📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 পশুপাখির প্রতি সদয় হওয়া জান্নাতে যাওয়ার মাধ্যম

📄 পশুপাখির প্রতি সদয় হওয়া জান্নাতে যাওয়ার মাধ্যম


রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'পশুপাখির প্রতি সদয় হওয়া জান্নাতে যাওয়ার মাধ্যম।' আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "একদা এক ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভীষণ পিপাসার্ত হয়ে পড়ল। সে একটি কূপ দেখে সেখানে নেমে পানি পান করে আবার ওপরে উঠে আসলো। তখন লোকটি দেখতে পেল, একটি কুকুর হাঁপাচ্ছে আর পিপাসার জ্বালায় মাটি খাচ্ছে। সে নিজে নিজে বলে উঠল, পিপাসার তাড়নায় আমার যেই অবস্থা হয়েছিল, এই কুকুরটিরও একই অবস্থা হয়েছে। অতঃপর সে পুনরায় কূপে নেমে তার মোজার মধ্যে পানি ভরে নিল। মুখে পানিভর্তি মোজা ধরে নিয়ে কূপ থেকে উঠে এল। এরপর কুকুরকে পানি পান করিয়ে তৃষ্ণা নিবারণ করল।'

কুকুরটি আল্লাহর কাছে লোকটির জন্য কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করল এবং আল্লাহ তাআলা এই অসিলায় লোকটিকে মাফ করে দিলেন।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা শুনে সাহাবায়ে কিরাম বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল, চতুষ্পদ জন্তুর উপকার করলে আমাদের জন্য কোনো প্রতিদান আছে?"

উত্তরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “প্রত্যেক তাজা কলিজার অধিকারীর (জীবিত প্রাণী) ক্ষেত্রেই প্রতিদান রয়েছে।"৯২৩

অর্থাৎ প্রতিটি জীবিত প্রাণীকে পান করানো, আহার করানোসহ প্রভৃতি কল্যাণময় কাজে প্রতিদান রয়েছে। হাদিসে তাজা কলিজার অধিকারী বলার কারণ হচ্ছে, জীব মারা গেলে তার দেহ ও কলিজা শুকিয়ে যায়।

দাউদি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'তাজা কলিজার অধিকারী অর্থাৎ প্রতিটি জীবিত প্রাণীর উপকার করলে প্রতিদান রয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে। এ কথাটি সকল প্রাণীর ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য।'

ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'প্রাণীদের উপকার করার এ ব্যাপকতার সীমা সম্মানযোগ্য প্রাণীগুলোর সাথে বিশেষায়িত। আর এগুলোকেও ততক্ষণ পর্যন্ত মারা হবে না, যতক্ষণ না শরয়ি কোনো কারণ পাওয়া যায়। এসব প্রাণী চাই নিজের মালিকানাধীন হোক বা অন্য কারও মালিকানাধীন কিংবা মালিকানাহীন হোক—সর্বাবস্থায়ই এগুলোকে পানি পান করানো, কিছু খেতে দেওয়াসহ প্রভৃতি উপায়ে এগুলোর প্রতি সদাচরণ করা সাওয়াবের কাজ। '৯২৪

আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "একটি কুকুরের পিপাসায় জান যায় যায় অবস্থা। বেচারা একটি কুয়ার পাশে ঘোরাঘুরি করছে তৃষ্ণায় কাতর হয়ে। তখন বনি ইসরাইলের পতিতাদের এক পতিতা তাকে দেখতে পেল। সে নিজের মোজা কুয়াতে ফেলে পানি তুলে আনল। আর কুকুরটিকে পানি পান করতে দিল। তার এ সদাচরণ দেখে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হলো।"৯২৫

টিকাঃ
৯২৩. সহিহুল বুখারি: ২৩৬৩, সহিহু মুসলিম: ২২৪৪।
৯২৪. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৪/২৪১।
৯২৫. সহিহুল বুখারি: ৩৪৬৭, সহিহ মুসলিম: ২২৪৫।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 জীবজন্তুকে খাওয়ালে কল্যাণ রয়েছে

📄 জীবজন্তুকে খাওয়ালে কল্যাণ রয়েছে


আনাস বিন মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কোনো মুসলিম চারা রোপণ করলে বা ফসল ফলালে তা থেকে পাখি, মানুষ বা চতুষ্পদ জন্তু খেলে রোপণকারীর জন্য তা সাদাকা হবে।"৯২৬

টিকাঃ
৯২৬. সহিহুল বুখারি: ২৩২০, সহিহু মুসলিম: ১৫৫৩।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 মা পাখি ও তার ছানার মাঝে বিচ্ছেদ ঘটাতে নিষেধ করেছেন

📄 মা পাখি ও তার ছানার মাঝে বিচ্ছেদ ঘটাতে নিষেধ করেছেন


ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলাম একটি সফরে। তিনি তাঁর প্রয়োজন সারতে আমাদের থেকে আলাদা হলেন। এ সময় আমরা হুম্মারা পাখির ৯২৭ সাথে দুটি ছানা দেখলাম। ছানাদুটি নিয়ে। নিলাম আমরা। পাখিটি এসে তখন ডানা ঝাপটাতে শুরু করল।'

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে এ অবস্থা দেখলেন। তিনি বললেন, "এ পাখিটির সাথে তার সন্তানদের বিচ্ছেদ ঘটাল কে? তোমরা তার ছানাগুলো তাকে ফিরিয়ে দাও।"

এরপর তিনি দেখলেন, পিঁপড়ার একটি ঢিবি পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "এটি কে পোড়াল?"

সাহাবিগণ উত্তর দিলেন, "আমরা।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আগুনের রব ছাড়া আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়ার অন্য কারও অধিকার নেই।"৯২৮

খাত্তাবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এ হাদিস প্রমাণ করে ভীমরুলের বাসা পোড়ানোও শরিয়তের দৃষ্টিতে মাকরুহ। কারণ, এর তেমন প্রয়োজনীয়তা নেই। পোড়ানো ছাড়াই অন্যভাবে ভীমরুল থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।'

পিঁপড়া দুই ধরনের হয়ে থাকে। ক্ষতিকর পিঁপড়া মারা স্বাভাবিকভাবে জায়িজ। কিন্তু যে পিঁপড়া ক্ষতিকর নয়, সেগুলো মারা জায়িজ নয়। এ পিঁপড়াগুলোর পা লম্বা লম্বা হয়ে থাকে। '৯২৯

টিকাঃ
৯২৭. হুম্মারা চড়ুই'র মতো ছোট জাতের পাখি।
৯২৮. সুনানু আবি দাউদ: ২৬৭৫।
৯২৯. আওনুল মাবুদ: ৭/২৪০।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তির বা অন্য কিছু দিয়ে গৃহপালিত জন্তু মারতে নিষেধ করেছেন

📄 তির বা অন্য কিছু দিয়ে গৃহপালিত জন্তু মারতে নিষেধ করেছেন


হিশাম বিন জাইদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর সাথে আমি হিকাম বিন আইউব (রাহিমাহুল্লাহ)-এর বাড়িতে এলাম এবং দেখলাম, কিছু কিশোর বা তরুণ ছেলে একটি মুরগি বেঁধে তার দিকে তির তাক করে আছে মারার জন্য।' এ দেখে আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্তুদের বেঁধে তাদের দিকে তির নিক্ষেপ করতে নিষেধ করেছেন। '৯৩০

আব্দুল্লাহ বিন উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) একবার ইয়াহইয়া বিন সাইদ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর কাছে গেলেন। সেখানে দেখতে পেলেন ইয়াহইয়া-এর পরিবারের এক ছেলে একটি মুরগিকে বেঁধে তির নিক্ষেপ করছে। ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এগিয়ে এসে মুরগিটিকে ছাড়িয়ে নিলেন। এরপর মুরগি ও ছেলেকে সাথে করে নিয়ে আসলেন। বললেন, 'তোমরা পশুপাখিদের এভাবে বেঁধে হত্যা করার জন্য তির নিক্ষেপ করতে তোমাদের ছেলেদের নিষেধ করবে। কারণ, পশুপাখি প্রভৃতিকে বেঁধে তির নিক্ষেপে হত্যা করার ব্যাপারে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিষেধাজ্ঞা শুনেছি আমি। '৯৩১

সাইদ বিন জুবাইর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কিছু কুরাইশ তরুণের পাশ দিয়ে গমন করছিলেন। তখন তিনি দেখতে পেলেন, ছেলেরা একটি পাখিকে বেঁধে রেখে তার দিকে তির নিক্ষেপ করছে। প্রতিটি ব্যর্থ নিশানার পরিবর্তে তারা পাখির মালিককে একটি করে তির দিচ্ছে। ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে দেখে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তখন তিনি বলেন, "এ কাজটা কে করেছে? যে এ কাজ করেছে, তার ওপর আল্লাহর অভিশাপ। প্রাণ আছে, এমন কিছুকে তির-নিশানাবাজির লক্ষ্যবস্তু বানায় যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অভিশাপ দিয়েছেন। "৯৩২

অন্য বর্ণনায় এসেছে, 'যে ব্যক্তি জীবজন্তুকে লক্ষ্যভেদের উপকরণ বানায়, তার প্রতি আল্লাহর অভিশাপ। '৯৩৩

ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'অর্থাৎ যেভাবে তোমরা চামড়া ও অন্যান্য বস্তুকে লক্ষ্যভেদের অনুশীলনের জন্য লক্ষ্যস্থল হিসেবে ব্যবহার করো, জীবজন্তুকে সেভাবে লক্ষ্যস্থল হিসেবে ব্যবহার কোরো না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ নিষেধাজ্ঞা হারামের অর্থে। এ জন্যই ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর বর্ণনায় এমন কর্মের কর্তার প্রতি আল্লাহর অভিশাপ দেওয়া হয়েছে। কারণ, এমন কর্ম জীবজন্তুকে শাস্তি দেওয়ার নামান্তর। এমন করলে সামনে থাকা প্রাণীটির জীবন বিপন্ন হয়। এমন কর্ম সম্পদের অপচয়। তির নিক্ষেপের পর জবাই না করা গেলে হালাল খাবারের একটা উৎস নষ্ট হয়ে গেল। আর যদি জবাই যোগ্য না হয়, তবে এ জীবের উপকার থেকে বঞ্চিত হতে হলো। '৯৩৪

টিকাঃ
৯৩০. সহিহুল বুখারি: ৫৫১৩, সহিহু মুসলিম: ১৯৫৬।
৯৩১. সহিহুল বুখারি: ৫৫১৪।
৯৩২. সহিহুল বুখারি: ৫৫১৫, সহিহু মুসলিম: ১৯৫৮।
৯৩৩. সুনানুন নাসায়ি: ৪৪৪২।
৯৩৪. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৩/১০৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00