📄 কখনো অল্প সাদাকায় অধিক বারাকাহ পাওয়া যায়
অনেক সময় অল্প সম্পদ দান করলেও, আল্লাহ তা কবুল করে নেন এবং তাতে প্রবৃদ্ধি দান করেন; ফলে এই অল্প সম্পদই অধিক সম্পদের চেয়ে বেশি বলে প্রমাণিত হয়।
আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "এক দিরহাম এক লাখ দিরহামের ওপর বিজয় হয়।"
সাহাবিগণ জানতে চাইলেন, "কীভাবে?"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এক ব্যক্তির নিকট দুটি দিরহাম ছিল। সে একটি দিরহাম দান করল। অন্যদিকে আরেকজন ব্যক্তি তার সম্পদের স্তূপের নিকট গেল এবং বিরাট সম্পদ থেকে এক লাখ দিরহাম দান করল।..."৬৩৬
টিকাঃ
৬৩৬. সুনানুন নাসায়ি ২৫২৭। হাদিসের মান: হাসান।
📄 সাদাকার প্রতি মহিলাদের অনেক বেশি উৎসাহিত করতেন
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর স্ত্রী জাইনাব (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বললেন, "হে নারীসমাজ, তোমরা সাদাকা করো; যদিও অলংকার থেকেই তোমাদের সাদাকা করতে হোক না কেন।"
জাইনাব (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'এরপর আমি আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে ফিরে এলাম। তাকে বললাম, "আপনি তো অসচ্ছল। এদিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সাদাকা করতে আদেশ করেছেন। আপনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গিয়ে জেনে আসুন, আপনাকে সাদাকা দিলে যথেষ্ট হবে, নাকি অন্য কাউকে সাদাকা করতে হবে।" আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, "বরং তুমি গিয়ে জেনে আসো।"
এরপর আমিই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলাম। দেখলাম, আনসারি এক নারী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরোজায় দাঁড়িয়ে আছে। সেও তা-ই জানতে এসেছে, যা জানার জন্য আমি আসলাম। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রবল গাম্ভীর্যপূর্ণ ব্যক্তিত্বের কারণে আমরা তাঁর কাছে যেতে ইতস্তত করছিলাম। তখন বিলাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বের হয়ে এলেন আমাদের কাছে। আমরা তাকে বললাম, “রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গিয়ে তাঁর কাছে বলুন, দরোজায় দুজন মহিলা দাঁড়িয়ে আছে। তারা জানতে চাইছে, তারা তাদের স্বামী ও সন্তানদের ওপর সাদাকা করলে কি তা সাদাকা আদায় হবে? তবে আমাদের পরিচয় তাঁকে বলবেন না।"
এরপর বিলাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গিয়ে তাঁকে তাদের কথা বললেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব না দিয়ে জানতে চাইলেন, "তারা কারা?"
বিলাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, "জনৈক আনসার মহিলা এবং জাইনাব।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে চাইলেন, "কোন জাইনাব?"
বিলাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, "আব্দুল্লাহর স্ত্রী জাইনাব।"
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এ সাদাকায় তারা দ্বিগুণ সাওয়াব পাবে। আত্মীয়তা রক্ষার সাওয়াব ও সাদাকার সাওয়াব।"৬৩৭
হাদিস থেকে বোঝা যায়:
* নিকটাত্মীয়দের সাদাকা করার প্রতি উৎসাহ। তবে ওয়াজিব সাদাকা হলে তা এমন আত্মীয়কে দেওয়া যাবে না, যার ভরণপোষণের দায়িত্ব দাতার কাঁধে ন্যস্ত।
* আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করার প্রতি উৎসাহ।
* স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রী নিজ সম্পদ থেকে দান করতে পারবে।
* নারীদের উপদেশ দেওয়া এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলকে ভালো কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করার বিষয়ে দায়িত্বশীলদের উৎসাহিত করা হয়েছে এ হাদিসে।
টিকাঃ
৬৩৭. সহিহুল বুখারি: ১৪৬৬, সহিহু মুসলিম: ১০০০।
📄 নারীরাই সবচেয়ে বেশি সাদাকা করতেন
আবু সাইদ খুদরি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'ইদুল ফিতর ও ইদুল আজহার দিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে সালাতে দাঁড়াতেন। সালাতের সালাম ফিরিয়ে মানুষের অভিমুখী হতেন। মানুষজন তাদের সালাতের স্থানে বসা থাকত। যদি কোনো অভিযান প্রেরণের প্রয়োজন থাকত, তবে তা মানুষের নিকট উপস্থাপন করতেন। অথবা অন্য কোনো প্রয়োজন থাকলে, আদেশ করতেন তিনি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, "তোমরা সাদাকা করো, তোমরা সাদাকা করো, তোমরা সাদাকা করো।"
অতঃপর (তাঁর আদেশ পেয়ে) নারীরাই সবচেয়ে বেশি সাদাকা করত। '৬৩৯
টিকাঃ
৬৩৮. ফাতহুল বারি: ৩/৩৩০।
৬৩৯. সহিহুল বুখারি: ৩০৪, সহিহু মুসলিম: ৮৮৯।
📄 তাদের বেশি জিকির করতে উদ্বুদ্ধ করতেন
ইউসাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত-তিনি মুহাজির নারী ছিলেন-তিনি বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের উদ্দেশে বললেন, "তোমরা অবশ্যই তাসবিহ سُبْحَانَ الْمَلِكِ الْقُدُّوس ) (لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ ) 7 (سُبْحَانَ اللهِ) অথবা سُبُّوحٌ قُدُّوسُ رَبُّ الْمَلَائِكَةِ وَالرُّوحِ( পড়বে। আঙুলে গুনে গুনে জিকির করবে। কিয়ামতের দিন আঙুলগুলোকে জিজ্ঞেস করা হবে এবং এগুলোকে কথা বলার জন্য আদেশ করা হবে। তাই তোমরা উদাসীন হয়ে আল্লাহর রহমত থেকে বিস্মৃত হোয়ো না।"৬৪০
ইবনে ইল্লান (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আঙুলে গোনার প্রকৃতি দুভাবে হতে পারে। এক. প্রতি আঙুলের গিরায় গিরায় গণনা করা। দুই. গিরায় গিরায় না গুনে পুরো আঙুল ধরে গণনা করা।'
আঙুলের গিরায় গিরায় গণনার ক্ষেত্রে প্রতিবার জিকিরের সময়ে একটি গিরায় বৃদ্ধাঙ্গুল রাখতে হবে। পুরো আঙুলে গণনার সময় প্রতিবার জikিরের সময় একটি আঙুল ভাঁজ করবে। '৬৪১
পুরো আঙুলে গণনা করা হোক বা আঙুলের গিরায় গিরায় ধরে গণনা করা হোক, উভয় পদ্ধতিরই অবকাশ আছে এখানে।
তিবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে জিকিরের সময় আঙুল দিয়ে হিসাব করতে উৎসাহিত করেছেন। কারণ, এতে তারা নিজেদের আঙুল দিয়ে যে গুনাহ করেছে, সে গুনাহ মুছে যাবে এবং তারা মার্জনাপ্রাপ্ত হবে।'
(কিয়ামতের দিন আঙুলগুলোকে জিজ্ঞাসা করা হবে): অর্থাৎ কিয়ামতের দিন আঙুলকে জিজ্ঞেস করা হবে যে, তারা কোন কাজে ব্যবহৃত হয়েছে, তার মাধ্যমে কোন কর্মগুলো সাধিত হয়েছে।
(এগুলোকে কথা বলার জন্য আদেশ করা হবে): অর্থাৎ আঙুলগুলোকে কথা বলার আদেশ করলে, এগুলো ব্যক্তির পক্ষে অথবা বিপক্ষে কথা বলবে। আঙুল দিয়ে কৃত কর্মগুলোর ফিরিস্তি দিতে থাকবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَوْمَ تَشْهَدُ عَلَيْهِمْ أَلْسِنَتُهُمْ وَأَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
“যেদিন তাদের কৃতকর্মের ব্যাপারে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে তাদের জিহ্বা, তাদের হাত ও তাদের পা।"৬৪২
(তাই তোমরা উদাসীন হোয়ো না...): অর্থাৎ তাই তোমরা জিকির থেকে উদাসীন হোয়ো না। জিকির পরিত্যাগ কোরো না।
(আল্লাহর রহমত থেকে বিস্মৃত হোয়ো না): মোল্লা আলি কারি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এখানে আল্লাহর রহমতকে বিস্মৃত হওয়ার অর্থ হচ্ছে, আল্লাহর রহমত আসার মাধ্যমকে ভুলে যাওয়া। অর্থাৎ তোমরা যদি জিকির না করো, তবে তোমরা তার সাওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে। তাই জিকির পরিত্যাগ করার অর্থ হচ্ছে রহমত পরিত্যাগ করা। তোমরা জিকির থেকে উদাসীন হলে আল্লাহও তোমাদের ওপর রহম করবেন না। '৬৪৩
টিকাঃ
৬৪০. সুনানুত তিরমিজি: ৩৫৮৩, সুনানু আবি দাউদ ১৫০৫, মুসনাদু আহমাদ ২৬৫৪৯। হাদিসের মান: হাসান।
৬৪১. আল-ফুতুহাতুর রব্বানিয়াহ: ৩/২৫০।
৬৪২. সুরা আন-নুর, ২৪: ২৪।
৬৪৩. তুহফাতুল আহওয়াজি: ১০/৩১।