📄 কখনো নির্দিষ্টভাবে কারও নিফাকি ফাঁস করে দিতেন
কখনো কখনো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই নির্দিষ্টভাবে কারও নিফাকি ফাঁস করে দিতেন, যাতে সাহাবিরা তার থেকে সাবধান থাকতে পারে।
আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'একদিন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে এসে বললেন, "হে আয়িশা, অমুক অমুক লোক আমাদের দ্বীন-যার ওপর আমরা রয়েছি-সম্পর্কে জানে বলে আমার মনে হয় না।"'
লাইস বিন সাদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'তারা দুজন মুনাফিক ছিল। '৫৮৭
জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সফর থেকে ফিরে আসছিলেন। যখন তিনি মদিনার নিকটবর্তী হলেন, তখন এক প্রচণ্ড বায়ু আঘাত হানল। মনে হচ্ছিল, এ বায়ুতে ধুলা উড়ে আরোহীকেও ধুলায় ঢেকে ফেলবে। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "কোনো এক মুনাফিকের মৃত্যুতে এ বাতাস প্রেরিত হয়েছে।"৫৮৮ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনায় এলেন, তখন জানা গেল, এক জঘন্য মুনাফিকের মৃত্যু হয়েছে। '৫৮৯
সেদিন জাইদ বিন রিফাআ নামের এক মুনাফিক মারা যায়। সে ইহুদিদের মধ্য থেকে একজন মুনাফিক ছিল। বনি কাইনুকার নেতৃস্থানীয় লোকদের একজন ছিল সে। সে বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিল।
সালামা বিন আকওয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে আমরা এক জ্বরাক্রান্ত রোগীকে দেখতে গেলাম। আমি অসুস্থ লোকটার গায়ে হাত দিয়ে বললাম, "আল্লাহর কসম, এমন তাপে পুড়তে আমি আর কাউকে দেখিনি।"
তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "কিয়ামতের দিন এর চেয়ে অধিক তাপে পুড়বে-এমন ব্যক্তিদের সম্পর্কে আমি কি তোমাদের বলব না? ঘাড় ফিরিয়ে নেওয়া এই দুজন আরোহী।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন দুজন লোককে দেখালেন, যারা তখন তাঁর সাহাবিদের মধ্যে গণ্য হতো। '৫৯০
ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'সালামা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সে দুজন মুনাফিককে সাহাবি বলে উল্লেখ করার কারণ হচ্ছে, তারা বাহ্যিকভাবে মুসলিম ছিল এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গ গ্রহণ করেছিল। নতুবা সালামা সত্যিকার অর্থে তাদের সাহাবি বলেননি। '৫৯১
আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আমরা তখন খাইবার যুদ্ধে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাথে থাকা লোকদের একজন ৫৯২ সম্পর্কে বললেন, "এ লোকটা জাহান্নামি।" যখন যুদ্ধ শুরু হলো, সে লোকটা প্রচণ্ডভাবে যুদ্ধ করতে থাকল। একসময় সে বেশ আহত হয়ে পড়ল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলা হলো, যাকে আপনি জাহান্নামি বলেছেন, সে আজ প্রচণ্ড বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছে এবং শহিদ হয়েছে।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তার স্থান জাহান্নামে।" তখন কিছু মানুষের মনে সন্দেহ হলো। এ সময় জানানো হলো যে, সে লোক মারা যায়নি এখনো; বরং সে. বেশ আহত অবস্থায় পড়ে আছে। যখন রাত ঘনিয়ে এল, তখন আর সে ধৈর্য রাখতে পারল না। আত্মহত্যা করল সে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানানো হলে তিনি বললেন, "আল্লাহু আকবার। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আমি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসুল।" এরপর তিনি বিলাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে আদশে দিলে বিলাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মানুষের মাঝে ঘোষণা দিলেন, "মুসলিম ব্যতীত কেউই জান্নাতে প্রবেশ করবে না। আর আল্লাহ কোনো পাপী ব্যক্তির মাধ্যমেও এ দ্বীনকে সাহায্য করতে পারেন। "৫৯৩
টিকাঃ
৫৮৭. সহিহুল বুখারি: ৬০৬৮।
৫৮৮. অর্থাৎ মুনাফিকের জন্য শাস্তিস্বরূপ তার মৃত্যুর চিহ্ন হিসেবে এবং মদিনা ও আল্লাহর বান্দাদের জন্য শান্তির বার্তা নিয়ে প্রেরিত হয়েছে এ বাতাস।
৫৮৯. সহিহু মুসলিম: ২৭৮২।
৫৯০. সহিহু মুসলিম: ২৭৮৩।
৫৯১. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৭/১২৮।
৫৯২. তার নাম কুজমান। সে মুনফিক ছিল। -ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৭/১২৩।
৫৯৩. সহিহুল বুখারি: ৪২০৪, সহিহু মুসলিম: ১১১।
📄 কখনো মুনাফিকদের কাউকে স্পষ্ট চিনিয়ে দিতেন
ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ঘরের ছায়ায় বসে ছিলেন। তখন ছায়া ধীরে ধীরে কমে আসছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবিদের উদ্দেশে বললেন, "এখন তোমাদের সামনে এক লোক আসবে। সে তোমাদের দিকে শয়তানের দৃষ্টিতে তাকাবে। তোমরা তাকে দেখলেও কোনো কথা বলবে না।"
একটু পর নীল চোখের এক লোক এল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখে ডাক দিলেন। কাছে আসলে তাকে বললেন, "তোমরা আমাকে গালি দাও কেন?"
লোকটি বলল, "আপনি যেভাবে আছেন, সেভাবে থাকুন। আমি তাদের নিয়ে আসছি।"
লোকটি চলে গেল। একটু পর তার সঙ্গীদের নিয়ে আসলো এবং আল্লাহর নামে কসম করে বলল যে, তারা এ রকম কিছুই বলেনি, কিছুই করেনি। অতঃপর আল্লাহ তাআলা নাজিল করেন:
يَوْمَ يَبْعَثُهُمُ اللهُ جَمِيعًا فَيَحْلِفُونَ لَهُ كَمَا يَحْلِفُونَ لَكُمْ وَيَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ عَلَى شَيْءٍ أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ الْكَاذِبُونَ
"যেদিন আল্লাহ তাদের সকলকে পুনরুত্থিত করবেন। অতঃপর তারা আল্লাহর সামনে শপথ করবে, যেমন তোমাদের সামনে শপথ করে। তারা মনে করবে যে, তারা সৎপথে আছে। সাবধান, তারাই তো আসল মিথ্যাবাদী!"৫৯৪_৫৯৫
টিকাঃ
৫৯৪. সুরা আল-মুজাদালা, ৫৮: ১৮।
৫৯৫. মুসানাদু আহমাদ: ৩২৬৭, তাফসিরু ইবনি কাসির: ৮/৫৩; সনদ জাইয়িদ। শাইখ আহমাদ শাকির (রাহিমাহুল্লাহ) এ হাদিসের সনদকে সহিহ বলেছেন।
📄 মুনাফিকদের সম্মান করতে নিষেধ করতেন
আব্দুল্লাহ বিন বুরাইদা (রাহিমাহুল্লাহ) তার বাবা থেকে বর্ণনা করেন, তার বাবা বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "তোমরা মুনাফিকদের নেতা বোলো না। কারণ, যদি তোমরা তাদের নেতা মনে করো, তবে তোমরা তোমাদের রবকে রাগান্বিত করলে। "৫৯৬
হাদিসের ব্যাখ্যা
'তবে তোমরা তোমাদের রবকে রাগান্বিত করলে'-অর্থাৎ তোমরা তাঁকে ক্রোধান্বিত করলে। কারণ, নেতা বলে ডাকা মুনাফিকদের জন্য সম্মানজনক। কিন্তু তারা এ সম্মানের উপযুক্ত নয়। বলা হয়ে থাকে, এর অর্থ হচ্ছে, যদি কোনো মুনাফিক তোমাদের নেতা হয়ে থাকে, তবে তোমাদের ওপর তার আনুগত্য করা আবশ্যক হয়ে যাবে। তোমরা তার আনুগত্য করলে তোমাদের রব রাগান্বিত হবেন। ৫৯৭
ইমাম ইবনে আসির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'তোমরা কোনো মুনাফিককে নেতা বোলো না। কারণ, তোমাদের নেতা যদি কোনো মুনাফিক হয়, তবে তোমাদেরও তো একই অবস্থা। আর এমন অবস্থার লোকদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট হন না। '৫৯৮
টিকাঃ
৫৯৬. সুনানু আবি দাউদ: ৪৯৭৭।
৫৯৭. আওনুল মাবুদ: ৭/৩০০৯।
৫৯৮. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ২/৪১৮।
📄 কোনো মুনাফিককে ব্যাপক কোনো নেতৃত্ব ও দায়িত্ব দিতেন না
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমদের সাথে যেমন আচরণ করতেন, মুনাফিকদের সাথেও দুনিয়ার বিষয়ে ঠিক তেমনই আচরণ করতেন। কিন্তু উম্মাহর কল্যাণে ব্যাপক দায়িত্বগুলোর ব্যাপারে তাদের নিরাপদ মনে করতেন না। তাই না কখনো তিনি কোনো মুনাফিককে অর্থ সংগ্রহের দায়িত্বে নিযুক্ত করেছেন, না কখনো কোনো যুদ্ধে আমির বানিয়েছেন, না কখনো মানুষের মাঝে বিচারের ভার দিয়েছেন, না কখনো সালাতে ইমামতির দায়িত্ব দিয়েছেন আর না কখনো অন্য কোনো দায়িত্বে তাদের নিযুক্ত করেছেন।
তাদের দায়িত্ব না দেওয়া এবং তাদের বিশ্বাস না করার কারণ হচ্ছে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অস্বীকার করত। তারা আল্লাহ, তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুমিনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করত। এর সাথে সাথে তাদের মাঝে আমানতের লেশমাত্র না থাকায় তাদের কোনো দায়িত্ব দিতেন না। কেননা, নেতৃত্ব পর্যায়ের কোনো দায়িত্বে নিযুক্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে আমানত বা বিশ্বাসযোগ্যতা প্রধান শর্তগুলোর একটি।