📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 মুনাফিকদের সরদার আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের মৃত্যু

📄 মুনাফিকদের সরদার আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের মৃত্যু


নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুক অভিযান থেকে ফিরে আসার পর ইবনে সালুল মৃত্যুবরণ করে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কাফন পরানোর জন্য আপন জামাটি দিলেন। তার জানাজাও তিনি পড়ালেন। যদিও তার কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুমিনদের অনেক কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছিল।

ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আব্দুল্লাহ বিন উবাই মারা গেলে তার পুত্র আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আসলেন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে। অনুরোধ করে বললেন, "কাফন পরানোর জন্য আপনার জামাটি দিন, তার জানাজা আদায় করুন এবং তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জামা দিয়ে বললেন, "কাফন পরানো শেষ হলে আমাকে খবর দেবে।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এলেন। ততক্ষণে কবর দেওয়া হয়ে গেছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দেহ উঠাতে বললেন। মরদেহ ওঠানো হলে তিনি নিজ হাঁটুর ওপর তাকে রেখে মুখের লালা মাখিয়ে দিলেন।'

উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, "যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জানাজা আদায় করতে গেলেন, তখন আমি তাঁর দিকে এগিয়ে গিয়ে বললাম, "হে আল্লাহর রাসুল, আপনি ইবনে উবাইয়ের জানাজা পড়বেন? অথচ সে এমন এমন বলেছিল একদিন!" আমি ইবনে উবাইয়ের বলা কথাগুলো তাকে স্মরণ করিয়ে দিলাম। তিনি মুচকি হেসে বললেন, "আমার থেকে দূরে সরো, উমর।"

কিন্তু আমি যখন বারবার বলতে লাগলাম, তখন তিনি বললেন, "আমাকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। যদি সত্তরবারের বেশি তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হতো, তবে আমি তা-ই করতাম।" এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাজা আদায় করে চলে গেলেন সেখান থেকে।'

একটু সময় পরই সুরা তাওবার দুটি আয়াত নাজিল হলো:

وَلَا تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِّنْهُم مَّاتَ أَبَدًا وَلَا تَقُمْ عَلَى قَبْرِهِ إِنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللهِ وَرَسُولِهِ وَمَاتُوا وَهُمْ فَاسِقُونَ

"আর তাদের (মুনাফিকদের) কোনো লোক মারা গেলে তার (জানাজার) সালাত তুমি কখনোই আদায় করবে না। তাদের কবরের পাশে কখনো দাঁড়াবে না। তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কুফরি করেছে এবং তারা কুফরি অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করেছে।"

[সুরা আত-তাওবা, ৯: ৮৪]

উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, "সেদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর আমার এ জবরদস্তিতে আমি বেশ লজ্জিত হয়েছি। আর আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই অধিক জানেন।"৫৫৬

ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কথা মানেননি; বরং ইসলামের বাহ্যিক হুকুম অনুযায়ী ইবনে উবাইয়ের জানাজা আদায় করেছেন। তা ছাড়া ইবনে উবাইয়ের ছেলে আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর আত্মিক পরিশুদ্ধতায় কপটতা ছিল না। আসলেই আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর অন্তর ছিল পরিশুদ্ধ। তাই তার সম্মানার্থে, তার কওমকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করতে এবং জানাজা না পড়ার কারণে যে ক্ষতি আপতিত হতো, তা প্রতিহত করতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবনে উবাইয়ের জানাজা আদায় করেন। '৫৫৭

ইমাম খাত্তাবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'মুনাফিকদের জানাজা পড়ার ব্যাপারে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা আসার আগে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবনে উবাইয়ের জানাজা আদায় করেছেন। জানাজা পড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ ছিল। প্রথমত, নামে হলেও ইবনে উবাই মুসলিমদের একজন ছিল। তার জানাজা আদায় করার পেছনে একটি কারণ ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুপম সহানুভূতি। দ্বিতীয়ত, ইবনে উবাইয়ের ছেলে আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) একজন খাঁটি সাহাবি ছিলেন। তার অন্তরের প্রশান্তির জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বাবার জানাজা আদায় করেন। তৃতীয়ত, ইবনে উবাই ছিল খাজরাজ গোত্রের নেতা। খাজরাজ গোত্রকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার নিমিত্তে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জানাজা আদায় করেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি ইবনে উবাইয়ের ছেলে আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর অনুরোধে সাড়া না দিতেন, তবে তা আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর প্রতি অসম্মান করা হতো। বিষয়টি খাজরাজ গোত্রের জন্যও লজ্জাজনক হতো। জানাজা পড়া না-পড়ার মাঝে যেটি উত্তম ছিল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেটিই গ্রহণ করেছেন। এরপর যখন এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আসলো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাজা পড়া থেকে বিরত থাকলেন। '৫৫৮

বলা হয়, ইবনে উবাইয়ের জন্য কাফন হিসেবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জামা দেওয়ার পেছনে কারণ ছিল একটি ইহসানের বদলা দেওয়া। বদরের যুদ্ধের পর বন্দীদের মধ্যে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-ও ছিলেন। তার গায়ে অন্য কারও জামাই মানানসই হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের জামা আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর গায়ে মানানসই হয়েছিল। সুফইয়ান বিন উয়াইনা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'তারা মনে করেন যে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জামা দেওয়ার কারণ হচ্ছে, ইহসানের প্রতিদান দিয়ে দেওয়া। '৫৫৯

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'যে বাহ্যিকভাবে মুসলিম, তার ক্ষেত্রে পরস্পর বিবাহ, ওয়ারিশ হওয়ার মতো ইসলামের বিধিবিধান প্রযোজ্য হবে। কিন্তু যার নিফাক ও নাস্তিকতা সম্পর্কে জানা যাবে, যে জানবে তার জন্য সে মুনাফিক-জিন্দিকের জানাজা আদায় করা জায়িজ নয়। যদিও মুনাফিকটি বাহ্যিকভাবে মুসলিমই হোক না কেন। কারণ, আল্লাহ তাআলা তাঁর নবিকে মুনাফিকদের জানাজা আদায় করতে নিষেধ করেছেন। এ ছাড়া যদি কারও ক্ষেত্রে মুনাফিক হওয়া না-হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ থাকে আর সে যদি বাহ্যিকভাবে মুসলিম হয়ে থাকে, তবে তার জানাজা পড়া জায়িজ আছে। '৫৬০

টিকাঃ
৫৫৬. সহিহুল বুখারি: ১২৬৯, সহিহু মুসলিম: ২৭৭৪।
৫৫৭. ফাতহুল বারি: ৮/৩৩৬।
৫৫৮. ফাতহুল বারি: ৮/৩৩৬।
৫৫৯. সহিহুল বুখারি: ১৩৫০।
৫৬০. আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা ৩/১৭-১৯। ঈষৎ পরিমার্জিত।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 জুলাস বিন সুয়াইদ মুনাফিক থেকে তাওবা করেছিলেন

📄 জুলাস বিন সুয়াইদ মুনাফিক থেকে তাওবা করেছিলেন


মুনাফিকদের মধ্যে যারা তাওবা করে মুসলিম হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে একজন হলেন, জুলাস বিন সুয়াইদ। জুলাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাবুক অভিযানে অংশ না নিয়ে পেছনে থেকে গিয়েছিলেন। এমনকি তাবুক অভিযানে অংশগ্রহণ না করতে মানুষকে কুমন্ত্রণাও দিয়েছিলেন। উমাইর বিন সাইদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এতিম হওয়ায় তার অধীনেই লালিতপালিত হতে থাকেন। উমাইরের মা জুলাস-কে বিয়ে করেছিলেন। জুলাস ভালোভাবেই উমাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর লালনপালন করে আসছিলেন।

একদিন উমাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) জুলাসকে বলতে শুনলেন, "যদি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্যবাদী হয়, তাহলে তো আমরা গাধার চেয়ে নিকৃষ্ট!"

উমাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তখন জুলাসকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "হে জুলাস, আপনি আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ ছিলেন। সকলের চাইতে আপনার কথাই আমার সবচেয়ে বেশি সুন্দর লাগে। আর আপনি যদি ঘৃণ্য কিছুতে লিপ্ত হন, তবে আমার নিকটই সবচেয়ে বেশি কষ্ট লাগে। আল্লাহর শপথ, আজ আপনি একটি কথা বললেন, তা যদি আমি কারও কাছে বলি, তবে আপনি লাঞ্ছিত হবেন। কিন্তু যদি আমি তা গোপন করি, তবে আমি ধ্বংস হয়ে যাব। তবে এ দুটির মাঝে একটি (প্রথমটি) অপরটির চাইতে সহজ।"

কিশোর উমাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এসে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সব জানালেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুলাসকে ডেকে পাঠালেন। জিজ্ঞেস করলেন, উমাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) যা বলল, তা সত্যি কি না। জুলাস তখন আল্লাহর কসম করে বলল, "উমাইর মিথ্যা বলছে। উমাইর যা বলল, আমি তা আদৌ বলিনি।"

উমাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, "আল্লাহর কসম, আপনি অবশ্যই এ রকম বলেছেন। আল্লাহর কাছে তাওবা করুন। যদি কুরআন নাজিল না হতো, যা আমাকে আপনার মতো (মিথ্যাবাদী) বানিয়ে দেবে, তবে আমি কখনোই এ কথা বলতাম না। (অর্থাৎ আমার নিশ্চিত বিশ্বাস আছে যে, আপনার মিথ্যার ব্যাপারে কুরআন নাজিল হবে এবং আমি যে আপনার মতো মিথ্যাবাদী নই, তা প্রমাণ হয়ে যাবে।)"

এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ওহি আসলো। সকলে তখন চুপ হয়ে বসে আছেন। কোনো নড়াচড়া নেই কারও। ওহি যখন নাজিল হতো, তখন সাহাবিদের কেউই নড়তেন না আপন জায়গা থেকে। কিছুক্ষণ পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথা তুললেন। তিলাওয়াত করলেন:

يَحْلِفُونَ بِاللهِ مَا قَالُوا وَلَقَدْ قَالُوا كَلِمَةَ الْكُفْرِ وَكَفَرُوا بَعْدَ إِسْلَامِهِمْ وَهَمُّمُوا بِمَا لَمْ يَنَالُوا وَمَا نَقَمُوا إِلَّا أَنْ أَغْنَاهُمُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ مِن فَضْلِهِ ، فَإِن يَتُوبُوا يَكُ خَيْرًا لَّهُمْ وَإِن يَتَوَلَّوْا يُعَذِّبْهُمُ اللَّهُ عَذَابًا أَلِيمًا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ، وَمَا لَهُمْ فِي الْأَرْضِ مِن وَلِي وَلَا نَصِيرٍ

"তারা আল্লাহর নামে শপথ করে বলছে যে, তারা কিছুই বলেনি; অথচ নিশ্চিতই তারা কুফরি কথা বলেছিল এবং ইসলাম গ্রহণের পর কাফির হয়ে গেল। আর তারা এমন বিষয়ের সংকল্প করেছিল, যা তারা কার্যকর করতে পারেনি। তারা শুধু এ কারণে প্রতিশোধ নিয়েছে যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় অনুগ্রহে তাদের সম্পদশালী করেছেন। যদি তারা তাওবা করে, তাহলে তা তাদের জন্য উত্তম হবে। আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে আল্লাহ তাদের ইহকাল ও পরকালে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রদান করবেন। আর ভূপৃষ্ঠে তাদের জন্য নেই কোনো রক্ষক ও সাহায্যকারী।"৫৬১

এরপর জুলাস মুখ খুললেন। বললেন, "আমি এ রকম বলেছি। আর আল্লাহ আমাকে তাওবার সুযোগ দিয়েছেন। আমি তাওবা করছি।" জুলাস নিজের গুনাহ স্বীকার করে উত্তমরূপে তাওবা করলেন। উমাইর বিন সাইদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এরও লালনপালন করতে লাগলেন আগের মতো।

উরওয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, "সে উমাইর মৃত্যু পর্যন্ত সাহাবিদের মাঝে বিশেষ মর্যাদাপ্রাপ্ত বলে বিবেচিত হন।"৫৬২

ইমাম ইবনে সিরিন (রাহিমাহুল্লাহ) মুরসাল সূত্রের বর্ণনায় বলেন, 'যখন এ আয়াতটি নাজিল হলো, তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কান ধরে আদর করে বললেন, “বেটা, তোমার কান ঠিকই আছে। তোমার রব তোমার সত্যায়ন করেছেন। "৫৬৩

উমর বিন খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) উমাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে হিমসের গভর্নর পদে নিয়োগ দেন। পরিশেষে উমাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) শামে মৃত্যুবরণ করেন। উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) প্রায়ই বলতেন, 'যদি উমাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মতো কোনো ব্যক্তি আমার পাশে থাকত, তবে আমি তাকে মুসলিমদের কল্যাণে নিযুক্ত করতাম। '৫৬৪

টিকাঃ
৫৬১. সুরা আত-তাওবা, ৯: ৭৪।
৫৬২. এ ঘটনাটি ইবনে জারির রাজ্জাক: ১৮৩০। -ইবনে আব্দুল বার তার তাফসির গ্রন্থে এনেছেন ১৪/৩৬১; মুসান্নাফে আব্দুর বলেন, 'এ ঘটনাটি তাফসিরের গ্রন্থগুলোতে প্রসিদ্ধ।' দেখুন, আল-ইসতিআব: ১/৭৯।
৫৬৩. মুসান্নাফু আব্দির রাজ্জাক: ১৮৩০৪।
৫৬৪. উসুদুল গাবাহ: ১/৮৭৩।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 মুনাফিকদের দেওয়া কষ্টে ধৈর্যধারণ করতেন

📄 মুনাফিকদের দেওয়া কষ্টে ধৈর্যধারণ করতেন


আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'হুনাইনের দিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গনিমত দেওয়ার সময় কিছু মানুষকে প্রাধান্য দিলেন। যেমন আকরা বিন হাবিস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে একশটি উট দিলেন। উয়াইনা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কেও সমপরিমাণ দিলেন। এভাবে আরবের আরও বেশ কয়েকজন সম্মানিত ব্যক্তিকে বেশি করে গনিমতের সম্পদ দিলেন।'

তখন এক লোক দাঁড়িয়ে বলল, "আল্লাহর কসম, এ বণ্টনে তিনি ইনসাফ করেননি। তার এ বণ্টন আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ছিল না।"

তখন আমি বললাম, "আল্লাহর কসম, আমি অবশ্যই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানাব।” এরপর আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে সে লোকের কথা বললাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘটনা শুনে বেশ রেগে গেলেন। তাঁর চেহারা লাল হয়ে গেল। তখন আমি বৃথা আফসোস করতে থাকলাম, যদি আমি তাকে না বলতাম, তবেই ভালো হতো। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইনসাফ না করেন, তবে আর কে ইনসাফ করবে?” এরপর বললেন, "আল্লাহ মুসা (আলাইহিস সালাম)-এর ওপর দয়া করুন। তিনি এর চেয়েও বেশি কষ্ট পেয়েছেন এবং ধৈর্যধারণ করেছেন। "৫৬৫

হাদিস থেকে শিক্ষা

* মূর্খদের সাথে কথা না বলে তাদের এড়িয়ে চলতে হবে। কষ্ট ফেলে ধৈর্য ধরতে হবে। পূর্বসূরিদের অনুসরণ করতে হবে।
* যে সকল মুনাফিক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কষ্ট দিয়েছিল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ক্ষেত্রে ধৈর্য ধরেছিলেন। অনেকবারই তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উদ্দেশ্যে ঘৃণ্য কথা বলেছে। কিন্তু তিনি তাদেরকে আনুগত্যের মধ্যে রাখতে এবং অন্য যারা মুসলিম হয়নি, তাদের ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করতে মুনাফিকদের কিছু না করে ধৈর্যধারণ করতেন। কারণ, মুনাফিকদের এসব ঔদ্ধত্যের কারণে তাদের শাস্তি দিলে অমুসলিমরা 'মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সঙ্গীদের হত্যা করে' বলে ইসলাম গ্রহণ করবে না।
* গুণীজনের মাঝে যে দোষটা নেই, তাদের প্রতি সে দোষটা আরোপ করলে তারা অনেক সময় রাগান্বিত হন। রেগে যাওয়া সত্ত্বেও তারা ধৈর্যধারণ করেন। যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধৈর্যধারণ করেছেন মুসা (আলাইহিস সালাম)-এর আদর্শ অনুসরণ করে। ৫৬৬

টিকাঃ
৫৬৫. সহিহুল বুখারি: ৩৪০৫, সহিহু মুসলিম: ১০৬২।
৫৬৬. ফাতহুল বারি: ৮/৫৬, ১০/৫১২।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 বৈশিষ্ট্য বর্ণনার সময় কোনো মুনাফিকের নাম নিতেন না

📄 বৈশিষ্ট্য বর্ণনার সময় কোনো মুনাফিকের নাম নিতেন না


মুনাফিকদের ক্ষেত্রে তাঁর অনুসৃত পন্থা ছিল-তিনি তাদের বৈশিষ্ট্য ও কর্মকাণ্ড আলোচনা করার সময় কারও নাম বা পরিচিতি বলতেন না।

পূর্বেই আমরা জেনে এসেছি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও কিছু মুনাফিককে নির্দিষ্ট করে চিনতেন না। কিন্তু তাদের নির্দিষ্ট করে না চেনার অর্থ এ নয় যে, তিনি মুনাফিকদের কর্মকাণ্ড ও বৈশিষ্ট্য জানতেন না। এমনটা মোটেই নয়; বরং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবিগণ কিছু মুনাফিককে নির্দিষ্ট করে চিনতেন আবার কিছু মুনাফিককে তাদের কর্মের মাধ্যমে চিনে নিতেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَوْ نَشَاءُ لَا رَيْنَاكَهُمْ فَلَعَرَفْتَهُم بِسِيمَاهُمْ ، وَلَتَعْرِفَنَّهُمْ فِي لَحْنِ الْقَوْلِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ أَعْمَالَكُمْ

'আমি ইচ্ছা করলে তোমাকে তাদের পরিচয় দিতাম। ফলে তুমি তাদের চেহারা দেখে চিনতে পারতে। তুমি অবশ্যই কথার ভঙ্গিতে তাদের চিনতে পারবে। আল্লাহ তোমাদের কাজ সম্পর্কে অবগত। '৫৬৭

ইবনে কাসির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আল্লাহ তাআলা বলছেন, "হে মুহাম্মাদ, আমি ইচ্ছে করলে তোমাকে তাদের একেকজনের পরিচয় দিতে পারি। ফলে তাদের প্রত্যেককে তুমি চিনে নিতে পারবে অনায়াসে।" কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টিকে গোপন রাখার জন্য বাহ্যিকভাবে বিষয়গুলো নিরাপদে রাখার জন্য এবং গোপনীয়তা কেবল তাঁর জ্ঞানে সীমাবদ্ধ রাখার জন্য সকল মুনাফিকের পরিচয় তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানাননি।

)وَلَتَعْرِ فَنَّهُمْ فِي لَحْنِ الْقَوْلِ( অর্থাৎ তাদের মুখ থেকে যে কথা বেরোয়, তা তাদের মনের উদ্দেশ্য বুঝিয়ে দেবে অনায়াসে। তাদের কথা শুনেই, কথার তাৎপর্য থেকেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝতে পারবেন যে, সে কোন দলের। '৫৬৮

টিকাঃ
৫৬৭. সুরা মুহাম্মাদ, ৪৭: ৩০।
৫৬৮. তাফসিরু ইবনি কাসির: ৭/৩২১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00