📄 স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন রক্ষা করার জন্য স্ত্রীর নিকট সুপারিশ করতেন
বারিরা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-কে আজাদ করা হলে তিনি তার কৃতদাস স্বামীর সাথে বৈবাহিক জীবন রাখতে চাইলেন না। তাই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়াকেই তিনি বেছে নিলেন। ৭৫৮ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারিরার স্বামীর হয়ে তার কাছে সুপারিশ করে বললেন, যেন সে ফিরে যায়। কিন্তু বারিরা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বললেন, 'তার কাছে আমার কোনো প্রয়োজন নেই।'
ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'বারিরা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর স্বামী ছিল একজন কৃতদাস। তার নাম ছিল মুগিস। আমার মনে হচ্ছে, আমি এখনো মুগিস-কে বারিরা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর পেছনে কাঁদতে কাঁদতে যেতে দেখছি। দেখতে পাচ্ছি, তার চোখ থেকে পানি এসে দাড়ি ভিজিয়ে দিচ্ছে।'
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে বলেছিলেন, “আব্বাস, বারিরার প্রতি মুগিসের এ ভালোবাসা, অন্যদিকে মুগিসের প্রতি বারিরার অনীহায় কি আপনি আশ্চর্য নন?"
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারিরা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর উদ্দেশে বলেছিলেন, "আহ! যদি বারিরা মুগিসের কাছে ফিরে যেত!"৭৫৯
বারিরা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) এই জবাবে বললেন, "আপনি কি আমায় আদেশ করছেন?"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উত্তরে বললেন, "না; বরং আমি সুপারিশ করছি।"
বারিরা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) তখন উত্তর দিলেন, "তবে তার কাছে আমার কোনো প্রয়োজন নেই।"৭৬০
বারিরা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর কথার অর্থ হচ্ছে, যদি আপনি আমাকে আদেশ না করে থাকেন, তবে আমি এ বিবাহ বিচ্ছেদ করাই বেছে নেব।
টিকাঃ
৭৫৮. কারণ, কোনো দাস-দাসীর বিবাহ হলে, পরবর্তী সময়ে দাসী স্বাধীন হয়ে গেলে তার পূর্বস্বামীর সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক রাখা না-রাখার বিষয়ে তার স্বাধীনতা থাকে।
৭৫৯. সুনানুন নাসায়ির বর্ণনায় (৫৩৩২) এসেছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যদি তুমি মুগিসের কাছে ফিরে যেতে! কারণ, সে তো তোমার বাচ্চার পিতা।'
৭৬০. সহিহুল বুখারি: ৫২৮৩।
📄 নারীদেরকে বিবাহের ব্যাপারে পরামর্শ দিতেন
ফাতিমা বিনতে কাইস (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'তার স্বামী তাকে তিন তালাক দিয়ে ইদ্দত পালনের জন্য স্থান ও খরচ দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও এমন ফয়সালা দিলেন এবং তাকে একজন সাহাবির ঘরে ইদ্দত পালনের সময়টা থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন।'
ফাতিমা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, "ইদ্দত পালন শেষে আমাকে বলবে।"
আমার ইদ্দত পালন শেষ হলো একসময়। আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে জানালাম, "মুআবিয়া বিন আবু সুফইয়ান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এবং আবু জাহম (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আবু জাহমের কাঁধে সব সময় ঋণের বোঝা থাকে। আর মুআবিয়া তো কপর্দকহীন; তুমি বরং উসামা বিন জাইদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে বিয়ে করো।"
কিন্তু উসামা বিন জাইদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে আমি পছন্দ করলাম না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার বললেন, "তুমি উসামাকে বিয়ে করো।"
ফাতিমা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) হাত দিয়ে ইশারা করে বললেন, 'উসামা এমন এমন।' ফাতিমা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলে চললেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, "আল্লাহর আনুগত্য ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনুগত্য তোমার জন্য উত্তম হবে।"
এরপর আমি উসামার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলাম। তারপর আল্লাহ তাআলা এতে এত কল্যাণ দান করলেন যে, আমি ঈর্ষার পাত্রে পরিণত হলাম। '৭৬১
ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উসামা বিন জাইদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কথা বলে তার দ্বীনদারি, তার মর্যাদা, তার উত্তম চরিত্রের কথা জানালেন ফাতিমা বিনতে কাইস (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-কে। এরপর বিয়ের কথা বললেন। কিন্তু ফাতিমা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) উসামা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে বিয়ে করা অপছন্দ করলেন। কারণ, একে তো উসামা বিন জাইদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) একজন কৃতদাস। তার ওপর তিনি ছিলেন অতি কালো বর্ণের। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারবার ফাতিমা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-কে উৎসাহ দিতে থাকলেন।'
ফাতিমা বিনতে কাইস (রাদিয়াল্লাহু আনহা) কল্যাণের কথা বুঝতে পেরে রাজি হয়ে গেলেন। আর হলোও তা-ই। তাদের সংসারে কল্যাণ বর্ষিত হলো। এ জন্যই ফাতিমা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেছিলেন, "আল্লাহ আমাদের সংসারে আমার জন্য এমন কল্যাণ দান করলেন যে, আমি অন্যদের নিকট ঈর্ষার পাত্রে পরিণত হলাম।"৭৬২
ইবনে উসাইমিন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এ হাদিসে আমরা দেখেছি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুজন সাহাবির মন্দগুণ বর্ণনা করেছেন। তিনি এ বর্ণনা তাদের দোষত্রুটি বর্ণনার জন্য দেননি; বরং নসিহত হিসেবে কল্যাণের স্বার্থে সত্যটা বলেছেন। নিন্দা করা এবং কল্যাণের স্বার্থে কারও মন্দ তুলে ধরার মাঝে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে।'
এমনিভাবে, কেউ যদি আপনার কাছে জানতে আসে যে, আমি কি অমুকের কাছে ইলম শিখব? যার কথা জিজ্ঞেস করা হয়েছে, আপনি যদি তার ব্যাপারে জানেন যে, সে আলিম বিকৃত মতের অনুসারী, তবে দ্বিধাহীন হয়ে প্রশ্নকারীকে বলবেন, তার কাছে তুমি ইলম শিখো না।'
এভাবে যদি সে আলিমের আকিদাতে বা চিন্তা কিংবা মতাদর্শে ত্রুটি থাকে, যে ত্রুটি পরামর্শ গ্রহণকারীর মাঝেও প্রভাব বিস্তার করতে পারে বলে আপনি ধারণা করেন, তবে নিঃসংকোচে পরামর্শ গ্রহণকারীকে বলবেন, না, তুমি তার কাছে ইলম শিখবে না। তার মাঝে এ ভুল আছে। তার এ এ বিকৃত চিন্তাধারা আছে। '৭৬৩
টিকাঃ
৭৬১. সহিহু মুসলিম: ১৪৮০।
৭৬২. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১০/৯৮।
৭৬৩. শারহু রিয়াজিস সালিহিন: ৬/১১০।
📄 সাহাবিদের জন্য পুণ্যবতী নারীদের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতেন
আনাস বিন মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুলাইবাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর জন্য এক আনসারি মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন মহিলার পিতার কাছে। তার পিতা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলল, "আমি মেয়ের মায়ের সাথে পরামর্শ করে জানাচ্ছি আপনাকে।"
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "ঠিক আছে তবে।"
মেয়ের পিতা তার স্ত্রীর কাছে এসে ঘটনা খুলে বলল। তখন মেয়ের মা বলে উঠল, "না, আল্লাহর কসম, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি জুলাইবাব ছাড়া অন্য কাউকে পাননি! অথচ আমরা মেয়ের ব্যাপারে অমুক অমুককে ফিরিয়ে দিয়েছি!"
ওদিকে বিয়ের পাত্রী আড়াল থেকে শুনছিল সব। তার বাবা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিষেধ করার জন্য রওনা হচ্ছিল প্রায়। তখন মেয়েটি বলে উঠল, "আপনারা কি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথার ওপরে নিষেধ করতে যাচ্ছেন!? যদি তিনি আপনাদের জন্য এটা ভালো মনে করেন, তবে আমাকে জুলাইবাবের কাছেই বিয়ে দিয়ে দিন।"
মেয়েটি যেন তার বাবা-মার দিব্যচক্ষু খুলে দিল। তারা দুজন বলল, “তুমি সঠিক বলেছ।"
মেয়ের বাবা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, "আপনি যদি তার ব্যাপারে ভালো মনে করেন, তবে আমরাও রাজি।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আমি তার প্রতি সন্তুষ্ট।"
এরপর উভয়ের বিয়ে হয়ে যায়। এরপর একদিন মদিনাবাসীর ওপর শত্রুরা উদ্যত হলে জুলাইবাব তাদের বিরুদ্ধে লড়তে যায়। লড়াই শেষে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। আর তার চারপাশে পাওয়া যায় কিছু মুশরিকের লাশ, যাদেরকে জুলাইবাব একাই ধরাশায়ী করেছিলেন।' আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'এরপর আমি দেখলাম, মদিনার মাঝে সবচেয়ে বেশি বিয়ের প্রস্তাব আসা নারী ছিল সেই মেয়েটি। '৭৬৪
টিকাঃ
৭৬৪. মুসনাদু আহমাদ: ১১৯৪৪। হাদিসটি শাইখাইনের শর্তানুযায়ী সহিহ।
📄 নারীর সম্মতি ছাড়া কাউকে বিয়ে দিতেন না
উকবা বিন আমির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে বললেন, "অমুক নারীর সাথে তোমার বিয়ে দিলে কি তুমি সন্তুষ্ট হবে?" লোকটি বলল, "জি।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরপর মহিলাকে বললেন, "অমুকের সাথে তোমার বিয়ে যদি দিই, তবে তুমি সন্তুষ্ট হবে?" মহিলাটি বলল, "জি।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরপর উভয়ের বিয়ে দিলেন। লোকটি সে মেয়েটির সাথে একত্রে সংসার করতে লাগল। কিন্তু তার জন্য মোহর নির্ধারণ করেনি, তাকে কিছু দেয়ওনি। লোকটি হুদাইবিয়াতে অংশ নিয়েছিল। যে হুদাইবিয়াতে অংশ নিয়েছিল, খাইবারের গনিমতে তার জন্য একটা অংশ ছিল। যখন লোকটি মৃত্যুর নিকটবর্তী, তখন সে সাথিদের বলল, "রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে অমুকের সাথে বিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আমি সে নারীকে কোনো মোহর দিইনি। তাকে কোনো কিছুই দিইনি। আমি তোমাদের সাক্ষী করে রাখছি, আমি তাকে মোহর হিসেবে আমার খাইবারের অংশটা দিলাম।" মহিলাটি স্বামীর দেওয়া মোহর এক লক্ষ দিরহামের বিনিময়ে বিক্রি করে দিল।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "সে বিয়েই উত্তম, যে বিয়ে সহজে হয়।"৭৬৫
অর্থাৎ কম খরচে, সহজ প্রস্তাবে যে বিয়ে হয়। এ হাদিসে মহিলাটির সৌভাগ্য ও প্রবৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া যায়। কারণ, বিয়ে হচ্ছে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে হৃদ্যতার সম্পর্ক। তাই বিয়ের ক্ষেত্রে সহজতাই কাম্য। যখন এ সহজতা পুরো বিয়ের মাঝে পাওয়া যায়, তখন বরকত ছড়িয়ে পড়ে তাদের জীবনে। আর মোহর দেওয়ার ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ততা ছেড়ে অনায়াসে আদায়যোগ্য মোহর নির্ধারণ করা এবং অলিমাসহ বিয়ের অন্যান্য দিকের খরচ কম হওয়া হাদিসে বর্ণিত সহজতার অন্তর্ভুক্ত। ৭৬৬
টিকাঃ
৭৬৫. সুনানু আবি দাউদ: ২১১৭।
৭৬৬. ফাইজুল কাদির: ৩/৪৮২।