📄 পশুপাখিকে গালি দিতে নিষেধ করেছেন
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পশুপাখিদের গালি দিতে নিষেধ করতেন; বিশেষ করে মোরগকে গালি দিতে নিষেধ করতেন। জাইদ বিন খালিদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "তোমরা মোরগকে গালি দিয়ো না। কেননা, মোরগ সালাতের জন্য জাগিয়ে দেয়।"৯৫৫
মোরগ তাহাজ্জুদের সময় ডাক দিয়ে জাগতে সাহায্য করে। তাই যে আল্লাহর ইবাদতে সাহায্য করে, সে প্রশংসার যোগ্য, নিন্দার নয়।
মুনাবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'মোরগের অভ্যাসই এ রকম। যখন ফজর ঘনিয়ে আসে, তখন মোরগ একনাগাড়ে ডাকতে থাকে। আবার যখন সূর্য হেলে পড়ে, তখনো ডাকতে থাকে। এটাই মোরগের স্বভাব, যার ওপর আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন।'
হালিমি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এ হাদিস থেকে আমরা জানতে পেলাম, যে প্রাণী উপকারী, তাকে গালি দেওয়া ঠিক নয়। তাকে হেয় করাও উচিত নয়; বরং উচিত হচ্ছে, সে প্রাণীর কদর করা এবং তার প্রতি সদয় হওয়া। '৯৫৬
ইমরান বিন হুসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো এক সফরের কথা। সে সফরে এক আনসার নারীও ছিল। উটের ওপর সওয়ার হয়ে সফর করছিল সে নারী। উটের আচরণে বিরক্ত হয়ে উটকে অভিসম্পাত করল সে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা শুনে বললেন, "উটের ওপর যা আছে, তা তোমরা নিয়ে নাও। আর উটটিকে ছেড়ে দাও। কারণ, উটটি অভিশপ্ত।"
ইমরান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'মনে হচ্ছে আমি এখনো মানুষের মাঝে ঘোরাফেরা করতে দেখছি সে উটটিকে। কিন্তু কেউই তার দিকে ভ্রুক্ষেপ করছে না।'৯৫৭
আবু বারজাহ আসলামি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, এক বালিকা উটে উপবিষ্ট ছিল। তার গোত্রের কিছু মালামালও সে উটের ওপর ছিল। হঠাৎ করে সে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখতে পেল। ঠিক তখনই পাহাড়ের সংকীর্ণ পথ এসে পড়ল। তখন বালিকাটি উটকে বলল, "হাল ৯৫৮, হে আল্লাহ, একে অভিশপ্ত করুন।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, "যে উটকে অভিশাপ দেওয়া হয়েছে, সে উট যেন আমাদের সাথে না চলে। "৯৫৯
ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'সে বালিকা ও অন্যদের প্রতি ধমক হিসেবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথাটি বলেছেন। কারণ, এর আগেও তিনি উট ও অন্যান্য পশুকে অভিশাপ দিতে নিষেধ করেছেন। একবার উটকে অভিশাপ দেওয়ার কারণে সেটিকে ছেড়ে দেওয়ার শাস্তি দিয়েছিলেন।'
এ হাদিসে নিষেধাজ্ঞা সে উটে চড়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে পথ চলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়েছে। অন্যথায় সে উট বিক্রি করা, জবাই করা এবং সে উটে চড়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া অন্য কারও সাথে পথ চলা নিষেধ করা হয়নি। আগের মতোই উটের এ ব্যবহারগুলো জায়িজ ছিল। এ হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথার উদ্দেশ্য ছিল, উটের ওপর যা রসদ, সরঞ্জাম আছে, তা নিয়ে নাও। '৯৬০
টিকাঃ
৯৫৫. সুনানু আবি দাউদ: ৫১০১।
৯৫৬. আওনুল মাবুদ: ১৪/৫।
৯৫৭. সহিহু মুসলিম: ২৫৯৫।
৯৫৮. উট চলতে না চাইলে এ শব্দ করে উটকে শাসানো হয়।
৯৫৯. সহিহু মুসলিম: ২৫৯৬।
৯৬০. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৬/১৪৮।
📄 দুর্বল জন্তু ছাগল জবাই করতে অনুৎসাহিত করতেন
আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক আনসারির কাছে এলেন মেহমান হয়ে। আনসার লোকটা ছাগল জবাইয়ের জন্য একটি ছুরি নিল হাতে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, "দুধালো ছাগল জবাই করবে না।"৯৬১
টিকাঃ
৯৬১. সহিহু মুসলিম: ২০৩৮।
📄 জবাইয়ের সময় পশুর প্রতি সদয় হতে আদেশ করতেন
শাদ্দাদ বিন আওস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে দুটি কথা আমি সংরক্ষণ করে রেখেছি। তিনি বলেছেন, "আল্লাহ তাআলা প্রতিটি বিষয়ে ইহসান (সদাচরণ) করা আবশ্যক করেছেন তোমাদের ওপর। তাই যখন তোমরা হত্যা করবে, তখন সুন্দর করে হত্যা করবে। আবার যখন তোমরা পশু জবাই করবে, সুন্দর করে জবাই করবে। জবাইকারী যেন জবাইয়ের আগে ছুরি ধার দিয়ে নেয় এবং জবাইয়ের পশুকে আরাম দেয়। "৯৬২
ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, '(এবং জবাইয়ের পশুকে আরাম দেয়): অর্থাৎ ধারালো ছুরি নিয়ে দ্রুতগতিতে জবাই করার মাধ্যমে জবাইয়ের পশুকে আরাম দেবে। আর মুসতাহাব হচ্ছে, পশুর সামনে ছুরি ধার না দেওয়া, একটি পশুর সামনে আরেকটিকে জবাই না করা এবং জবাইয়ের স্থলে পশুকে টেনে-হেঁচড়ে না নেওয়া।'
(সুন্দরভাবে হত্যা করবে) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ কথাটি প্রতিটি হত্যার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সে হত্যা হতে পারে কিসাসের, হতে পারে হদ বা এমন অন্য কিছুর। এ হাদিসটি ইসলামি মৌলিক নীতিমালা সন্নিবেশিত হাদিসগুলোর একটি। '৯৬৩
ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'এক লোক একটি ছাগল জবাই করার জন্য শুইয়ে রেখে ছুরি ধার দিচ্ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাকে বললেন, "তুমি কি তাকে কয়েকটি মৃত্যু দিতে চাও?! তাকে শোয়ানোর আগে কেন ছুরি ধার দিলে না?"৯৬৪
টিকাঃ
৯৬২. সহিহু মুসলিম: ১৯৫৫।
৯৬৩. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৩/১০৭।
৯৬৪. মুসতাদরাকুল হাকিম: ৭৫৬৩। বুখারি (রাহিমাহুল্লাহ)-এর শর্তে সহিহ। ইমাম জাহাবি (রাহিমাহুল্লাহ)-ও হাদিস সহিহ হওয়ার ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন।
📄 গাধা ও ঘোড়ার মিলন ঘটাতে নিষেধ করেছেন
আলি বিন আবু তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি খচ্চর হাদিয়া পেলেন। খচ্চরে চড়ে তিনি বের হলে আমি বললাম, “যদি আমরা গাধা ও ঘোড়ায় মিলন ঘটাই, তবে আমাদেরও এ রকম খচ্চর হতো।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যুত্তরে বললেন, "কেবল মূর্খরাই এমনটা করে। "৯৬৫
বলা হয়, গাধা ও ঘোড়ার মিলনে খচ্চরের জন্ম নেওয়া হচ্ছে উত্তমের বদলে মন্দটা নেওয়া। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা অপছন্দ করেছেন।
ইমাম খাত্তাবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আল্লাহই ভালো জানেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অপছন্দ করার কারণ কী। খচ্চরের গুণগত মান কম হওয়াই এর কারণ হতে পারে। গাধা ও ঘোড়ার মিলন ঘটালে খচ্চর জন্মাবে, ফলে ঘোড়ার সংখ্যা কমে যাবে, ঘোড়ার তুলনায় খচ্চরের স্ফূর্তি কম হবে, তার উপকারিতার পরিমাণ কম হবে। অথচ আরোহণ, দৌড়ানো, তত্ত্ব-তালাশে, জিহাদের কাজে, গনিমত সংগ্রহ ও সংরক্ষণে ঘোড়া অধিক উপকারী। ঘোড়ার গোশত খাওয়া যায়। এ ছাড়াও ঘোড়ার আরও নানাবিধ উপকার আছে। কিন্তু খচ্চরে এসব উপকারিতা নেই। ঘোড়ার পরিমাণ বাড়লে তার মাধ্যমে উপকারিতাও বেশি হবে। তাই ঘোড়ার বংশবৃদ্ধি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পছন্দনীয় ছিল। '৯৬৬
টিকাঃ
৯৬৫. সুনানু আবি দাউদ: ২৫৬৫, সুনানুন নাসায়ি: ৩৫৮০।
৯৬৬. আওনুল মাবুদ: ৭/১৬৭।