📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের জন্য শরিয়তের অনেক বিধান শিথিল করে দিতেন

📄 তাদের জন্য শরিয়তের অনেক বিধান শিথিল করে দিতেন


* বয়স্ক ব্যক্তি দুর্বল হয়ে গেলে তার পক্ষে অন্য কেউ হজ আদায় করে দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে

ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'খাসআম গোত্রের এক নারী এসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলল, "হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার ওপর হজ করা ফরজ। আমার বাবা বেশ বৃদ্ধ। বাহনে চড়া তার জন্য অসম্ভব ব্যাপার। আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ আদায় করব?"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, "হাঁ।"৮১৪

* বার্ধক্যের কারণে রোজার মাধ্যমে কাফফারা দিতে অক্ষম হলে মিসকিনকে খানা খাইয়ে কাফফারা আদায়ের সুযোগ রয়েছে

খাওলা বিনতে সালাবা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর হাদিসে আমরা স্পষ্ট দেখেছি। জিহারের কারণে তার স্বামী আওস বিন সামিত (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ওপর রোজা আদায় করা ফরজ হলেও খাওলা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) স্বামীর অপরাগতার কথা তুললেন। খাওলা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, "তার কাছে যাও, তাকে বলো, একটি দাস মুক্ত করতে।"

আমি বললাম, "আল্লাহর শপথ, হে আল্লাহর রাসুল, তার সে সামর্থ্য নেই।"

তাহলে সে ধারাবাহিক দুমাস রোজা রাখবে।

আল্লাহর শপথ, হে আল্লাহর রাসুল, তিনি তো বেশ বৃদ্ধ। রোজা রাখার সামর্থ্যও তার নেই।

তাহলে সে যেন এক অসাক খেজুর ষাটজন মিসকিনকে খাওয়ায়।

আল্লাহর শপথ, হে আল্লাহর রাসুল, তার এমন সামর্থ্যও নেই।

তাহলে আমি তাকে এক আরক পরিমাণ খেজুর দিয়ে সাহায্য করব।

খাওলা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, তখন আমি বললাম, "হে আল্লাহর রাসুল, আমিও তাকে এক আরক খেজুর দিয়ে সাহায্য করব।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি সঠিক করেছ, উত্তম করেছ। তাহলে যাও, তার পক্ষ থেকে সাদাকা করে দাও। আর তোমার স্বামীর ব্যাপারে কল্যাণকামী হও।"

খাওলা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'এরপর আমি তেমনই করলাম, যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ করেছেন। '৮১৫

* বৃদ্ধদের দুর্বলতার প্রতি লক্ষ রেখে সালাত সংক্ষিপ্ত করার আদেশ দিতেন

আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "তোমাদের কেউ মানুষদের ইমামতি করলে, সে যেন সালাত দীর্ঘায়িত না করে। কারণ, মুক্তাদিদের মধ্যে দুর্বল, অসুস্থ এবং বয়স্ক থাকতে পারে। অপরপক্ষে, একাকী সালাত আদায় করার সময় নিজের ইচ্ছেমতো লম্বা সময় নিয়ে সালাত আদায় করতে পারে সে।"৮১৬

টিকাঃ
৮১৪. সহিহুল বুখারি: ১৫১৩, সহিহু মুসলিম: ১৩৩৪।
৮১৫. মুসনাদু আহমাদ ২৬৭৭৪, সুনানু আবি দাউদ: ২২১৪।
৮১৬. সহিহুল বুখারি: ৬৭১, সহিহু মুসলিম ৪৬৮।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 বৃদ্ধদেরকে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন

📄 বৃদ্ধদেরকে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন


বৃদ্ধরা মৃত্যুর নিকটবর্তী। তাই তাওবা করা এবং আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া অপরিহার্য তাদের জন্য। আল্লাহ তাআলা বলেন:

أَوَلَمْ نُعَمِّرْكُم مَّا يَتَذَكَّرُ فِيهِ مَن تَذَكَّرَ وَجَاءَكُمُ النَّذِيرُ فَذُوقُوا فَمَا لِلظَّالِمِينَ مِن نَّصِيرٍ

'আমি কি তোমাদের এত দীর্ঘ জীবন দান করিনি যে, তখন কেউ সতর্ক হতে চাইলে সতর্ক হতে পারতে? তোমাদের নিকট তো সতর্ককারীরাও এসেছিল। সুতরাং শাস্তি আস্বাদন করো; জালিমদের কোনো সাহায্যকারী নেই। '৮১৭

ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'সতর্ককারীর অর্থ হচ্ছে চুল পেকে যাওয়া। '৮১৮

আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "আল্লাহ যাকে অধিক আয়ু দিয়েছেন, এমনকি সে ষাট বছর বয়সে উপনীত হয়েছে, তার জন্য ওজর পেশ করার কোনো সুযোগ রাখেননি তিনি। "৮১৯

ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, '(ওজর পেশ করার কোনো সুযোগ রাখেননি): তথা আল্লাহর কাছে গিয়ে "আপনি যদি আমার জীবনকালটা আরেকটু দীর্ঘ করতেন, তবে আপনার আদেশগুলো পালন করতে পারতাম আমি" বলে ওজর পেশ করার কোনো সুযোগ নেই।'

কোনো বৃদ্ধের জন্য আল্লাহর আনুগত্য না করে যেহেতু এতটুকু ওজর পেশ করারও সুযোগ বাকি নেই, তাই তার জন্য জীবনে অর্জিত আমলের কবুলিয়াত কামনা করা, ইসতিগফার করে যাওয়া, আখিরাতের জন্য পরিপূর্ণরূপে নিজেকে আল্লাহর আনুগত্যে সঁপে দেওয়া উচিত। '৮২০

ইবনে বাত্তাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আল্লাহ তাকে ষাট বছরের দীর্ঘ এক জীবন দিয়ে সমাপ্তি ঘটিয়েছেন সকল ওজরের। কারণ, ষাট বছর বয়স জীবন সমাপ্তির ঘোষণা। এ বয়সটা আল্লাহমুখী হওয়ার বয়স। এ বয়সটা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করার বয়স। এ বয়সটা মৃত্যু ও আল্লাহর সাক্ষাতের অপেক্ষায় থাকার বয়স।'

ষাট বছর পর্যন্ত জীবন প্রলম্বিত হওয়া আদম-সন্তানের জীবনে আরেকটি সুযোগ। এমন সুযোগ তার জীবনে বহুবারই গত হয়েছে। প্রথমে সে ছিল অবুঝ, আল্লাহ তাকে বোধশক্তি দিয়ে তার একটি ওজরের সুযোগ নিঃশেষ করেছেন। এভাবে একে একে বারবার আল্লাহর দিকে ফিরে আসার সুযোগ দিয়ে আল্লাহ তার ওজরগুলো সমাপ্ত করেছেন। শেষ পর্যন্ত তাকে বৃদ্ধ বয়সে উপনীত করেছেন। কিন্তু তার ওপর প্রমাণ সাব্যস্ত করার আগ পর্যন্ত তাকে কোনো শাস্তি দেননি তিনি। '৮২১

টিকাঃ
৮১৭. সুরা ফাতির, ৩৫: ৩৭।
৮১৮. তাফসিরু ইবনি কাসির ৬/৪৯৩। বুখারি (রাহিমাহুল্লাহ) এ কিতাবুর রিকাকে এ হাদিসটি তালিকে এনেছেন।
৮১৯. সহিহুল বুখারি: ৬০৫৬।
৮২০. ফাতহুল বারি: ১১/২৪০।
৮২১. শারহু সহিহিল বুখারি: ১০/১৫৩।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 দুনিয়াসক্তি ও সম্পদ জমা করা থেকে তাদের সতর্ক করতেন

📄 দুনিয়াসক্তি ও সম্পদ জমা করা থেকে তাদের সতর্ক করতেন


আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'দুটি বিষয়ে একজন বৃদ্ধের মনেও যুবকের মতো আকর্ষণ বিরাজ করে। এক. দীর্ঘ জীবনের আশা। দুই. সম্পদ-প্রাচুর্যের লোভ। '৮২২

বুখারির বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'দুটি বিষয়ে বৃদ্ধের মনে যুবকের মতো প্রাণবন্ত আশা থাকে। অপরটি হচ্ছে, দীর্ঘ জীবনের আশা।'

হাদিসের মর্মার্থ: 'যুবকের অন্তরের ভালোবাসা তাকে দিয়ে যেকোনো কিছু করিয়ে নিতে পারে; তেমনই বৃদ্ধের অন্তরও সম্পদের প্রতি এমন ভালোবাসা পোষণ করে, যার কারণে যেকোনো কিছু করতে পারে সে। ৮২৩

আনাস বিন মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "আদম-সন্তান বুড়িয়ে যায়, কিন্তু দুটি বিষয় তার মাঝে যৌবনপ্রাপ্ত হতে থাকে। একটি হচ্ছে, সম্পদের লোভ। অপরটি হচ্ছে, জীবনের আশা।"৮২৪

(বুড়িয়ে যায়): তথা তার চুল পেকে যেতে থাকে এবং সে দুর্বল হতে থাকে।

(যৌবন প্রাপ্ত হতে থাকে): অর্থাৎ যৌবন বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং শক্তিশালী হতে থাকে। (তার মাঝে) তথা তার চরিত্রের মাঝে। (সম্পদের লোভ): তথা সম্পদ জমা করা ও তা দান না করার স্বভাব। (জীবনের আশা): তথা দীর্ঘ জীবনের আশা। ৮২৫

ইমাম কুরতুবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এ হাদিসে দীর্ঘ জীবন ও অধিক ধনসম্পদের আশা করার প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এগুলো প্রশংসনীয় নয় মোটেই।'

প্রশ্ন হতে পারে, কেবল এ দুটিকেই কেন বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে? উত্তর হচ্ছে, এ দুটিকে বিশেষভাবে উল্লেখ করার পেছনে রয়েছে গভীর প্রজ্ঞা। মানুষের নিকট সবচেয়ে পছন্দসই বিষয় তার জীবন। মানুষ বেঁচে থাকতে চায়। তাই তার কাছে দীর্ঘ জীবন পছন্দনীয়। আর মানুষ জীবনের পরে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে তার সম্পদকে। কারণ, সম্পদের মাধ্যমে দেহের সুস্থতা নিশ্চিত করতে পারে সে। সুস্থ থাকলেই তো সে দীর্ঘ জীবন পাবে-অন্তত স্বাভাবিকভাবে এমনটিই তো হয়ে থাকে। কিন্তু জীবন ও সম্পদ নিয়ে দীর্ঘ আশায় লিপ্ত ব্যক্তি যখনই দেখে যে, তার প্রিয় দুটি বিষয় নিঃশেষের পথে; তখন আরও বেশি আকর্ষণ ও ভালোবাসা সৃষ্টি হয় এ দুটির প্রতি এবং এগুলোর স্থায়িত্বের প্রতি সৃষ্টি হয় আরও বেশি আগ্রহ। '৮২৬

টিকাঃ
৮২২. সহিহুল বুখারি: ৬৪২০, সহিহু মুসলিম: ১০৪৬।
৮২৩. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৭/১৩৮।
৮২৪. সহিহুল বুখারি: ৬৪২১, সহিহু মুসলিম: ১০৪৭।
৮২৫. তুহফাতুল আহওয়াজি: ৬/৫২০।
৮২৬. ফাতহুল বারি: ১১/২৪১।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 বৃদ্ধদের গুনাহকে বেশি মারাত্মক সাব্যস্ত করতেন

📄 বৃদ্ধদের গুনাহকে বেশি মারাত্মক সাব্যস্ত করতেন


আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "কিয়ামতের দিন তিন শ্রেণির মানুষের সাথে আল্লাহ একটুও কথা বলবেন না, তাদের পবিত্রও করবেন না এবং তাদের দিকে তাকাবেনও না; বরং তাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেবেন তিনি। সে তিন শ্রেণি হলো-এক. বৃদ্ধ জিনাকারী। দুই. মিথ্যাবাদী শাসক। তিন. অহংকারী ভিক্ষুক। "৮২৭

এ হাদিসটিতে বৃদ্ধ জিনাকারী, মিথ্যাবাদী শাসক ও অহংকারী ভিক্ষুকের জন্য এক প্রচণ্ড ধমক রয়েছে।

আর এ তিনটি শ্রেণিকেই বিশেষভাবে শাস্তির কথা শোনানোর কারণ হচ্ছে, এদের সকলের কাছ থেকেই উল্লেখিত অপরাধগুলো দূরে ছিল; তা সত্ত্বেও তারা সে অপরাধে লিপ্ত হয়েছে। এমন অপরাধ করার কোনো প্রয়োজনও ছিল না তাদের। স্ব স্ব ক্ষেত্রে অপরাধ প্ররোচনায় দুর্বল ছিল। যদিও তাদের সবাইকেই অপরাধের শাস্তি দেওয়া হবে। যেহেতু এসব অপরাধের প্রয়োজন ও অপরাধের প্রতি শক্ত প্ররোচনা ছিল না তাদের, তাই তাদের এ অপরাধ হচ্ছে হঠকারিতা ও আল্লাহর আজাবকে তুচ্ছজ্ঞান করার শামিল। ৮২৮

টিকাঃ
৮২৭. সহিহু মুসলিম: ১০৭।
৮২৮. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ২/১১৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00