📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 সাহাবিগণ যথাযথভাবে বয়স্কদের অধিকার আদায় করতেন

📄 সাহাবিগণ যথাযথভাবে বয়স্কদের অধিকার আদায় করতেন


ইবনে কাসির (রাহিমাহুল্লাহ) তালহা বিন উবাইদুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর একটি কথা উল্লেখ করেন, 'প্রচণ্ড অন্ধকার এক রাতে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) একটি বাড়িতে প্রবেশ করেন। পরদিন সকালে আমি সে বাড়িতে উপস্থিত হই। সে বাড়িতে দেখি, অন্ধ এক বৃদ্ধা বসে আছেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, "আপনার কাছে এ লোকটি এসেছিল কেন?"

তিনি উত্তর দিলেন, "সে এত এত সময় ধরে আমার সেবা করে। আমার জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যগুলো এনে দেয়। আমার কষ্ট দূর করে দেয়।"৭৯৫

বয়স্কদের প্রতি এমন যত্ন-আত্তি ও শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণের উদাহরণগুলো অমুসলিম সমাজের জন্য বড়ই লজ্জাজনক। কারণ, তারা নিজ সমাজের বয়স্কদের সমাদর করে না, তাদের প্রতি সদাচরণ করে না। অমুসলিম সমাজে বয়স্করা এমনভাবে জীবনযাপন করে; যেন এ পৃথিবীতে তাদের আত্মীয় বলতে কখনো কেউ ছিল না।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে বয়স্কদের অধিকার লুণ্ঠিত হচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে। অবহেলা ও দারিদ্র্যের মাঝে কাটছে তাদের জীবন। বয়স্কদের বৃহৎ একটা অংশ তাদের জীবন পার করছে কোনো ধরনের জীবনোপকরণ ব্যতীত।

৩২টি রাষ্ট্রে জরিপ চালিয়ে 'বয়স্কদের অবস্থা ২০০২' শিরোনামে একটি গবেষণা নথিভুক্ত হয়েছে। এতে উঠে এসেছে এক চরম সত্য। বয়স্কদের অনেকেই সঠিক চিকিৎসা ও শিক্ষার অভাবে ভুগছে। সরকার এবং বাজেট প্রণেতারা তাদের ভুলে গেছে। তাই মানবেতর জীবনযাপন করছে এ শ্রেণিটি।

গবেষকদের একজন বলেন, 'যখন আপনার বয়সসীমা ষাট ছোঁয়, আপনার সাথে এমন আচরণ করা হবে, যেন আপনি মানুষই নন।'

এমনকি কোনো কোনো পাষাণ হৃদয়ের মানুষ বয়স্কমুক্ত পৃথিবী চায়। কারণ, বয়স্করা কোনো ধরনের উপকারে আসে না। তারা নাকি কেবলই একটা বোঝা!

বিষয়টা আরও জটিল আকার ধারণ করছে। কারণ, সারা বিশ্বে বয়স্কদের সংখ্যা বেড়ে চলেছে প্রতিনিয়ত।

বিশ্বব্যাপী পরিচালিত এ পরিসংখ্যান অনুযায়ী :

* বিংশ শতাব্দী বয়স্কদের সংখ্যা বৃহৎ পরিসরে বৃদ্ধি পেতে দেখেছে পৃথিবীর অধিকাংশ রাষ্ট্রে।
* ১৪০০ হিজরি মোতাবেক ১৯৮০-ইসায়িতে বিশ্বে বয়স্কদের সংখ্যা ছিল ৩৭৬ মিলিয়ন।
* ১৪১০ হি./১৯৯০ ইসায়িতে এ সংখ্যা ৮% বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ৪২৭মিলিয়নে।
* ১৪২০ হি./২০০০ সালে বয়স্কদের সংখ্যা পৌঁছে যায় ৫৯০ মিলিয়নে।
* ধারণা করা হচ্ছে, ১৪৪০ হি./২০২০ সাল ৭৯৬ নাগাদ বয়স্কদের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে পৌঁছে যাবে ১১৭১ মিলিয়নে। ফলে পৃথিবীবাসীর মধ্যে ২৫%-ই হবে বৃদ্ধ। ৭৯৭

বর্তমান ইউরোপীয় সমাজের মূল জনসংখ্যা বুড়িয়ে যাচ্ছে সময়ের সাথে সাথে। অন্যদিকে তাদের জন্মহারও কম। সে জন্য আপনি তাদের মাঝে যুবকদের সংখ্যা কমই পাবেন।

পক্ষান্তরে আমাদের মুসলিম সমাজে আপনি যুবকদের সংখ্যা পাবেন তাদের চেয়ে বেশি। কারণ, আমাদের জন্মহার তাদের চেয়ে ঢের বেশি।

ইউরোপের বৃদ্ধরা তাদের সন্তানদের থেকে কেবল কটু আচরণই পায়। সমাজ তাদের অবহেলা করে। তাই তারা বলে, বৃদ্ধ হলে যখন আমাদের পরিণতি এমন হয়, তবে কেন সন্তান জন্মদান ও সন্তান পালন! এর চেয়ে কুকুরই ঢের ভালো। তাই অবাধ্য সন্তানের চাইতে কুকুর প্রতিপালনের প্রতিই বেশি ঝুঁকছে তারা।

এ জন্যই আমরা তাদের কুকুরপ্রীতি ও কুকুর লালনপালনের প্রতি এত আগ্রহ দেখি। পশ্চিমা দেশগুলোতে কুকুরের হাসপাতাল, কুকুরের হোটেল, পোশাক ইত্যাদি পাওয়া যায় যত্রতত্র।

একদিকে তারা কুকুর পালনের প্রতি যেমন আগ্রহী, তেমনই অনীহা শিশু পালনের প্রতি। তাই মানবশিশু মারা যায় অকালে ক্ষুধা ও রোগে ভুগে।

আল্লাহর করুণায় আমাদের মুসলিম সমাজের বয়স্করা সমাদর, সদাচরণ ও সম্মান পেয়ে থাকেন ছোটদের কাছ থেকে। ইসলাম আমাদের শেখায় এবং উৎসাহ দেয় মাতাপিতা ও বয়স্কদের সম্মান ও সদাচরণ করতে। আমাদের বয়স্কদের কাউকে যখন হাসপাতালের বিছানায় থাকতে হয়, সন্তানরা তখন পালাক্রমে তাদের সেবা করে। আশপাশের মানুষজন তাদের দেখার জন্য হাসপাতালে ভিড় করে। এমনকি এতটুকু সময় পর্যন্ত তাদের একাকী কাটাতে হয় না।

টিকাঃ
৭৯৫. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৭/১৫৩।
৭৯৬. মূল বইতে এভাবে আছে। অবশ্য ২০২০ ইসায়ি হিসেবে হিজরি সন ১৪৪১ হওয়ার কথা। (-অনুবাদক)
৭৯৭. সূত্র: http://fac.ksu.edu.sa/assalmanea/publications

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 দুর্বলতার কথা বিবেচনা করে তাদের ডেকে পাঠাতেন না

📄 দুর্বলতার কথা বিবেচনা করে তাদের ডেকে পাঠাতেন না


তাদের বয়স ও দুর্বলতার কথা চিন্তা করে তিনিই তাদের কাছে যেতেন, তাঁর কাছে আসতে তাদের বাধ্য করতেন না।

'মক্কা-বিজয়ের পরের কথা। মসজিদে হারামে প্রবেশ করলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। ইত্যবসরে আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তার পিতা আবু কুহাফাকে নিয়ে এলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখে বললেন, "তুমি বৃদ্ধকে বাড়িতে রাখলে না কেন, আমিই তার কাছে যেতাম।"

আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল, আপনি তার কাছে যাওয়ার চাইতে তিনি আপনার কাছে হেঁটে আসাই সমীচীন।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তাকে সমানে বসাও।" আবু কুহাফাকে বসানো হলো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বুক মুছে দিলেন। তাকে বললেন, "ইসলাম গ্রহণ করুন।" আবু কুহাফা ইসলাম গ্রহণ করলেন। '৭৯৮

এ বয়োবৃদ্ধের প্রতি কয়েকটি দিক থেকে সম্মান দেখিয়েছেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রথমত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই তার কাছে তার বাড়িতে যেতে চেয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত, তাকে তার সামনে বসাতে বলেছিলেন তিনি। তৃতীয়ত, তিনি নিজ হাতে তার বুক মুছে দিয়ে তাকে সমাদর করেছেন।

টিকাঃ
৭৯৮. মুসনাদু আহমাদ: ২৭০০১।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের উত্তম পদ্ধতিতে অভ্যর্থনা জানাতেন

📄 তাদের উত্তম পদ্ধতিতে অভ্যর্থনা জানাতেন


ইতিপূর্বে খাদিজা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর বান্ধবী এক বৃদ্ধার আলোচনা করেছি আমরা। 'একবার মদিনায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এ বৃদ্ধা আসলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কুশলাদি জানতে চেয়ে বললেন, "আপনাদের কী অবস্থা? কেমন আছেন আপনারা? আমাদের পরে কেমন কাটছে দিনকাল?"

বৃদ্ধা চলে যাওয়ার পর আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল, এ বৃদ্ধাকে এমন অভ্যর্থনার কারণ কী?"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিয়েছিলেন, "হে আয়িশা, খাদিজা যখন বেঁচে ছিল, তখন এ নারী আমাদের কাছে আসত। আর পুরোনো বন্ধুর প্রতি উত্তম আচরণ করা ইমানের অংশ। "৭৯৯

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্মান ও সমাদরের সাথে অভ্যর্থনা করলেন বৃদ্ধার। জানতে চাইলেন তার কুশলাদি। সামান্য এক বৃদ্ধার প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এমন উন্নত আচরণ প্রমাণ করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতটা অনুপম চরিত্র ও আচরণের অধিকারী ছিলেন।

টিকাঃ
৭৯৯. মুসতাদরাকুল হাকিম: ৪০।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের সাথে হাস্যরস করতেন

📄 তাদের সাথে হাস্যরস করতেন


এ হাদিসটি একটু আগেই গত হয়েছে আমাদের আলোচনায়। 'এক বৃদ্ধা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, "হে আল্লাহর রাসুল, আমার জন্য দোয়া করুন, আল্লাহ যেন আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করান।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উদ্দেশে বললেন, "হে অমুকের মা, জান্নাতে কোনো বৃদ্ধা প্রবেশ করবে না।"

এরপর বৃদ্ধা কাঁদতে কাঁদতে সেখান থেকে চলে যায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরপর বললেন, "তোমরা তাকে জানিয়ে দাও, জান্নাতে কোনো নারী বৃদ্ধা অবস্থায় প্রবেশ করবে না। জান্নাতে তারা যুবতি হয়ে প্রবেশ করবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

إِنَّا أَنشَأْنَاهُنَّ إِنشَاءُ - فَجَعَلْنَاهُنَّ أَبْكَارًا - عُرُبًا أَتْرَابًا

"আমি জান্নাতি রমণীগণকে বিশেষরূপে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর তাদের করেছি চিরকুমারী, সোহাগিনী ও সমবয়স্কা।” (সুরা আল-ওয়াকিয়া, ৫৬: ৩৫-৩৭) '৮০০

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৃদ্ধার সাথে কৌতুক করে তাকে বোঝাতে চেয়েছেন যে, জান্নাতে কেউ তার মতো বৃদ্ধা হয়ে প্রবেশ করবে না; বরং সকলেই তেত্রিশ বছর বয়সী যুবক-যুবতি হবে।

টিকাঃ
৮০০. তিরমিজি শামায়িলে বর্ণনা করেছেন, পৃষ্ঠা নং ১৯৯। হাদিসের মান: সহিহ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00