📄 উম্মতের প্রতি বৃদ্ধদের সম্মান করার নির্দেশ দিতেন
আবু মুসা আশআরি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'বৃদ্ধ মুসলিম, কুরআনের প্রতি সীমালঙ্ঘন ও কুরআনকে উপেক্ষা করেনি-কুরআনের এমন ধারকবাহক এবং ন্যায়পরায়ণ শাসককে সম্মান করা আল্লাহকে সম্মান করার অন্তর্ভুক্ত। '৭৯১
(বৃদ্ধ মুসলিমকে সম্মান করার অর্থ) সভা-মজলিসে তার প্রতি সম্মান দেখানো, তার প্রতি সদাচরণ করা, কোমল আচরণে তাকে আগলে রাখা ইত্যাদি।
এমন বান্দার প্রতি সম্মান করা তার রবকে সম্মান করার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণ হচ্ছে, বয়স্কদের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে আল্লাহর কাছে। তারা অন্যদের চেয়ে ইসলাম গ্রহণে অগ্রবর্তী। অন্যদের ওপর তাদের অধিকারও রয়েছে। সমাজে তাদের স্বীকৃত মর্যাদা রয়েছে। সর্বোপরি, ইসলাম তাদের এমন সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছে; তাই তাদের সম্মান করার অর্থ আল্লাহকে সম্মান করা।
কুরআনের ধারকবাহকদের সম্মান করার অর্থ, কুরআনের পাঠক, কুরআনের হাফিজ ও কুরআনের মুফাসসিরকে সম্মান করা।
(কুরআনের প্রতি সীমালঙ্ঘন করেনি): তথা আমল করার ক্ষেত্রে সীমাতিক্রম করে না। কুরআনের যে শব্দগুলোর অর্থ অস্পষ্ট ও গোপন রাখা হয়েছে, সেগুলোর পেছনে মাত্রাতিরিক্ত লেগে থাকে না।
(কুরআনকে উপেক্ষা করেনি): তথা কুরআন থেকে দূরে সরে যায়নি। কুরআন তিলাওয়াত পরিত্যাগ করেনি; বরং যথাযথভাবে কুরআন তিলাওয়াত করেছে, তার অর্থ আত্মস্থ করেছে এবং তদনুযায়ী আমল করেছে। '৭৯২
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ হাদিসে বয়স্ক মুসলিম, কুরআনের ধারকবাহক ও ন্যায়পরায়ণ শাসকের কথা একত্রে এনেছেন। বয়স্কদের কথা বলেছেন সবার আগে। যেন তিনি বলতে চেয়েছেন, তোমরা যেমন ন্যায়পরায়ণ শাসক, নেতা ও বিচারককে সম্মান করে থাকো, তেমনই সম্মান করবে বয়স্কদের। তোমরা যেমন কুরআনের ধারকবাহকদের সম্মান করো, ঠিক তেমনই বয়স্কদেরও সম্মান করবে।
আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'এক বৃদ্ধ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য আসলেন। লোকেরা তার জন্য জায়গা প্রশস্ত করতে সময় নিল। এতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়, যে আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না এবং আমাদের বৃদ্ধদের সম্মান করে না।"৭৯৩
অন্য রিওয়ায়াতে এসেছে, 'যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না, আমাদের বড়দের অধিকার বোঝে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। '৭৯৪
(আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়): তথা সে আমাদের ধর্মীয় নীতির অনুসরণ করেনি।
এ হাদিসে বর্ণিত বারাআত বা সম্পর্কচ্ছেদ রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, আসল অর্থে নয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন ব্যক্তিকে 'মুসলিমদের দলভুক্ত নয়' বলার কারণ হচ্ছে, মুসলিমরা সবাই তাদের বড়দের শ্রদ্ধা করে। মুসলিম সমাজের কাউকেই এমন পাওয়া যাবে না, যারা নিজেদের বয়স্কদের সম্মান করে না।
(অধিকার বোঝে না) তথা বয়স্করা যে সম্মান ও শ্রদ্ধার পাত্র, তাদের সে রকম উপযুক্ত শ্রদ্ধা ও সম্মান করে না।
(আমাদের বৃদ্ধদের সম্মান করে না): কথাটি 'বৃদ্ধদের সম্মান করে না' এর চাইতে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। 'আমাদের বৃদ্ধদের সম্মান করে না' বলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বোঝাতে চেয়েছেন, যে তাদের সাথে কথায়, কাজে বা ইশারায় সীমালঙ্ঘন করে, সে যেন স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি সীমালঙ্ঘন করে। কারণ, হাদিসে তিনি বয়স্কদের কেবল বৃদ্ধ বলেননি; বরং তার সাথে 'আমাদের' শব্দটি যুক্ত করেছেন।
টিকাঃ
৭৯১. সুনানু আবি দাউদ: ৪৮৪৩।
৭৯২. আওনুল মাবুদ: ১৩/১৩২।
৭৯৩. সুনানুত তিরমিজি: ১৯১৯।
৭৯৪. সুনানু আবি দাউদ: ৪৯৪৩।
📄 সাহাবিগণ যথাযথভাবে বয়স্কদের অধিকার আদায় করতেন
ইবনে কাসির (রাহিমাহুল্লাহ) তালহা বিন উবাইদুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর একটি কথা উল্লেখ করেন, 'প্রচণ্ড অন্ধকার এক রাতে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) একটি বাড়িতে প্রবেশ করেন। পরদিন সকালে আমি সে বাড়িতে উপস্থিত হই। সে বাড়িতে দেখি, অন্ধ এক বৃদ্ধা বসে আছেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, "আপনার কাছে এ লোকটি এসেছিল কেন?"
তিনি উত্তর দিলেন, "সে এত এত সময় ধরে আমার সেবা করে। আমার জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যগুলো এনে দেয়। আমার কষ্ট দূর করে দেয়।"৭৯৫
বয়স্কদের প্রতি এমন যত্ন-আত্তি ও শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণের উদাহরণগুলো অমুসলিম সমাজের জন্য বড়ই লজ্জাজনক। কারণ, তারা নিজ সমাজের বয়স্কদের সমাদর করে না, তাদের প্রতি সদাচরণ করে না। অমুসলিম সমাজে বয়স্করা এমনভাবে জীবনযাপন করে; যেন এ পৃথিবীতে তাদের আত্মীয় বলতে কখনো কেউ ছিল না।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে বয়স্কদের অধিকার লুণ্ঠিত হচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে। অবহেলা ও দারিদ্র্যের মাঝে কাটছে তাদের জীবন। বয়স্কদের বৃহৎ একটা অংশ তাদের জীবন পার করছে কোনো ধরনের জীবনোপকরণ ব্যতীত।
৩২টি রাষ্ট্রে জরিপ চালিয়ে 'বয়স্কদের অবস্থা ২০০২' শিরোনামে একটি গবেষণা নথিভুক্ত হয়েছে। এতে উঠে এসেছে এক চরম সত্য। বয়স্কদের অনেকেই সঠিক চিকিৎসা ও শিক্ষার অভাবে ভুগছে। সরকার এবং বাজেট প্রণেতারা তাদের ভুলে গেছে। তাই মানবেতর জীবনযাপন করছে এ শ্রেণিটি।
গবেষকদের একজন বলেন, 'যখন আপনার বয়সসীমা ষাট ছোঁয়, আপনার সাথে এমন আচরণ করা হবে, যেন আপনি মানুষই নন।'
এমনকি কোনো কোনো পাষাণ হৃদয়ের মানুষ বয়স্কমুক্ত পৃথিবী চায়। কারণ, বয়স্করা কোনো ধরনের উপকারে আসে না। তারা নাকি কেবলই একটা বোঝা!
বিষয়টা আরও জটিল আকার ধারণ করছে। কারণ, সারা বিশ্বে বয়স্কদের সংখ্যা বেড়ে চলেছে প্রতিনিয়ত।
বিশ্বব্যাপী পরিচালিত এ পরিসংখ্যান অনুযায়ী :
* বিংশ শতাব্দী বয়স্কদের সংখ্যা বৃহৎ পরিসরে বৃদ্ধি পেতে দেখেছে পৃথিবীর অধিকাংশ রাষ্ট্রে।
* ১৪০০ হিজরি মোতাবেক ১৯৮০-ইসায়িতে বিশ্বে বয়স্কদের সংখ্যা ছিল ৩৭৬ মিলিয়ন।
* ১৪১০ হি./১৯৯০ ইসায়িতে এ সংখ্যা ৮% বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ৪২৭মিলিয়নে।
* ১৪২০ হি./২০০০ সালে বয়স্কদের সংখ্যা পৌঁছে যায় ৫৯০ মিলিয়নে।
* ধারণা করা হচ্ছে, ১৪৪০ হি./২০২০ সাল ৭৯৬ নাগাদ বয়স্কদের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে পৌঁছে যাবে ১১৭১ মিলিয়নে। ফলে পৃথিবীবাসীর মধ্যে ২৫%-ই হবে বৃদ্ধ। ৭৯৭
বর্তমান ইউরোপীয় সমাজের মূল জনসংখ্যা বুড়িয়ে যাচ্ছে সময়ের সাথে সাথে। অন্যদিকে তাদের জন্মহারও কম। সে জন্য আপনি তাদের মাঝে যুবকদের সংখ্যা কমই পাবেন।
পক্ষান্তরে আমাদের মুসলিম সমাজে আপনি যুবকদের সংখ্যা পাবেন তাদের চেয়ে বেশি। কারণ, আমাদের জন্মহার তাদের চেয়ে ঢের বেশি।
ইউরোপের বৃদ্ধরা তাদের সন্তানদের থেকে কেবল কটু আচরণই পায়। সমাজ তাদের অবহেলা করে। তাই তারা বলে, বৃদ্ধ হলে যখন আমাদের পরিণতি এমন হয়, তবে কেন সন্তান জন্মদান ও সন্তান পালন! এর চেয়ে কুকুরই ঢের ভালো। তাই অবাধ্য সন্তানের চাইতে কুকুর প্রতিপালনের প্রতিই বেশি ঝুঁকছে তারা।
এ জন্যই আমরা তাদের কুকুরপ্রীতি ও কুকুর লালনপালনের প্রতি এত আগ্রহ দেখি। পশ্চিমা দেশগুলোতে কুকুরের হাসপাতাল, কুকুরের হোটেল, পোশাক ইত্যাদি পাওয়া যায় যত্রতত্র।
একদিকে তারা কুকুর পালনের প্রতি যেমন আগ্রহী, তেমনই অনীহা শিশু পালনের প্রতি। তাই মানবশিশু মারা যায় অকালে ক্ষুধা ও রোগে ভুগে।
আল্লাহর করুণায় আমাদের মুসলিম সমাজের বয়স্করা সমাদর, সদাচরণ ও সম্মান পেয়ে থাকেন ছোটদের কাছ থেকে। ইসলাম আমাদের শেখায় এবং উৎসাহ দেয় মাতাপিতা ও বয়স্কদের সম্মান ও সদাচরণ করতে। আমাদের বয়স্কদের কাউকে যখন হাসপাতালের বিছানায় থাকতে হয়, সন্তানরা তখন পালাক্রমে তাদের সেবা করে। আশপাশের মানুষজন তাদের দেখার জন্য হাসপাতালে ভিড় করে। এমনকি এতটুকু সময় পর্যন্ত তাদের একাকী কাটাতে হয় না।
টিকাঃ
৭৯৫. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৭/১৫৩।
৭৯৬. মূল বইতে এভাবে আছে। অবশ্য ২০২০ ইসায়ি হিসেবে হিজরি সন ১৪৪১ হওয়ার কথা। (-অনুবাদক)
৭৯৭. সূত্র: http://fac.ksu.edu.sa/assalmanea/publications
📄 দুর্বলতার কথা বিবেচনা করে তাদের ডেকে পাঠাতেন না
তাদের বয়স ও দুর্বলতার কথা চিন্তা করে তিনিই তাদের কাছে যেতেন, তাঁর কাছে আসতে তাদের বাধ্য করতেন না।
'মক্কা-বিজয়ের পরের কথা। মসজিদে হারামে প্রবেশ করলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। ইত্যবসরে আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তার পিতা আবু কুহাফাকে নিয়ে এলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখে বললেন, "তুমি বৃদ্ধকে বাড়িতে রাখলে না কেন, আমিই তার কাছে যেতাম।"
আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল, আপনি তার কাছে যাওয়ার চাইতে তিনি আপনার কাছে হেঁটে আসাই সমীচীন।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তাকে সমানে বসাও।" আবু কুহাফাকে বসানো হলো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বুক মুছে দিলেন। তাকে বললেন, "ইসলাম গ্রহণ করুন।" আবু কুহাফা ইসলাম গ্রহণ করলেন। '৭৯৮
এ বয়োবৃদ্ধের প্রতি কয়েকটি দিক থেকে সম্মান দেখিয়েছেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রথমত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই তার কাছে তার বাড়িতে যেতে চেয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত, তাকে তার সামনে বসাতে বলেছিলেন তিনি। তৃতীয়ত, তিনি নিজ হাতে তার বুক মুছে দিয়ে তাকে সমাদর করেছেন।
টিকাঃ
৭৯৮. মুসনাদু আহমাদ: ২৭০০১।
📄 তাদের উত্তম পদ্ধতিতে অভ্যর্থনা জানাতেন
ইতিপূর্বে খাদিজা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর বান্ধবী এক বৃদ্ধার আলোচনা করেছি আমরা। 'একবার মদিনায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এ বৃদ্ধা আসলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কুশলাদি জানতে চেয়ে বললেন, "আপনাদের কী অবস্থা? কেমন আছেন আপনারা? আমাদের পরে কেমন কাটছে দিনকাল?"
বৃদ্ধা চলে যাওয়ার পর আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল, এ বৃদ্ধাকে এমন অভ্যর্থনার কারণ কী?"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিয়েছিলেন, "হে আয়িশা, খাদিজা যখন বেঁচে ছিল, তখন এ নারী আমাদের কাছে আসত। আর পুরোনো বন্ধুর প্রতি উত্তম আচরণ করা ইমানের অংশ। "৭৯৯
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্মান ও সমাদরের সাথে অভ্যর্থনা করলেন বৃদ্ধার। জানতে চাইলেন তার কুশলাদি। সামান্য এক বৃদ্ধার প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এমন উন্নত আচরণ প্রমাণ করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতটা অনুপম চরিত্র ও আচরণের অধিকারী ছিলেন।
টিকাঃ
৭৯৯. মুসতাদরাকুল হাকিম: ৪০।