📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 নারীরা কোনো উপকার করলে তার যথাযথ প্রতিদান দিতেন

📄 নারীরা কোনো উপকার করলে তার যথাযথ প্রতিদান দিতেন


নারীদের কারও অবদান কখনো ভুলতেন না তিনি; বরং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতেন এবং তাদের প্রতি সদাচরণ করতেন।

ইমরান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে আমরা এক সফরে ছিলাম। আমরা রাতের বেলা অগ্রসর হতাম। একদিন শেষ রাতে আমরা এক জায়গায় ঘুমিয়ে পড়লাম। মুসাফিরের জন্য সে ঘুমের চেয়ে মধুর কোনো কিছু হতে পারে না।'

পরদিন সূর্যের গরম আলো আমাদের জাগিয়ে তুলল। আমাদের মাঝে প্রথম জেগেছিলেন আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)। এরপর অমুক, এরপর অমুক। চতুর্থবারে জেগে উঠলেন উমর বিন খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু)।'

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুমালে আমরা কেউ তাঁকে জাগিয়ে তুলতাম না। যতক্ষণ না তিনি জেগে উঠছেন, আমরা অপেক্ষা করতাম। কারণ, আমরা জানতাম না, ঘুমের ভেতর কী ঘটছে। ৭১৬

উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) জেগে উঠে মানুষের অবস্থা দেখলেন (সকলে ঘুমিয়ে; অথচ সালাতের সময় অতিক্রম হয়ে গেছে)। উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) জোরেশোরে তাকবির দিলেন। উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ছিলেন উচ্চকণ্ঠের অধিকারী। তিনি তাকবির দিতে থাকলেন, আর তার স্বরও চড়তে থাকল। তার আওয়াজে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জেগে উঠলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জেগে উঠলে সকলে তাঁর নিকট ওজর পেশ করল। তিনি বললেন, "সমস্যা নেই। সামনে অগ্রসর হও।"৭১৭

কাফেলা এগিয়ে চলল। একটু সামনে গিয়েই আবার থামল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের অজু করতে বলে নিজেও অজু করে নিলেন। সালাতের জন্য ডাকা হলো। সকলকে নিয়ে তিনি সালাত আদায় করলেন।'

সকলের সালাত শেষে দেখা গেল একজন পৃথক হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। জামাআতের সাথে সালাত আদায় করেননি তিনি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম "হে অমুক, সবার সাথে সালাত আদায় করলে না কেন?" বললেন,

সে বলল, "আমার গোসল ফরজ হয়েছে, কিন্তু পানি নেই।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করে নাও। সেটাই তোমার জন্য যথেষ্ট হবে।"

এরপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কাফেলা এগিয়ে চলল। কাফেলার লোকেরা পিপাসার অভিযোগ করলে তিনি থামলেন। একজনকে ৭১৮ ডাকলেন, সাথে ডাকলেন সাথে আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে। বললেন, "তোমরা দুজন গিয়ে পানির খোঁজ করো। আমরা যখন এগিয়ে চললাম, দেখলাম, এক উষ্ট্রারোহী নারী। তার পায়ের কাছে পানির দুটি মশক বাঁধা।"

আমরা তাকে বললাম, "পানি কোথা থেকে এনেছ?"

অনেক দূর, অনেক দূর! আশা করে লাভ নেই। তোমরা পানি খুঁজে পাবে না।

তোমার ও তোমার পরিচিতজনদের মাঝে দূরত্ব কতটুকু?

একদিন ও একরাতের পথ।

আমাদের সাথে চলো তবে।

কোথায়?

আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে।

যাকে সাবিয়ি (ধর্ম পরিবর্তনকারী) বলা হয়, তার কাছে?

হাঁ, তোমরা যাঁর ব্যাপারে এ কথাটি বলো, তাঁর কাছে চলো।

(বর্ণনাকারী বলেন) এরপর মহিলাকে নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলেন তারা দুজন। তাকে ঘটনার বিবরণ দিলেন। মহিলাটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কেও তা-ই বলল, যা আমাদের বলেছিল। আরও বলল, "তার দুটি এতিম সন্তান আছে।" এরপর মহিলাকে নামানো হলো তার উট থেকে। দুটি পাত্র আনতে বললেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। মশকের মুখ দিয়ে পানি ঢাললেন পাত্র দুটিতে। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মশকদুটির ওপরের মুখ বন্ধ করে দিয়ে নিচের মুখ দুটি খুলে দিলেন। ৭১৯

"পানি পান করো, পানি পান করো" বলে মানুষদের ডাকা হলো। এরপর আমরা চল্লিশজন মানুষ পানি পান করলাম। তৃষ্ণার্ত ছিলাম আমরা। পানি পান করে পরিতৃপ্ত হলাম। আমাদের কাছে যতটি মশক ও পাত্র ছিল, সবগুলোতে পানি ভরে নিলাম। তবে আমরা উটকে পানি পান করাইনি। আমরা এত পানি নেওয়ার পরও সে মশকদুটি থেকে যেন পানি উপচে পড়ছে! এর মাঝে যার গোসল ফরজ হয়েছিল, তাকে এক পাত্র পানি দিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যাও, এ পানি দিয়ে গোসল করে নাও।"

আর মহিলাটি তখন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল, তার পানি দিয়ে কী করা হচ্ছে। আল্লাহর শপথ, পানি নেওয়া শেষ হলো। কিন্তু মনে হচ্ছিল, মশকদুটি থেকে যখন পানি নেওয়া শুরু করি আমরা, তখনকার চাইতে এখন মশকদুটি আরও বেশি পানিতে ভরে আছে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বললেন, "তোমাদের কাছে যা আছে, এ মহিলার জন্য একত্র করো।"

কেউ আজওয়া খেজুর আনল, কেউ আটা আনল, কেউ ছাতু আনল। এভাবে তার জন্য অনেক খাদ্যদ্রব্য জমা করা হলো একটি কাপড়ে। এরপর মহিলাকে উটে উঠিয়ে দেওয়া হলো। কাপড়টি পুঁটলি করে উটের ওপর তার সামনে রাখা হলো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, "যাও। এ খাদ্য হতে তোমার পরিবারকে খাওয়াও। তুমি জানো, আমরা তোমার পানি থেকে এতটুকু কম করিনি; বরং আল্লাহই আমাদের পানি দিয়েছেন।"

এরপর মহিলা তার পরিবারের কাছে আসলো। দেরি হওয়ার কারণ জানতে চাইল তারা। বলল, "তোমাকে কীসে আটকে রেখেছিল, হে অমুক?"

মহিলা উত্তর দিল, "আশ্চর্যজনক এক ঘটনা ঘটল। দুজন লোক আমার সামনে এল। এরপর আমাকে নিয়ে "ধর্ম পরিবর্তনকারী" বলা হয় যাকে, তার কাছে নিয়ে গেল। এরপর তিনি এমন এমন করলেন।" এরপর মহিলা তার মধ্যমা ও তর্জনি আঙুলদ্বয় আকাশের দিকে তুলে বলল, "আল্লাহর কসম, নিশ্চয় তিনি আসমান ও জমিনের মাঝে সবচেয়ে বড় জাদুকর। অথবা তিনি সত্যিই আল্লাহর রাসুল।"

মুসলিমরা কখনো সে এলাকার মুশরিকদের ওপর অতর্কিতে হামলা করলেও কখনো সে মহিলার গোত্রের ওপর হামলা করতেন না। একদিন মহিলা তার গোত্রকে বলল, "আমার বিশ্বাস, এরা (মুসলিমরা) ইচ্ছে করেই আমাদের ছেড়ে দিচ্ছে। তবুও কি তোমরা ইসলামে প্রবেশ করবে না?” গোত্রের লোকেরা মহিলার কথা মানল। তারা সবাই ইসলামে প্রবেশ করল। '৭২০

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে মহিলার যথাযথ সমাদর করলেন। তার অবদানের যথাযথ মর্যাদা দিলেন। তার জন্য খাবার একত্র করলেন। তার কর্মের কারণে তার গোত্রকেও সমাদরের অন্তর্ভুক্ত করলেন।

আইনি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে মহিলাকে, তার গোত্র ও ভূমিকে আক্রমণ না করে তার অবদানের যথাযথ প্রতিদান দিলেন। '৭২১

হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়:

* কারও সালাত ছুটে গেলে, স্মরণ আসার পর আদায় করে দেবে; যদিও ওয়াক্ত শেষ হয়ে যাক।
* পানির প্রয়োজন যখন তীব্র হয়ে যায়, তখন যার কাছে পানি পাওয়া যায়, তার কাছ থেকে নিতে হবে এবং তাকে বিনিময় দিয়ে দিতে হবে। যেমন এ মহিলাকে দেওয়া হয়েছিল।
* এ হাদিসে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুজিজা বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরো বাহিনীকে অজু করালেন, তাদের পানি পান করালেন, গোসলও করালেন। এসবই করলেন মশকের নিচের দিকের মুখটি খুলে দিয়ে। পানিসংক্রান্ত কাজ শেষ হলো। কিন্তু দেখা গেল মশকদুটি তখনো পরিপূর্ণ পানিতে।
* এ হাদিসে মানুষের প্রতি সদাচরণের শিক্ষা রয়েছে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে মহিলার সম্মান বজায় রাখলেন মহিলার গোত্রের মাঝে। তার গোত্রের ওপর কখনো আক্রমণ করা হয়নি; মহিলার পানি পান করানোর বদৌলতে। আর সম্মান করা ও আক্রমণ না করার কারণ ছিল মহিলা ও তার গোত্রের ইসলাম গ্রহণের আশায়।
* কোনো কাফিরের প্রতি দয়া দেখিয়ে তাকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার শিক্ষা পাই আমরা এ হাদিস থেকে। ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্যই সে মহিলার গোত্রের ওপর হামলা করা হয়নি। এরপর তারা বুঝতে পেরে নিজ থেকেই ইসলাম গ্রহণে এগিয়ে আসলো এবং সত্যকে আপন করে নিল। ৭২২

টিকাঃ
৭১৬. সাহাবিগণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ঘুম থেকে জাগাতেন না। কেননা, ঘুমের মধ্যে ওহি নাজিলের সম্ভাবনা ছিল। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জাগিয়ে ওহি নাজিলের মাঝে ব্যাঘাত ঘটে কি না, তাই তারা ভয়ে তাঁকে জাগাতেন না।
৭১৭. সময়মতো সালাত না পড়তে পারার কারণে সাহাবিদের অন্তর অস্থির ছিল। তাঁরা আফসোস করছিলেন। তাঁরা যেহেতু ইচ্ছে করে এমন করেনি, তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম 'কোনো সমস্যা নেই' বলে তাঁদের সান্ত্বনা দিলেন।
৭১৮. তিনি ছিলেন বর্ণনাকারী সাহাবি স্বয়ং ইমরান বিন হুসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহু)।
৭১৯. মশকের ওপরের মুখের চেয়ে নিচের মুখ দিয়ে বেশি পানি পড়ে।
৭২০. সহিহুল বুখারি ৩৪৪, সহিহু মুসলিম: ৬৮২।
৭২১. উমদাতুল কারি: ৪/৩২।
৭২২. শারহু সহিহিল বুখারি: ১/৪৮৭।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 নবুয়তের সাথে নারীদের ভুল সংশোধন করে দিতেন

📄 নবুয়তের সাথে নারীদের ভুল সংশোধন করে দিতেন


নারীদের কাউকে ভুল করতে দেখলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্নেহের সাথে নরম কণ্ঠে তার ভুল ধরিয়ে দিতেন।

আনাস বিন মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মহিলার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যিনি কবরের পাশে বসে কাঁদছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি আল্লাহকে ভয় করো এবং সবর করো।" মহিলাটি বলল, "আমার কাছ থেকে চলে যান। আপনার ওপর তো আমার মতো মুসিবত আসেনি।" সে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে চিনতে পারেনি (বিধায় এমন কথা বলেছে)। পরে তাকে বলা হলো যে, তিনি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তখন সে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরোজায় হাজির হলো। সেখানে কোনো পাহারাদার পেলে না। সে আরজ করল, "আমি আপনাকে চিনতে পারিনি।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "সবর তো বিপদের প্রথম অবস্থাতেই।"৭২৩

অর্থাৎ উত্তম সবরকারী হচ্ছে সে, যে বিপদ আপতিত হওয়ার সাথে সাথে সবর করে। অন্যদিকে যে দেরিতে সবর করে, তার সবর প্রথম পর্যায়ের মতো উত্তম হয় না। তার সাওয়াবও কম হয়। কারণ, দিন যত গড়াবে, মানুষ তত দুঃখ ভুলে যায়, কষ্ট ভুলে যায়-তখন সবর করাও সহজ হয়ে যায়।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদত্ত উত্তরের ব্যাখ্যা

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে সে নারীকে তাকওয়া ও ধৈর্যের আদেশ করেছিলেন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে চিনতে না পেরে সে নারী বিরূপ আচরণ করে বসে। এরপর ক্ষমা চাইতে আসলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রত্যুত্তর দিলেন আরেকটি কথা যোগ করে। সেটি হচ্ছে, সবরের আসল স্থল হচ্ছে দুঃখ অবস্থার প্রথম সময়টি। এ সবরেই সাওয়াব মিলে বেশি। ৭২৪

(আল্লাহকে ভয় করো এবং সবর করো) হাদিসের ভাষ্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, এ নারী অতিরিক্ত কাঁদার কারণে বা তার ক্রন্দন বিলাপে পরিণত হওয়ার কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উদ্দেশে এ কথাটা বলেছেন। অন্যথায় স্বাভাবিকভাবে কাঁদলে তো কোনো সমস্যা নেই। স্বাভাবিক ক্রন্দনের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞাও নেই।

মহিলাটি যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে ক্ষমা চাইতে আসে, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে উত্তরটি দিয়েছিলেন, এ ধরনের উত্তরকে বলা হয় 'উসলুবুল হাকিম' তথা প্রজ্ঞাময় উত্তর। প্রশ্নকারী যে প্রশ্নটি করেন, সেটি যদি প্রয়োজনীয় প্রশ্ন বা যথাযথ প্রশ্ন না হয়, তখন উত্তরদাতা যথাযথ ও প্রয়োজনীয় প্রশ্নটির উত্তর দেওয়া উসলুবুল হাকিমের অন্তর্ভুক্ত। ৭২৫

হাদিস থেকে আমরা অনায়াসে বুঝতে পারি যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেন বলছেন, ক্ষমা চাওয়ার দরকার নেই। আমি নিজের জন্য রাগান্বিত হই না; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমি রাগান্বিত হই। তুমি বরং এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ের দিকে নজর দাও।...

হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়:

* কেউ না জানলে তাকে জানানোর ক্ষেত্রে বিনয়ী হওয়া, কোমল আচরণে আগলে নিয়ে শিখিয়ে দেওয়া, দুঃখ-কষ্টে নিপতিত ব্যক্তির প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, বিরূপ আচরণ করে ক্ষমা চাইলে ক্ষমা করে দেওয়া, সর্বদা সকলের ক্ষেত্রে আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকারের আমল করে যাওয়া।
* একজন বিচারক সাধারণ মানুষের জন্য সহজগম্য হবেন।
* কেউ সৎ কাজের আদেশ করলে, তাকে না চিনলেও তার কথা গ্রহণ করে আমল করতে হবে।
* ধৈর্যহীনতা নিষিদ্ধ কর্ম। সে জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ নারী সাহাবিকে সবরের সাথে সাথে আল্লাহকে ভয় করার আদেশ দিয়েছেন।
* দাওয়াত বা নসিহা করার সময় মানুষের দেওয়া কষ্টের ওপর ধৈর্যধারণ করার প্রতি উৎসাহ।

টিকাঃ
৭২৩. সহিহুল বুখারি: ১২৮৩, সহিহু মুসলিম: ৯২৬।
৭২৪. ফাতহুল বারি: ৩/১৫০।
৭২৫. আল-ইদাহ ফি উলুমিল বালাগাহ ২/১১০।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 মহিলাদের প্রহার করতে নিষেধ করেছেন

📄 মহিলাদের প্রহার করতে নিষেধ করেছেন


ইয়াস বিন আব্দুল্লাহ বিন আবু জুবাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমরা আল্লাহর দাসীদের মেরো না।" এরপর উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানালেন, "মহিলারা তাদের স্বামীর অবাধ্য হয়।" অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাদের মৃদু আঘাতের অনুমতি দেন।'

এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের কাছে মহিলারা এসে তাদের স্বামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে লাগল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরিবারের কাছে অনেক মহিলা স্বামীদের নিয়ে অভিযোগ করেছে। যারা নিজের স্ত্রীকে প্রহার করে, তারা তোমাদের মধ্যে ভালো মানুষ নয়।"৭২৬

তাই নারীদের মন্দ আচরণে ধৈর্যধারণ করা এবং তাদের প্রহার না করা উত্তম ও অধিক সুন্দর। ৭২৭

টিকাঃ
৭২৬. সুনানু আবি দাউদ: ২১৪৬, সুনানু ইবনি মাজাহ: ১৯৮৫।
৭২৭. আওনুল মাবুদ: ৬/১৩০।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাওবাকারী নারীর সঙ্গে পূর্বের মতো সদাচার করার নির্দেশ দিতেন

📄 তাওবাকারী নারীর সঙ্গে পূর্বের মতো সদাচার করার নির্দেশ দিতেন


ইমরান বিন হুসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'জুহাইনা গোত্রের এক নারী গর্ভবতী অবস্থায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, “হে আল্লাহর নবি, আমি হদযোগ্য। আমার ওপর হদ কায়িম করুন।"

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার অভিভাবককে ডেকে বললেন, "এ নারীর প্রতি সদাচরণ করো। সন্তান প্রসব হলে তাকে আমার কাছে নিয়ে আসবে।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদেশ পালন করা হলো যথাযথভাবে। তাকে নিয়ে আসা হলো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদেশ দিলে মহিলার কাপড় শক্ত করে বাঁধা হলো। এরপর তিনি রজম করার আদেশ করলেন। রজম শেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জানাজা আদায় করলেন।'

তখন উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উদ্দেশে বললেন, “হে আল্লাহর নবি, আপনি জিনাকারীর জানাজা আদায় করলেন?"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "সে এমন তাওবা করেছে, যদি তার তাওবা মদিনার সত্তরজন লোকের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া হয়, তবে তাদের সকলের জন্য তা যথেষ্ট হবে। তুমি এর চেয়ে উত্তম তাওবা দেখেছ? সে তো তাওবা করতে গিয়ে আল্লাহর জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত দিয়ে দিয়েছে। "৭২৮

গামিদি মহিলার অভিভাবককে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, 'এ নারীর প্রতি সদাচরণ করো। সন্তান প্রসব হলে তাকে আমার কাছে নিয়ে আসবে।'

সদাচরণের আদেশ করার দুটি কারণ।

এক. মহিলার আত্মীয়-স্বজনরা লজ্জার কারণে আত্মসম্মানের বশবর্তী হয়ে তার ক্ষতি করতে পারে। সে জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাবধানতাবশত আদেশ করলেন, যেন তার প্রতি তারা সদাচরণ করে।

দুই. মহিলা তাওবা করার কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দয়াপরবশ হয়ে তার প্রতি সদাচরণ করার জন্য আদেশ করেছেন। কারণ, তার তাওবার পরে মানুষের মনে তার প্রতি ঘৃণার কারণে তাকে তারা কষ্টদায়ক কথাবার্তা শোনাবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাই আগ থেকেই সেগুলো নিষেধ করে দিলেন। ৭২৯

মাখজুম গোত্রের এক মহিলা চুরি করে হদপ্রাপ্ত হয়। আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'সে উত্তমরূপে তাওবা করেছিল। এরপর তার বিয়ে হয়। সে আমার কাছে আসত। আর আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে তার প্রয়োজন তুলে ধরতাম। '৭৩০

অন্য বর্ণনায় এসেছে, 'হদ কায়িমের পর মাখজুমি নারী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উদ্দেশে বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল, আমার জন্য তাওবা করার কোনো পথ আছে কি?"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব দিলেন, "জন্মের দিন সন্তান যেমন গুনাহ থেকে মুক্ত থাকে, তেমনই তুমিও আজ গুনাহমুক্ত।"৭৩১

টিকাঃ
৭২৮. সহিহু মুসলিম: ১৬৯৬।
৭২৯. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১১/২০৫।
৭৩০. সহিহুল বুখারি: ৪৩০৪, সহিহু মুসলিম: ১৬৮৮।
৭৩১. মুসনাদু আহমাদ ৬৬১৯, আহমাদ শাকিরের মতে, হাদিসটি সহিহ। শুআইব আরনাউত বলেন, হাদিসটি জইফ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00