📄 নারীদের উপদেশ দেওয়ার প্রতি বেশ আগ্রহী ছিলেন
জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'ইদের দিন আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সালাত আদায় করলাম। খুতবার আগে আজান ও ইকামত ছাড়া তিনি সালাত পড়ালেন। সালাত শেষে বিলাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ওপর ভর দিয়ে দাঁড়ালেন তিনি। অতঃপর আল্লাহকে ভয় করার ও তাঁর আনুগত্য করার আদেশ করলেন এবং মানুষদের উপদেশ দিলেন।'
এরপর সেখান থেকে নারীদের কাছে আসলেন। তাদের উপদেশ দিলেন। বললেন, "তোমরা সাদাকা করবে। কারণ, অধিকাংশ নারীরা জাহান্নামের ইন্ধন হবে।" মহিলাদের মাঝখান থেকে গালে তিলবিশিষ্ট এক নারী দাঁড়িয়ে বলল, “কেন, হে আল্লাহর রাসুল?"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, "কারণ, তোমরা অধিক হারে অভিযোগ করো এবং স্বামীর প্রতি অকৃতজ্ঞ হও।"৬৩১
জাবির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'এরপর নারীরা তাদের অলংকার খুলে সাদাকা করতে লাগল। তারা তাদের কানের দুল ও আংটি খুলে বিলাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাপড়ে নিক্ষেপ করতে লাগল। '৬৩২
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইদের সালাত পড়াতে এসে যখন দেখলেন, অনেক মানুষ একত্র হয়েছে, তখন স্বভাবতই মহিলাদের কাতার পুরুষদের কাতারের পেছনে হওয়ায় মহিলারা বেশ দূরে পড়ে যায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখলেন, তারা খুতবা শুনতে পাবে না। তাই ইলম শেখার ক্ষেত্রে তাদের অধিকার আদায় করার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই তাদের কাছে গিয়ে উপদেশ ও নির্দেশনা দিলেন।
ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'শিক্ষক ইলম শেখানোর সময় যদি মহিলারা শুনতে না পায়, তবে পুরুষদের শেখানো থেকে অবসর হয়ে কোনো ফিতনা ও ক্ষতির আশঙ্কা না থাকলে মহিলাদের কাছে এসে তাদের ইলম শেখানো মুসতাহাব। '৬৩৩
বর্তমানে মাইক, সাউন্ডবক্স ইত্যাদি সাউন্ড সিস্টেমের মাধ্যমে আওয়াজ উঁচু করা যায়। তাই মহিলাদের কাছে এসে তাদের ইলম শেখানোর কোনো প্রয়োজন নেই।
হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়:
* নারীদের ইলম শেখানো, তাদের উপদেশ দেওয়া, ইসলামের বিধিবিধান জানানো শরিয়তের দৃষ্টিতে মুসতাহাব ও প্রশংসনীয় কাজ।
* ইবনে জুরাইজ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি আতা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর কাছে জানতে চাইলাম, বর্তমান সময়ে নারীদের উপদেশ দেওয়া আমিরের কর্তব্য কি না? আতা (রাহিমাহুল্লাহ) জবাব দিলেন, "এটা নারীদের অধিকার। কেন তারা তাদের অধিকার আদায় করে না?"৬৩৪
* রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্নেহশীল হয়ে নারীদের উপদেশ দিয়েছেন। তাদের প্রতি কঠোর হননি, রূঢ় আচরণ করেননি।
* ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'সে সময়টা তাদের জন্য কঠিন কষ্টের সময় হলেও তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা শুনে দ্রুত গতিতে নিজেদের অলংকার সাদাকা করতে লাগলেন। এ থেকে বোঝা যায়, দ্বীনি কাজে তাদের মর্যাদা ছিল অতি উন্নত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদেশের আনুগত্যের প্রতি তারা ছিল বেশ আগ্রহী ও উৎসাহী। তাদের আনুগত্যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সন্তুষ্ট। '৬৩৫
টিকাঃ
৬৩১. অর্থাৎ নারীরা স্বামীর অধিকার ও অনুগ্রহ অস্বীকার করে। স্বামীর অনুগ্রহের কথা গোপন রাখে এবং বেশি বেশি অভিযোগ করে। অন্য এক রিওয়ায়াতে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'স্ত্রীর প্রতি যদি স্বামী এক যুগ ধরে সদাচরণ করতে থাকে, এরপর স্ত্রী যদি সামান্য কোনো কিছু কোনোদিন তার মাঝে দেখে, সাথে সাথে স্ত্রী বলে উঠবে, আমি তোমার থেকে কখনো সদাচরণ পাইনি।' দেখুন, সহিহুল বুখারি: ২৯, সহিহু মুসলিম: ৯০৭।
৬৩২. সহিহু মুসলিম: ৮৮৫।
৬৩৩. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৬/১৭৪।
৬৩৪. সহিহুল বুখারি: ৯৬১, সহিহু মুসলিম: ৮৮৫।
৬৩৫. ফাতহুল বারি: ২/৪৬৯।
📄 কখনো অল্প সাদাকায় অধিক বারাকাহ পাওয়া যায়
অনেক সময় অল্প সম্পদ দান করলেও, আল্লাহ তা কবুল করে নেন এবং তাতে প্রবৃদ্ধি দান করেন; ফলে এই অল্প সম্পদই অধিক সম্পদের চেয়ে বেশি বলে প্রমাণিত হয়।
আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "এক দিরহাম এক লাখ দিরহামের ওপর বিজয় হয়।"
সাহাবিগণ জানতে চাইলেন, "কীভাবে?"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এক ব্যক্তির নিকট দুটি দিরহাম ছিল। সে একটি দিরহাম দান করল। অন্যদিকে আরেকজন ব্যক্তি তার সম্পদের স্তূপের নিকট গেল এবং বিরাট সম্পদ থেকে এক লাখ দিরহাম দান করল।..."৬৩৬
টিকাঃ
৬৩৬. সুনানুন নাসায়ি ২৫২৭। হাদিসের মান: হাসান।
📄 সাদাকার প্রতি মহিলাদের অনেক বেশি উৎসাহিত করতেন
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর স্ত্রী জাইনাব (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বললেন, "হে নারীসমাজ, তোমরা সাদাকা করো; যদিও অলংকার থেকেই তোমাদের সাদাকা করতে হোক না কেন।"
জাইনাব (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'এরপর আমি আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে ফিরে এলাম। তাকে বললাম, "আপনি তো অসচ্ছল। এদিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সাদাকা করতে আদেশ করেছেন। আপনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গিয়ে জেনে আসুন, আপনাকে সাদাকা দিলে যথেষ্ট হবে, নাকি অন্য কাউকে সাদাকা করতে হবে।" আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, "বরং তুমি গিয়ে জেনে আসো।"
এরপর আমিই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলাম। দেখলাম, আনসারি এক নারী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরোজায় দাঁড়িয়ে আছে। সেও তা-ই জানতে এসেছে, যা জানার জন্য আমি আসলাম। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রবল গাম্ভীর্যপূর্ণ ব্যক্তিত্বের কারণে আমরা তাঁর কাছে যেতে ইতস্তত করছিলাম। তখন বিলাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বের হয়ে এলেন আমাদের কাছে। আমরা তাকে বললাম, “রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গিয়ে তাঁর কাছে বলুন, দরোজায় দুজন মহিলা দাঁড়িয়ে আছে। তারা জানতে চাইছে, তারা তাদের স্বামী ও সন্তানদের ওপর সাদাকা করলে কি তা সাদাকা আদায় হবে? তবে আমাদের পরিচয় তাঁকে বলবেন না।"
এরপর বিলাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গিয়ে তাঁকে তাদের কথা বললেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব না দিয়ে জানতে চাইলেন, "তারা কারা?"
বিলাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, "জনৈক আনসার মহিলা এবং জাইনাব।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে চাইলেন, "কোন জাইনাব?"
বিলাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, "আব্দুল্লাহর স্ত্রী জাইনাব।"
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এ সাদাকায় তারা দ্বিগুণ সাওয়াব পাবে। আত্মীয়তা রক্ষার সাওয়াব ও সাদাকার সাওয়াব।"৬৩৭
হাদিস থেকে বোঝা যায়:
* নিকটাত্মীয়দের সাদাকা করার প্রতি উৎসাহ। তবে ওয়াজিব সাদাকা হলে তা এমন আত্মীয়কে দেওয়া যাবে না, যার ভরণপোষণের দায়িত্ব দাতার কাঁধে ন্যস্ত।
* আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করার প্রতি উৎসাহ।
* স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রী নিজ সম্পদ থেকে দান করতে পারবে।
* নারীদের উপদেশ দেওয়া এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলকে ভালো কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করার বিষয়ে দায়িত্বশীলদের উৎসাহিত করা হয়েছে এ হাদিসে।
টিকাঃ
৬৩৭. সহিহুল বুখারি: ১৪৬৬, সহিহু মুসলিম: ১০০০।
📄 নারীরাই সবচেয়ে বেশি সাদাকা করতেন
আবু সাইদ খুদরি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'ইদুল ফিতর ও ইদুল আজহার দিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে সালাতে দাঁড়াতেন। সালাতের সালাম ফিরিয়ে মানুষের অভিমুখী হতেন। মানুষজন তাদের সালাতের স্থানে বসা থাকত। যদি কোনো অভিযান প্রেরণের প্রয়োজন থাকত, তবে তা মানুষের নিকট উপস্থাপন করতেন। অথবা অন্য কোনো প্রয়োজন থাকলে, আদেশ করতেন তিনি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, "তোমরা সাদাকা করো, তোমরা সাদাকা করো, তোমরা সাদাকা করো।"
অতঃপর (তাঁর আদেশ পেয়ে) নারীরাই সবচেয়ে বেশি সাদাকা করত। '৬৩৯
টিকাঃ
৬৩৮. ফাতহুল বারি: ৩/৩৩০।
৬৩৯. সহিহুল বুখারি: ৩০৪, সহিহু মুসলিম: ৮৮৯।