📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 হালের মুনাফিকরা আরও ভয়ংকর ও বেশি ফাসাদ সৃষ্টিকারী

📄 হালের মুনাফিকরা আরও ভয়ংকর ও বেশি ফাসাদ সৃষ্টিকারী


আবু ওয়ায়িল হুজাইফা বিন ইয়ামান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগের মুনাফিকদের চাইতে আজকের মুনাফিকরা অধিক ভয়ংকর ও অনিষ্টকারী। নববি যুগে মুনাফিকরা তাদের কাজকর্ম লুকাত। কিন্তু এখনকার মুনাফিকরা প্রকাশ্যে তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায়। '৫৯৯

ইবনে বাত্তাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'নববি যুগের পরের সময়টাতে মুনাফিকরা আরও ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। নববি যুগে মুনাফিকরা তাদের কথাবার্তা গোপন করত। তাই তাদের অনিষ্টতা অন্যদের গ্রাস করত না। '৬০০

ইবনে তিন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'হুজাইফা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কথা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, নববি যুগের মুনাফিকগুলো প্রকাশ্যে কোনো অনিষ্ট করতে পারত না। কিন্তু পরবর্তী যুগের মুনাফিকগুলো প্রকাশ্যেই নিফাকি কথাবার্তা বলে বেড়াতে শুরু করে। তারা কখনো তাদের কুফরির কথা স্পষ্ট বলেনি। তবে তাদের মুখ থেকে উদ্‌দ্গীরিত কথা থেকেই তাদের কুফরি বুঝে আসত। তারা তাদের কথার মাধ্যমেই চিহ্নিত হয়ে যেত। '৬০১

ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'ইবনে বাত্তাল (রাহিমাহুল্লাহ)-এর কথার সমর্থন পাওয়া যায় বাজ্জার (রাহিমাহুল্লাহ)-এর উল্লিখিত বর্ণনায়। বাজ্জার (রাহিমাহুল্লাহ) আসিমের সূত্রে আবু ওয়ায়িল (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণনা করেন, আবু ওয়ায়িল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, "আমি হুজাইফা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে জানতে চাইলাম, আজকের দিনে নিফাক অধিক অনিষ্টকর, নাকি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে নিফাক অধিক অনিষ্টকর ছিল?"

হুজাইফা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) নিজের কপাল চাপড়ে জবাব দিলেন, "হায়, আজকের দিনে প্রকাশ্যে নিফাক চলছে। অন্যদিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে মুনাফিকরা তাদের নিফাকি গোপন করে চলত।"৬০২

মুসলিম উম্মাহ নিফাকের মতো দ্বিতীয় কোনো ভয়ংকর অনিষ্টের সম্মুখীন হয়নি। না অতীতকালে, না বর্তমানে, আর না ভবিষ্যতে এমন কোনো ক্ষতিকর কিছু থাকবে, যা নিফাকের চেয়ে অধিক ভয়ংকর হবে। মুনাফিকরা সবচেয়ে বেশি অনিষ্টকারী, সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক। মুনাফিকরা তাদের কাফির ভাইদের পক্ষ থেকে ইসলাম ও মুসলিমদের ওপর সর্বদা বিরাজমান একটি সমস্যা। কারণ, মুনাফিকরা আমাদের মতো একই রঙের হয়ে থাকে। তাদের চামড়া আর আমাদের চামড়া একই হয়ে থাকে। তারা আমাদের মতো একই ভাষায় কথা বলে। আমাদের মতো ইসলামের শিআরগুলো প্রকাশ্যে পালন করে থাকে। আমাদের মতো ইসলাম প্রকাশ করে থাকে এবং আমাদের সাথে জামাআতে অংশ নেয়। বাহ্যিকভাবে তাদের সাথে আমাদের কোনো পার্থক্য নেই বললেই চলে। কিন্তু তারা কখনো মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে ক্লান্তিবোধ করে না; বরং সর্বদাই মুসলিমদের ধ্বংসের জন্য ষড়যন্ত্র করতে থাকে। আমাদের শত্রুদের সাহায্য করতে মুসলিমদের চাইতে তাদের সাথেই বেশি বন্ধুত্ব রক্ষা করে চলে। এ জন্য আল্লাহ, তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুমিনগণ মুনাফিকদের বিপদ থেকে সতর্ক করেন, তাদের ক্ষতি থেকে সাবধান করেন, সতর্কতা অবলম্বনের জন্য আদেশ করেন এবং সজাগ থাকতে বলেন।

মুনাফিকদের থেকে কতটুকু সতর্ক থাকা আবশ্যকতা জানার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, নিফাক ও মুনাফিক বিষয়ে কুরআনের সতেরোটি মাদানি সুরায় আলোচনা হয়েছে। ইবনুল কাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'মনে হয় পুরো কুরআনেই তাদের আলোচনায় পূর্ণ। '৬০৩

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতের ওপর খারাপ নেতৃত্বকারী আবির্ভূত হওয়ার আশঙ্কা করেছেন। উমর বিন খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "আমি আমার উম্মতের ওপর সবচেয়ে বেশি যে বিপদটাকে ভয় করি, সেটা হচ্ছে এমন সব মুনাফিক, যারা মুখে জ্ঞানের কথা বলবে।"৬০৪

মুনাবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এমন সব মুনাফিক, যারা মুখে জ্ঞানের কথা বলবে'-অর্থাৎ ইলমের অধিকারী ও মুখে জ্ঞানের কথা বলে। কিন্তু তার অন্তরে ইলম নেই, তার আমলও নেই। আদতে সে ভ্রষ্ট আকিদার ধারকবাহক। বকবক করে মানুষকে ধোঁকায় ফেলে দেয়। তাদের কথার মাঝে গোমরাহি লুকিয়ে থাকে। '৬০৫

ইবনুল কাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'ইসলামের সামনে মুনাফিকরা হচ্ছে ভীষণ বড় বিপদ। কারণ, মুনাফিকরা ইসলামের প্রতিই সম্বন্ধিত হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা ইসলামের শত্রু। তাদের মুখ থেকে বের হওয়া প্রতিটি কথায় শত্রুতা থাকে। কিন্তু মূর্খরা মনে করে তাদের কথায় বুঝি জ্ঞান ও শুদ্ধি ঝরে পড়ছে! এটা মূর্খতার চূড়ান্ত। অনিষ্টতার শেষ সীমা।

আল্লাহই ভালো জানেন, না জানি ইসলামের কত আশ্রয়স্থল তারা ধ্বংস করেছে! ইসলামের কত দুর্গ ধ্বংসে তাদের হাত রয়েছে! ইসলামের কত ইলম তারা নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে! বর্তমানেও ইসলাম ও মুসলিমগণ মুনাফিক নামের এ ভয়ংকর বিপদের সাথে লড়ে চলেছে। বর্তমানেও তারা গোপনে গোপনে তাদের ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। আর তারা দাবি করছে যে, তারা আসলে সংশোধনের কাজ করছে। তারা নাকি সংশোধনকারী। অথচ আল্লাহ বলেছেন:

أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ الْمُفْسِدُونَ وَلَكِن لَّا يَشْعُرُونَ

'সাবধান, মূলত তারাই অশান্তি সৃষ্টিকারী, কিন্তু তারা তা বুঝতে পারে না।' (সুরা আল-বাকারা, ২: ১২) '৬০৬

টিকাঃ
৫৯৯. সহিহুল বুখারি: ৭১১৩।
৬০০. শারহু সহিহিল বুখারি: ১০/৫৭।
৬০১. ফাতহুল বারি: ১৩/৭৪।
৬০২. মুসনাদুল বাজ্জার: ২৯০০।
৬০৩. মাদারিজুস সালিকিন ১/৩৫৮।
৬০৪. মুসনাদু আহমাদ: ১৪৪।
৬০৫. আত-তাইসির বি-শারহিল জামিয়িস সগির: ১/৫২।
৬০৬. মাদারিজুস সালিকিন: ১/৩৫৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00