📄 তির বা অন্য কিছু দিয়ে গৃহপালিত জন্তু মারতে নিষেধ করেছেন
হিশাম বিন জাইদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর সাথে আমি হিকাম বিন আইউব (রাহিমাহুল্লাহ)-এর বাড়িতে এলাম এবং দেখলাম, কিছু কিশোর বা তরুণ ছেলে একটি মুরগি বেঁধে তার দিকে তির তাক করে আছে মারার জন্য।' এ দেখে আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্তুদের বেঁধে তাদের দিকে তির নিক্ষেপ করতে নিষেধ করেছেন। '৯৩০
আব্দুল্লাহ বিন উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) একবার ইয়াহইয়া বিন সাইদ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর কাছে গেলেন। সেখানে দেখতে পেলেন ইয়াহইয়া-এর পরিবারের এক ছেলে একটি মুরগিকে বেঁধে তির নিক্ষেপ করছে। ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এগিয়ে এসে মুরগিটিকে ছাড়িয়ে নিলেন। এরপর মুরগি ও ছেলেকে সাথে করে নিয়ে আসলেন। বললেন, 'তোমরা পশুপাখিদের এভাবে বেঁধে হত্যা করার জন্য তির নিক্ষেপ করতে তোমাদের ছেলেদের নিষেধ করবে। কারণ, পশুপাখি প্রভৃতিকে বেঁধে তির নিক্ষেপে হত্যা করার ব্যাপারে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিষেধাজ্ঞা শুনেছি আমি। '৯৩১
সাইদ বিন জুবাইর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কিছু কুরাইশ তরুণের পাশ দিয়ে গমন করছিলেন। তখন তিনি দেখতে পেলেন, ছেলেরা একটি পাখিকে বেঁধে রেখে তার দিকে তির নিক্ষেপ করছে। প্রতিটি ব্যর্থ নিশানার পরিবর্তে তারা পাখির মালিককে একটি করে তির দিচ্ছে। ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে দেখে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তখন তিনি বলেন, "এ কাজটা কে করেছে? যে এ কাজ করেছে, তার ওপর আল্লাহর অভিশাপ। প্রাণ আছে, এমন কিছুকে তির-নিশানাবাজির লক্ষ্যবস্তু বানায় যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অভিশাপ দিয়েছেন। "৯৩২
অন্য বর্ণনায় এসেছে, 'যে ব্যক্তি জীবজন্তুকে লক্ষ্যভেদের উপকরণ বানায়, তার প্রতি আল্লাহর অভিশাপ। '৯৩৩
ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'অর্থাৎ যেভাবে তোমরা চামড়া ও অন্যান্য বস্তুকে লক্ষ্যভেদের অনুশীলনের জন্য লক্ষ্যস্থল হিসেবে ব্যবহার করো, জীবজন্তুকে সেভাবে লক্ষ্যস্থল হিসেবে ব্যবহার কোরো না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ নিষেধাজ্ঞা হারামের অর্থে। এ জন্যই ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর বর্ণনায় এমন কর্মের কর্তার প্রতি আল্লাহর অভিশাপ দেওয়া হয়েছে। কারণ, এমন কর্ম জীবজন্তুকে শাস্তি দেওয়ার নামান্তর। এমন করলে সামনে থাকা প্রাণীটির জীবন বিপন্ন হয়। এমন কর্ম সম্পদের অপচয়। তির নিক্ষেপের পর জবাই না করা গেলে হালাল খাবারের একটা উৎস নষ্ট হয়ে গেল। আর যদি জবাই যোগ্য না হয়, তবে এ জীবের উপকার থেকে বঞ্চিত হতে হলো। '৯৩৪
টিকাঃ
৯৩০. সহিহুল বুখারি: ৫৫১৩, সহিহু মুসলিম: ১৯৫৬।
৯৩১. সহিহুল বুখারি: ৫৫১৪।
৯৩২. সহিহুল বুখারি: ৫৫১৫, সহিহু মুসলিম: ১৯৫৮।
৯৩৩. সুনানুন নাসায়ি: ৪৪৪২।
৯৩৪. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৩/১০৮।
📄 পশুর মুখে চিহ্ন আঁকতে এবং প্রহার করতে নিষেধ করেছেন
জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পাশ দিয়ে কিছু গাধা হেঁটে গেল। সেগুলোর গালে চিহ্ন আঁকা ছিল। এ দেখে তিনি বললেন, "যে লোক এ চিহ্ন এঁকেছে, আল্লাহ তাকে অভিশপ্ত করুন। "৯৩৫
দ্বিতীয় এক বর্ণনায় এসেছে, 'গাধাগুলোকে দেখার পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যে ব্যক্তি পশুর মুখে দাগ অঙ্কন করে অথবা পশুর মুখে প্রহার করে, আমি তাকে অভিশাপ দিয়েছি-তোমাদের কাছে কি এ সংবাদ পৌঁছেনি?"৯৩৬
ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'মানুষ, গাধা, ঘোড়া, উট, খচ্চর, ছাগলসহ অন্যান্য সম্মানযোগ্য প্রাণীর মুখে আঘাত করা নিষিদ্ধ। তবে তো মানুষের মুখে আঘাত করা আরও মারাত্মক পাপ। কারণ, মানুষের সৌন্দর্য তার মুখে নিহিত। চেহারায় আঘাত করা বড়ই স্পর্শকাতর একজন মানুষের জন্য। কারণ, চেহারায় প্রহার করলে প্রহারের প্রভাব স্পষ্ট দেখা যায়। কখনো তা লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় প্রহৃত ব্যক্তির জন্য। কখনো-বা ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াতে পারে প্রহৃত ব্যক্তির দেহের কোনো প্রত্যঙ্গের জন্য।'
অন্যদিকে উল্লেখিত হাদিসগুলোর মাধ্যমে প্রমাণিত যে, পশুর চেহারায় দাগ দেওয়া নিষিদ্ধ কর্ম। মানুষের সম্মানের জন্য মানুষের মুখে দাগ আঁকাও হারাম। আর এমন কাজের কোনো প্রয়োজনও নেই। তাই মানুষের মুখে দাগ এঁকে তাকে কষ্টে ফেলা জায়িজ নেই।'
মানুষ ভিন্ন অন্য প্রাণীগুলোর ক্ষেত্রে আমাদের মাজহাবের একদল আলিম বলেন, 'এমন কাজ মাকরুহ।' ইমাম বাগাবি (রাহিমাহুল্লাহ) 'এমন কাজ জায়িজ নেই' বলে দলিল উল্লেখ করে হারাম হওয়া সাব্যস্ত করেন। আর হারাম হওয়াই অধিক স্পষ্ট। কারণ, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন কাজকারীকে অভিশাপ দিয়েছেন। আর কোনো কাজের কারণে অভিশাপ দেওয়া, সে কাজটি হারাম হওয়া প্রমাণিত করে।'
অন্যদিকে, জীবজন্তুর মুখ ছাড়া দেহের অন্য জায়গায় দাগ আঁকা আমাদের মতে কোনো মতানৈক্য ছাড়াই জায়িজ। তবে জাকাত ও জিজিয়ার পশুগুলোকে চিহ্নিত করার জন্য দাগ এঁকে দেওয়া মুসতাহাব। এ ছাড়া অন্য কাজের পশুগুলোর মুখভিন্ন অন্য অঙ্গে চিহ্ন আঁকা মুসতাহাবও নয়, আবার নিষিদ্ধও নয়।'
অভিধান-প্রণেতাদের মতে, দাগ আঁকার অর্থ হচ্ছে, সেঁক দিয়ে চিহ্ন দেওয়া। ৯৩৭
টিকাঃ
৯৩৫. সহিহু মুসলিম: ২১১৭।
৯৩৬. সুনানু আবি দাউদ: ২৫৬৪।
৯৩৭. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৪/৯৭।
📄 জীবজন্তুর অঙ্গ বিকৃতি ঘটাতে নিষেধ করেছেন
আব্দুল্লাহ বিন জাফর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদল মানুষের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি দেখলেন, কিছু লোক তির নিক্ষেপ করছে একটি ভেড়ার দিকে। এ কাজটা তাঁর বেজায় অপছন্দ হলো। তিনি বললেন, "তোমরা পশুদের তির নিক্ষেপের লক্ষ্যবস্ত বানিও না” বা বললেন, "এভাবে তাদের অঙ্গবিকৃতি করো না।"৯৩৮
টিকাঃ
৯৩৮. সুনানুন নাসায়ি: ৪৪৪০।
📄 বিনা প্রয়োজনে পশু ধাওয়া করতে নিষেধ করেছেন
ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোড়া ও চতুষ্পদ জন্তু খাসি করতে নিষেধ করেছেন। '৯৩৯
ইমাম কুরতুবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'বিনা প্রয়োজনে পশু খাসি করা নিষিদ্ধ। তবে গোশতের পরিশুদ্ধি বা পশুর কোনো ক্ষতি প্রতিরোধে প্রয়োজনে খাসি করা জায়িজ। '৯৪০
ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'অভক্ষণযোগ্য পশুর খাসি করা হারাম। ভক্ষণযোগ্য পশু ছোট থাকতে খাসি করা যায়, বড় হয়ে গেলে আর জায়িজ নেই। '৯৪১
আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) ও আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কুরবানি করার ইচ্ছে করতেন, তিনি দুটি বড়, মোটাতাজা, শিংযুক্ত, ধূসর ও খাসিকৃত মেষ কিনতেন। এরপর একটিকে জবাই করতেন তাঁর উম্মতের সে সদস্যের পক্ষ থেকে, যে তাওহিদের সাক্ষ্য দিয়েছে এবং নবুওয়াতের সাক্ষ্য দিয়েছে। আর অপরটি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ও তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে জবাই করতেন। '৯৪২
টিকাঃ
৯৩৯. মুসনাদু আহমাদ: ৪৭৫৫।
৯৪০. আল-মুফহিম লিমা উশকিলা মিন তালখিসি কিতাবি মুসলিম: ১২/১২৭।
৯৪১. ফাতহুল বারি: ৯/১১৯।
৯৪২. সুনানু ইবনি মাজাহ: ৩১২২।