📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 মুনাফিকদের ভীতি প্রদর্শন করতেন

📄 মুনাফিকদের ভীতি প্রদর্শন করতেন


নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো মুখোশধারী এ মুনাফিক দলটিকে ভীতি প্রদর্শন করতেন। হুজাইফা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "আমার সাহাবিদের মাঝে বারোজন মুনাফিক আছে। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। জান্নাতের ঘ্রাণও তারা পাবে না। এদের জন্য জান্নাতে প্রবেশ করা এতটাই অসম্ভব, যেমন সুচের ছিদ্র দিয়ে উট প্রবেশ করা অসম্ভব। তাদের আটজনের জন্য দুবাইলাহ-ই যথেষ্ট হবে। দুবাইলাহ হচ্ছে একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। এটি তাদের কাঁধে উত্থিত হয়ে তাদের বুকের ভেতর ছড়িয়ে পড়বে। এরপর তাদের মৃত্যু হবে।"৫৩৪

'আমার সাহাবিদের মাঝে'- অর্থাৎ তারা আমার সাহাবি বেশে তাদের মাঝে লুকিয়ে আছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা আমার সাহাবিদের মধ্যে পরিগণিত নয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَمِمَّنْ حَوْلَكُم مِّنَ الْأَعْرَابِ مُنَافِقُونَ وَمِنْ أَهْلِ الْمَدِينَةِ مَرَدُوا عَلَى النِّفَاقِ لَا تَعْلَمُهُمْ نَحْنُ نَعْلَمُهُمْ : سَنُعَذِّبُهُم مَّرَّتَيْنِ ثُمَّ يُرَدُّونَ إِلَى عَذَابٍ عَظِيمٍ

'তোমাদের চারপাশে কতক বেদুইন হলো মুনাফিক। আর মদিনাবাসীদের কেউ কেউ নিফাকিতে অনঢ়। তুমি তাদের চেনো না, আমি তাদের চিনি। আমি তাদের দ্বিগুণ শাস্তি দেবো, (ক্ষুধা বা নিহত হওয়া এবং কবরের শাস্তি)। অতঃপর তাদের মহাশাস্তির দিকে ফিরিয়ে আনা হবে। '৫৩৫

এসব লোক আমার সাহাবিদের বেশ ধরে আছে। বাহ্যিকভাবে তারা আমার সাহাবি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তারা আমার বিপক্ষে।

'বারোজন মুনাফিক'-এরা সেসব লোক, যারা মুখোশ পরে এসেছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এ কথার মাধ্যমে আকাবার রাতে ঘটা সে ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। যেখানে আল্লাহ তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে রক্ষা করেছেন এবং তাকে সেসব আক্রমণকারীর নাম জানিয়ে দিয়েছেন। '৫৩৬

'তাদের জন্য যথেষ্ট হবে'- অর্থাৎ তাদের অনিষ্টতা প্রতিহত করবে।

'এটি তাদের কাঁধে উত্থিত হবে'- অর্থাৎ তাদের কাঁধে গরম ফোঁড়া উঠবে। এ থেকে যে উত্তাপ বের হবে, তার তাপ তাদের বুকে ছড়িয়ে পড়বে। ফোঁড়াটিকে আগুনের বাতির সাথে তুলনা দেওয়া হয়েছে এ হাদিসে। যার অর্থ হচ্ছে, আগুনের শিখা। ৫৩৭

টিকাঃ
৫৩৪. সহিহু মুসলিম: ২৭৭৯।
৫৩৫. সুরা আত-তাওবা, ৯: ১০১।
৫৩৬. ফাইজুল কাদির: ৪/৪৫৪।
৫৩৭. মিরকাতুল মাফাতিহ: ৯/৩৮১৬।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 বারোজন মুনাফিকের নাম হুজাইফা -কে জানিয়েছিলেন

📄 বারোজন মুনাফিকের নাম হুজাইফা -কে জানিয়েছিলেন


বাহনের লাগাম ধরে ফেললেন এবং সেটিকে নিয়ে হেঁটে চললেন। কিছুক্ষণ পর দেখলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক জায়গায় বসা। হুজাইফা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) উটকে বসালেন এবং নিজেও পাশে বসে পড়লেন। যতক্ষণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম না উঠলেন, ততক্ষণ তিনি সেখানে বসে ছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে এসে বললেন, "কে?"

হুজাইফা বিন ইয়ামান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)।

আমি তোমার কাছে গোপন কথা গচ্ছিত রাখছি। কারও কাছে তুমি এ গোপন কথা প্রকাশ করবে না। অমুক অমুকের জানাজা পড়তে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে।'

একসময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইনতিকাল করলেন। আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর খিলাফতকালও শেষ হয়ে এল। এরপর এল উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর শাসনকাল। উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর সময়ে যখনই কেউ মৃত্যুবরণ করত, তিনি ধারণা করতেন এ লোকটি হয়তো সে মুনাফিক দলের একজন। উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তখন এসে হুজাইফা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাত ধরতেন, তাকে জানাজা পড়ার জন্য নিয়ে যেতে চাইতেন। যদি হুজাইফা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তার সাথে যেতেন, তবে তিনি সে লোকের জানাজা পড়তেন। কিন্তু যদি হুজাইফা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তার হাত ছাড়িয়ে নিতেন এবং তার সাথে যেতে অস্বীকৃতি জানাতেন, তখন উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) জানাজায় অংশগ্রহণ না করে তার সাথে চলে যেতেন এবং অন্যদের জানাজা পড়ে নেওয়ার আদেশ দিতেন। '৫৪১

কিছু লোক মনে করে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুজাইফা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে সকল মুনাফিকের নাম জানিয়েছেন। এটা ভুল ধারণা। স্বয়ং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও সকল মুনাফিককে চিনতেন না। তিনি মুনাফিকদের নির্দিষ্ট একটা অংশকে চিনতেন এবং তাদের নামধাম ও পরিচয় জানতেন। অন্য একটা অংশকে বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে চিনতেন। আর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবল হুজাইফা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্রকারী মুনাফিকদের নাম বলেছিলেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَمِمَّنْ حَوْلَكُم مِّنَ الْأَعْرَابِ مُنَافِقُونَ وَمِنْ أَهْلِ الْمَدِينَةِ مَرَدُوا عَلَى النِّفَاقِ لَا تَعْلَمُهُمْ نَحْنُ نَعْلَمُهُمْ : سَنُعَذِّبُهُم مَّرَّتَيْنِ ثُمَّ يُرَدُّونَ إِلَى عَذَابٍ عَظِيمٍ

'তোমাদের চারপাশে কতক বেদুইন হলো মুনাফিক। আর মদিনাবাসীদের কেউ কেউ নিফাকিতে অনঢ়। তুমি তাদের চেনো না, আমি তাদের চিনি। আমি তাদের দ্বিগুণ শাস্তি দেবো, (ক্ষুধা বা নিহত হওয়া এবং কবরের শাস্তি)। অতঃপর তাদের মহাশাস্তির পানে ফিরিয়ে আনা হবে। '৫৪২

এ আয়াত এ বিষয়ে দলিল যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল মুনাফিককে চিনতেন না। আল্লাহ তাঁকে মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য জানিয়েছেন। সে বৈশিষ্ট্যের আলোকে তিনি কিছু মুনাফিককে চিনে নিতেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَوْ نَشَاءُ لَأَرَيْنَاكَهُمْ فَلَعَرَفْتَهُم بِسِيمَاهُمْ ، وَلَتَعْرِفَنَّهُمْ فِي لَحْنِ الْقَوْلِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ أَعْمَالَكُمْ

'আমি ইচ্ছা করলে তোমাকে তাদের পরিচয় দিতাম; ফলে তুমি তাদের চেহারা দেখে তাদের চিনতে পারতে। তুমি অবশ্যই কথার ভঙ্গিতে তাদের চিনতে পারবে। আল্লাহ তোমাদের কাজ সম্পর্কে অবগত।' [সুরা মুহাম্মাদ, ৪৭: ৩০]৫৪৩

টিকাঃ
৫৪১. আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি ১৭২৯৭।
৫৪২. সুরা আত-তাওবা, ৯: ১০১।
৫৪৩. তাফসিরু ইবনি কাসির ৪/২০৪।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাবুক যুদ্ধে মুমিনদের নিয়ে মুনাফিকদের ঠাট্টা-বিদ্রূপ

📄 তাবুক যুদ্ধে মুমিনদের নিয়ে মুনাফিকদের ঠাট্টা-বিদ্রূপ


তাবুক অভিযানে মুনাফিকদের প্রকাশ্য অপরাধ ছিল, তারা মুমিনদের নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করেছিল। এ ঠাট্টা করার কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঠাট্টাকারীকে বেঁধে রাখার শাস্তি দিয়েছেন।

আব্দুল্লাহ বিন উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'গাজওয়ায়ে তাবুকের এক মজলিসে একদিন এক লোক বলল, "আমি এ বেদুইনদের মতো এত পেটুক, এত মিথ্যুক, শত্রুসম্মুখে এত ভীতু লোক কখনো দেখিনি। "৫৪৪

তখন মজলিসে উপস্থিত একজন বলে উঠলেন, "তুমিই মিথ্যুক। তুমিই তো আসলে মুনাফিক। অবশ্যই আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অবহিত করব।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে সে মুনাফিকের ঠাট্টার কথা পৌঁছাল। এ ব্যাপারে কুরআন নাজিল হলো।'

ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'এরপর আমি তাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উটের পেটের সাথে বাঁধা অবস্থায় দেখিছি। মাটির পাথরের সাথে সে আহত হচ্ছিল আর বলছিল, “হে আল্লাহর রাসুল, আমরা তো কেবল কথার কথা বলছিলাম এবং একটু কৌতুক করছিলাম।"৫৪৫

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ “তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর হুকুম-আহকামের সাথে এবং তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ঠাট্টা করছিলে?" [সুরা আত-তাওবা, ৯: ৬৫]৫৪৬

وَلَئِن سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ ، قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ - لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُم بَعْدَ إِيمَانِكُمْ إِن نَّعْفُ عَن طَائِفَةٍ مِّنكُمْ نُعَذِّبْ طَائِفَةً بِأَنَّهُمْ كَانُوا مُجْرِمِينَ

'আর যদি তুমি তাদের কাছে জিজ্ঞেস করো, তবে তারা বলবে, "আমরা তো কথার কথা বলছিলাম এবং কৌতুক করছিলাম।" আপনি বলুন, "তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর হুকুম-আহকামের সাথে এবং তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ঠাট্টা করছিলে!" তোমরা এখন অজুহাত দেখিয়ো না। তোমরা তো ইমান আনার পর কুফরি করেছ। যদিও আমি তোমাদের মধ্য হতে কতককে ক্ষমা করে দিই, তবুও কতককে শাস্তি দেবোই। কারণ, তারা অপরাধী ছিল। '৫৪৭

আল্লাহর দ্বীন নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা নিফাকের আলামত। আল্লাহকে নিয়ে, তাঁর হুকুম-আহকাম নিয়ে ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিয়ে ঠাট্টা করা কুফর। এমন কর্ম দ্বীন থেকে বের করে দেয়। কারণ, দ্বীনের মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে আল্লাহকে সম্মান করা, তাঁর দ্বীন ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সম্মান করার ওপর। এসব ভিত্তির কোনোটিকে নিয়ে ঠাট্টা করা মূলভিত্তির বিরোধী ও বিপরীত। ইমান ভঙ্গের কারণগুলোর অন্যতম কারণ এটি।

হাদিসে আমরা দেখেছি, মুনাফিকটি যদিও ওজর পেশ করেছিল, কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবল এতটুকুই বলেছিলেন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর হুকুম-আহকামের সাথে এবং তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ঠাট্টা করছিলে! তোমরা এখন অজুহাত দেখিয়ো না, তোমরা তো ইমান আনার পর কুফরি করেছ।

কেউ হয়তো বলতে পারেন, এ ঘটনায় তো দ্বীন নিয়ে সরাসরি কোনো বিদ্রুপ করেনি লোকটি; বরং মুমিনদের একটা অংশকে নিয়ে ঠাট্টা করা হয়েছে।

উত্তরে আমরা বলব, মুমিনদের সে অংশটাকে তাদের ব্যক্তিত্ব বা গোত্রের কারণে ঠাট্টা করা হয়নি; বরং তাদের দ্বীনের কারণে ঠাট্টা করেছিল সে লোকটি।

সুরা তাওবার একটি নাম الفَاضِحَة )ফাঁসকারী/মুখোশ উন্মোচনকারী)। কারণ, এ সুরাটি মুনাফিকদের মুখোশ উন্মোচন করে দিয়ে তাদের আসল চেহারা উপস্থাপন করেছে সকলের সামনে। তাদের গোপন কথা, তাদের ষড়যন্ত্র, তাদের নিকৃষ্ট লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, তাদের বিদ্রুপ ও হিংসাত্মক কথাবার্তা, মুসলিম সমাজের ধ্বংসসাধনে তাদের গৃহীত পদক্ষেপ সব ফাঁস করে দেওয়া হয়েছে।

সাইদ বিন জুবাইর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:

'আমি ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে বললাম, "সুরা তাওবা।" তিনি বললেন, "এটি الفَاضِحَة )ফাঁসকারী/মুখোশ উন্মোচনকারী)।” এ সুরাটি وَمِنْهُمْ وَمِنْهُمْ (তাদের একদল এ করেছে, তাদের একদল এ করেছে) বলে বলে আয়াত নাজিল হয়েই যাচ্ছিল। ফলে সবাই ধারণা করছিল, এমন কোনো লোক বাকি থাকবে না, যার সম্পর্কে সব বলা হবে না। সবারই কথা প্রকাশ করে দেওয়া হবে। '৫৪৮

টিকাঃ
৫৪৪. এত পেটুক তথা এসব বেদুইনরা বেশি বেশি খায়, তাই তাদের পেট বড় হয়। তারা খাদ্যলোভী, তাই সব সময় খাবারকে ঘিরেই তাদের যত চিন্তা। এত মিথ্যুক তথা তারা কেবল মিথ্যা কথাই বলে বেড়ায়। এত ভীতু তথা শত্রুদের সামনে তারা ভীত থাকে। শত্রুদের সাথে লড়াই না করে তাদের সামনে থেকে পালায়। আদতে এসব দোষ পূর্ণরূপে মুনাফিকদের মাঝে পাওয়া যায়, মুমিনদের মধ্যে নয়। ইবনে উসাইমিন কৃত শারহু রিয়াজিস সালিহিন ২/১০১।
৫৪৫. অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, আমরা তো সফরের ক্লান্তি দূর করছিলাম কিছু কৌতুক করে।
৫৪৬. তাফসিরুত তাবারি: ১৬৯১২।
৫৪৭. সুরা আত-তাওবা, ৯: ৬৫-৬৬।
৫৪৮. সহিহুল বুখারি: ৪৮৮২।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 মুনাফিকদের বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রাজনৈতিক পদক্ষেপ

📄 মুনাফিকদের বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রাজনৈতিক পদক্ষেপ


মুনাফিকদের প্রকাশ্য সমাবেশস্থলগুলো ধ্বংস করা

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مَسْجِدًا ضِرَارًا وَكُفْرًا وَتَفْرِيقًا بَيْنَ الْمُؤْمِنِينَ وَإِرْصَادًا لِمَنْ حَارَبَ اللهَ وَرَسُولَهُ مِنْ قَبْلُ وَلَيَحْلِفُنَّ إِنْ أَرَدْنَا إِلَّا الْحُسْنَى وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ - لَا تَقُمْ فِيهِ أَبَدًا لَمَسْجِدُ أُسِّسَ عَلَى التَّقْوَى مِنْ أَوَّلِ يَوْمٍ أَحَقُّ أَنْ تَقُومَ فِيهِ فِيهِ رِجَالٌ يُحِبُّونَ أَنْ يَتَطَهَّرُوا وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُطَهِّرِينَ

'আর যারা মসজিদ তৈরি করেছে ক্ষতিসাধন, কুফর আর মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এবং ইতিপূর্বে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধ করেছে, তাদের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারের নিমিত্তে, আর তারা অবশ্যই শপথ করবে যে, আমাদের উদ্দেশ্য সৎ বৈ মন্দ নয়। কিন্তু আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, তারা অবশ্যই মিথ্যাবাদী। হে মুহাম্মাদ, তুমি কখনো সেখানে দাঁড়াবে না। তবে প্রথম দিন থেকে যে মসজিদের ভিত্তি রাখা হয়েছে তাকওয়ার ওপর, সেটিই তোমার দাঁড়ানোর যোগ্যস্থান। সেখানে রয়েছে এমন লোক, যারা পবিত্রতাকে ভালোবাসে। আর আল্লাহ পবিত্র লোকদের ভালোবাসেন। '৫৪৯

অর্থাৎ মুমিনদের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে )وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مَسْجِدًا ضِرَارًا( নিজেদের সমাবেশস্থল হিসেবে যারা মসজিদ স্থাপন করে।

)وَكُفْرًا( -অর্থাৎ অন্যরা মসজিদ তৈরি করে ইমানকে উদ্দেশ্য করে। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে কুফরি।

)وَتَفْرِيقًا بَيْنَ الْمُؤْمِنِينَ( অর্থাৎ মুমিনদের মাঝে দেশত্ববোধের চেতনা, জাতীয়তার চেতনা সৃষ্টি করে তাদের মাঝে বিভেদ ও মতপার্থক্য তৈরির উদ্দেশ্যে তারা এ মসজিদ তৈরি করছে।

)وَإِرْصَادًا( -অর্থাৎ তাদের মসজিদ তৈরির আরেকটি উদ্দেশ্য হচ্ছে একটি নিরুপদ্রব ঘাঁটি তৈরি করা।

অর্থাৎ আল্লাহর ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুদ্ধকারী লোকদের সাহায্য করার নিমিত্তে তারা এ মসজিদ তৈরি করে।

যেমন: আবু আমির রাহিব। লোকটা প্রথমে মক্কার মুশরিকদের কাছে যায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরুদ্ধে সাহায্য চাওয়ার জন্য। মক্কায় তার উদ্দেশ্য পূরণ না হলে রোম সম্রাট কাইসারের কাছে দাবি নিয়ে হাজির হয়। কিন্তু পথেই তার ইহলিলা সাঙ্গ হয়ে যায়। সে ও তার মুনাফিক ভাইয়েরা কাইসারের কাছ থেকে ওয়াদা ও সমর্থন পেয়েছিল।

)وَلَيَحْلِفُنَّ إِنْ أَرَدْنَا إِلَّا الْحُسْنَى( অর্থাৎ তারা অবশ্যই তাদের এ মসজিদ তৈরির উদ্দেশ্য বলতে গিয়ে কসম করে বলবে, আমাদের উদ্দেশ্য ভালো বৈ মন্দ নয়। আমাদের উদ্দেশ্য দুর্বল, অক্ষম ও অসমর্থ লোকদের প্রতি অনুগ্রহ করা।

)وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ( অর্থাৎ কিন্তু আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, তারা মিথ্যুক। তাদের কসমের তুলনায় আল্লাহর সাক্ষ্যই অধিক সত্য।

)لَا تَقُمْ فِيهِ أَبَدًا( অর্থাৎ যে মসজিদ ক্ষতির উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে, তুমি সে মসজিদে সালাত আদায় করবে না। সে মসজিদের কোনো প্রয়োজন নেই তোমার। আল্লাহ তোমাকে সে মসজিদ থেকে অভাবমুক্ত রেখেছেন।

لَمَسْجِدٌ أُسِّسَ عَلَى التَّقْوَى مِنْ أَوَّلِ يَوْمٍ) আয়াতে বর্ণিত মসজিদটি কুবা মসজিদ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মদিনা আগমনের পর এখানেই প্রথম সালাত আদায় করেন তিনি। এ মসজিদটির প্রতিষ্ঠা ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে, আল্লাহর স্মরণ ও দ্বীনের ভিত্তিগুলো প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে। এ মসজিদটি সুপ্রাচীন ও উত্তম।

)أَحَقُّ أَنْ تَقُومَ فِيهِ( অর্থাৎ এ মসজিদ তোমার সালাত পড়া ও আল্লাহর স্মরণ করার জন্য অধিক উত্তম। এর অধিকারীরাও উত্তম মানুষ। এ জন্য ( فِيهِ رِجَالٌ يُحِبُّونَ أَنْ يَتَطَهَّرُوا ) : এখানকার লোকগুলো নিজেদের গুনাহ থেকে মুক্ত করতে পছন্দ করে। পছন্দ করে নাপাকি ও অপবিত্রতা থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে।
( وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُطَّهِّرِينَ) অর্থাৎ অন্তরের পবিত্রতাকে ভালোবাসেন। তারা শিরক ও মন্দ স্বভাব থেকে মুক্ত। আল্লাহ তাদের বাহ্যিক পবিত্রতাকেও ভালোবাসেন। তারা নাপাকি ও অপবিত্রতা থেকে মুক্ত থাকে। '৫৫০

আয়াত থেকে শিক্ষা

* এক মসজিদের ক্ষতির উদ্দেশ্যে পাশে আরেকটি মসজিদ তৈরি করা হারাম। ক্ষতির উদ্দেশ্যে তৈরি মসজিদটি ভেঙে ফেলা ওয়াজিব। মসজিদটি কিছু লোকের মন্দ উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে স্থাপন করা হয়েছে।
* কোনো কোনো আমল উত্তম হলেও মানুষের মন্দ নিয়ত সে আমলকে মন্দ কাজে পরিণত করে। ফলে একটি উত্তম আমল নিষিদ্ধ কাজে পরিণত হয়। যেমন: মসজিদ স্থাপন করা একটি উত্তম আমল। কিন্তু মসজিদে জিরার স্থাপন করা মন্দ কাজ।
* মুমিনদের মাঝে বিভেদ তৈরি করে-এমন প্রতিটি কাজই গুনাহ। এমন কর্মকাণ্ড থেকে অবশ্যই দূরে থাকতে হবে। একইভাবে মুমিনদের ঐক্যবদ্ধ করে, মুমিনদের মাঝে হৃদ্যতা সৃষ্টি করে-এমন প্রতিটি কাজই উত্তম। এমন কাজ করতে হবে, এমন কাজ করার জন্য অন্যকে আদেশ করতে হবে, উৎসাহিত করতে হবে।
* এ আয়াতগুলোতে গুনাহের স্থানগুলোতে সালাত পড়া, তা থেকে দূরে থাকা, তার ধারে কাছেও যাওয়া থেকে নিষেধ করা হয়েছে।
* স্থানের ওপর পাপের একটা প্রভাব থাকে। যেমন: মসজিদে জিরারের ওপর মুনাফিকদের পাপের প্রভাব পড়েছে এবং সেখানে সালাত পড়া নিষিদ্ধ হয়েছে। তেমনিভাবে পুণ্যকর্মেরও একটা প্রভাব থাকে। যেমন: মসজিদে কুবা। এমনকি আল্লাহ এ মসজিদের প্রশংসা করে বলেছেন:

لَمَسْجِدُ أُسِّسَ عَلَى التَّقْوَى مِنْ أَوَّلِ يَوْمٍ أَحَقُّ أَنْ تَقُومَ فِيهِ

'প্রথম দিন থেকে যে মসজিদের ভিত্তি রাখা হয়েছে তাকওয়ার ওপর, সেটিই তোমার দাঁড়ানোর যোগ্যস্থান।' [সুরা আত-তাওবা, ৯: ১০৮]

মসজিদের কুবার বিশেষ মর্যাদা আছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি শনিবার মসজিদে কুবায় এসে সালাত আদায় করতেন। ৫৫১ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে কুবায় সালাত পড়ার জন্য সাহাবিদের উৎসাহ দিতেন। ৫৫২

আয়াতগুলোতে বর্ণিত কারণগুলো বিশ্লেষণ করে চারটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি উৎকলিত হয়। সেগুলো হচ্ছে:

* প্রত্যেক এমন কাজ, যাতে মুসলিমদের ক্ষতি আছে, অথবা যে কাজ আল্লাহর অবাধ্যতা (প্রতিটি পাপই কুফরের শাখা বিশেষ), অথবা যে কাজ করলে মুসলিমদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি হয়, অথবা যে কাজে আল্লাহর শত্রুদের সাহায্যে হয়-তা হারাম ও নিষিদ্ধ। এর বিপরীত কাজগুলোর বিপরীত হুকুম।
* আল্লাহর অবাধ্যতায় করা প্রতিটি পাপই পাপীকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে নিতে থাকে। যতদিন অনবরত পাপের কাজ চলতে থাকে, ততদিন আল্লাহ থেকে একটু একটু করে দূরে সরতে থাকে পাপী। যতক্ষণ পর্যন্ত পাপ ছেড়ে পরিপূর্ণ তাওবা না করা হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত এ অধঃপতন চলতেই থাকে। যখন লজ্জা ও আফসোসের কারণে টুকরো টুকরো হয়ে যায় অন্তর, সে অন্তর থেকেই আসে পরিপূর্ণ তাওবা।
* মসজিদে কুবা তাকওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই মসজিদটি উত্তম। অন্যদিকে, যে মসজিদটি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে প্রতিষ্ঠা করেছেন, যে মসজিদ নির্মাণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে কাজ করেছেন, যে মসজিদটি আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য বাছাই করেছেন, বলা বাহুল্য সে মসজিদটি অধিক উত্তম হবে-সালাতের জন্য সেটি অতিউত্তম মসজিদ হবে।
* যে আমলের মূলভিত্তি ইখলাস ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণ, সে আমলই তাকওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ আমলই আমলকারীকে জান্নাতে পৌঁছে দেবে। অন্যদিকে যে আমল মন্দ বাসনা ও বিদআত-গোমরাহির ওপর ভিত্তি করে করা হয়, সে আমল জাহান্নামীদের আমল। এ আমল আমলকারীকে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত করবে। আর আল্লাহ জালিম সম্প্রদায়কে হিদায়াত দেন না। ৫৫৩

ইবনে কাসির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এ আয়াতগুলো নাজিলের পটভূমি এ রকম, মদিনায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আগমনের আগের কথা। খাজরাজ গোত্রের আবু আমির রাহিব নামে এক লোক ছিল। জাহিলি যুগে এ লোকটি খ্রিষ্টান হয়ে যায়। আহলে কিতাবের ইলম শিখতে থাকে। তার মাঝে জাহিলি যুগের পৌত্তলিকতাময় বন্দনার অংশ ছিল। খাজরাজ গোত্রে তার বিশেষ মর্যাদা ছিল।'

এরপর যখন রাসulullah সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় হিজরত করলেন, মুসলিমরাও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পাশে জমায়েত হলেন; ইসলামের পতাকা বুলন্দ হলো, ইসলামের আওয়াজ উচ্চ হলো, আল্লাহ তাআলা বদর প্রান্তরে মুসলিমদের বিজয় দিলেন। তখন অভিশপ্ত আমির তার হিংসা ও শত্রুতা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করল। মক্কার মুশরিক কুরাইশদের কাছে দৌড়ে গেল। তাদের কাছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সাহায্য-সমর্থন চাইল।

আরবের যারা তার সাথে একমত হয়েছিল, তাদের সে এক কথায় আনল। উহুদের বছর তারা যুদ্ধের জন্য এল। এ যুদ্ধে মুসলিমদের জন্য তেমনই ছিল, যেমন আল্লাহ তাদের জন্য ফয়সালা করেছেন। আর সর্বশেষ সফলতা মুমিনদেরই।'

এ পাপী উহুদের যুদ্ধের সময় মুসলিম ও কাফির দুই কাতারের মাঝখানে গর্ত খুঁড়ে রাখল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে গর্তগুলোরই একটিতে পড়ে গিয়েছিলেন। সেদিন তিনি আহত হলেন। তাঁর মুখে আঘাত লাগল। তাঁর ডান পাশের নিচের রুবাইয়া দাঁতগুলো ভেঙে গেল। তাঁর মাথায় আঘাত লাগল।'

যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে দ্বন্দ্ব যুদ্ধের জন্য আবু আমির এগিয়ে এল। নিজ গোত্র আনসারকে আহ্বান জানাল। তাকে সাহায্য করার জন্য আহ্বান জানাল। তার সাথে হাত মিলাবার জন্য বলল। কিন্তু আনসাররা তার কথা শুনে বলল, "আল্লাহ তোমাকে চোখ দেননি, হে ফাসিক, হে আল্লাহর শত্রু!” আনসাররা তাকে যা ইচ্ছে বললেন, গালি দিলেন। এরপর সে "আল্লাহর শপথ, আমি চলে আসার পর আবার দেখি, আমার কওমকে অকল্যাণ গ্রাস করে নিয়েছে" বলে ফিরে গেল।'

মদিনা থেকে তার পালিয়ে আসার পূর্বে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দাওয়াত দিয়েছিলেন। তাকে কুরআন পড়ে শুনিয়েছিলেন। সে ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং অবাধ্যতা দেখায়। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদদোয়া করে বলেছিলেন, সে যেন পলায়নপর হয়ে, বিতাড়িত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সে বদদোয়াই তার মৃত্যর ক্ষেত্রে সত্য হয়েছে।'

উহুদ যুদ্ধের পরের কথা। আমির দেখল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রভাব-প্রতিপত্তি বেড়ে চলেছে। সে এবার রোমের বাদশা হিরাক্লিয়াসের কাছে গেল। তার কাছে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরুদ্ধে সাহায্য চাইল। হিরাক্লিয়াস তাকে সাহায্য করার ওয়াদা করে তার প্রতি অনুগ্রহ করে তাকে তার কাছে রেখে দেয়। আমির সেখান থেকে মদিনায় মুনাফিকদের কাছে চিঠি লিখে পাঠাত, তাদের আশা দিত, শীঘ্রই সে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য একটি সেনাবাহিনী নিয়ে আসছে। তার আসার পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরাজিত হবেন। আর তাকে অপসারণ করে মদিনায় তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করবে।'

আমির তার মুনাফিক সাথিদের আদেশ দিল, তারা যেন সুরক্ষিত একটি স্থান বানায়, যেখানে তার পত্রবাহক আসবে। সে ফিরে আসলে যে জায়গাটা তাদের জন্য ঘাঁটির কাজ দেবে।'

তার আদেশ অনুযায়ী মুনাফিকরা মসজিদে কুবার পাশেই একটি মসজিদ বানাতে শুরু করে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুক যুদ্ধে বের হওয়ার আগেই তাদের মসজিদ নির্মাণ সম্পন্ন হয়। তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে তাদের সাথে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানায়। তাদের সাথে তাদের মসজিদে সালাত পড়ার জন্য আহ্বান করে। যাতে তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মতি নিয়েছে বলে প্রমাণ দিতে পারে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে তারা বলল, তারা মূলত দুর্বলদের সহজকরণের উদ্দেশ্যে মসজিদটি বানিয়েছে। শীতের সময় যাদের কষ্ট হয়, তাদের জন্য এ মসজিদ বানিয়েছে।'

আল্লাহ তাআলা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বাঁচিয়ে দিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আমরা একটি সফরের প্রস্তুতিতে আছি। যখন ফিরব, তখন যাব ইনশাআল্লাহ।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাবুক থেকে মদিনার উদ্দেশে রওনা হলেন। মদিনায় পৌঁছতে তখন হয়তো আর একদিন বা দিনের কিছু অংশ পরিমাণ দূরে ছিলেন, তখন জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে মসজিদে জিরারের সংবাদ নিয়ে আসলেন। জানিয়ে দিলেন যে, এ মসজিদটি কুফরির উদ্দেশ্যে বানানো হয়েছে। তাকওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত মসজিদে কুবা থেকে মুসলিমদের পৃথক করে এ মসজিদে এনে মুসলিমদের মাঝে বিচ্ছেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্য তাদের।'

তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় আসার পূর্বেই মসজিদটি ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য একদল সাহাবিকে পাঠিয়ে দিলেন। আল্লাহ তাআলা নাজিল করলেন-

لَا تَقُمْ فِيهِ أَبَدًا لَمَسْجِدٌ أُسِّسَ عَلَى التَّقْوَى مِنْ أَوَّلِ يَوْمٍ أَحَقُّ أَنْ تَقُومَ فِيهِ

"প্রথম দিন থেকে যে মসজিদের ভিত্তি রাখা হয়েছে তাকওয়ার ওপর, সেটিই তোমার দাঁড়ানোর যোগ্যস্থান।" [সুরা আত-তাওবা, ৯ : ১০৮]' ৫৫৪

জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'মসজিদে জিরার যখন গুড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন আমি তার ধোঁয়া দেখেছি। '৫৫৫

টিকাঃ
৫৪৯. সুরা আত-তাওবা, ৯ ১০৭-১০৮।
৫৫০. তাফসিরুস সাদি: ১/৩৫১।
৫৫১. সহিহুল বুখারি: ১১৯২, সহিহু মুসলিম: ১৩৯৯। ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত।
৫৫২. সুনানুত তিরমিজি: ৩২৪। উসাইদ বিন হুজাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'মসজিদে কুবায় সালাত পড়া উমরার সমান।' হাদিসটি সহিহ।
৫৫৩. তাফসিরুস সাদি: ১/৩৫১।
৫৫৪. তাফসিরু ইবনি কাসির: ৪/১৮৫।
৫৫৫. মুসতাদরাকুল হাকিম: ৮৭৬৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00