📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 প্রাণীদের কষ্ট দিতে নিষেধ করতেন

📄 প্রাণীদের কষ্ট দিতে নিষেধ করতেন


কোনো প্রাণীর ওপর অতিরিক্ত কাজের বোঝা চাপাতে, প্রাণীকে ক্ষুধার্ত রাখতে ও কষ্ট দিতে নিষেধ করতেন।

আব্দুল্লাহ বিন জাফর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন আমাকে তাঁর বাহনের পেছনে বসিয়ে নিলেন। ... এরপর তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারার জন্য এক আনসারি সাহাবির বাগানে প্রবেশ করলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে একটি উট দেখতে পেলেন। উটটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখতে পেয়ে কাঁদতে শুরু করল। তার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়তে থাকল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে আসলেন। উটের মাথার পেছনে হাত বুলিয়ে দিলে উটটি কান্না থামাল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবার জোর আওয়াজে বলতে লাগলেন, "এ উটটি কার? এ উটের মালিক কে?"

তখন এক আনসারি যুবক এগিয়ে এল। বলল, "আমার, হে আল্লাহর রাসুল।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, "এ প্রাণীটি আল্লাহ তোমার মালিকানায় দিয়েছেন। তুমি কি এ অবলা প্রাণীর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো না? প্রাণীটি আমার কাছে অভিযোগ করছে যে, তুমি তাকে ক্ষুধার্ত রাখো, তাকে কষ্ট দাও। "৯১৩

সাহল বিন হানজালিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি উটের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। দেখলেন, ক্ষুধায় পিঠের সাথে পেট লেগে আছে উটটির। তিনি বললেন, "তোমরা এ অবলা প্রাণীর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। সুস্থ-সবল প্রাণীর ওপর আরোহণ করবে। সুন্দররূপে ভক্ষণ করবে।"৯১৪

আলকামি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ বাণীর মর্ম হচ্ছে, এসব প্রাণী কথা বলতে পারে না যে, ক্ষুধার কথা তোমাদের বলবে। তৃষ্ণার সময় পানি চাইবে। ক্লান্তি ও কষ্টের সময় মুখ ফুটে ব্যথার কথা জানাবে। তাই তোমরা এসব বিষয়ে খেয়াল রাখো এবং তাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো।'

(সুন্দররূপে ভক্ষণ করবে) অর্থাৎ প্রাণীগুলো যখন খাওয়ার উপযুক্ত হবে, হৃষ্টপুষ্ট হবে, তখন সেগুলো জবাই করে খাবে। '৯১৫

মুআজ বিন আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহনে উপবিষ্ট একদল লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাদের বললেন, "তোমরা সুস্থ-সবল প্রাণীর ওপর আরোহণ করো। সুস্থ অবস্থায় বিরাম দাও তাদের। রাস্তায় ও বাজারে আলাপচারিতার জন্য আরোহণের প্রাণীকে চেয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে না। কেননা, অনেক বাহন আল্লাহকে অধিক স্মরণ করার কারণে তার আরোহীর চাইতে উত্তম হয়ে থাকে। "৯১৬

আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "তোমরা তোমাদের বাহনের পশুগুলোকে কথা বলার আসন বানানো থেকে বিরত থাকো। কারণ, তোমরা যেন কষ্টহীনভাবে এক শহর থেকে অন্য শহরে গমন করতে পারো, সে জন্য আল্লাহ এগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। জমিনকে তোমাদের জন্য বাসযোগ্য করেছেন। অতএব, তোমরা জমিনের ওপর বসেই তোমাদের প্রয়োজন পূরণ করো। "৯১৭

টিকাঃ
৯১৩. সুনানু আবি দাউদ: ২৫৪৯।
৯১৪. সুনanu আবি দাউদ: ২৫৪৮।
৯১৫. আওনুল মাবুদ: ৭/১৫৮।
৯১৬. মুসনাদু আহমাদ: ১৫২১৯।
৯১৭. সুনানু আবি দাউদ: ২৫৬৭।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 বাহন-জন্তুর প্রতি নম্রতা অবলম্বনের নির্দেশ দিতেন

📄 বাহন-জন্তুর প্রতি নম্রতা অবলম্বনের নির্দেশ দিতেন


শুরাইহ বিন হানি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) একটি উটের ওপর চড়লেন। উটটি ছিল কঠোর স্বভাবের। তাই আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) কঠিনভাবেই উটটিকে এদিক-ওদিক ফেরাচ্ছিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমার উচিত নম্রতা অবলম্বন করা। "৯১৮

আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যখন তোমরা উর্বর ভূমি দিয়ে সফর করো, তখন উটকে তার অংশ দাও। আর যখন তোমরা শুষ্ক ও খরা প্রান্তর ধরে সফর করো, তখন দ্রুত সফর করো। রাতের বেলার বিশ্রামের সময় রাস্তায় অবতরণ করবে না। কেননা, রাতের রাস্তা ক্ষতিকর জন্তু ও কীটে ভরা থাকে। "৯১৯

উর্বর ভূমি বলতে অধিক চারণভূমি ও ঘাসবহুল অঞ্চল বোঝানো হয়েছে। শুষ্ক ও খরা প্রান্তর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, বৃষ্টিহীন ও দুর্ভিক্ষকবলিত অঞ্চল।

হাদিসের মর্মার্থ: হাদিসে আরোহণের প্রাণীর প্রতি সদয় হওয়া, প্রাণীর কল্যাণের প্রতি খেয়াল রাখার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। হাদিসে বলা হয়েছে, যদি তোমরা উর্বর অঞ্চল ধরে সফর করো, তবে সফরের মাঝে বিশ্রাম দাও। বাহনের প্রাণীটিকে কিছু সময়ের জন্য চারণভূমিতে ছেড়ে দাও। প্রাণীটি চাহিদামতো খেয়ে নেবে। সামনে চলার জন্য প্রস্তুত হবে।

আর যদি দুর্ভিক্ষকবলিত অঞ্চল দিয়ে সফর করতে হয়, তবে দ্রুত গতিতে চলতে থাকো। যাতে উদ্দিষ্ট স্থানে তাড়াতাড়ি পৌঁছা যায় এবং আরোহণের প্রাণীর গায়ে কিছুটা শক্তি অবশিষ্ট থাকে। এ সময়ে সফরের মাঝে বিরতি দিও না। হতে পারে এতে প্রাণীটির ক্ষতি হবে। কারণ, বিরতির সময় প্রাণীটি চারণভূমি তালাশ করে না পেয়ে দুর্বল হয়ে পড়বে। কখনো-বা ক্লান্ত হয়ে চলার শক্তি হারিয়ে ফেলবে।

সফরের সময় সাধারণত রাতের শেষ প্রহরে ঘুম ও বিশ্রামের জন্য বিরতি দেওয়া হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ হাদিসে বলেছেন, 'রাতের বেলার বিশ্রামের সময় রাস্তায় অবতরণ করবে না। কেননা, রাতের রাস্তা ক্ষতিকর জন্তু ও কীটে ভরা থাকে।' সফর ও সফরের বিশ্রামের আদব এটি। রাতের বেলার রাস্তা ঘেরা থাকে বিভিন্ন বিষধর ও হিংস্র কীটপতঙ্গে। রাতের বেলা তাদের চলার জন্য সুবিধাজনক। রাস্তায় পড়ে থাকা হাড়গোড়সহ বিবিধ খাদ্য এরা কুড়িয়ে নেয়। কেউ যদি রাতের বেলা রাস্তার পাশে কাটাতে চায়, তবে এগুলোর শিকার হয়ে পড়ে। তাই রাতের বেলায় সফরের অবতরণের জন্য রাস্তা মোটেই নিরাপদ নয়। উচিত হচ্ছে, রাস্তা থেকে দূরে গিয়ে বিশ্রাম নেওয়া। ৯২০

টিকাঃ
৯১৮. সহিহু মুসলিম: ২৫৯৪।
৯১৯. সহিহু মুসলিম: ১৯২৬।
৯২০. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৩/৬৯।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 জন্তুকে কষ্ট দেওয়া জাহান্নামে প্রবেশের কারণ

📄 জন্তুকে কষ্ট দেওয়া জাহান্নামে প্রবেশের কারণ


রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'জন্তুকে কষ্ট দেওয়াটা অনেক সময় জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হবে।'

আব্দুল্লাহ বিন উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "একটি বিড়ালকে কষ্ট দেওয়ার কারণে এক নারীকে আজাব দেওয়া হয়েছে। সে বিড়ালটিকে বেঁধে রেখেছিল। না তাকে খাবার দিয়েছিল, না পানি দিয়েছিল। জমিনের কীটপতঙ্গ খেয়ে বাঁচার জন্য তাকে একটু ছেড়েও দেয়নি। ফলে বিড়ালকে কষ্ট দেওয়ার কারণে সে জাহান্নামে প্রবেশ করেছে। "৯২১

ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এ হাদিস প্রমাণ করে, বিড়াল হত্যা করা হারাম এবং খাদ্য-পানীয় না দিয়ে বিড়ালকে আটকে রাখাও হারাম। '৯২২

টিকাঃ
৯২১. সহিহুল বুখারি: ৩৪৮২, সহিহু মুসলিম: ২২৪২।
৯২২. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৪/২৪০।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 পশুপাখির প্রতি সদয় হওয়া জান্নাতে যাওয়ার মাধ্যম

📄 পশুপাখির প্রতি সদয় হওয়া জান্নাতে যাওয়ার মাধ্যম


রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'পশুপাখির প্রতি সদয় হওয়া জান্নাতে যাওয়ার মাধ্যম।' আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "একদা এক ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভীষণ পিপাসার্ত হয়ে পড়ল। সে একটি কূপ দেখে সেখানে নেমে পানি পান করে আবার ওপরে উঠে আসলো। তখন লোকটি দেখতে পেল, একটি কুকুর হাঁপাচ্ছে আর পিপাসার জ্বালায় মাটি খাচ্ছে। সে নিজে নিজে বলে উঠল, পিপাসার তাড়নায় আমার যেই অবস্থা হয়েছিল, এই কুকুরটিরও একই অবস্থা হয়েছে। অতঃপর সে পুনরায় কূপে নেমে তার মোজার মধ্যে পানি ভরে নিল। মুখে পানিভর্তি মোজা ধরে নিয়ে কূপ থেকে উঠে এল। এরপর কুকুরকে পানি পান করিয়ে তৃষ্ণা নিবারণ করল।'

কুকুরটি আল্লাহর কাছে লোকটির জন্য কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করল এবং আল্লাহ তাআলা এই অসিলায় লোকটিকে মাফ করে দিলেন।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা শুনে সাহাবায়ে কিরাম বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল, চতুষ্পদ জন্তুর উপকার করলে আমাদের জন্য কোনো প্রতিদান আছে?"

উত্তরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “প্রত্যেক তাজা কলিজার অধিকারীর (জীবিত প্রাণী) ক্ষেত্রেই প্রতিদান রয়েছে।"৯২৩

অর্থাৎ প্রতিটি জীবিত প্রাণীকে পান করানো, আহার করানোসহ প্রভৃতি কল্যাণময় কাজে প্রতিদান রয়েছে। হাদিসে তাজা কলিজার অধিকারী বলার কারণ হচ্ছে, জীব মারা গেলে তার দেহ ও কলিজা শুকিয়ে যায়।

দাউদি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'তাজা কলিজার অধিকারী অর্থাৎ প্রতিটি জীবিত প্রাণীর উপকার করলে প্রতিদান রয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে। এ কথাটি সকল প্রাণীর ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য।'

ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'প্রাণীদের উপকার করার এ ব্যাপকতার সীমা সম্মানযোগ্য প্রাণীগুলোর সাথে বিশেষায়িত। আর এগুলোকেও ততক্ষণ পর্যন্ত মারা হবে না, যতক্ষণ না শরয়ি কোনো কারণ পাওয়া যায়। এসব প্রাণী চাই নিজের মালিকানাধীন হোক বা অন্য কারও মালিকানাধীন কিংবা মালিকানাহীন হোক—সর্বাবস্থায়ই এগুলোকে পানি পান করানো, কিছু খেতে দেওয়াসহ প্রভৃতি উপায়ে এগুলোর প্রতি সদাচরণ করা সাওয়াবের কাজ। '৯২৪

আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "একটি কুকুরের পিপাসায় জান যায় যায় অবস্থা। বেচারা একটি কুয়ার পাশে ঘোরাঘুরি করছে তৃষ্ণায় কাতর হয়ে। তখন বনি ইসরাইলের পতিতাদের এক পতিতা তাকে দেখতে পেল। সে নিজের মোজা কুয়াতে ফেলে পানি তুলে আনল। আর কুকুরটিকে পানি পান করতে দিল। তার এ সদাচরণ দেখে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হলো।"৯২৫

টিকাঃ
৯২৩. সহিহুল বুখারি: ২৩৬৩, সহিহু মুসলিম: ২২৪৪।
৯২৪. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৪/২৪১।
৯২৫. সহিহুল বুখারি: ৩৪৬৭, সহিহ মুসলিম: ২২৪৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00