন অবশিষ্ট থাকবে। তাঁর সুপারিশে রবী গোত্র ও মুদার গোত্রের সব সংখ্যক লোক জান্নাতে যাবে।
হযরত উমর (রাঃ) তাই রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর যুগ পেরোতে পারতেন। তাঁর বিচার অত্যন্ত অদ্ভুত হেলেনা। বন্ধুরা মায়ার সেবায়েতের কারণে তাকে একাকী ফেলে এসে রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে সাক্ষাত করার তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। এজন্য তাকে সাহাবীদের মধ্যে গণ্য না করে তাবেঈনদের মধ্যে গণ্য করা হয়।
হযরত উমরের শাসন সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর বহুশ প্রশংসার পর হযরত উমর (রাঃ) তাঁর আপনার প্রতীক্ষায় থাকতেন। ইয়ামেন থেকে যখন কোন সাহায্যকারী সেনাদল আসত তখন তিনি জিজ্ঞেস করতেন, “তোমাদের মধ্যে উয়াইস আমের নামে কেউ আছে কি?” সাধারণত তার সম্পর্কে কেউ কিছু বলতে পারতো না। কারণ ইয়ামেন তিনি কোন সুপরিচিত ব্যক্তিও ছিলেন না।
একদিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর ভবিষ্যদ্বাণীর প্রতি লক্ষ্য রেখে হযরত উমর (রাঃ) ইয়ামেন থেকে আগত প্রতিনিধি দলগুলোকে উয়াইস করণীয় অনুসন্ধান অব্যাহত রাখেন। পরবর্তী কেউ উয়াইস করণীকে সনাক্ত করতে পারলে ও তার সম্পর্কে মুসলিম জাহানের খলিফা হযরত উমর (রাঃ) এর আগ্রহ দেখে তা খুবই বিস্মিত হয়। তোরা। উয়াইসকে আমরা অতি সাধারণ লোক হিসেবেই জানি, তাঁকে তো কোন গুরুত্বপূর্ণ মনে করি না।
অবশেষে একদিন কোন এক প্রতিনিধি দলের সাথে হযরত উয়াইস করণী এসে গেলেন। হযরত উমর (রাঃ) এর সাথে সাক্ষাত হলো হুল তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি মুদার গোত্রের উপগোত্র ‘করণ’ লোক? তিনি বলেন, হ্যাঁ। তিনি বলেন, আপনার কি কুষ্ঠরোগ হয়েছিল তা-ই তো সুস্থ হয়েছেন এবং মাত্র এক দিরহাম পরিমাণ জায়গা অবশিষ্ট আছে? তিনি বলেন, হ্যাঁ। উমর (রাঃ) বলেন, আপনার কি বেঁচে আছেন? উয়াইস উত্তর দিলেন, হ্যাঁ।
অতঃপর হযরত উমর (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলতে শুনেছিঃ ইয়ামেনের সাহায্যকারী দলের সাথে উয়াইস ইবনে আমের এক ব্যক্তি তোমাদের কাছে আসবে। সে পরবর্তীকালে (তাবিন্দর) মধ্যে একজন উত্তম লোক হবে। সে কোন কিছুর শপথ করলে আল্লাহ তা পূরণ করে দেন। যদি তুমি তাকে দিয়ে তোমার গুণাহ ক্ষমার জন্য দোয়া করার সুযোগ পাও তবে তাই করবে। উমর (রাঃ) বলেন, কাজেই আপনি আমার ক্ষমার জন্য দোয়া করুন। অতএব আপনি উমরের (রাঃ) জন্য ক্ষমা চেয়ে দোয়া করলেন।
উমর (রাঃ) তাঁকে বললেন, আপনি কোথায় যাওয়ার ইচ্ছা রাখেন? তিনি বললেন, ‘কুফা’। উমর (রাঃ) বললেন, সেখানকার গভর্ণরকে আপনার সাহায্যর জন্য লিখে দেই? তিনি বলেন, গরীব মিসকিনদের মধ্যে বাস করাই আমার কাছে অধিক প্রিয়।
পরবর্তী বছর কুফার এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি হজ্জে এলেন এবং হযরত উমর (রাঃ) উয়াইস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। সে বলল, তাঁকে আমি এমন অবস্থায় রেখে এসেছি যে, তার ঘরটা অত্যন্ত ভাঙা রয়েছে এবং তার জীবনধারণ খুবই নগণ্য। হযরত উমর (রাঃ) তাকে উয়াইস সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর হাদীস বর্ণনা করলেন। লোকটি কুফায় ফিরে এসে উয়াইস করণীর সাথে সাক্ষাত করে বলল, আপনি আমার গুনাহ মাফের জন্য দোয়া করুন। তিনি বললেন, আপনি এইমাত্র কল্যাণময় সফর (হজ্জ) থেকে ফিরে এসেছেন, বরং আপনিই আমার জন্য দোয়া করুন। অতঃপর জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি হযরত উমর (রাঃ) এর সাথে সাক্ষাত করেছেন? লোকটি বললো, হ্যাঁ। তখন হযরত উয়াইস তার জন্য দোয়া করলেন।
লোকদের মধ্যে উয়াইস করণীর সম্পর্কে জানাজানি হয়ে যায়। সবাই তাঁর মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন হলে তিনি সেখান থেকে অন্যত্র চলে যান।
উয়াইস করণীর মাতৃভক্তি ও বুজুর্গী সম্পর্কে লোকমুখে নানা কথা প্রচলিত আছে। কিন্তু অনেকেরই জানা নেই যে, তিনি জিদ্দার ময়দানে আল্লাহর রাহে জীবন দিয়ে শহীদ হয়ে যান।