📄 নারীদের সাথে তাঁর আচরণের মূল কাঠামো ছিল ধৈর্য ও স্নেহ
সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে উপবিষ্ট ছিলেন কয়েকজন কুরাইশ নারী। তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে প্রশ্ন করছিলেন, নানান বিষয় জানতে চাইছিলেন তাঁর কাছে। তাদের কণ্ঠস্বর উঁচু ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কণ্ঠের তুলনায়। এমন সময় উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এসে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) অনুমতি চাইতেই নারীরা সকলে পর্দার আড়ালে চলে গেল।'
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুমতি দিলে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ভেতরে এলেন। দেখলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসছেন। উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, "আল্লাহ আপনার মুখ সদা হাস্যোজ্জ্বল রাখুন। হে আল্লাহর রাসুল, আপনার জন্য আমার বাবা-মা কুরবান হোক।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আমি এ নারীদের প্রতি আশ্চর্য হলাম। তারা আমার কাছেই ছিল। কিন্তু যখনই তোমার কণ্ঠস্বর শুনল, তখন তারা পর্দার আড়ালে চলে গেল।"
উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল, তাদের ওপর কর্তব্য হচ্ছে, আপনাকে বেশি ভয় করা।"
এরপর উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মহিলাদের দিকে মুখ করে বললেন, "হে নিজেদের প্রাণের শত্রু, তোমরা আমাকে ভয় করছ; অথচ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ভয় করছ না!?"
ভেতর থেকে নারীদের আওয়াজ এল, "আপনি অধিক কঠোর ও রাগী।"৬৮৭
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে থামিয়ে বললেন, “থামো হে উমর, সে সত্তার কসম-যাঁর হাতে আমার প্রাণ, শয়তান যখন তোমাকে কোনো রাস্তায় চলতে দেখে, তখন শয়তান আর সে রাস্তা দিয়ে এগোয় না, অন্য রাস্তা ধরে সে।"৬৮৮
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথাটি বাহ্যিক অর্থেই ধর্তব্য। কারণ, সত্যিকার অর্থেই শয়তান যে রাস্তায় উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে চলতে দেখে, উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ভয়ে সে ওই রাস্তা ত্যাগ করে অন্য রাস্তা ধরে। কারণ, উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে শয়তান অনেক ভয় করত। পাছে না উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাকে কিছু করে বসেন।
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, কোমল আচরণ, ধৈর্য ও স্নেহশীলতা অনেক উত্তম। এ উত্তমতা ততক্ষণ বজায় থাকে, যতক্ষণ শরিয়তের কোনো বিধান এগুলোর কারণে না ছুটে যায়। তাই আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِلْمُؤْمِنِينَ
'আর মুমিনদের জন্য আপনার স্নেহের ডানা মেলে দিন। '৬৮৯
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نَفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ 'যদি আপনি রূঢ় মেজাজ ও কঠিন হৃদয়ের হতেন, তবে অবশ্যই তারা আপনার নিকট হতে সরে যেত। '৬৯০
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ 'মুমিনদের প্রতি তিনি বড়ই স্নেহশীল, করুণাপরায়ণ। '৬৯১'৬৯২
টিকাঃ
৬৮৭. আলিমগণ বলেন, 'আধিক্যতার শব্দ ব্যবহার এখানে উত্তম হিসেবে নয়; বরং এটা স্রেফ কঠোরতার জন্য ব্যবহার করেছেন নারী সাহাবিরা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবল তাদের প্রতিই রাগান্বিত হতেন, যারা আল্লাহর কোনো হক আদায় করে না। অন্যদিকে, উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সাধারণ কোনো মাকরুহ কাজ করতে দেখলে বা কোনো মুসতাহাব ছুটে যেতে দেখলে কঠোরতা করতেন অন্যদের ওপর। এ জন্যই নারী সাহাবিগণ তার ক্ষেত্রে আধ্যিকতাবোধক শব্দ ব্যবহার করেছেন। দেখুন, ফাতহুল বারি: ৭/৪৭।
৬৮৮. সহিহুল বুখারি: ৩৬৮৩, সহিহু মুসলিম: ২৩৯৭।
৬৮৯. সুরা আল-হিজর, ১৫: ৮৮।
৬৯০. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১৫৯।
৬৯১. সুরা আত-তাওবা, ৯: ১২৮।
৬৯২. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৫/১৬৫।
📄 বিধবাদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের প্রতি স্নেহশীল ছিলেন। নারীদের মধ্যে বিধবাগণ তো তাঁর দয়া ও স্নেহশীলতার অধিক উপযুক্ত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন অনুপম চরিত্রের অধিকারী। কখনো তিনি বিধবাদের দেখে অহংকার করতেন না। তাদের সাথে কথা বলতে, তাদের প্রয়োজন পূরণে কখনো সংকোচবোধ করতেন না।
আব্দুল্লাহ বিন আবু আওফা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিক পরিমাণে জিকির করতেন। অনর্থক কথা ও কাজ একেবারেই করতেন না। সালাত দীর্ঘ করে আদায় করতেন। খুতবা সংক্ষিপ্ত করে সমাপ্ত করতেন। বিধবা ও মিসকিনের প্রয়োজন পূরণে তাদের সাথে হেঁটে যেতে কখনো সংকোচবোধ করতেন না। '৬৯৩
টিকাঃ
৬৯৩. সুনানুন নাসায়ি: ১৪১৪।
📄 বিধবাদের সাহায্য করার ফজিলত বলতেন
তিনি ইরশাদ করেছেন, 'বিধবা ও মিসকিনের জন্য চেষ্টাকারী আল্লাহর রাস্তার মুজাহিদের মতো। অথবা সে লোকের মতো, যে লোক দিনে রোজা রাখে এবং রাতে কিয়াম করে থাকে। '৬৯৪
ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'চেষ্টাকারী অর্থ, যে তাদের জন্য কামাই করে। বিধবা হলো, যার স্বামী নেই; চাই সে বিয়ে করুক বা না করুক। কেউ কেউ বলে, যে স্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একাকী আছে, সে বিধবা।'
ইবনে কুতাইবা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'বিধবাদের أَرْمَلَ বলা হয়। কারণ, তাদের মাঝে إرْمال পাওয়া যায়। إِرْمَال অর্থ হচ্ছে, স্বামী না থাকার কারণে আপতিত দারিদ্র্য এবং সম্বলহীন হওয়া। তাই যখন কোনো লোকের রসদ শেষ হয়ে যায়, তখন বলা হয় أَرْمَلَ الرَّجُلُ অর্থাৎ লোকটি সম্বলহীন হলো।'
টিকাঃ
৬৯৪. সহিহুল বুখারি: ৫৩৫৩, সহিহু মুসলিম: ২৯৮২।
📄 নারীদের প্রয়োজন দ্রুত মিটিয়ে দিতেন
আনাস বিন মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'এক মহিলা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল, আমার একটা প্রয়োজন ছিল আপনার কাছে।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "হে অমুকের মা, তুমি একটু রাস্তায় অপেক্ষা করো, আমি তোমার প্রয়োজন মেটাবার ব্যবস্থা করছি।" এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাস্তার একপাশে তার সাথে দেখা করে তার প্রয়োজন মিটিয়ে দিলেন। '৬৯৫
এ হাদিসটিতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিনম্রতার অনুপম দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত হয়েছে। এ নারীটির সাহায্যের প্রয়োজন পড়ল আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে সাথে তার প্রয়োজনে সাড়া দিয়ে তার প্রয়োজন পূরণ করলেন।
হাদিস থেকে বোঝা যায়:
* রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুসের সাথে ও তাদের কাছাকাছি থাকতেন, যাতে তাঁকে দেখে মানুষ তাঁর অনুসরণ করতে পারে এবং বিভিন্ন প্রয়োজনে তাঁর কাছে সহজে আসতে পারে। এভাবে মানুষের কাছে থাকা সকল দায়িত্বশীলদের উচিত।
* মুসলিমদের কল্যাণের জন্য তিনি প্রয়োজনে কষ্ট সহ্য করতেন।
* কেউ নিজের অভাব নিয়ে উপস্থিত হলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা পূর্ণ করতেন।
* সাধারণ একজন মহিলার সাথেও তিনি নিঃসংকোচে কথা বলেছেন। এটা তাঁর অনুপম বিনম্রতার বহিঃপ্রকাশ। ৬৯৬
আনাস বিন মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'যদি মদিনার কোনো দাসী এসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাত ধরে কোথাও নিয়ে যেতে চাইত, তবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সে অনায়াসে নিয়ে যেতে পারত যেখানে তার ইচ্ছে হতো। '৬৯৭
ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এখানে হাত ধরে নিয়ে যাওয়ার অর্থ হলো, কোনো দাসী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে তার প্রয়োজন পূরণ করিয়ে দেওয়ার আবেদন করলে তিনি তাতে সাড়া দিতে কোনোরূপ কুণ্ঠাবোধ করতেন না। এমনকি তার প্রয়োজন যদি মদিনার বাইরের কোনো জায়গায় হয়, তিনি সেখানে গিয়ে তার প্রয়োজন মেটাতেন। এটা প্রমাণ করে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যধিক বিনয়ী ও নম্র ছিলেন এবং সব ধরনের অহংকার থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। '৬৯৮
ফায়দা: এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, দাসী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাত ধরেছে; অথচ অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো (গাইরে মাহরাম) মহিলার হাত স্পর্শ করেননি-এ বিরোধের নিরসন কী?
উত্তর: উলামায়ে কিরাম এর কয়েকটি উত্তর দিয়েছেন-
১. এখানে হাত ধরার কথা বলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অত্যধিক বিনয়-নম্রতা বোঝানো হয়েছে; যেমনটি ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন। ৬৯৯
২. অনেক ক্ষেত্রে স্বাধীন মহিলার হukুমের সাথে দাসীর হুকুমের ভিন্নতা রয়েছে। দাসীকে ক্রয় করা যায়, বিক্রয় করা যায়। এ জন্য গাইরে মাহরাম পুরুষদের সাথে দাসীর পর্দা করা জরুরি নয়।
৩. সম্ভবত ওই দাসী সাবালিকা ছিল না। এই উত্তরটাই অধিক যথার্থ। [শেষের উত্তর দুটি আব্দুল আজিজ রাজিহি দিয়েছেন। [৭০০
টিকাঃ
৬৯৫. সহিহু মুসলিম: ২৩২৬।
৬৯৬. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৫/১৮২। ঈষৎ পরিমার্জিত।
৬৯৭. মুসনাদু আহমাদ: ১১৫৩০। বুখারি (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর তালিকে এ হাদিসটি এনেছেন, হাদিস: ৬০৭২।
৬৯৮. ফাতহুল বারি: ১০/৪৯০।
৬৯৯. ফাতহুল বারি: ১০/৪৯০।
৭০০. বলেছেন শাইখ আব্দুল আজিজ আর-রাজিহি। ইসলামওয়েব।