📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 মৃত সাহাবির পরিবারের সঙ্গে সদাচরণ করতেন

📄 মৃত সাহাবির পরিবারের সঙ্গে সদাচরণ করতেন


আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের মধ্যে কেবল তাঁর স্ত্রীদের কাছে যেতেন। আর কেবল উম্মে সুলাইম (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর বাড়িতে যাতায়াত করতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে এসে তাকে সহানুভূতি জানাতেন। এ ব্যাপারে তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বললেন, "আমি তার প্রতি স্নেহশীল হই। কারণ, তার ভাই আমার সাথেই জিহাদে অংশ নিয়ে শহিদ হয়।"৭১২

উম্মে সুলাইম বিনতে মিলহান আনসারি (রাদিয়াল্লাহু আনহা)। আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মা। তিনি জন্মগত নামে নয়; বরং তার উপনাম উম্মে সুলাইম নামেই প্রসিদ্ধ ছিলেন। তার নামের ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে।

'তার ভাই'-বলে উদ্দেশ্য হচ্ছে, হারাম বিন মিলহান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)। তিনি বিরে মাউনার ঘটনায় শাহাদত বরণ করেন।

হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়:

* দ্বীনি ভাই, বন্ধুর মৃত্যুর পর তার পরিবারের সুবিধা-অসুবিধা দেখাশোনা করা, তাদের কাছে যাওয়া-আসা করা উচিত।
* নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে সুলাইমের বাড়িতে যাতায়াত করে তার অন্তর প্রশান্ত করতেন, তাকে সহানুভূতি জানাতেন। কারণ, তার ভাই হারাম বিন মিলহান রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে (তাঁর নির্দেশে) জিহাদে অংশ নিয়ে শহিদ হন। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবি হারাম (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মৃত্যুর পর তার পরিবর্তে তার বোনের নিকট এসে তাকে সহানুভূতি জানাতেন। ৭১৩

টিকাঃ
৭১২. সহিহুল বুখারি: ২৮৪৪, সহিহু মুসলিম: ২৪৫৫।
৭১৩. ফাতহুল বারি: ৮/৪৬১।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 স্বামীকে সম্বোধন করতেন

📄 স্বামীকে সম্বোধন করতেন


নারীদের প্রতি তাঁর সহানুভূতির আরেকটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে, কোনো নারী তার স্বামী থেকে যথোচিত আচরণ না পেলে তিনি স্বামীদের সংশোধন করতেন।

আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'একদিন খুইয়াইলা বিনতে হাকিম (রাদিয়াল্লাহু আনহা) আমার কাছে আসলেন। তিনি ছিলেন উসমান বিন মাজউন (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর স্ত্রী। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জীর্ণ-শীর্ণ অবস্থায় দেখে আমাকে বললেন, "আয়িশা, খুয়াইলার কী জীর্ণ অবস্থা!"

আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসুল, খুয়াইলা এমন এক নারী, যার স্বামী থেকেও নেই। তার স্বামী দিনে রোজা থাকে আর রাতে কিয়ামুল লাইল আদায় করে পার করে দেয়। খুয়াইলাকে সময় দেয় না; তার হক আদায় করে না। যেন সে খুয়াইলার স্বামীই নয়।"

এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উসমান বিন মাজউন (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে ডেকে পাঠালেন। উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আসলে তাকে বললেন, "উসমান, তুমি কি আমার সুন্নাতের প্রতি অনীহ?!"

উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, "আল্লাহর শপথ, কখনো নয়। আমি তো আপনার সুন্নাত তালাশ করি।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তবে আমি ঘুমাই, সালাত আদায় করি। কখনো রোজা রাখি, কখনো রোজা রাখি না। আমি নারীদের বিবাহ করি। উসমান, আল্লাহকে ভয় করো। কারণ, তোমার ওপর তোমার স্ত্রীর অধিকার আছে। তোমার ওপর তোমার মেহমানের অধিকার রয়েছে। তোমার ওপর তোমার নিজের অধিকার আছে। তাই কোনো দিন রোজা রাখবে, কোনো দিন রোজা রাখবে না। রাতের কিছু অংশ সালাত আদায় করবে, কিছু অংশ ঘুমোবে।"৭১৪

(তোমার ওপর তোমার স্ত্রীর অধিকার রয়েছে) ইমাম খাত্তাবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, হাদিসাংশটির উদ্দেশ্য হচ্ছে, তুমি সারা দিন রোজা রেখে ও সারা রাত সালাত পড়ে শক্তিহীন হয়ে পড়লে তোমার স্ত্রীর অধিকার আদায় করতে পারবে না।

(তোমার ওপর তোমার মেহমানদের অধিকার রয়েছে): হাদিসের এ অংশটি এ মাসআলার জন্য দলিল যে, কোনো নফল সিয়াম পালনকারীর নিকট মেহমান এলে মেহমানের সাথে খাবার খাওয়ার জন্য রোজা ভাঙা মুসতাহাব। যাতে মেহমানের মন আনন্দিত হয় এবং মেজবানের প্রতি মেহমানের ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। কারণ, মেজবান তার জন্য নিজের রোজা ভেঙে তাকে একপ্রকার সম্মান করেছে। ৭১৫

টিকাঃ
৭১৪. সুনানু আবি দাউদ: ১৩৬৯, মুসনাদু আহমাদ: ২৫৭৭৬।
৭১৫. আওনুল মাবুদ: ৪/১৭০।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 নারীরা কোনো উপকার করলে তার যথাযথ প্রতিদান দিতেন

📄 নারীরা কোনো উপকার করলে তার যথাযথ প্রতিদান দিতেন


নারীদের কারও অবদান কখনো ভুলতেন না তিনি; বরং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতেন এবং তাদের প্রতি সদাচরণ করতেন।

ইমরান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে আমরা এক সফরে ছিলাম। আমরা রাতের বেলা অগ্রসর হতাম। একদিন শেষ রাতে আমরা এক জায়গায় ঘুমিয়ে পড়লাম। মুসাফিরের জন্য সে ঘুমের চেয়ে মধুর কোনো কিছু হতে পারে না।'

পরদিন সূর্যের গরম আলো আমাদের জাগিয়ে তুলল। আমাদের মাঝে প্রথম জেগেছিলেন আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)। এরপর অমুক, এরপর অমুক। চতুর্থবারে জেগে উঠলেন উমর বিন খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু)।'

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুমালে আমরা কেউ তাঁকে জাগিয়ে তুলতাম না। যতক্ষণ না তিনি জেগে উঠছেন, আমরা অপেক্ষা করতাম। কারণ, আমরা জানতাম না, ঘুমের ভেতর কী ঘটছে। ৭১৬

উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) জেগে উঠে মানুষের অবস্থা দেখলেন (সকলে ঘুমিয়ে; অথচ সালাতের সময় অতিক্রম হয়ে গেছে)। উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) জোরেশোরে তাকবির দিলেন। উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ছিলেন উচ্চকণ্ঠের অধিকারী। তিনি তাকবির দিতে থাকলেন, আর তার স্বরও চড়তে থাকল। তার আওয়াজে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জেগে উঠলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জেগে উঠলে সকলে তাঁর নিকট ওজর পেশ করল। তিনি বললেন, "সমস্যা নেই। সামনে অগ্রসর হও।"৭১৭

কাফেলা এগিয়ে চলল। একটু সামনে গিয়েই আবার থামল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের অজু করতে বলে নিজেও অজু করে নিলেন। সালাতের জন্য ডাকা হলো। সকলকে নিয়ে তিনি সালাত আদায় করলেন।'

সকলের সালাত শেষে দেখা গেল একজন পৃথক হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। জামাআতের সাথে সালাত আদায় করেননি তিনি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম "হে অমুক, সবার সাথে সালাত আদায় করলে না কেন?" বললেন,

সে বলল, "আমার গোসল ফরজ হয়েছে, কিন্তু পানি নেই।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করে নাও। সেটাই তোমার জন্য যথেষ্ট হবে।"

এরপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কাফেলা এগিয়ে চলল। কাফেলার লোকেরা পিপাসার অভিযোগ করলে তিনি থামলেন। একজনকে ৭১৮ ডাকলেন, সাথে ডাকলেন সাথে আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে। বললেন, "তোমরা দুজন গিয়ে পানির খোঁজ করো। আমরা যখন এগিয়ে চললাম, দেখলাম, এক উষ্ট্রারোহী নারী। তার পায়ের কাছে পানির দুটি মশক বাঁধা।"

আমরা তাকে বললাম, "পানি কোথা থেকে এনেছ?"

অনেক দূর, অনেক দূর! আশা করে লাভ নেই। তোমরা পানি খুঁজে পাবে না।

তোমার ও তোমার পরিচিতজনদের মাঝে দূরত্ব কতটুকু?

একদিন ও একরাতের পথ।

আমাদের সাথে চলো তবে।

কোথায়?

আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে।

যাকে সাবিয়ি (ধর্ম পরিবর্তনকারী) বলা হয়, তার কাছে?

হাঁ, তোমরা যাঁর ব্যাপারে এ কথাটি বলো, তাঁর কাছে চলো।

(বর্ণনাকারী বলেন) এরপর মহিলাকে নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলেন তারা দুজন। তাকে ঘটনার বিবরণ দিলেন। মহিলাটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কেও তা-ই বলল, যা আমাদের বলেছিল। আরও বলল, "তার দুটি এতিম সন্তান আছে।" এরপর মহিলাকে নামানো হলো তার উট থেকে। দুটি পাত্র আনতে বললেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। মশকের মুখ দিয়ে পানি ঢাললেন পাত্র দুটিতে। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মশকদুটির ওপরের মুখ বন্ধ করে দিয়ে নিচের মুখ দুটি খুলে দিলেন। ৭১৯

"পানি পান করো, পানি পান করো" বলে মানুষদের ডাকা হলো। এরপর আমরা চল্লিশজন মানুষ পানি পান করলাম। তৃষ্ণার্ত ছিলাম আমরা। পানি পান করে পরিতৃপ্ত হলাম। আমাদের কাছে যতটি মশক ও পাত্র ছিল, সবগুলোতে পানি ভরে নিলাম। তবে আমরা উটকে পানি পান করাইনি। আমরা এত পানি নেওয়ার পরও সে মশকদুটি থেকে যেন পানি উপচে পড়ছে! এর মাঝে যার গোসল ফরজ হয়েছিল, তাকে এক পাত্র পানি দিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যাও, এ পানি দিয়ে গোসল করে নাও।"

আর মহিলাটি তখন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল, তার পানি দিয়ে কী করা হচ্ছে। আল্লাহর শপথ, পানি নেওয়া শেষ হলো। কিন্তু মনে হচ্ছিল, মশকদুটি থেকে যখন পানি নেওয়া শুরু করি আমরা, তখনকার চাইতে এখন মশকদুটি আরও বেশি পানিতে ভরে আছে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বললেন, "তোমাদের কাছে যা আছে, এ মহিলার জন্য একত্র করো।"

কেউ আজওয়া খেজুর আনল, কেউ আটা আনল, কেউ ছাতু আনল। এভাবে তার জন্য অনেক খাদ্যদ্রব্য জমা করা হলো একটি কাপড়ে। এরপর মহিলাকে উটে উঠিয়ে দেওয়া হলো। কাপড়টি পুঁটলি করে উটের ওপর তার সামনে রাখা হলো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, "যাও। এ খাদ্য হতে তোমার পরিবারকে খাওয়াও। তুমি জানো, আমরা তোমার পানি থেকে এতটুকু কম করিনি; বরং আল্লাহই আমাদের পানি দিয়েছেন।"

এরপর মহিলা তার পরিবারের কাছে আসলো। দেরি হওয়ার কারণ জানতে চাইল তারা। বলল, "তোমাকে কীসে আটকে রেখেছিল, হে অমুক?"

মহিলা উত্তর দিল, "আশ্চর্যজনক এক ঘটনা ঘটল। দুজন লোক আমার সামনে এল। এরপর আমাকে নিয়ে "ধর্ম পরিবর্তনকারী" বলা হয় যাকে, তার কাছে নিয়ে গেল। এরপর তিনি এমন এমন করলেন।" এরপর মহিলা তার মধ্যমা ও তর্জনি আঙুলদ্বয় আকাশের দিকে তুলে বলল, "আল্লাহর কসম, নিশ্চয় তিনি আসমান ও জমিনের মাঝে সবচেয়ে বড় জাদুকর। অথবা তিনি সত্যিই আল্লাহর রাসুল।"

মুসলিমরা কখনো সে এলাকার মুশরিকদের ওপর অতর্কিতে হামলা করলেও কখনো সে মহিলার গোত্রের ওপর হামলা করতেন না। একদিন মহিলা তার গোত্রকে বলল, "আমার বিশ্বাস, এরা (মুসলিমরা) ইচ্ছে করেই আমাদের ছেড়ে দিচ্ছে। তবুও কি তোমরা ইসলামে প্রবেশ করবে না?” গোত্রের লোকেরা মহিলার কথা মানল। তারা সবাই ইসলামে প্রবেশ করল। '৭২০

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে মহিলার যথাযথ সমাদর করলেন। তার অবদানের যথাযথ মর্যাদা দিলেন। তার জন্য খাবার একত্র করলেন। তার কর্মের কারণে তার গোত্রকেও সমাদরের অন্তর্ভুক্ত করলেন।

আইনি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে মহিলাকে, তার গোত্র ও ভূমিকে আক্রমণ না করে তার অবদানের যথাযথ প্রতিদান দিলেন। '৭২১

হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়:

* কারও সালাত ছুটে গেলে, স্মরণ আসার পর আদায় করে দেবে; যদিও ওয়াক্ত শেষ হয়ে যাক।
* পানির প্রয়োজন যখন তীব্র হয়ে যায়, তখন যার কাছে পানি পাওয়া যায়, তার কাছ থেকে নিতে হবে এবং তাকে বিনিময় দিয়ে দিতে হবে। যেমন এ মহিলাকে দেওয়া হয়েছিল।
* এ হাদিসে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুজিজা বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরো বাহিনীকে অজু করালেন, তাদের পানি পান করালেন, গোসলও করালেন। এসবই করলেন মশকের নিচের দিকের মুখটি খুলে দিয়ে। পানিসংক্রান্ত কাজ শেষ হলো। কিন্তু দেখা গেল মশকদুটি তখনো পরিপূর্ণ পানিতে।
* এ হাদিসে মানুষের প্রতি সদাচরণের শিক্ষা রয়েছে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে মহিলার সম্মান বজায় রাখলেন মহিলার গোত্রের মাঝে। তার গোত্রের ওপর কখনো আক্রমণ করা হয়নি; মহিলার পানি পান করানোর বদৌলতে। আর সম্মান করা ও আক্রমণ না করার কারণ ছিল মহিলা ও তার গোত্রের ইসলাম গ্রহণের আশায়।
* কোনো কাফিরের প্রতি দয়া দেখিয়ে তাকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার শিক্ষা পাই আমরা এ হাদিস থেকে। ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্যই সে মহিলার গোত্রের ওপর হামলা করা হয়নি। এরপর তারা বুঝতে পেরে নিজ থেকেই ইসলাম গ্রহণে এগিয়ে আসলো এবং সত্যকে আপন করে নিল। ৭২২

টিকাঃ
৭১৬. সাহাবিগণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ঘুম থেকে জাগাতেন না। কেননা, ঘুমের মধ্যে ওহি নাজিলের সম্ভাবনা ছিল। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জাগিয়ে ওহি নাজিলের মাঝে ব্যাঘাত ঘটে কি না, তাই তারা ভয়ে তাঁকে জাগাতেন না।
৭১৭. সময়মতো সালাত না পড়তে পারার কারণে সাহাবিদের অন্তর অস্থির ছিল। তাঁরা আফসোস করছিলেন। তাঁরা যেহেতু ইচ্ছে করে এমন করেনি, তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম 'কোনো সমস্যা নেই' বলে তাঁদের সান্ত্বনা দিলেন।
৭১৮. তিনি ছিলেন বর্ণনাকারী সাহাবি স্বয়ং ইমরান বিন হুসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহু)।
৭১৯. মশকের ওপরের মুখের চেয়ে নিচের মুখ দিয়ে বেশি পানি পড়ে।
৭২০. সহিহুল বুখারি ৩৪৪, সহিহু মুসলিম: ৬৮২।
৭২১. উমদাতুল কারি: ৪/৩২।
৭২২. শারহু সহিহিল বুখারি: ১/৪৮৭।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 নবুয়তের সাথে নারীদের ভুল সংশোধন করে দিতেন

📄 নবুয়তের সাথে নারীদের ভুল সংশোধন করে দিতেন


নারীদের কাউকে ভুল করতে দেখলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্নেহের সাথে নরম কণ্ঠে তার ভুল ধরিয়ে দিতেন।

আনাস বিন মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মহিলার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যিনি কবরের পাশে বসে কাঁদছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি আল্লাহকে ভয় করো এবং সবর করো।" মহিলাটি বলল, "আমার কাছ থেকে চলে যান। আপনার ওপর তো আমার মতো মুসিবত আসেনি।" সে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে চিনতে পারেনি (বিধায় এমন কথা বলেছে)। পরে তাকে বলা হলো যে, তিনি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তখন সে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরোজায় হাজির হলো। সেখানে কোনো পাহারাদার পেলে না। সে আরজ করল, "আমি আপনাকে চিনতে পারিনি।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "সবর তো বিপদের প্রথম অবস্থাতেই।"৭২৩

অর্থাৎ উত্তম সবরকারী হচ্ছে সে, যে বিপদ আপতিত হওয়ার সাথে সাথে সবর করে। অন্যদিকে যে দেরিতে সবর করে, তার সবর প্রথম পর্যায়ের মতো উত্তম হয় না। তার সাওয়াবও কম হয়। কারণ, দিন যত গড়াবে, মানুষ তত দুঃখ ভুলে যায়, কষ্ট ভুলে যায়-তখন সবর করাও সহজ হয়ে যায়।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদত্ত উত্তরের ব্যাখ্যা

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে সে নারীকে তাকওয়া ও ধৈর্যের আদেশ করেছিলেন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে চিনতে না পেরে সে নারী বিরূপ আচরণ করে বসে। এরপর ক্ষমা চাইতে আসলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রত্যুত্তর দিলেন আরেকটি কথা যোগ করে। সেটি হচ্ছে, সবরের আসল স্থল হচ্ছে দুঃখ অবস্থার প্রথম সময়টি। এ সবরেই সাওয়াব মিলে বেশি। ৭২৪

(আল্লাহকে ভয় করো এবং সবর করো) হাদিসের ভাষ্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, এ নারী অতিরিক্ত কাঁদার কারণে বা তার ক্রন্দন বিলাপে পরিণত হওয়ার কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উদ্দেশে এ কথাটা বলেছেন। অন্যথায় স্বাভাবিকভাবে কাঁদলে তো কোনো সমস্যা নেই। স্বাভাবিক ক্রন্দনের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞাও নেই।

মহিলাটি যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে ক্ষমা চাইতে আসে, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে উত্তরটি দিয়েছিলেন, এ ধরনের উত্তরকে বলা হয় 'উসলুবুল হাকিম' তথা প্রজ্ঞাময় উত্তর। প্রশ্নকারী যে প্রশ্নটি করেন, সেটি যদি প্রয়োজনীয় প্রশ্ন বা যথাযথ প্রশ্ন না হয়, তখন উত্তরদাতা যথাযথ ও প্রয়োজনীয় প্রশ্নটির উত্তর দেওয়া উসলুবুল হাকিমের অন্তর্ভুক্ত। ৭২৫

হাদিস থেকে আমরা অনায়াসে বুঝতে পারি যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেন বলছেন, ক্ষমা চাওয়ার দরকার নেই। আমি নিজের জন্য রাগান্বিত হই না; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমি রাগান্বিত হই। তুমি বরং এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ের দিকে নজর দাও।...

হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়:

* কেউ না জানলে তাকে জানানোর ক্ষেত্রে বিনয়ী হওয়া, কোমল আচরণে আগলে নিয়ে শিখিয়ে দেওয়া, দুঃখ-কষ্টে নিপতিত ব্যক্তির প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, বিরূপ আচরণ করে ক্ষমা চাইলে ক্ষমা করে দেওয়া, সর্বদা সকলের ক্ষেত্রে আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকারের আমল করে যাওয়া।
* একজন বিচারক সাধারণ মানুষের জন্য সহজগম্য হবেন।
* কেউ সৎ কাজের আদেশ করলে, তাকে না চিনলেও তার কথা গ্রহণ করে আমল করতে হবে।
* ধৈর্যহীনতা নিষিদ্ধ কর্ম। সে জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ নারী সাহাবিকে সবরের সাথে সাথে আল্লাহকে ভয় করার আদেশ দিয়েছেন।
* দাওয়াত বা নসিহা করার সময় মানুষের দেওয়া কষ্টের ওপর ধৈর্যধারণ করার প্রতি উৎসাহ।

টিকাঃ
৭২৩. সহিহুল বুখারি: ১২৮৩, সহিহু মুসলিম: ৯২৬।
৭২৪. ফাতহুল বারি: ৩/১৫০।
৭২৫. আল-ইদাহ ফি উলুমিল বালাগাহ ২/১১০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00