📄 অসুস্থ নারীদের দেখতে যেতেন
জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে সায়িব (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর নিকট এলেন। তাকে বললেন, "উম্মে সায়িব, তোমার কী হয়েছে, কাঁদছ কেন?"
উম্মে সায়িব (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলল, "জ্বর। আল্লাহ এর অমঙ্গল করুন।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "জ্বরকে গালমন্দ করো না। কারণ, জ্বর এমনভাবে আদম-সন্তানের গুনাহ দূর করে, যেভাবে কামারের হাপর লোহার মরীচিকা দূর করে। "৭৪০
জংধরা লোহাকে যখন আগুনের মাঝে দেওয়া হয়, তখন তার সব মরীচিকা দূর হয়ে লোহা পরিষ্কার হয়ে যায়; তেমনই জ্বর মানুষের গুনাহকে দূর করে দেয়।
উম্মে আলা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'আমি যখন রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন আমাকে দেখতে আসেন। তিনি বলেন, "সুসংবাদ গ্রহণ করো, হে উম্মে আলা। কারণ, অসুখের মাধ্যমে একজন মুসলিমের গুনাহগুলো আল্লাহ এমনভাবে মিটিয়ে দেন, যেমনভাবে আগুন স্বর্ণ-রৌপ্যের ময়লা দূর করে।"৭৪১
ইমাম মুনজিরি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'উম্মে আলা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) ছিলেন হাকিম বিন হিজাম (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ফুফু। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে বাইআত হওয়া নারীদের একজন ছিলেন তিনি। '৭৪২
আবু উমামা বিন সাহল (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আওয়ালি গোত্রের এক নারী অসুস্থ হয়ে পড়ল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থদের দেখতে যেতেন। তাকে দেখতে এসে বলে গেলেন, "এ নারী মারা গেলে আমাকে জানাবে।"
সে রাতে মহিলাটি মারা যায়। লোকেরা তাকে দাফনও করে ফেলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে না জানিয়ে। সকালবেলা তিনি সে নারী সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তখন তারা বলল, “আমরা আপনাকে ঘুম থেকে জাগানো সমীচীন মনে করিনি, হে আল্লাহর রাসুল।"
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে নারীর কবরের নিকট আসলেন। অতঃপর চারটি তাকবির বলে তার জানাজা আদায় করলেন। '৭৪৩
ইবনে আব্দুল বার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এ হাদিস প্রমাণ করে, (গাইরে মাহরাম) বৃদ্ধা নারী অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের দেখতে যাওয়াতে বাধা নেই। তবে গাইরে মাহরাম নারী যদি বৃদ্ধা না হয়, তাহলে তার কাছে না গিয়ে তার মাহরাম কারও থেকে খোঁজখবর নেবে। '৭৪৪
টিকাঃ
৭৪০. সহিহু মুসলিম: ২৫৭৫।
৭৪১. সুনানু আবি দাউদ: ৩০৯২।
৭৪২. আত-তারগিব ওয়াত তারহিব ৪/১৪৮।
৭৪৩. সুনানুন নাসায়ি ১৯০৭, সহিহুল বুখারি ৪৫৮, সহিহু মুসলিম: ৯৫৬।
৭৪৪. আত-তামহিদ: ৬/২৫৫।
📄 নারীদের কেউ দোয়া চাইলে দোয়া করতেন
আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে সুলাইম (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর বাড়িতে আসলেন। তখন তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে খেজুর ও মাখন নিয়ে আসলেন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমাদের মাখন পাত্রে রেখে দাও এবং তোমাদের খেজুর থলিতে রেখে দাও। আমি আজ রোজাদার।" এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরের এক কোণে গিয়ে নফল সালাত আদায় করলেন। অতঃপর উম্মে সুলাইম (রাদিয়াল্লাহু আনহা) ও তার পরিবারের লোকজনের জন্য দোয়া করলেন।'
উম্মে সুলাইম (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল, আমার এক কলিজার টুকরো আছে।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে চাইলেন, "সে কে?"
উম্মে সুলাইম (রাদিয়াল্লাহু আনহা) জবাব দিলেন, "আপনার ছোট্ট সেবক আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)। তার জন্য দোয়া করুন আল্লাহর কাছে।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আখিরাতের এমন কোনো কল্যাণ বাদ নেই, যার দোয়া আমার জন্য করলেন না এবং দুনিয়ার এমন কোনো কল্যাণ বাকি নেই, যা তিনি আমার জন্য আল্লাহর কাছে চাইলেন না। তিনি দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ, আপনি তাকে সম্পদ ও সন্তান দান করুন এবং তাতে বরকত দান করুন। "৭৪৫
এতটুকু বলার পর আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, "রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দোয়ার বরকতে আমি আনসারদের অন্যতম ধনাঢ্য ব্যক্তি হয়ে উঠলাম। আর আমার মেয়ে উমাইনা বলেছে, হাজ্জাজ বিন ইউসুফ (রাহিমাহুল্লাহ) বসরায় আসার পূর্বে আমার একশ বিশজন সন্তানসন্ততিকে দাফন করা হয়েছে। "৭৪৬
এরপর আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ৯৩ হিজরি সাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। তার বয়স একশর কাছাকাছি হয়েছিল।
আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার জন্য তিনটি জিনিসের দোয়া করলেন। যার মাঝে দুটির বাস্তবায়ন আমি নিজ চোখে দেখেছি। আর তৃতীয়টি আশা করি আখিরাতে পূর্ণ হবে।'৭৪৭
সায়িব বিন ইয়াজিদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আমার খালা আমাকে নিয়ে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসলেন। বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল, আমার এ ভাগনে অসুস্থ।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আমার জন্য বরকতের দোয়া করলেন। এরপর অজু করলেন তিনি। আমি তাঁর অজুর পানি থেকে কিছুটা পান করলাম। এরপর আমি তাঁর পেছনে দাঁড়ালে তাঁর নবুওয়াতের মোহর দেখলাম। তা ছিল পাখির ডিমের মতো। '৭৪৮
ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'হাদিসে ব্যবহৃত الحجلة من زر الحَجَلَةِ অর্থ হচ্ছে পাখি। এর ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, বলে উদ্দেশ্য হচ্ছে শুভ্রতা। এ কথাটার সত্যায়ন আরেকটি হাদিসে পাওয়া যায়। যেখানে বলা হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবুওয়াতের মোহর ছিল কবুতরের ডিমের মতো। '৭৪৯
টিকাঃ
৭৪৫. তাবাকাতু ইবনি সাদির (৭/১৪) রিওয়ায়াতে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়ায় বলেছিলেন, 'হে আল্লাহ আপনি তাকে অনেক ধনসম্পদ, সন্তানসন্ততি ও দীর্ঘ জীবন দান করুন। তার পাপরাশি ক্ষমা করে দিন।' ফাতহুল বারি: ৪/২২৯।
৭৪৬. সহিহুল বুখারি: ১৮৪৬।
৭৪৭. সহিহু মুসলিম: ২৪৮১।
৭৪৮. সহিহুল বুখারি: ১৮৩।
৭৪৯. ফাতহুল বারি: ৬/৫৬২।
📄 কোনো কোনো নারীর নাম পরিবর্তন করে অন্য নাম রাখতেন
ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর এক কন্যার নাম ছিল আসিয়া। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সে নাম পরিবর্তন করে রাখলেন জামিলা।'৭৫০
পূর্বে একটি হাদিসে আমরা দেখেছি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাসসামা মুজানিয়্যাহর নাম পরিবর্তন করে হাসসানা মুজানিয়্যাহ রাখেন।
ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এ হাদিসগুলোর সারমর্ম হচ্ছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মন্দ ও নিকৃষ্ট নামগুলো পরিবর্তন করে সুন্দর নাম রাখতেন তাদের। এ রকম অনেক হাদিসেই বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক সাহাবির নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম রেখেছিলেন তাদের।'৭৫১
মুহাম্মাদ বিন আমর বিন আতা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি আমার কন্যার নাম রাখলাম, বাররা (পুণ্যবতী)। কিন্তু জাইনাব বিনতে আবু সালামা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) আমাকে বললেন, “রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ নাম রাখতে নিষেধ করেছেন। আমার নামও বাররা ছিল। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, "তোমরা নিজেরা নিজেদের এমন মনে কোরো না। আল্লাহই জানেন তোমাদের মধ্যে কে পুণ্যবান আর কে পুণ্যবান নয়।"
তখন সাহাবিরা বলেছিলেন, "তাহলে আমরা কী নাম রাখব?"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন উত্তর দিয়েছিলেন, "তোমরা তার নাম রাখো জাইনাব।"৭৫২
টিকাঃ
৭৫০. সহিহু মুসলিম: ৩৯৮৮।
৭৫১. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৪/১২০।
৭৫২. সহিহু মুসলিম: ২১৪২।
📄 পুরুষ সাহাবিদের নামও তিনি পরিবর্তন করতেন
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার অনেক পুরুষ সাহাবির নাম পরিবর্তন করে সুন্দর নামকরণ করেছিলেন। তিনি আসি (অবাধ্য) নামের সাহাবিদের নাম পরিবর্তন করে মুতি' (অনুগত) রাখতেন।
আব্দুল্লাহ বিন মুতি' (রাহিমাহুল্লাহ) নিজ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'কুরাইশদের আসি নাম বিশিষ্টদের মধ্য থেকেই যে-ই ইসলাম গ্রহণ করত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নাম রাখতেন মুতি'। ৭৫৩ তার (আব্দুল্লাহ-এর পিতার) নামও আসি ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নামও মুতি' রাখলেন। '৭৫৪
ইবনে মুসাইয়িব (রাহিমাহুল্লাহ) স্বীয় পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন যে, 'তার পিতা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার নাম কী?" তিনি উত্তর দিলেন, "হাজান (চিন্তা-পেরেশানি)।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি সাহল (সহজ)।"
আমার পিতা বললেন, "হাজান নামটা আমার বাবার দেওয়া। এ নাম আমি পরিবর্তন করব না।"
ইবনে মুসাইয়িব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এরপর থেকে সব সময় আমাদের সাথে চিন্তা-উদ্বিগ্নতা লেগেই আছে। '৭৫৫
উসামা বিন আখদারি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'এক লোকের নাম ছিল আসরাম (পরিত্যক্ত/কর্তিত)। সে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে আসা দলের একজন ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার নাম কী?" সে উত্তর দিল, "আমি আসরাম।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "বরং তুমি জুরআ (বীজ/খেত)।"৭৫৬
আমাদের উচিত সন্তানদের মন্দ নাম না রেখে ভালো ও সুন্দর নাম বাছাই করা।
টিকাঃ
৭৫৩. দেখুন, ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১২/১৩৪।
৭৫৪. সহিহু মুসলিম: ১৭৮২।
৭৫৫. সহিহুল বুখারি: ৬১৯০।
৭৫৬. সুনানু আবি দাউদ: ৪৯৫৪। সনদ জাইয়িদ।