📄 শিশুদের সাথে খেলাধুলা ও হাসিকৌতুক করতেন
খালিদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কন্যা উম্মে খালিদ (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'অনেকগুলো কাপড় আসলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে। তাতে কালো নকশাদার একটি কাপড় ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের বললেন, "বলো, এ নকশি কাপড়টি কাকে পরাব?"
সাহাবিগণ চুপ হয়ে থাকলেন।
এরপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "উম্মে খালিদকে এখানে নিয়ে আসো।"
আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে আসা হলো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে আমাকে পরিয়ে দিলেন কাপড়টি। আর বললেন, "এটি পুরাতন করে ফেলো।"
এরপর তিনি নকশার দিকে তাকাতে লাগলেন এবং হাত দিয়ে ইশারা করে বললেন, "উম্মে খালিদ, এটা সানা। হে উম্মে খালিদ, এটা সানা।" সানা একটি হাবশি শব্দ, যার অর্থ সুন্দর। ৮৪৯
উম্মে খালিদ (রাদিয়াল্লাহু আনহা) হাবশায় হিজরত করেছিলেন নিজ পরিবারের সাথে। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাথে হাস্যরস করলেন হাবশি ভাষা ব্যবহার করে।
(এটি পুরাতন করে ফেলো): আরবরা এ কথাটি ব্যবহার করত দোয়ার অর্থে। এর মর্মার্থ হচ্ছে, দীর্ঘজীবী হও। ৮৫০
ইমাম বুখারি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'উম্মে খালিদ (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর মতো দ্বিতীয় কোনো নারী এতটা সময় বেঁচে থাকেনি। '৮৫১
শিশুদের প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদরঃস্নেহ করে হাস্যরসের আরকটি উদাহরণ বর্ণনা করেছেন আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)। তিনি বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে সালামা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর কন্যা জাইনাবকে স্নেহ করে ডাকতেন "হে জুয়াইনাব, হে জুয়াইনাব” বলে। '৮৫২
ইবনুল কাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'একদিন ছোট্ট জাইনাব রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘরে আসলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন গোসল করছিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পানির ছিটা মারলেন তার মুখে। জাইনাব একসময় বৃদ্ধা হয়ে গেলেও সে পানির বরকতে তার চেহারা যুবতিদের মতো সুন্দর ও কমনীয় ছিল। '৮৫৩
মাহমুদ বিন রবি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আমার স্মরণ আছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার বালতি থেকে মুখে পানি নিয়ে তা আমার মুখে মারলেন। তখন আমার বয়স ছিল পাঁচ বছর। '৮৫৪
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহচর্যের বরকতের কারণেই বড় হওয়ার পর মাহমুদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কেবল এ ঘটনাটিই মনে ছিল। আর কেবল এ কারণেই মাহমুদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে সাহাবিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুলির মতো করে দূর থেকে পানি নিক্ষেপ করেছিলেন মাহমুদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ওপর। মাহমুদের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ কাজটি হয়তো খেলাচ্ছলে ছিল অথবা মাহমুদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে বরকত দানের জন্য ছিল। যেমনটি তিনি সাহাবিদের সন্তানদের সাথে করতেন।'
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, কথাবার্তার মজলিসগুলোতে শিশুদের নিয়ে উপস্থিত হতে কোনা বাধা নেই। আমির তার অধীন সঙ্গীদের ঘরে যেতে পারেন, তাদের শিশুসন্তানদের সাথে খেলাধুলা ও ঠাট্টা করতে পারেন। ৮৫৫
টিকাঃ
৮৪৯. সহিহুল বুখারি: ৫৮৪৫।
৮৫০. ফাতহুল বারি: ১০/২৮০।
৮৫১. ফাতহুল বারি: ৬/১৮৪।
৮৫২. জিয়া কৃত আল-মুখতারা: ১৭৩৩। হাদিসের মান: সহিহ।
৮৫৩. ইবনুল কাইয়িম কৃত সুনানু আবি দাউদের হাশিয়া: ১/১২২, ইবনে আব্দুল বার কৃত আল-ইসতিআব: ৪/১৮৫৫।
৮৫৪. সহিহুল বুখারি: ৭৭।
৮৫৫. ফাতহুল বারি: ১/১৭৩। ঈষৎ পরিমার্জিত।
📄 সদ্য দুধ ছাড়ানো শিশুর সাথেও হাস্যরস করতেন
আনাস বিন মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সবচেয়ে সুন্দর চরিত্রের মানুষ। আমার একটি ছোট ভাই ছিল। তার নাম ছিল আবু উমাইর। সে ছিল সদ্য দুধ ছাড়ানো শিশু। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে যখন সে আসত, স্নেহভরা কণ্ঠে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলতেন, "হে আবু উমাইর, কোথায় তোমার নুগাইর?"৮৫৬ নুগাইর ছিল আবু উমাইরের একটি পাখি। তিনি এ পাখি নিয়ে খেলতেন।'
হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়:
* যার সন্তান নেই, তার কুনিয়াত (শুরুতে আবু বা উম্মু সংযুক্ত উপনাম) রাখা বৈধ।
* শিশুদের জন্য এমন কুনিয়াত ব্যবহার করা মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত নয়।
* পাপের সংমিশ্রণ না রেখে কৌতুক করা বৈধ।
* তাসগির বা ছোট অর্থবোধক শব্দ নিয়ে নাম রাখা বৈধ।
* চড়ুই পাখি ইত্যাদি নিয়ে শিশুদের খেলাধুলা করা জায়িজ। আর শিশুর অভিভাবক শিশুর জন্য এমন পাখির ব্যবস্থা করতে কোনো অসুবিধে নেই।
* কৃত্রিমতাহীন সুন্দর বচনে ছন্দাকারে কথা বলা জায়িজ।
* শিশুদের স্নেহ করতে হবে। আদর-সোহাগে আগলে রাখতে হবে তাদের।
* রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উত্তম চারিত্র, তাঁর উন্নত গুণাবলি ও বিনয়-নম্রতার প্রমাণ।
* আত্মীয়দের সাথে সাক্ষাৎ করতে যেতে হবে। আবু উমাইরের মা উম্মে সুলাইম (রাদিয়াল্লাহু আনহা) ছিলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাহরাম। ৮৫৭
টিকাঃ
৮৫৬. সহিহুল বুখারি: ৬২০৩, সহিহু মুসলিম: ২১৫০।
৮৫৭. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৪/১২৯।
📄 আনাস -এর সাথেও হাস্যরস করে কথা বলতেন
আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায়ই আমাকে "হে দুই কানওয়ালা” বলে ডাক দিতেন। '৮৫৮
অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর সাথে কৌতুক করে কথা বলতেন।
টিকাঃ
৮৫৮. সুনানু আবি দাউদ: ৫০০২, সুনানুত তিরমিজি: ১৯৯২।
📄 শিশুদের মাঝে প্রতিযোগিতা দিতেন
শিশুদের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেলাধুলার একটি অংশ ছিল, তাদের মাঝে প্রতিযোগিতা করানো।
'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর পরিবারের আব্দুল্লাহ, উবাইদুল্লাহ-সহ আরও অনেককে একটি সারিতে দাঁড় করাতেন। এরপর বলতেন, "যে আমার কাছে প্রথমে দৌড়ে আসবে, তার জন্য এ এ পুরস্কার।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা শুনে তারা প্রতিযোগিতা করে দৌড় দিত। কেউ এসে তাঁর পিঠে চড়ে যেত, কেউবা তাঁর বুকে চড়ে উঠত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাউকে জড়িয়ে ধরতেন। '৮৫৯ তাদের কাউকে চুমু খেতেন,
টিকাঃ
৮৫৯. মুসনাদু আহমাদ: ১৮৩৯। মাজমাউজ জাওয়াদে (৯/২৮৫) হাদিসটির সনদ হাসান বলা হয়েছে।