📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য

📄 মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য


রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের সামনে মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতেন। উদ্দেশ্য ছিল, বৈশিষ্ট্যগুলো তাদের জানানো এবং তাদের থেকে সতর্ক ও সাবধান করা। বৈশিষ্ট্যগুলো হচ্ছে:

ফজর ও ইশার সালাতে অলসতা

আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'ফজর ও ইশার সালাত জামাআতে আদায় করা মুনাফিকদের ওপর সবচেয়ে কঠিন ছিল। যদি তারা জানত, এ দুটিতে কী কল্যাণ আছে, তবে তারা হামাগুড়ি দিয়ে হলেও আসত। '৫৭২

ইবনে রজব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'অন্য ওয়াক্তগুলোর তুলনায় ফজর ও ইশার সময় মসজিদে এসে সালাত পড়া মুনাফিকদের জন্য অধিক কষ্টকর ছিল। কারণ, অলসতা ও লোকদেখানো তাদের চরিত্রের ভূষণ। যারা রিয়া করে, লোকদেখানোর জন্য ইবাদত করে, যখন মানুষ দেখে, তখনই তারা আমলগুলো করে। কিন্তু যখন মানুষ তাদের দেখে না, তখন আমল-ইবাদত করা কষ্টকর হয়ে যায় তাদের ওপর।'

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَإِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلَاةِ قَامُوا كُسَالَى يُرَاءُونَ النَّاسَ وَلَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلًا.

"যখন তারা সালাতে দাঁড়ায়, তখন আলস্যভরে দাঁড়ায়। তাদের সালাতের উদ্দেশ্য হয় লোকদের দেখানো। আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে তারা। "৫৭৩

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দুই ওয়াক্তের সালাত অন্ধকারে আদায় করতেন। ফজরের সালাত অধিকাংশ সময় তিনি আঁধার থাকতে আদায় করতেন। আর ইশার সালাত দেরিতে আদায় করতেন। তখন মসজিদে কোনো বাতি থাকত না। তাই তখনো অন্ধকারেই সালাত আদায় করা হতো। এ দুই ওয়াক্তের সালাতে কেবল পুণ্যপ্রত্যাশী মুমিনরাই উপস্থিত হতেন। মুনাফিকরা এ দুই ওয়াক্তের সালাতে আসত না। তারা মনে করত, তারা না এলেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম টের পাবেন না। '৫৭৪

ওয়াক্তের শেষ পর্যন্ত বিলম্ব করে সালাত আদায় করা

আনাস বিন মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "মুনাফিকের সালাতের স্বরূপ হচ্ছে, সে সূর্যকে দেখতে থাকে। যখন সূর্য শয়তানের দুই শিংয়ের মাঝ দিয়ে অস্তপ্রায় হয়ে আসে, তখন সে সালাতে দাঁড়ায়। তাড়াতাড়ি চার ঠোকর মেরে সালাত আদায় করে নেয়। তার সালাতে খুব কমই সে আল্লাহকে স্মরণ করে। "৫৭৫

হাদিসের ব্যাখ্যা

'শয়তানের দুই শিংয়ের মাঝ দিয়ে' কেউ বলেন, এ কথাটির বাহ্যিক অর্থ নিতে হবে এখানে। উদ্দেশ্য হচ্ছে, সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় শয়তান তার দুই শিং নিয়ে উপস্থিত হয় সূর্যের সামনে। এমনিভাবে অস্ত যাওয়ার সময়ও। কারণ, কাফিররা এ সময় সূর্যকে সিজদা করে। তাই তখন শয়তান এসে সূর্যের সাথে থাকে। যাতে সূর্যকে যারা পূজা করে, তারা যেন একপ্রকার শয়তানকেই পূজা করে এমনটা প্রতিভাত হয়। শয়তান ও তার সাঙ্গোপাঙ্গোরা তখন ভাবে সূর্যের পূজারিরা তাকেই পুজো দিচ্ছে।

কেউ বলেন, এ কথাটির রূপক অর্থ নিতে হবে। শয়তানের এক শিং ও দুই শিং বলতে উদ্দেশ্য হচ্ছে, শয়তানের প্রভাব-প্রতিপত্তি, তার ও তার সাঙ্গোপাঙ্গোদের বিজয়। মূল অর্থ হচ্ছে, সালাত দেরি করে একেবারে শেষ ওয়াক্তে আদায় করা শয়তানকে সম্মান করারই নামান্তর। শিং দিয়ে পশু যেমন মানুষকে ঠেকিয়ে রাখে, তেমনই শয়তান এদের তাড়াতাড়ি সালাত আদায় করার ক্ষেত্রে ঠেকিয়ে রাখে।

এ দুটি মতের মধ্যে প্রথম মতটিই সঠিক। ৫৭৬

* মিথ্যা কথা বলা, ওয়াদা ভঙ্গ করা, বিশ্বাসঘাতকতা করা

আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "মুনাফিকের আলামত তিনটি: মিথ্যা বলা, ওয়াদা ভঙ্গ করা, আমানতের খিয়ানত করা।"৫৭৭

আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যার মাঝে চারটি স্বভাব থাকবে, সে নিরেট মুনাফিক। অথবা যার মাঝে চারটি স্বভাবের একটি থাকবে, তার মাঝে নিফাকের একটি স্বভাব থাকবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে এ স্বভাব ত্যাগ করবে। স্বভাব চারটি হচ্ছে মিথ্যা বলা, ওয়াদা ভঙ্গ করা, বিশ্বাসঘাতকতা করা, অশ্লীল কথা ৫৭৮ বলা। '৫৭৯

মুনাফিকদের মাঝে উত্তম চরিত্র ও দ্বীনি বুঝ থাকে না

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'দুটি বৈশিষ্ট্য কোনো মুনাফিকের মাঝে থাকে না। এক. উত্তম চরিত্র। দুই. দ্বীনি বুঝ। '৫৮০

হাদিসের ব্যাখ্যা

উত্তম চরিত্র বলে উদ্দেশ্য হচ্ছে, কল্যাণের পথের পথিক হওয়া, সালিহিনের মতো হওয়ার চেষ্টা করা, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সকল দোষত্রুটি থেকে মুক্ত হওয়া।

দ্বীনের বুঝ বলে উদ্দেশ্য হচ্ছে, দ্বীনের প্রকৃত অনুধাবন। দ্বীনের বুঝ একজন মানুষের মাঝে ভয় ও তাকওয়ার জন্ম দেয়। কিন্তু কিছু মানুষ নিজের সম্মানের আশায় ও ইলম বেচে খাওয়ার জন্য ইলম শিখে থাকে। তারা দ্বীনি বুঝের এ মহান স্তর থেকে অনেক দূরে। কারণ, তাদের দ্বীনি বুঝ জিহ্বার আগায় থাকে, অন্তরে নয়। ৫৮১

* দোদুল্যমানতা

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'মুনাফিক হচ্ছে মাদি ছাগলের মতো। মাদি ছাগল দুই পুরুষ ছাগলের মাঝে ঘুরতে থাকে। একবার এর কাছে যায়, তো আবার এর কাছে যায়। '৫৮২

আল্লামা সিনদি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'মাদি ছাগল পুরুষ ছাগলের সঙ্গলাভের আশায় দুই পুরুষ ছাগলের মাঝে ঘুরপাক খায়। একজনের কাছে স্থির থাকে না। মুনাফিকরা প্রকাশ্যে মুমিনদের সাথে থাকে। ভেতরে ভেতরে নিজেদের মনস্কামনা পূরণ করতে ও ফাসাদ সৃষ্টিতে সাহায্যের জন্য মুশরিকদের কাছে যায়। এভাবে তারা নিজেদের মাদি ছাগল হিসেবে প্রমাণ করে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দেওয়া দৃষ্টান্ত অনুযায়ী মুনাফিকরা আদতে পুরুষত্বহীন হয়ে থাকে। '৫৮৩

মুনাফিকদের নিন্দনীয় স্বভাব-বৈশিষ্ট্য অনেক। সুরা তাওবা তাদের প্রতি লাঞ্ছনাকর কথাবার্তা ও তাদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় পূর্ণ। আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন এ সুরায়। যাতে মুমিনগণ নিফাক ও মুনাফিকদের থেকে সতর্ক ও সাবধান থাকে।

টিকাঃ
৫৭২. সহিহুল বুখারি: ৬৫৭, সহিহু মুসলিম: ৬৫১।
৫৭৩. সুরা আন-নিসা, ৪: ১৪২।
৫৭৪. ফাতহুল বারি: ৫/২৩।
৫৭৫. সহিহু মুসলিম: ৬২২।
৫৭৬. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৫/১২৪।
৫৭৭. সহিহুল বুখারি: ৩৩, সহিহু মুসলিম ৫৯।
৫৭৮. অর্থাৎ সত্যকে অপছন্দ করে এবং মিথ্যা ও ভ্রান্ত কথা বলে। অভিধান-প্রণেতাদের মতে, অশ্লীল কথার মূল হচ্ছে সরল পথকে অপছন্দ করা। দেখুন, ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ২/৪৮।
৫৭৯. সহিহুল বুখারি: ২৪৫৯, সহিহু মুসলিম: ৫৮।
৫৮০. সুনানুত তিরমিজি: ২৬৮৪।
৫৮১. তুহফাতুল আহওয়াজি: ৭/৩৭৮।
৫৮২. সহিহু মুসলিম: ২৭৮৪।
৫৮৩. মিরকাতুল মাফাতিহ শারহু মিশকাতিল মাসাবিহ: ১/১৩০।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ মুনাফিকদেরকে মুমিনদের কষ্ট দিতে নিষেধ করতেন

📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ মুনাফিকদেরকে মুমিনদের কষ্ট দিতে নিষেধ করতেন


আব্দুল্লাহ বিন উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বরে আরোহণ করে উচ্চ আওয়াজে ডাক দিয়ে বললেন, “হে মুখে ইসলাম গ্রহণকারী দল, যাদের অন্তরে ইমান প্রবেশ করেনি, তোমরা মুসলিমদের কষ্ট দিয়ো না, কটু কথা বলে তাদের লজ্জা দিয়ো না, তাদের দোষ তালাশ কোরো না। কারণ, যে ব্যক্তি তার আপন মুসলিম ভাইয়ের দোষ তালাশ করবে, আল্লাহ তার দোষগুলো প্রকাশ করে দেবেন। আর আল্লাহ যার দোষত্রুটি প্রকাশ করে দেবেন, সে যদি নিজের ঘরের ভেতর লুকিয়েও থাকে, তবুও সে লাঞ্ছিত হবে।"৫৮৪

আল্লাহ তাআলা বলেন:

إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَن تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ، وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ

'যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতে মর্মন্তুদ শাস্তি এবং আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।'৫৮৫

টিকাঃ
৫৮৪. সুনানুত তিরমিজি: ২০৩২।
৫৮৫. সুরা আন-নূর, ২৪: ১৯।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 মুনাফিক কর্তৃক সাহাবিদের কষ্টপ্রদানের কিছু খণ্ডচিত্র

📄 মুনাফিক কর্তৃক সাহাবিদের কষ্টপ্রদানের কিছু খণ্ডচিত্র


আবু মাসউদ বদরি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সাদাকা করার আদেশ করলেন। তাই আমরা পিঠে বোঝা বহনের কাজ করে প্রাপ্ত মজুরি সাদাকা করতাম। আবু আকিল কিছুটা বেশি সাদাকা করল। এক সা' সাদাকা করল। আরেকজন তার চেয়ে

মুনাফিকরা তখন বলল, "আল্লাহ এ সাদাকার মুখাপেক্ষী নন। আর অন্যরা তো লোক দেখানোর জন্য সাদাকা করে।" তখন আল্লাহ তাআলা নাজিল করলেন:

الَّذِينَ يَلْمِزُونَ الْمُطَّوِّعِينَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ فِي الصَّدَقَاتِ وَالَّذِينَ لَا يَجِدُونَ إِلَّا جُهْدَهُمْ فَيَسْخَرُونَ مِنْهُمْ سَخِرَ اللَّهُ مِنْهُمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ

“যারা (যেসব মুনাফিক) মুমিনদের মধ্যে স্বেচ্ছায় দান-সাদাকাকারীদের কটাক্ষ করে এবং (কটাক্ষ করে) যারা কষ্টার্জিত সামান্য বস্তু ছাড়া (দান করার মতো) কিছু পায় না তাদেরকে এবং তাদের নিয়ে বিদ্রুপ করে, আল্লাহ তাদের পাল্টা বিদ্রুপ করবেন। আর তাদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি।' [সুরা আত-তাওবা, ৯: ৭৯]৫৮৬

সাহাবিদের মধ্যে যারা দরিদ্র ছিলেন, তারা কম পরিমাণে সাদাকা করতে পারতেন। তাদের সাদাকা সম্পর্কে মুনাফিকরা বলত, "আল্লাহ তোমার সাদাকার মুখাপেক্ষী নন।" অন্যদিকে যে সকল সাহাবি ধনী ছিলেন, তারা বেশি পরিমাণে সাদাকা করতেন। তাদের সম্পর্কে মুনাফিকরা বলত, "তারা এত বেশি সাদাকা লোক দেখানোর জন্য করছে।"

মুনাফিকদের স্বভাব-চরিত্র এমনই ছিল। তারা মুমিনদের মিথ্যা দোষ দিত এবং তাদের নিয়ে বাজে মন্তব্য করত। সব সময় মুমিনদের সন্দেহের চোখে দেখত। মুমিনরা যে ভালো কাজই করত, তারা সে কাজেই দোষ ধরত। মুমিনদের মনে হীন উদ্দেশ্য আছে, এরূপ কথা বলে মুনাফিকরা তাদের দোষ বর্ণনা করত। যেমনই আমরাও বর্তমান সময়ে দেখছি, পত্র-পত্রিকাগুলোতে এমন কিছু মানুষের সমালোচনা করা হয়, যারা আদতে ভালো কাজ করছে। এমনটা ঘটার কারণ হচ্ছে, মুনাফিকরা উত্তম ও কল্যাণকর কাজ পছন্দ করে না। ভালো কাজ হোক, কল্যাণের কাজ বৃদ্ধি পাক, এটা তারা চায় না। তাই তারা কল্যাণকামীদের নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে। চাই সে কাজ মসজিদ, মাদরাসা যেখানেই হোক না কেন; মুনাফিকরা সবখানেই তাদের নাক গলাবে আর মুমিনদের নিন্দা করবে।

টিকাঃ
৫৮৬. সহিহুল বুখারি: ৪৬৬৮, সহিহু মুসলিম: ১০১৮।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 কখনো নির্দিষ্টভাবে কারও নিফাকি ফাঁস করে দিতেন

📄 কখনো নির্দিষ্টভাবে কারও নিফাকি ফাঁস করে দিতেন


কখনো কখনো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই নির্দিষ্টভাবে কারও নিফাকি ফাঁস করে দিতেন, যাতে সাহাবিরা তার থেকে সাবধান থাকতে পারে।

আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'একদিন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে এসে বললেন, "হে আয়িশা, অমুক অমুক লোক আমাদের দ্বীন-যার ওপর আমরা রয়েছি-সম্পর্কে জানে বলে আমার মনে হয় না।"'

লাইস বিন সাদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'তারা দুজন মুনাফিক ছিল। '৫৮৭

জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সফর থেকে ফিরে আসছিলেন। যখন তিনি মদিনার নিকটবর্তী হলেন, তখন এক প্রচণ্ড বায়ু আঘাত হানল। মনে হচ্ছিল, এ বায়ুতে ধুলা উড়ে আরোহীকেও ধুলায় ঢেকে ফেলবে। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "কোনো এক মুনাফিকের মৃত্যুতে এ বাতাস প্রেরিত হয়েছে।"৫৮৮ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনায় এলেন, তখন জানা গেল, এক জঘন্য মুনাফিকের মৃত্যু হয়েছে। '৫৮৯

সেদিন জাইদ বিন রিফাআ নামের এক মুনাফিক মারা যায়। সে ইহুদিদের মধ্য থেকে একজন মুনাফিক ছিল। বনি কাইনুকার নেতৃস্থানীয় লোকদের একজন ছিল সে। সে বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিল।

সালামা বিন আকওয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে আমরা এক জ্বরাক্রান্ত রোগীকে দেখতে গেলাম। আমি অসুস্থ লোকটার গায়ে হাত দিয়ে বললাম, "আল্লাহর কসম, এমন তাপে পুড়তে আমি আর কাউকে দেখিনি।"

তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "কিয়ামতের দিন এর চেয়ে অধিক তাপে পুড়বে-এমন ব্যক্তিদের সম্পর্কে আমি কি তোমাদের বলব না? ঘাড় ফিরিয়ে নেওয়া এই দুজন আরোহী।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন দুজন লোককে দেখালেন, যারা তখন তাঁর সাহাবিদের মধ্যে গণ্য হতো। '৫৯০

ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'সালামা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সে দুজন মুনাফিককে সাহাবি বলে উল্লেখ করার কারণ হচ্ছে, তারা বাহ্যিকভাবে মুসলিম ছিল এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গ গ্রহণ করেছিল। নতুবা সালামা সত্যিকার অর্থে তাদের সাহাবি বলেননি। '৫৯১

আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আমরা তখন খাইবার যুদ্ধে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাথে থাকা লোকদের একজন ৫৯২ সম্পর্কে বললেন, "এ লোকটা জাহান্নামি।" যখন যুদ্ধ শুরু হলো, সে লোকটা প্রচণ্ডভাবে যুদ্ধ করতে থাকল। একসময় সে বেশ আহত হয়ে পড়ল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলা হলো, যাকে আপনি জাহান্নামি বলেছেন, সে আজ প্রচণ্ড বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছে এবং শহিদ হয়েছে।'

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তার স্থান জাহান্নামে।" তখন কিছু মানুষের মনে সন্দেহ হলো। এ সময় জানানো হলো যে, সে লোক মারা যায়নি এখনো; বরং সে. বেশ আহত অবস্থায় পড়ে আছে। যখন রাত ঘনিয়ে এল, তখন আর সে ধৈর্য রাখতে পারল না। আত্মহত্যা করল সে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানানো হলে তিনি বললেন, "আল্লাহু আকবার। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আমি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসুল।" এরপর তিনি বিলাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে আদশে দিলে বিলাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মানুষের মাঝে ঘোষণা দিলেন, "মুসলিম ব্যতীত কেউই জান্নাতে প্রবেশ করবে না। আর আল্লাহ কোনো পাপী ব্যক্তির মাধ্যমেও এ দ্বীনকে সাহায্য করতে পারেন। "৫৯৩

টিকাঃ
৫৮৭. সহিহুল বুখারি: ৬০৬৮।
৫৮৮. অর্থাৎ মুনাফিকের জন্য শাস্তিস্বরূপ তার মৃত্যুর চিহ্ন হিসেবে এবং মদিনা ও আল্লাহর বান্দাদের জন্য শান্তির বার্তা নিয়ে প্রেরিত হয়েছে এ বাতাস।
৫৮৯. সহিহু মুসলিম: ২৭৮২।
৫৯০. সহিহু মুসলিম: ২৭৮৩।
৫৯১. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৭/১২৮।
৫৯২. তার নাম কুজমান। সে মুনফিক ছিল। -ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৭/১২৩।
৫৯৩. সহিহুল বুখারি: ৪২০৪, সহিহু মুসলিম: ১১১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00