📄 জবাইয়ের সময় পশুর প্রতি সদয় হতে আদেশ করতেন
শাদ্দাদ বিন আওস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে দুটি কথা আমি সংরক্ষণ করে রেখেছি। তিনি বলেছেন, "আল্লাহ তাআলা প্রতিটি বিষয়ে ইহসান (সদাচরণ) করা আবশ্যক করেছেন তোমাদের ওপর। তাই যখন তোমরা হত্যা করবে, তখন সুন্দর করে হত্যা করবে। আবার যখন তোমরা পশু জবাই করবে, সুন্দর করে জবাই করবে। জবাইকারী যেন জবাইয়ের আগে ছুরি ধার দিয়ে নেয় এবং জবাইয়ের পশুকে আরাম দেয়। "৯৬২
ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, '(এবং জবাইয়ের পশুকে আরাম দেয়): অর্থাৎ ধারালো ছুরি নিয়ে দ্রুতগতিতে জবাই করার মাধ্যমে জবাইয়ের পশুকে আরাম দেবে। আর মুসতাহাব হচ্ছে, পশুর সামনে ছুরি ধার না দেওয়া, একটি পশুর সামনে আরেকটিকে জবাই না করা এবং জবাইয়ের স্থলে পশুকে টেনে-হেঁচড়ে না নেওয়া।'
(সুন্দরভাবে হত্যা করবে) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ কথাটি প্রতিটি হত্যার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সে হত্যা হতে পারে কিসাসের, হতে পারে হদ বা এমন অন্য কিছুর। এ হাদিসটি ইসলামি মৌলিক নীতিমালা সন্নিবেশিত হাদিসগুলোর একটি। '৯৬৩
ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'এক লোক একটি ছাগল জবাই করার জন্য শুইয়ে রেখে ছুরি ধার দিচ্ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাকে বললেন, "তুমি কি তাকে কয়েকটি মৃত্যু দিতে চাও?! তাকে শোয়ানোর আগে কেন ছুরি ধার দিলে না?"৯৬৪
টিকাঃ
৯৬২. সহিহু মুসলিম: ১৯৫৫।
৯৬৩. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৩/১০৭।
৯৬৪. মুসতাদরাকুল হাকিম: ৭৫৬৩। বুখারি (রাহিমাহুল্লাহ)-এর শর্তে সহিহ। ইমাম জাহাবি (রাহিমাহুল্লাহ)-ও হাদিস সহিহ হওয়ার ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন।
📄 গাধা ও ঘোড়ার মিলন ঘটাতে নিষেধ করেছেন
আলি বিন আবু তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি খচ্চর হাদিয়া পেলেন। খচ্চরে চড়ে তিনি বের হলে আমি বললাম, “যদি আমরা গাধা ও ঘোড়ায় মিলন ঘটাই, তবে আমাদেরও এ রকম খচ্চর হতো।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যুত্তরে বললেন, "কেবল মূর্খরাই এমনটা করে। "৯৬৫
বলা হয়, গাধা ও ঘোড়ার মিলনে খচ্চরের জন্ম নেওয়া হচ্ছে উত্তমের বদলে মন্দটা নেওয়া। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা অপছন্দ করেছেন।
ইমাম খাত্তাবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আল্লাহই ভালো জানেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অপছন্দ করার কারণ কী। খচ্চরের গুণগত মান কম হওয়াই এর কারণ হতে পারে। গাধা ও ঘোড়ার মিলন ঘটালে খচ্চর জন্মাবে, ফলে ঘোড়ার সংখ্যা কমে যাবে, ঘোড়ার তুলনায় খচ্চরের স্ফূর্তি কম হবে, তার উপকারিতার পরিমাণ কম হবে। অথচ আরোহণ, দৌড়ানো, তত্ত্ব-তালাশে, জিহাদের কাজে, গনিমত সংগ্রহ ও সংরক্ষণে ঘোড়া অধিক উপকারী। ঘোড়ার গোশত খাওয়া যায়। এ ছাড়াও ঘোড়ার আরও নানাবিধ উপকার আছে। কিন্তু খচ্চরে এসব উপকারিতা নেই। ঘোড়ার পরিমাণ বাড়লে তার মাধ্যমে উপকারিতাও বেশি হবে। তাই ঘোড়ার বংশবৃদ্ধি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পছন্দনীয় ছিল। '৯৬৬
টিকাঃ
৯৬৫. সুনানু আবি দাউদ: ২৫৬৫, সুনানুন নাসায়ি: ৩৫৮০।
৯৬৬. আওনুল মাবুদ: ৭/১৬৭।
📄 জীবজন্তু ও পশুপাখি নবুওয়াতের সাক্ষ্য দিয়েছে
আবু সাইদ খুদরি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'এক নেকড়ে বাঘ এক রাখালের একটি ছাগলের পিছু ধাওয়া করছিল। রাখালটিও ছাগলের খোঁজে নেমে পড়ল। একটু পর ছাগলকে পেয়ে নেকড়ের কাছ থেকে কেড়ে নিতে উদ্যত হলো। নেকড়েটি ছাগলের লেজ ধরে রেখে বলল, "তুমি কি আল্লাহকে ভয় করো না! আল্লাহ আমাকে যে রিজিক দিয়েছেন, তুমি সে রিজিক কেড়ে নিতে চাইছ?"
রাখাল বলল, "আশ্চর্য! নেকড়ে দেখি আমার সাথে মানুষের ভাষায় কথা বলছে!"
নেকড়েটি বলল, “এর চেয়ে আশ্চর্যকর সংবাদ আমি তোমাকে জানাই। ইয়াসরিবের মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে অতীত যুগের সংবাদ জানাচ্ছেন।"
এরপর রাখাল তার ছাগলপাল হাঁকিয়ে মদিনায় এল। মদিনার ভেতরে এক প্রান্তে ছাগল রেখে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে সব খুলে বলল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদেশ দিলে মসজিদে একত্র হওয়ার ঘোষণা দেওয়া হলো।'
মানুষ মসজিদে এল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে। সবার সামনে রাখালকে বললেন, "এদের সবটা শোনাও।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদেশ পেয়ে রাখাল পুরো ঘটনার বর্ণনা দিল আরেকবার।'
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "সে সত্য বলেছে। যাঁর হাতে আমার প্রাণ-তাঁর শপথ করে বলছি, ততদিন পর্যন্ত কিয়ামত হবে না, যতদিন না হিংস্র পশু মানুষের সাথে কথা বলবে, যতদিন না মানুষ তার চাবুকের সাথে-তার জুতোর ফিতার সাথে কথা বলবে, যতদিন না একজন মানুষের উরু তার অনুপস্থিতিতে তার স্ত্রী কী করেছে তা বলবে। "৯৬৭
টিকাঃ
৯৬৭. মুসনাদু আহমাদ: ১১৩৮৩।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ভালোবাসার কারণে সাফিনাকে সাহায্য করেছিল একটি সিংহ
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আজাদকৃত দাস সাফিনা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'নৌকায় চড়ে আমি সমুদ্রযাত্রা করছিলাম। কিন্তু সাগরেই নৌকাটি ভেঙে গেল। আমি তখন একটি কাঠের টুকরোতে উঠে পড়লাম। কাঠের টুকরোটি ভাসাতে ভাসাতে আমাকে একটি জঙ্গলে নিয়ে আসলো। সে জঙ্গলে সিংহ ছিল। একটি সিংহ আমাকে দেখে ফেলল। আমি তাকে বললাম, “হে সিংহ, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দাস।” আমার কথা শুনে সিংহ মাথা নত করে ফেলল। সিংহটি তার কাঁধ দিয়ে আমাকে ইশারা করে যাচ্ছিল। এভাবে সে আমাকে দিক-নির্দেশনা দিয়ে দিয়ে একটি রাস্তায় আনল। এরপর সে গোঁ গোঁ করতে থাকল। আমার ধারণা হলো, সে আমাকে বিদায় জানাচ্ছে। '৯৬৮
ইবনে মুনকাদির (রাহিমাহুল্লাহ)-এর বর্ণনায় এসেছে, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দাস সাফিনা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মুসলিম সৈন্যের সাথে রোমানদের ভূমিতে ছিলেন তখন। তিনি মুসলিম সেনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তাদের হারিয়ে ফেলেছিলেন অথবা বন্দী হয়ে গিয়েছিলেন রোমানদের হাতে। এরপর যখন বন্দিত্ব থেকে পালিয়ে তিনি মুসলিম সেনাদলের খোঁজ করছিলেন, তখন তিনি সিংহের সামনে পড়েন।'
তখন তিনি সিংহকে বললেন, "ওহে সিংহ, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দাস। আমার সাথে এমন এমন ঘটেছে।"
সাফিনা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কথা শুনে সিংহটি লেজ নেড়ে নেড়ে তাঁর পাশে এসে দাঁড়াল। সিংহ যখনই একটা শব্দ শুনত সাথে সাথে সেদিকে যেত এরপর সাফিনা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে আসত। এভাবে সাফিনা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মুসলিম সৈন্যের কাছে পৌঁছালেন। অতঃপর সিংহটি ফিরে গেল। ৯৬৯
টিকাঃ
৯৬৮. মুসতাদরাকুল হাকিম ৪২৩৫। হাদিসটি সহিহ হওয়ার ব্যাপারে ইমাম জাহাবি (রাহিমাহুল্লাহ)-ও একাত্মতা পোষণ করেছেন।
৯৬৯. মুসান্নাফু আব্দির রাজ্জাক ২০৫৪৪, হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৯/১৩০।