📄 পঞ্চম পর্যায়ে পুনরায় বিশ্বে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে
এই ভবিষ্যদ্বাণী সম্বলিত আরও হাদীস মুসলিম, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থে রয়েছে। তার একটি উদ্ধৃতি এখানে দেওয়া হলঃ
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “তোমাদের দ্বীনের সূচনা নবুওয়াত ও রাহমাত থেকে। আল্লাহ যতদিন চাইবেন একে অক্ষুণ্ণ রাখবেন। তারপর নবুয়াতের অনুসারে খেলাফত চলবে যতদিন তিনি চাইবেন। আল্লাহর ইচ্ছায় এটারও অবসান হবে। তারপর শুরু হবে রাজতন্ত্র। তারপর তা থাকবে যতদিন আল্লাহ চাইবেন। যেদিন আল্লাহ চাইবেন ততদিন তা চলবে। তারপর আল্লাহ তায়ালা তার অবসান ঘটাবেন। অতঃপর নবুয়াতের পদ্ধতির নেই খেলাফত ও প্রতিষ্ঠিত হবে-যা মানুষের মধ্যে ন্যায় যত অনুযায়ী শাসন করবে এবং জমীনে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে। এ শাসন ব্যবস্থা আসমানবাসীও খুশি হবে এবং দুনিয়াবাসীও। আসমান প্রাণ খুলে তার বরকত সমূহ বর্ষণ করতে থাকবে এবং জমীন তার গর্ভস্থ সবকিছু বাইরে নিক্ষেপ করবে। (সিরাতে সরওয়ারে আলম)
উক্ত হাদীসে মিল্লাতের (মুসলিম জাতির) পাঁচটি পর্যায়ের কথা বলা হয়েছে। এর তিনটি পর্যায় ইতিমধ্যেই অতীত হয়েছে। প্রথম পর্যায় রাসূলুল্লাহ (সা) এর নেতৃত্বে নবুয়াতের ভিত্তিতে খেলাফত পরিচালিত হয়েছে ১০ বছর- অর্থাৎ ৬২২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৬৩২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। রাসূলুল্লাহ (সা) এর ইন্তিকালের পর ইসলামী খেলাফতের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয় খুলাফায়ে রাশেদার নেতৃত্বে। তাঁরা নবুয়াতের অনুসারে পরিপূর্ণ ইসলামী খেলাফত পরিচালনা করেন ৩০ বছর। এর পর তৃতীয় পর্যায়-এ শুরু হয় রাজতন্ত্র। বর্তমানে চতুর্থ পর্যায় বা অত্যাচারী শাসকদের যুগ চলছে। অবশেষে পঞ্চম পর্যায়ে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে তা অবশ্যই সত্য হবে। আমরা তা দেখার অপেক্ষায় আছি।
📄 মুসলমানগণ অমুসলিমদের কাছে পরাজিত ও লাঞ্ছিত হবে
খাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “অদূর ভবিষ্যতে অন্য জাতির লোকেরা তোমাদের উপর বিজয়ী হবে, যেমন ক্ষুধার্ত লোকেরা সববেতভাবে বড় পাত্রের দিকে এগিয়ে আসে”। তখন এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের সংখ্যা কি তখন কম হবে? রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, “না, বরং সে সময় তোমরা সংখ্যায় অনেক হবে। কিন্তু তোমাদের অবস্থা হবে সমুদ্রের ফেনার মত, আল্লাহ তখন তোমাদের শত্রুদের ভেতর থেকে তোমাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি দূর করে দিবেন এবং তোমাদের অন্তরে দুর্বলতা সৃষ্টি করে দিবেন।” তখন জনৈক সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ (সাঃ), দুর্বলতার সৃষ্টি কেন হবে?” তিনি বললেন, “দুনিয়ার প্রতি ভালবাসা এবং মৃত্যু ভয় করার জন্য।” (আবু দাউদ- ৪২৪৭, কিতাবুল মালাহিন; বায়হাকী)
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি খাওবান (রাঃ) কে লক্ষ্য করে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে বলতে শুনেছি, “কে খাওবান! যখন অন্য জাতির লোকেরা তোমাদেরকে আক্রমণ করার জন্য একে অপরকে আহ্বান করবে, যেমন করে লোকেরা একেই পাত্রের কাছে আমার জন্য ও সেখান থেকে খাওয়ার জন্য একে অপরকে আহ্বান করে, তখন তুমি কি করবে ?” খাওবান বলেন, আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গ হোক। এটা কি এমন যে, আমরা সংখ্যায় কম হব? নবী (সাঃ) বললেন, “না, সেদিন তোমরা সংখ্যায় হবে অনেক, কিন্তু আল্লাহ সে সময় তোমাদের অন্তরে দুর্বলতা সৃষ্টি করে দিবেন”। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! সে দুর্বলতাটি কি? তিনি বললেন, “এই দুনিয়ার প্রতি ভালবাসা এবং যুদ্ধ করতে অপছন্দ করা।” (আহমাদ-২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩৮৯)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “তোমরা যখন বেচাকেনা করবে, গাভীর লেজ ধরে থাকবে, চাষাবাদে লেগে যাবে এবং জিহাদ পরিত্যাগ করবে, আল্লাহ তখন তোমাদের উপর অপমান চাপিয়ে দিবেন এবং তা তোমাদের থেকে তাড়াতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা নিজেদের দিকে প্রত্যাবর্তন করো”। (আহমাদ; আবু দাউদ; হাকেম)
মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সময়ে (সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমদিকে) এই ভবিষ্যদ্বাণী রাজত্ব করেছিলেন সে সময়ে বিষয়টি ছিল কল্পনাतीत। মুসলিম জাতি তখন উদীয়মান শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ইসলাম ও মুসলিম জাতি তখন অগ্রগামী। মিথ্যা ও অন্ধকারের পাহাড় ভেদ করে সত্যের আলোর জয়গান। সারা সমাজ, সভ্যতা বিভক্তিতে আর মিথ্যা তো বিতাড়িত হবেই।
ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগে মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) পারস্যবিচারের ধ্বংস থেকে নির্যাতিত মানবতাকে মুক্ত করে আনলেন। শুধু দুই পারসিককে বিতাড়িত করে ক্ষান্ত হননি। পূর্বেই ঘোষণা দেন লাইন, “কেসরা ধ্বংস হবে এর পর আর কোন কেসরার জন্ম হবে না।” সপ্তদশ শতাব্দী থেকে কেসরার পতনের ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ইতিহাসে এক নবযুগ তৈরি হয়। সৌন্দর্য-বীর্যে, জ্ঞানে বিজ্ঞানে, সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে মুসলিমরা গোটা বিশ্বের নেতৃত্বে আসনে অধিষ্ঠিত ছিল। মুসলিম জাতির মত এরূপ নিরঙ্কুশ ক্ষমতা, প্রতিষ্ঠা ও কর্তৃত্ব আর কোন জাতি কখনো অর্জন করতে পারেনি। ইতিহাস সাক্ষী, এ কৃতিত্ব একমাত্র মুসলিম জাতির।
১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে স্পেনে খ্রিস্টান শক্তির কাছে মুসলমানদের পরাজয় বরণ করে। আর তখন থেকেই শুরু হয় এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হওয়ার পালা-যা ছিল মুসলিম জাতির জন্য চরম বেদনাদায়ক। এ অবস্থা চলতে থাকবে যদ্দিন মুসলিম জাতি বিশ্বের বুকে পুনরায় বিজয়ী হবার পূর্ব পর্যন্ত। মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যা বলেছেন তা কখনও ভ্রান্তি হবে না, শান্তি হবেও না কখনো।
মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী এখন মুসলিম জাতিকে চরম লাঞ্ছনা ও নির্যাতনের নিষ্পেষিত হতে হচ্ছে। শত শত বছর ধরে মুসলিম জাতি অমুসলিমদের হাতে কত যে নির্যাতিত হয়েছে তা বর্ণনাতীত। কেবল বিগত দুই দশকে অমুসলিমদের হাতে বহু সংখ্যক মুসলিম নারী পুরুষ নির্যাতিত ও নিহত হয়েছে তার শত শত প্রমাণ বিদ্যমান। অসহায় মুসলিমও কখনো কখনো মুসলিমদেরকে নিয়ে নির্যাতিত হয়নি। বিগত কয়েক দশকে বিশ্ব ব্যাপী মুসলিম নির্যাতনের কিছু বর্ণনা এখানে দেওয়া হলঃ
১৯৯২-৯৫ পর্যন্ত বসনিয়ায় খ্রিস্টানদের দ্বারা দুই লক্ষাধিক মুসলিম নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়। আট লক্ষাধিক মুসলিমকে পুরোপুরি বা আংশিক পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়। লক্ষাধিক মুসলিম বালিকা ও নারীকে পরিকল্পিতভাবে ধর্ষণ করা হয়। প্রায় ৩০০ মসজিদ ধ্বংস করা হয়। বিশ্বের প্রায় ১৫০ কোটি মুসলমান তখন ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' পাঠ ছাড়া আর কি করতে পেরেছে? ভারতের গুজরাটে, আহমেদাবাদে নিরপেক্ষ সূত্র মতে এ পর্যন্ত দুই লক্ষাধিক মুসলিমকে হত্যা করা হয়েছে। যাদের বেশির ভাগকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। ধ্বংস করা হয়েছে ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ সহ ১৮০ টি মসজিদ এবং ২৪০ টির মতো দরগাহ।
মধ্যপ্রাচ্যের ফিলিস্তিনে মুসলমানদেরকে উপর ইহুদী অপশক্তির অকথ্য নির্যাতন অর্ধশতাব্দীর অধিক কাল ধরে বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করছে।
‘News week’ লিখেছে, চেচনিয়াতে ১৯৮৪ সালে রুশ নেতা স্টালিন ৫ লক্ষেরও বেশি চেচেন মুসলিম নাগরিককে সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত করে। তাদের ধারাবাহিক জ্বালিয়ে দেয়।
গত দশকে রাশিয়ান বাহিনী প্রায় ১ লক্ষ চেচেন মুসলিমকে হত্যা করে। ১ লক্ষ লোক নির্বাসিত করে এবং দেশটির এক এক তৃতীয়াংশকে পরিতেসিত ও উর্বরভূমিতে পরিণত করা হয়। (News Week, 11 Nov.02, Page-13)
আফগানিস্তান ইরাক, চীন, ফিলিপাইন, কাশ্মীর সহ বিশ্বের প্রায় সর্বত্রই আজ উগ্র খ্রিস্টান মুসলিমদেরকে পুরোপুরি ধ্বংস করার প্রাণ। মুসলমানদের মান সম্মান, সহায় সম্পদ সবই আজ নগ্ন হিংস্রতার শিকার। তাদের আর্তনাদ আর হাহাকারে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত। যে পবিত্র ভূমিতে আমাদের প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ (সাঃ) প্রথম ইসলামের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন সেই পুণ্যভূমি মক্কা মদীনায় আজ নাপাক শক্তির অশুভ পদচারণ।
ইসলাম ও মুসলমানদের উপর অমুসলিম জাতির বিজয় ও কর্তৃত্বের কারণ কি? উল্লেখিত তিনটি হাদীসে মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কারণ বলে দিয়েছেন। হাদীসগুলো আমাদের গুরুত্ব দিয়ে পাঠ করা উচিত। ভেবে দেখা দরকার এখন কি মুসলমানদের উপর সেই অভিশাপ চলছে না যার ভবিষ্যদ্বাণী আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে আমাদের নবীজী (সাঃ) করে গিয়েছিলেন?
যে মুসলিম জাতি অর্ধেক হেলার হেলান সব জাতিকে একদা উঁচুতে বসতে হতো সেই শানকে জাতি আজ অন্যান্য জাতির খেলার পুতুলে পরিণত হয়েছে। সাহাবীদের যুগে তাদের ভাগ্যে কোন চিত্ত কল্পনাতীত ছিল। কারণে মুসলিমের কিছু সংখ্যক সাহাবী যেভাবে প্রতিরোধি গঠনে বিশ্ব জয় করে চলেছেন সে সময়ে তাঁরা কিভাবে মুসলিম জাতির এ করুণ অবস্থার কথা কল্পনা করতে পারেন। তাই তারা নবীজীকে জিজ্ঞাসা করলেন, “মুসলমানদের এ অবস্থা তাদের বংশের হবে কবে?”
এ জিজ্ঞাসার জবাবে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর প্রকৃত কারণ উপরোক্ত হাদীস তিনটিতে বর্ণনা করেছেন এবং এর পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ লাভের উপায়ও বলে দিয়েছেন।
বর্তমান বিশ্বে মুসলমানদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, উপরোক্ত হাদীসগুলোতে বর্ণিত অবস্থার সাথে বর্তমানের মুসলিমদের অবস্থার হুবহু মিল যাচ্ছে। এবং একটা মিল এর সাথে কখনো কখনো বলা হয় না। বর্তমানে মুসলমানদের স্বভাব-চরিত্র এবং সামগ্রিক দুরবস্থা ঠিক উল্লিখিত হাদীসগুলোর আলোকে বিশ্লেষণ করা দরকার।
অমুসলিম সমর বিশেষজ্ঞরা পর্যন্ত মুসলমানদের পরাজয়ের পেছনে কারণ বর্ণনায় নিজেদের অজ্ঞাতে নয়। এর কথাই প্রতিধ্বনি করেছেন Lawrence D. Higgins নামক একজন মার্কিন বিশেষজ্ঞ তার Military decline of Ottoman Empire শিরোণামে লিখেছেন “ Under the first ten Sultans, the Ottoman Turkeys had been an aggressive military power, open to technological innovation and improvement... the elite of the Ottoman army dominated the battlefield. Turkish general were the equal of the best Austrian, Spanish and French Commanders. The Sultan himself commanded his armies in the field. By 1650 Turkish Weapons were outmoded. Within the ... corps, corruption and nepotism were rife. Instead of seeking battle, the janissaries sought comfort, wealth and political influence. Not only did they occasionally make and unmake sultans, they also blocked all attempts to reform and modernize the army. At the very -time the Austrian and Russian military strength increased, Turkish military strength declined ... ” ( - Brassey's Encyclopedia of military History and Biography, (Edited by- Frankin D. Margiotta, 1994, P#752)
বস্তুত দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা, যুদ্ধের প্রতি অনীহা এবং মৃত্যু ভয় আমাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে করলে অলস ও কাপুরুষ, আর আধ্যাত্মিকভাবে আমাদেরকে করেছে অসুস্থ। বিভিন্ন ধরনের যেমন পুষ্টিকর ও উন্নত খাবারের প্রতি অনীহা, তেমনিই আমাদের অন্তরে ইবাদতের কষ্ট সহ্য করা বা ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য ত্যাগ স্বীকার করা এবং কিতাল (শস্ত্র সংগ্রাম) করার মত সুউচ্চ মর্যাদা দানকারী, প্রভাব-প্রতিপত্তি দানকারী, শক্তিশালী আমলের প্রতিও রয়েছে সীমাহীন অনীহা। আজ অসুস্থ হবার কারণে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে গিয়েছি যার কারণে আজ আমরা অন্যায়, অবিচার ও জুলুম-নির্যাতনের প্রতিরোধ করা তো দূরের কথা প্রতিবাদের ভাষাও ভুলে গেছি। আমাদের অন্তরে এখনো যতটুকু ধর্মভাব আছে তার ফলতোহীন চেষ্টা তিনি টিকেই আছে। আমাদের ঈমানের আজ এমনই দুরবস্থা যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কথা যা বিশ্বাস করা কুফরি, যার সত্যতার সন্দেহ প্রকাশ করা কুফরি- তাতেও ঠিকমত ভরসা করতে পারি না।
ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ৮২ হাজার সদস্যের বাহিনী কখনও সংখ্যালঘুদের কারণে পরাজিত হবে না।” (তিরমিজি, আবু দাউদ; আহমাদ)
আমরা ভুলে গেছি, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নির্দেশ, “তোমরা মুশরিকদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ করবে যেমন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ করে। এবং জেনে রাখ, আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে আছেন”। (আত-তওবাঃ ৩৬)
এখন মুশরিকী বলতে কী বুঝি? সাধারণভাবে পূজা পাঠ আমাদের রোজগারের অর্থ বাকি থাকে। কিন্তু তার শাস্ত্রগত হুবহু আমার অনেককেই নেই। মুশরিকী বলতে সে সকল লোকদেরকেই বুঝায় যারা আল্লাহর ভয় এবং তাঁর সন্তুষ্টির আশায় তাঁর যাবতীয় আদেশ ও নিষেধ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর প্রদর্শিত পথ ও পদ্ধতি অনুসারে মেনে চলেন। এ হিসেবে, আয়াতে নির্দেশ হলো, ‘সর্বাত্মক ভাবে যুদ্ধ করা’- আল্লাহর এ নির্দেশটি যদি আমরা পালন না করি, তাহলে আমরা মুশরিকী হতে পারব কি? আর মুশরিকী না হলে উল্লিখিত আয়াত অনুসারে আল্লাহ কি আমাদের সাথে থাকবেন?
মুসলমান যে আল্লাহ তা'আলার প্রিয় এ কথা খুব সত্য। সেই সাথে একথাও সত্য যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রিয় বান্দাদেরকে কখনো লাঞ্ছিত ও অপমানিত করেন না। তাহলে আমরা মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও আজ নানা ভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত কেন হচ্ছি? তাহলে নিশ্চয়ই আমাদের মুসলমান হবার দাবীতে কোথাও আজ গলদ আছে। আমাদের নাম সরকার দপ্তরে মুসলমান হিসেবে লিখিত আছে, কিন্তু সেই সরকার দপ্তরের সার্টিফিকেট অনুসারে আল্লাহর দপ্তরেও বর্ণিত হয় না। আল্লাহ তা'আলার নিজস্ব দপ্তর রয়েছে- তা আমাদের সরকারি দপ্তর থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দপ্তরে আমাদের নাম তার অনুগত বান্দাদের তালিকায় লিখিত আছে না কি অবাধ্য বান্দাদের তালিকায় লিখিত আছে- তা একবার আমাদের খোঁজ করা দরকার।
আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবী (সাঃ) এর মারফত আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন পথের দিশা, নির্দিষ্টকরেছেন হওয়ার উপায় ও নিয়ম-কানুন। জানিয়ে দিয়েছেন আমাদের দুনিয়া ও আখিরাতের প্রধান-প্রভাব-প্রতিপত্তি লাভ করার পথ ও পদ্ধতি। যে কাজ মানুষকে দুনিয়া ও আখিরাতে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করে, আল্লাহ তায়ালা নবী (সাঃ) মারফত তার সবই আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আমরা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর দেখানো পথ ছেড়ে দিয়ে চলছি অথচ আশা করছি যে মুসলমান হবার উপায়-উপকরণ ও নিয়ম-কানুন জেনে নিয়ে তা আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনে সবচে চর্চা এবং বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করছি? আখিরাতের প্রধান-প্রতিপত্তি ও সাফল্য লাভ করার পথ ও পদ্ধতিকে কি অনুসরণ করছি? যে সব কাজ মানুষকে দুনিয়া ও আখিরাতে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করে সে সব কাজ কি আমরা ত্যাগ করেছি? দুনিয়া ও আখিরাতে অপমানিত ও অপদস্থ হয়ে কি ফল ভোগ করছি- পরকালেও কি আমরা সে রকম অপমানিত ও অপদস্থ হব না? আমাদের এই বর্তমান মুসলমানিত্ব আমাদেরকে রক্ষা করতে পারবে কি?
আমাদের অন্তরের উপর চিন্তা করা উচিত যে, আমরা কেন আজ আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হচ্ছি? কেন আজ চারিদিক হতে আমাদের উপর এ বিপদ-আপদ এসে পড়ছে? কেন আজ আল্লাহর বান্দা হিসেবে আমরা যাদেরকে মনে করি, তারা সকল ক্ষেত্রে আমাদের উপর বিজয়ী?
মিরদাস আসলামী (রাঃ) বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “নেককার লোকেরা ক্রমান্বয়ে মৃত্যুবরণ করবেন। আর বাকী লোকেরা যব অথবা খেজুরের আবর্জনা অনুযায়ী অংশ হিসেবে বেঁচে থাকবে। আল্লাহ তায়ালা এদের প্রতি ভ্রুক্ষেপও করবেন না।” (বুখারী, কিতাবুল রেমাম)
প্রিয় নবী (সাঃ) দুষ্টকর্মীদেরকে যবের ভূষি ও খেজুরের আহারের অনুপযোগী অংশের সাথে তুলনা করে অপদার্থ বলে ঘোষণা করেছেন এবং জানিয়ে দিলেন যে, এ অপদার্থের কি হলো, তারা কোথায় ধ্বংস হলো, কার কাছে পরাজিত-নির্যাতিত হলো ইত্যাদি বিষয়ে আল্লাহ তায়ালার কোন পরোয়া নেই- আমরা কি বর্তমানে এ অবস্থার মুখোমুখি নই?
📄 মুশরিক কুরাইশরা বেশি দিন টিকে থাকবে না
“এ ভূখন্ড থেকে তোমাকে উৎখাত করে এখন থেকে बहिष्कार করার জন্যে তারা তৎপর হয়েছিল। কিন্তু যদি তারা এরূপ করে তাহলে তোমার পরে তারা এখানে বেশিদিন টিকে থাকতে পারবে না”। (সূরা বনী ইসরাইল : ৭৬)
এ সুস্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী সম্বলিত আয়াতগুলো যখন অবতীর্ণ হয় তখন তা বাস্তব রূপ লাভ করার কোন আলামতই দেখা যাচ্ছিল না; কিন্তু দশ বছরের মধ্যে তা অক্ষরে অক্ষরে সত্যে পরিণত হয়। মুষ্টিমেয় ঈমানদারদের উপর কুরাইশদের অত্যাচার তখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। অত্যাচার, নির্যাতনের কারণে অনেককেই কিয়ামত পর্যন্ত হতে হচ্ছে। এ সূরা নাযিল হবার এক বছর পর নবী (সঃ) কে তারা মক্কা থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য করে। বের করে দিয়েই তারা ক্ষান্ত হয়নি। নবী (সঃ) ও তাঁর আন্দোলনকে চিরতরে নির্মূল করার জন্য সমগ্র আরবের মুশরিকরা জোটবদ্ধ হয়ে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। এতদসত্ত্বেও তাদের আন্দোলন ব্যর্থ হয়। মক্কা থেকে বের হয়ে যাবার পর আট বছরকাল তাদের সাথে নবী (সঃ) বিজয়ীর বেশে মক্কায় প্রবেশ করেন। তারপর দু’বছরের মধ্যেই সমগ্র আরব ভূখন্ড থেকে মুশরিকদের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়। যারাই তখন সেখানে অবস্থান করছিল মুসলিম হিসেবেই করছিল। মুশরিকদের কোন স্থানই সেখানে ছিল না।
📄 পূর্ণ নিরাপত্তার যুগ আসবে
হযরত খাব্বাব ইবনুল আরাত (রাঃ) বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কাবা ঘরের ছায়ায় বসেছিলেন। আমি তাঁর কাছে হাজির হয়ে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ), জুলুম অত্যাচারের আর অন্ত নেই। আপনি কি আল্লাহর দরবারে দোয়া করছেন না?
এ কথা শুনে তাঁর চেহারা মোবারক রক্তিম বর্ণ ধারণ করল। তিনি বললেন, তোমাদের পূর্বে যারা ঈমানদার ছিলেন তাদের উপর এর চেয়ে ঢের বেশি নির্যাতন হয়েছে। লোহার চিরুনী দিয়ে তাদের শরীরের মাংস ভিন্ন ভিন্ন করা হতো, তাদের মাথার উপর করাত রেখে চিরে ফেলা হতো, তথাপি তারা সত্য দ্বীন থেকে সরে পড়েনি। নিশ্চিতভাবে জেনে রাখ যে, আল্লাহ এ কাজ সম্পূর্ণ করেই ছাড়বেন। এমন এক সময় আসবে যখন এক ব্যক্তি সা’নআ’ থেকে হাজরামাউত পর্যন্ত নির্ভয়ে সফর করবে এবং আল্লাহকে ছাড়া আর কাউকে ভয় করবে না। কিন্তু তোমরা বড়ই তাড়াহুড়ো করছো।–(বুখারী)
পরবর্তকালে ইতিহাসের সবার জানা আছে। ইসলামের স্বর্ণযুগ এমন একটি শান্তি ও নিরাপত্তা সমাজ উপহার দিয়েছিল যা পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয়টি নেই। অন্ধকার যুগের অবসান ঘটিয়ে ইসলামের সোনালী যুগের আবির্ভাবের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়।
ইসলামের স্বর্ণ যুগে পরিপূর্ণ শান্তি ও নিরাপত্তার যে সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার কিছু দৃষ্টান্ত এখানে উল্লেখ করা হলঃ
‘আইনের চোখে সবাই সমান’
হজ্জ করার সময় ভিক্ষুর মধ্যে আরবের পার্শ্ববর্তী এক রাজার চাদর এক দাসের পায়ে জড়িয়ে যায়। বিরক্ত ও ক্রুদ্ধ হয়ে রাজা ‘জাবালা’ সেই দাসের গালে চড় বসিয়ে দিলেন। লোকটি খলিফা উমরের (রাঃ) নিকট সুবিচার প্রার্থনা করে নালিশ করে। জাবালাকে তৎক্ষণাৎ ডেকে পাঠানো হলো। অভিযোগ সত্য কিনা জিজ্ঞাসা করায় জাবালা ক্রুদ্ধ ভাষায় উত্তর দিলেন, “অভিযোগ সত্য”। এই লোকটি আমার চাদর মাড়িয়ে যায় কারণ ঘরের ধুয়ে।
“কিন্তু কাজটি কি ইচ্ছাকৃত নয়, ঘটনাক্রমে হয়ে গেছে”- রুক্ষস্বরে বাধা দিয়ে বললেন খলিফা। উদ্ধত ভাবে জাবালা বললেন,“ তাতে কিছু আসে যায় না-এ মাসটা যদি পবিত্র হজ্জের মাস না হতো তবে আমি লোকটিকে মেরেই ফেলতাম।” জাবালা ছিলেন ইসলামী সাম্রাজ্যের একজন শক্তিশালী মিত্র ও খলিফার ব্যক্তিগত বন্ধু।
বিখ্যাত ভিক্ষুর উত্তর দিলেন জাবালা, “কিন্তু আমি যে রাজা আর ও যে একজন দাস।” উত্তর শুনে উমর (রাঃ) বললেন, “তোমরা দু’জনই মুসলমান এবং আল্লাহর চোখে দু’জনই সমান।” পবিত্র রাজার অহংকারে চুর হয়ে গেল।
মুভির নাকের অঙ্গুলী মানুষের নাক
একদিন থেকে আফ্রিকার খলিফার খ্রিস্টান পাঠিয়ে যে কে একজন দূত আসে। ঐ দূতকে এক বৃদ্ধের ভাঙা প্রতিষ্ঠিতর নাম করে নেত্রে ফেলছে। খ্রিস্টানরা উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। ঘরে মিল তা, এটা একজন মুসলমানেরই কাজ। খ্রিস্টান নেতারা মুসলিম সেনাপতি আমর ইবনুল আস এর কাছে এলে বিচার ও অন্যায়ের কাজির প্রতিবাদ দাবি করল। সেনাপতি আমর সব শুনে অত্যন্ত দুঃখিত হলেন। ক্ষতিপূরণ স্বরূপ তিনি প্রতিশ্রুতি সম্পূর্ণ নতুন করে তৈরি করে দিতে চাইলেন। কিন্তু খ্রিস্টান নেতারা প্রতিশোধ নেবার বাসা ছিল অন্য রূপ। তারা শুধু প্রকাশ করে বললেন, ঐ খ্রিষ্টান এটা বললো, “বড় খ্রিষ্টানে আমরা প্রান্তর পরে বসে মনে করি। তার প্রতিমূর্তির এরূপ অপমান হওয়াতে আমরা অত্যন্ত আঘাত পেয়েছি। অর্থাৎ এর প্রতিশোধ নয়। আমরা চাই এই অপমানের দ্বারা আমরা যতটুকু তৈরি করে ঠিক তেমনি আমি চাই এই অপমান।” এ কথা শুনে রাকদের মত জ্বলে উঠলেন আমর ইবনুল আস। তীক্ষ্ণ চোখে মুখমণ্ডল উত্তীত হয় উঠলো। কিছুক্ষণ নীরব থেকে নিজেকে সংযত করে নিয়ে তিনি খ্রিস্টান বিপণকে লক্ষ্য করে বললেন, “আমার অনুরোধ, এ প্রস্তাব ছাড়া অন্য কোন একস্থানের কাছে কেউ আমি আপনাদের দিতে প্রস্তুত, যার নাক আপনাদের চান।” খ্রিস্টান নেতারাও সকলেই এ প্রস্তাবে সম্মত হলো। পরদিন খ্রিস্টান ও মুসলমান বিরাট এক ময়দানে জমায়েত হলো। মিশরের শাসক সেনাপতি আমর ইবনুল আস (রাঃ) সবার সামনে হাজির হয়ে বিপদে বললেন,“ আদেশ শাসকের দায়িত্ব আমার। যে অপমান আজ আপনাদের তাতে আমার দুর্বলতাই প্রকাশ পেয়েছে। তাই তরবারি গ্রহণ এবং আপনিই আমার নাসিকা ছেদন করুন।”
এ কথা বলেই তিনি বিপক্ষকে একখানি তরবারি হাতে দিলেন। জনতা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, খ্রিস্টানরা স্তব্ধ। চারদিকে থম থমে ভাব। সে নিরাবতায় নিঃশব্দতা ভঙ্গ করে ভয় হয়। সহসা সেই নীরবতা ভঙ্গ করে একজন মুসলিম সৈন্য এগোলো। চিৎকার করে বলল, “আমিই দোষী- আমার মাযহাবের আমার কোন অপরাধ নেই। আমিই মূর্তির নাসিকা কর্তন করেছি, এই তো আমার হাতেই আছে।” সেনাপতি এদিকে এসে বিপক্ষের তরবারির নিতে নিজের নাসিকা পেতে দিল। প্রতি বিশব। প্রতি বিশব। বিশপের অন্তরে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল। তরবারি ছুড়ে ফেলে দিয়ে বিশপ বললেন, “ধন্য সেনাপতি, ধন্য এই বীর সৈনিক, আর ধন্য আপনাদের মুহাম্মদ (সঃ) যাঁর মহান আদর্শে আপনাদের মত মহৎ, উদার, নির্ভীক ও শক্তিমান ব্যক্তি পড়ে উঠেছে। খ্রিষ্টের প্রতিকৃতির অপমানে কথা অন্যায়ের হয়েছে সন্দেহ নেই, কিন্তু ভয় চাইতেও অন্যায়ে যা যদি আমি এই সুন্দর ও জীবন্ত দেহের অবমাননা করি। সেই মহান ও আদর্শ নবীকেও আমার সালাম জানাই।”