📄 তাদের কেউ ভুল করলে নরম ভাষায় শুধরে দিতেন
ছোটদের কেউ ভুল করলে তাদের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আচরণের মূলনীতি ছিল নির্দেশনামূলক। ছোটদের কম বয়স হিসেবে তাদের যেভাবে শুধরানো দরকার, সেভাবে তাদের শুধরে দিতেন তিনি।
আবু রাফি বিন আমর গিফারি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'বাল্যকালে একবার আনসারদের খেজুর গাছে ঢিল ছুড়ছিলাম আমি। তারা আমাকে ধরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে নিয়ে গেলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, "বেটা, খেজুর গাছে ঢিল মারো কেন?"
আমি বললাম, "ক্ষুধার জ্বালায়, হে আল্লাহর রাসুল।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তবে খেজুর গাছে ঢিল মারবে না। গাছের নিচে যা পড়বে, সে খেজুরগুলো খাবে।"
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, "আল্লাহ তোমাকে পরিতৃপ্ত করুন। তোমার তৃষ্ণা নিবারণ করুন।"৮৭৫
টিকাঃ
৮৭৫. সুনানুত তিরমিজি: ১২৮৮, মুসনাদু আহমাদ: ১৯৮৩০।
📄 তাদের সঙ্গে স্নেহভরা বাক্যে কথা বলতেন
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছোটদেরকে তাদের সবচেয়ে সুন্দর নাম বা কুনিয়াত বা বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে ডাকতেন। কখনো কোনো শিশুকে ডাকার সময় বলতেন 'বেটা, আমি তোমাকে কিছু বাক্য শেখাব।' কখনো-বা বলতেন, 'বেটা, আল্লাহর নাম নাও। ডান দিক থেকে খাও।'
কখনো ডাকতেন 'বৎস' বলে। যেমন: হিজাবের আয়াত নাজিল হওয়ার পর আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে বলেছিলেন, 'বৎস, তোমার পেছনে। '৮৭৬
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চাচাতো ভাই জাফর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ঘরে এসে তার সন্তানদের ডাকার নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, 'তোমরা আমার ভাইয়ের প্রিয় সন্তানদের ডেকে দাও।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো তাদের কুনিয়ত ধরে ডেকেছিলেন। যেমন: এক ছোট শিশুকে 'হে আবু উমাইর' বলে ডেকেছিলেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কত আদর করে, স্নেহভরা কণ্ঠে শিশু ও কিশোর সাহাবিদের ডাকতেন! কিন্তু আজ মুসলিমদের মাঝে ভর করে নিয়েছে কঠোরতা। তারা শিশুদের সাথে কঠোর আচরণ করে বসে প্রায় সময়।
টিকাঃ
৮৭৬. মুসনাদু আহমাদ: ১১৯৫৮।
📄 দায়িত্ব গ্রহণে শিশুদের প্রস্তুত করতেন
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দায়ভার গ্রহণের জন্য শিশুদের প্রস্তুত করতেন। কেননা, আজকে যারা শিশু, তারাই ভবিষ্যতে উম্মাহর কর্ণধার।
আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আমি কিছু ছেলের সাথে খেলছিলাম। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে আসলেন। সালাম দিলেন আমাদের। এরপর আমাকে একটি প্রয়োজনে পাঠালেন। যার কারণে মায়ের কাছে যেতে যেতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। মায়ের কাছে যখন গেলাম, তিনি জানতে চাইলেন, "দেরি হলো কেন?"
আমি বললাম, “রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি প্রয়োজনে পাঠিয়েছিলেন আমাকে।"
মা জানতে চাইলেন, "কী সে প্রয়োজন?"
আমি জানালাম, "বিষয়টা গোপনীয়।"
মা বললেন, “আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গোপনীয় বিষয় কাউকে জানাবে না কখনো।"
একটু পর আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর এক ছাত্র তার কাছে গোপনীয় বিষয়টি জানতে চাইলেন। আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তখন বললেন, "আল্লাহর শপথ, যদি সে বিষয়টি কাউকে বলতাম, তবে অবশ্যই তোমাকে তা জানাতাম আমি।"৮৭৭
অন্য বর্ণনায় এসেছে, আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে গোপন একটি বিষয় গচ্ছিত রাখলেন। কাউকেই আমি সে বিষয়টি জানাইনি কখনো। আমার মা উম্মে সুলাইম (রাদিয়াল্লাহু আনহা) জিজ্ঞেস করলে তাকেও জানাইনি। '৮৭৮
ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'কতিপয় আলিম বলেন, মনে হয় গোপনীয় বিষয়টি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের বিষয়ে ছিল। যদি এ বিষয়টি আদৌ উম্মাহর জন্য উপকারী হতো, তবে আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) অবশ্যই তা প্রকাশ করতেন। '৮৭৯
হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়:
* রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন অনুপম চরিত্রের অধিকারী। বিনয় ছিল তাঁর চরিত্রের ভূষণ। তাঁর বিনয়-নম্রতা এতটা উচ্চ ছিল যে, তিনি বাজারে খেলাধুলায় রত শিশুদের পর্যন্ত সালাম দিতেন অনায়াসে।
* কারও পাশ দিয়ে গমন করার সময় যদিও তারা শিশুই হোক না কেন, তাদের সালাম দেওয়া সুন্নাত।
* কোনো শিশু বিশ্বস্ত হলে প্রয়োজনে তাকে গোপন কাজে পাঠানো জায়িজ।
টিকাঃ
৮৭৭. সহিহু মুসলিম: ২৪৮২।
৮৭৮. সহিহুল বুখারি: ৬২৮৯।
৮৭৯. ফাতহুল বারি: ১১/৮২।
📄 শিশুদের ব্যক্তিত্ব গঠন করতেন
শিশুদের প্রতিপালনের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো শিশুদের ব্যক্তিত্ব গঠন করা। কিন্তু অধিকাংশ বাবারাই উদাসীন এ ব্যাপারে। অথচ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুদের মর্যাদা দিতেন, তাদের ব্যক্তিত্ব গঠন করতেন তিনি। অনেক ক্ষেত্রে অন্য দশজন বড় ব্যক্তির সাথে যেমন আচরণ করতেন, শিশুদের সাথেও তেমনই ব্যবহার করতেন। এভাবে তাদের ব্যক্তিত্ব গঠনের প্রক্রিয়া চলতে থাকত।
সাহল বিন সায়িদি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পানীয় নিয়ে আসলেন। নিজে কিছুটা পান করলেন। উপস্থিত লোকদের মাঝে সবার ডানে ছিল একটি বালক। আর বাম দিকে ছিল বৃদ্ধরা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বালকটিকে বললেন, "বড়দের আগে দেওয়ার জন্য তুমি কি আমায় অনুমতি দেবে?"
সে বলল, "না, আল্লাহর শপথ, হে আল্লাহর রাসুল! আপনার কাছ থেকে আমার পাওনাতে আমি অন্য কাউকে প্রাধান্য দেবো না।"
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছেলেটির হাতে পানীয়ের বাটিটি দিলেন। '৮৮১
শিশুদের ব্যক্তিত্বকে সম্মান করার ফলে তারা আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়। তাদের অন্তরে জাগে প্রশান্তির সমীরণ। তাদের প্রতিভায় প্রবৃদ্ধি আসে। অন্যদিকে শিশুদের অবজ্ঞা করতে থাকলে, তাদেরকে তাদের প্রাপ্য মর্যাদা না দেওয়ার ফলে মনের ভেতরে তারা বাধা অনুভব করে। নিচুতা ও হীনতায় পর্যবসিত হয় তাদের ব্যক্তিত্ব। তাদের মনের ভেতর কাজ করে প্রবল হীনম্মন্যতা।
টিকাঃ
৮৮০. ইবনে উসাইমিন কৃত শারহু রিয়াজিস সালিহিন: ৪/৪১-৪৪। ঈষৎ পরিমার্জিত।
৮৮১. সহিহুল বুখারি: ২৩১৯, সহিহু মুসলিম: ২০৩০।