📄 তিনি ঘোড়া ভালোবাসতেন
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোড়া ভালোবাসতেন, ঘোড়ার যত্ন করতেন এবং অন্যদের এ ব্যাপারে নির্দেশনা দিতেন।
মাকিল বিন ইয়াসার (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'ঘোড়ার চেয়ে অধিক প্রিয় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে অন্য কিছু ছিল না। এরপর তিনি বলে উঠলেন, “হে আল্লাহ, আমায় ক্ষমা করুন। ভুল বলেছি; বরং তাঁর কাছে স্ত্রীই ছিল অধিক প্রিয়।"৯০২
আনাস বিন মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'একদিন দেখা গেল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাদর দিয়ে তাঁর ঘোড়ার মুখ মুছে দিচ্ছেন। এ ব্যাপারে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, “ঘোড়ার ব্যাপারে গত রাতে আমাকে তিরস্কার করা হয়েছে।"৯০৩
আবু ওয়ালিদ সুলাইমান আল-বাজি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'ঘোড়ার মর্যাদা বর্ণনা করতে, ঘোড়ার রক্ষণাবেক্ষণে বিশেষ দৃষ্টি দিতে এবং ঘোড়ার প্রতি উত্তম আচরণ করার গুরুত্ব বোঝানোর জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপন চাদর দিয়ে ঘোড়ার মুখ মুছে দিচ্ছিলেন।'
পূর্বে এমন কিছু দেখা যায়নি বলে তাঁর কাছে এ প্রশ্নটি করা হয়েছিল। প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন, “ঘোড়ার পরিচর্যা করেন না বলে তাঁকে তিরস্কার করা হয়েছে।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ কথা থেকে বোঝা যাচ্ছে, ঘোড়ার রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচর্যা ও যত্ন করার প্রতি আরও গুরুত্ব দেওয়ার জন্য তাঁকে তিরস্কার করা হয়েছে। কারণ, ঘোড়া সাওয়াব ও গনিমতের মাধ্যম। ঘোড়ার মাধ্যমে অনেক সাওয়াব এবং যুদ্ধের ময়দানে গনিমত লাভ হয়। '৯০৪
জারির বিন আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখলাম, তিনি ঘোড়ার কপালের চুল বিন্যাস করছেন আর বলছেন, "ঘোড়ার কপালে কিয়ামত পর্যন্ত কল্যাণ নিহিত আছে। কল্যাণগুলো হচ্ছে, প্রতিদান ও গনিমত। "৯০৫
খাত্তাবি (রাহিমাহুল্লাহ)-সহ মুহাদ্দিসগণ বলেন, 'কপাল বলে এখানে পুরো ঘোড়া উদ্দেশ্য। এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, ঘোড়া লালনপালন করা মুসতাহাব। যুদ্ধের জন্য এবং আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে কিতাল করার উদ্দেশ্যে ঘোড়া ক্রয় করা ও প্রস্তুত করা শরিয়তে প্রশংসনীয় কাজ। ঘোড়া অনেক কল্যাণ ও মর্যাদার অধিকারী। আর এ হাদিস থেকে আরও বোঝা যায়, কিয়ামত পর্যন্ত জিহাদ চলমান থাকবে। '৯০৬
টিকাঃ
৯০২. মুসনাদু আহমাদ: ১৯৮০১। শুআইব আরনাউত-এর মতে হাদিসটি হাসান লি-গাইরিহি। আলবানি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন হাদিসটি জইফ।
৯০৩. সুনানুত তিরমিজি: ১৬৯৬।
৯০৪. আল-মুনতাকা শারহুল মুয়াত্তা: ৩/২১৬।
৯০৫. সহিহু মুসলিম: ১৮৭২।
৯০৬. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৩/১৬।
📄 শিকাল ঘোড়া অপছন্দ করতেন তিনি
আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিকাল ঘোড়া অপছন্দ করতেন। '৯০৭
শিকাল হচ্ছে, ঘোড়ার পেছনের ডান পা ও সামনের বাম পায়ে সাদা রঙের ছটা থাকা। অথবা সামনের ডান পা ও পেছনের বাঁ পায়ে সাদা রঙের ছটা থাকা।
আবু উবাইদ (রাহিমাহুল্লাহ) ও অধিকাংশ ভাষা বিশেষজ্ঞগণ বলেন, 'তিন পা সাদা-শুভ্র এবং এক পা সাধারণ বর্ণের হলে সে ঘোড়াকে শিকাল বলে। অধিকাংশ সময় শিকাল ঘোড়ার তিন পা এক রঙের হয়। এ ব্যাপারে এ ছাড়াও অনেক অভিমত পাওয়া যায়।'
একটি মত হচ্ছে, এ রকম ঘোড়ার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতায় পাওয়া গেছে যে, এগুলো অভিজাত ঘোড়া হয় না। '৯০৮
টিকাঃ
৯০৭. সহিহু মুসলিম: ১৮৭৫।
৯০৮. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৩/১৯।
📄 বিড়ালকে খাওয়াতেন, পান করাতেন এবং আদর করতেন
আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিড়ালের জন্য পানির পাত্র রাখতেন। বিড়াল পানি পান করে নিলে বাকি পানি দিয়ে অজু করে নিতেন তিনি। '৯০৯
আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "বিড়াল অপবিত্র প্রাণী নয়। বিড়াল তোমাদের ঘরে আসা-যাওয়া করে এমন একটি প্রাণী। আর আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখেছি, বিড়ালের পান করা পানির অবশিষ্টাংশ দিয়ে অজু করেছেন তিনি। "৯১০
কাব বিন মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মেয়ে কাবশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) ছিলেন আবু কাতাদা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর পুত্রবধূ। তিনি বলেন, 'একবার আবু কাতাদা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বাইরে থেকে এলে আমি তাঁকে অজুর পানি দিলাম। এ সময় একটি বিড়াল এসে পাত্র থেকে পান করতে লাগলে আবু কাতাদা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) পাত্রটা হেলিয়ে ধরলেন বিড়ালের জন্য। বিড়াল পানি পান করে নিল। কাবশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, "আবু কাতাদা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) দেখলেন, আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে আছি। তিনি বললেন, "তুমি দেখছি, আশ্চর্য হয়েছ!" আমি বললাম, "জি।" তিনি বললেন, "রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "বিড়াল অপবিত্র প্রাণী নয়। সে তো তোমাদের ঘরে আসা-যাওয়া করে এমন একটি প্রাণী।"৯১১
ইমাম বাগাবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হয়তো বিড়ালের সাদৃশ্য দিয়েছেন দাস-দাসীর সাথে। দাস-দাসী সেবার জন্য রাখা হয়। তারা সেবা করার জন্য পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের কাছে যাওয়া-আসা করে। পরিবারের মাঝে তাদের আনাগোনা থাকে। তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন, )طَوَّافُونَ عَلَيْكُمْ( অর্থাৎ “তোমাদের একজনকে অন্যজনের নিকট তো যাতায়াত করতেই হয়।" [সুরা আন-নুর, ২৪: ৫৮]
অথবা হতে পারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিড়ালকে তাদের সাথে সাদৃশ্য দিয়েছেন, যারা কোনো প্রয়োজনের জিনিসটি নেওয়ার জন্য এসে থাকে। মূল কথা হচ্ছে, যে মানুষটি কোনো প্রয়োজনে এসে থাকে, তার প্রয়োজন মেটানো যেমন সাওয়াবের কাজ, তেমনই বিড়ালের প্রয়োজন মেটানোও সাওয়াবের কাজ। '৯১২
টিকাঃ
৯০৯. তাবারানি কৃত আল-আওসাত: ৭৯৪৯।
৯১০. সুনানু আবি দাউদ: ৭৬।
৯১১. সুনানু আবি দাউদ: ৭৫, সুনানুত তিরমিজি: ৯২, সুনানুন নাসায়ি ৮৬, সুনানু ইবনি মাজাহ : ৩৬৭।
৯১২. শারহুস সুন্নাহ: ২/৭০। ঈষৎ পরিমার্জিত।
📄 প্রাণীদের কষ্ট দিতে নিষেধ করতেন
কোনো প্রাণীর ওপর অতিরিক্ত কাজের বোঝা চাপাতে, প্রাণীকে ক্ষুধার্ত রাখতে ও কষ্ট দিতে নিষেধ করতেন।
আব্দুল্লাহ বিন জাফর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন আমাকে তাঁর বাহনের পেছনে বসিয়ে নিলেন। ... এরপর তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারার জন্য এক আনসারি সাহাবির বাগানে প্রবেশ করলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে একটি উট দেখতে পেলেন। উটটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখতে পেয়ে কাঁদতে শুরু করল। তার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়তে থাকল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে আসলেন। উটের মাথার পেছনে হাত বুলিয়ে দিলে উটটি কান্না থামাল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবার জোর আওয়াজে বলতে লাগলেন, "এ উটটি কার? এ উটের মালিক কে?"
তখন এক আনসারি যুবক এগিয়ে এল। বলল, "আমার, হে আল্লাহর রাসুল।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, "এ প্রাণীটি আল্লাহ তোমার মালিকানায় দিয়েছেন। তুমি কি এ অবলা প্রাণীর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো না? প্রাণীটি আমার কাছে অভিযোগ করছে যে, তুমি তাকে ক্ষুধার্ত রাখো, তাকে কষ্ট দাও। "৯১৩
সাহল বিন হানজালিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি উটের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। দেখলেন, ক্ষুধায় পিঠের সাথে পেট লেগে আছে উটটির। তিনি বললেন, "তোমরা এ অবলা প্রাণীর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। সুস্থ-সবল প্রাণীর ওপর আরোহণ করবে। সুন্দররূপে ভক্ষণ করবে।"৯১৪
আলকামি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ বাণীর মর্ম হচ্ছে, এসব প্রাণী কথা বলতে পারে না যে, ক্ষুধার কথা তোমাদের বলবে। তৃষ্ণার সময় পানি চাইবে। ক্লান্তি ও কষ্টের সময় মুখ ফুটে ব্যথার কথা জানাবে। তাই তোমরা এসব বিষয়ে খেয়াল রাখো এবং তাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো।'
(সুন্দররূপে ভক্ষণ করবে) অর্থাৎ প্রাণীগুলো যখন খাওয়ার উপযুক্ত হবে, হৃষ্টপুষ্ট হবে, তখন সেগুলো জবাই করে খাবে। '৯১৫
মুআজ বিন আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহনে উপবিষ্ট একদল লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাদের বললেন, "তোমরা সুস্থ-সবল প্রাণীর ওপর আরোহণ করো। সুস্থ অবস্থায় বিরাম দাও তাদের। রাস্তায় ও বাজারে আলাপচারিতার জন্য আরোহণের প্রাণীকে চেয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে না। কেননা, অনেক বাহন আল্লাহকে অধিক স্মরণ করার কারণে তার আরোহীর চাইতে উত্তম হয়ে থাকে। "৯১৬
আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "তোমরা তোমাদের বাহনের পশুগুলোকে কথা বলার আসন বানানো থেকে বিরত থাকো। কারণ, তোমরা যেন কষ্টহীনভাবে এক শহর থেকে অন্য শহরে গমন করতে পারো, সে জন্য আল্লাহ এগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। জমিনকে তোমাদের জন্য বাসযোগ্য করেছেন। অতএব, তোমরা জমিনের ওপর বসেই তোমাদের প্রয়োজন পূরণ করো। "৯১৭
টিকাঃ
৯১৩. সুনানু আবি দাউদ: ২৫৪৯।
৯১৪. সুনanu আবি দাউদ: ২৫৪৮।
৯১৫. আওনুল মাবুদ: ৭/১৫৮।
৯১৬. মুসনাদু আহমাদ: ১৫২১৯।
৯১৭. সুনানু আবি দাউদ: ২৫৬৭।