📄 তাবুক থেকে ফেরার পথে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে ব্যর্থ হত্যাচেষ্টা
তাবুক অভিযানে অংশগ্রহণকারী কিছু মুনাফিক যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হত্যাচেষ্টা করলেও আল্লাহ তাঁর নবিকে রক্ষা করেছেন।
পনেরোজন লোক এ কথায় একমত হলো, তারা রাতের বেলা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাহনকে পাহাড়ি পথে নিয়ে যাবে। তারা সেখানেই তাদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করবে।
আবু তুফাইল (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'তাবুক অভিযান থেকে ফেরার পথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন ঘোষণাকারীকে আদেশ দিলে সে ঘোষণা করল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আকাবার ৫২৯ পথ ধরে সামনে এগোবেন। অন্য কেউ যেন এ পথে না আসে।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে পথে এগোলেন। পেছনে ছিলেন হুজাইফা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)। আর আম্মার (রাদিয়াল্লাহু আনহু) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাহন সামনে থেকে টেনে নিচ্ছিলেন। এ সময় হঠাৎ করে একদল মুখোশপরা অশ্বারোহীদল কোথা থেকে যেন উঠে এল। তারা আম্মার (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে ঘিরে ধরল। আম্মার (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাদের সওয়ারিগুলোর মুখের ওপর অনবরত আঘাত করতে থাকলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুজাইফা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে বললেন, "যথেষ্ট হয়েছে। যথেষ্ট হয়েছে।" একসময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহন থেকে নেমে এলেন। ততক্ষণে আম্মার (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-ও ফিরে এসেছেন। রাসulullah সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আম্মার (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে বললেন, "আম্মার, তুমি কি জানো এরা কারা?"
"এরা মুখোশ পরে এলেও তাদের অধিকাংশ বাহন আমার চেনা।" উত্তর দিলেন আম্মার (রাদিয়াল্লাহু আনহু)।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি কি জানো, তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল?"
আম্মার (রাদিয়াল্লাহু আনহু) উত্তর দিলেন, "আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিক জ্ঞাত।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তারা আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিয়ে পালিয়ে গিয়ে তাকে হত্যা করতে চাইছিল।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে লোকদের থেকে তিনজনের ওজর কবুল করলেন। তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, "আল্লাহর কসম, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘোষণাকারীর ঘোষণা শুনিনি। আর আমরা জানিও না, এ দলটা কী উদ্দেশ্যে এসেছিল।"
আম্মার (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তখন বললেন, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, বাকি বারোজন দুনিয়ার জীবনে এবং সাক্ষ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দিন আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করল।"৫৩০
এ মুনাফিকগুলোর ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা নাজিল করেন: وَهَمُّوا بِمَا لَمْ يَنَالُوا
'তারা ষড়যন্ত্র করেছিল কিন্তু তাতে সফল হয়নি।'৫৩১
ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
'এ হাদিসে বর্ণিত আকাবা অঞ্চল মিনা প্রান্তরের প্রসিদ্ধ সে আকাবা নয়, যেখানে আনসার সাহাবিদের বাইআত সংঘটিত হয়েছিল। এ আকাবাটি তাবুকের পথে অবস্থিত। মুনাফিকরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হত্যা করার জন্য এ স্থানে একত্রিত হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তাদের ষড়যন্ত্র থেকে তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে রক্ষা করলেন। '৫৩২
ইমাম ইবনে আসির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
'কিছু মূর্খ বলে, হাদিসে উল্লিখিত এ আকাবাটি হচ্ছে সে-ই আকাবা, ইসলামের প্রথম যুগে যেখানে বাইআত নেওয়া হয়েছিল। এসব মূর্খদের মতে বাইআত প্রদানকারীদের মধ্য থেকেই একদল মুখোশ পরে এসেছিল আক্রমণের উদ্দেশ্যে।
কিন্তু এমনটা মোটেই নয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুক অভিযান থেকে ফেরার পথে এ আকাবাটিতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে ঘোষণাকারী বলেছিল, কেউ যেন আকাবায় আবির্ভূত না হয়। যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আকাবার পথ ধরে চলছিলেন, তখন মুখোশ পরে উপস্থিত হয় মুনাফিকদের এ দলটি। যেন তাদের কেউ না চিনতে পারে। তারা নিশ্চয়ই গুরুতর কোনো মন্দের ইচ্ছে নিয়েই এসেছিল। কিন্তু আল্লাহ তাদের সফল হতে দেননি। '৫৩৩
টিকাঃ
৫২৯. আকাবা দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, পাহাড়ের পথ।
৫৩০. মুসনাদু আহমাদ: ২৩২৮০। হাইসামি কৃত মাজমাউজ জাওয়ায়িদ: ৬/১৯৫; তার সনদের বর্ণনাকারী সহিহ হাদিসের বর্ণনাকারী। শাইখ শুআইব আরনাউত বলেন, ইমাম মুসলিমের শর্তানুযায়ী তার সনদটি শক্তিশালী। এ ঘটনার সারাংশ সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। দেখুন, সহিহু মুসলিম: ২৭৭৯।
৫৩১. সুরা আত-তাওবা: ৭৪।
৫৩২. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৭/১২৬।
৫৩৩. জামিউল উসুল মিন আহাদিসির রাসুল: ১/৯৩০৬।
📄 মুনাফিকদের ভীতি প্রদর্শন করতেন
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো মুখোশধারী এ মুনাফিক দলটিকে ভীতি প্রদর্শন করতেন। হুজাইফা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "আমার সাহাবিদের মাঝে বারোজন মুনাফিক আছে। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। জান্নাতের ঘ্রাণও তারা পাবে না। এদের জন্য জান্নাতে প্রবেশ করা এতটাই অসম্ভব, যেমন সুচের ছিদ্র দিয়ে উট প্রবেশ করা অসম্ভব। তাদের আটজনের জন্য দুবাইলাহ-ই যথেষ্ট হবে। দুবাইলাহ হচ্ছে একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। এটি তাদের কাঁধে উত্থিত হয়ে তাদের বুকের ভেতর ছড়িয়ে পড়বে। এরপর তাদের মৃত্যু হবে।"৫৩৪
'আমার সাহাবিদের মাঝে'- অর্থাৎ তারা আমার সাহাবি বেশে তাদের মাঝে লুকিয়ে আছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা আমার সাহাবিদের মধ্যে পরিগণিত নয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمِمَّنْ حَوْلَكُم مِّنَ الْأَعْرَابِ مُنَافِقُونَ وَمِنْ أَهْلِ الْمَدِينَةِ مَرَدُوا عَلَى النِّفَاقِ لَا تَعْلَمُهُمْ نَحْنُ نَعْلَمُهُمْ : سَنُعَذِّبُهُم مَّرَّتَيْنِ ثُمَّ يُرَدُّونَ إِلَى عَذَابٍ عَظِيمٍ
'তোমাদের চারপাশে কতক বেদুইন হলো মুনাফিক। আর মদিনাবাসীদের কেউ কেউ নিফাকিতে অনঢ়। তুমি তাদের চেনো না, আমি তাদের চিনি। আমি তাদের দ্বিগুণ শাস্তি দেবো, (ক্ষুধা বা নিহত হওয়া এবং কবরের শাস্তি)। অতঃপর তাদের মহাশাস্তির দিকে ফিরিয়ে আনা হবে। '৫৩৫
এসব লোক আমার সাহাবিদের বেশ ধরে আছে। বাহ্যিকভাবে তারা আমার সাহাবি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তারা আমার বিপক্ষে।
'বারোজন মুনাফিক'-এরা সেসব লোক, যারা মুখোশ পরে এসেছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এ কথার মাধ্যমে আকাবার রাতে ঘটা সে ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। যেখানে আল্লাহ তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে রক্ষা করেছেন এবং তাকে সেসব আক্রমণকারীর নাম জানিয়ে দিয়েছেন। '৫৩৬
'তাদের জন্য যথেষ্ট হবে'- অর্থাৎ তাদের অনিষ্টতা প্রতিহত করবে।
'এটি তাদের কাঁধে উত্থিত হবে'- অর্থাৎ তাদের কাঁধে গরম ফোঁড়া উঠবে। এ থেকে যে উত্তাপ বের হবে, তার তাপ তাদের বুকে ছড়িয়ে পড়বে। ফোঁড়াটিকে আগুনের বাতির সাথে তুলনা দেওয়া হয়েছে এ হাদিসে। যার অর্থ হচ্ছে, আগুনের শিখা। ৫৩৭
টিকাঃ
৫৩৪. সহিহু মুসলিম: ২৭৭৯।
৫৩৫. সুরা আত-তাওবা, ৯: ১০১।
৫৩৬. ফাইজুল কাদির: ৪/৪৫৪।
৫৩৭. মিরকাতুল মাফাতিহ: ৯/৩৮১৬।
📄 বারোজন মুনাফিকের নাম হুজাইফা -কে জানিয়েছিলেন
বাহনের লাগাম ধরে ফেললেন এবং সেটিকে নিয়ে হেঁটে চললেন। কিছুক্ষণ পর দেখলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক জায়গায় বসা। হুজাইফা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) উটকে বসালেন এবং নিজেও পাশে বসে পড়লেন। যতক্ষণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম না উঠলেন, ততক্ষণ তিনি সেখানে বসে ছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে এসে বললেন, "কে?"
হুজাইফা বিন ইয়ামান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)।
আমি তোমার কাছে গোপন কথা গচ্ছিত রাখছি। কারও কাছে তুমি এ গোপন কথা প্রকাশ করবে না। অমুক অমুকের জানাজা পড়তে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে।'
একসময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইনতিকাল করলেন। আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর খিলাফতকালও শেষ হয়ে এল। এরপর এল উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর শাসনকাল। উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর সময়ে যখনই কেউ মৃত্যুবরণ করত, তিনি ধারণা করতেন এ লোকটি হয়তো সে মুনাফিক দলের একজন। উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তখন এসে হুজাইফা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাত ধরতেন, তাকে জানাজা পড়ার জন্য নিয়ে যেতে চাইতেন। যদি হুজাইফা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তার সাথে যেতেন, তবে তিনি সে লোকের জানাজা পড়তেন। কিন্তু যদি হুজাইফা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তার হাত ছাড়িয়ে নিতেন এবং তার সাথে যেতে অস্বীকৃতি জানাতেন, তখন উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) জানাজায় অংশগ্রহণ না করে তার সাথে চলে যেতেন এবং অন্যদের জানাজা পড়ে নেওয়ার আদেশ দিতেন। '৫৪১
কিছু লোক মনে করে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুজাইফা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে সকল মুনাফিকের নাম জানিয়েছেন। এটা ভুল ধারণা। স্বয়ং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও সকল মুনাফিককে চিনতেন না। তিনি মুনাফিকদের নির্দিষ্ট একটা অংশকে চিনতেন এবং তাদের নামধাম ও পরিচয় জানতেন। অন্য একটা অংশকে বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে চিনতেন। আর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবল হুজাইফা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্রকারী মুনাফিকদের নাম বলেছিলেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمِمَّنْ حَوْلَكُم مِّنَ الْأَعْرَابِ مُنَافِقُونَ وَمِنْ أَهْلِ الْمَدِينَةِ مَرَدُوا عَلَى النِّفَاقِ لَا تَعْلَمُهُمْ نَحْنُ نَعْلَمُهُمْ : سَنُعَذِّبُهُم مَّرَّتَيْنِ ثُمَّ يُرَدُّونَ إِلَى عَذَابٍ عَظِيمٍ
'তোমাদের চারপাশে কতক বেদুইন হলো মুনাফিক। আর মদিনাবাসীদের কেউ কেউ নিফাকিতে অনঢ়। তুমি তাদের চেনো না, আমি তাদের চিনি। আমি তাদের দ্বিগুণ শাস্তি দেবো, (ক্ষুধা বা নিহত হওয়া এবং কবরের শাস্তি)। অতঃপর তাদের মহাশাস্তির পানে ফিরিয়ে আনা হবে। '৫৪২
এ আয়াত এ বিষয়ে দলিল যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল মুনাফিককে চিনতেন না। আল্লাহ তাঁকে মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য জানিয়েছেন। সে বৈশিষ্ট্যের আলোকে তিনি কিছু মুনাফিককে চিনে নিতেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَوْ نَشَاءُ لَأَرَيْنَاكَهُمْ فَلَعَرَفْتَهُم بِسِيمَاهُمْ ، وَلَتَعْرِفَنَّهُمْ فِي لَحْنِ الْقَوْلِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ أَعْمَالَكُمْ
'আমি ইচ্ছা করলে তোমাকে তাদের পরিচয় দিতাম; ফলে তুমি তাদের চেহারা দেখে তাদের চিনতে পারতে। তুমি অবশ্যই কথার ভঙ্গিতে তাদের চিনতে পারবে। আল্লাহ তোমাদের কাজ সম্পর্কে অবগত।' [সুরা মুহাম্মাদ, ৪৭: ৩০]৫৪৩
টিকাঃ
৫৪১. আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি ১৭২৯৭।
৫৪২. সুরা আত-তাওবা, ৯: ১০১।
৫৪৩. তাফসিরু ইবনি কাসির ৪/২০৪।
📄 তাবুক যুদ্ধে মুমিনদের নিয়ে মুনাফিকদের ঠাট্টা-বিদ্রূপ
তাবুক অভিযানে মুনাফিকদের প্রকাশ্য অপরাধ ছিল, তারা মুমিনদের নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করেছিল। এ ঠাট্টা করার কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঠাট্টাকারীকে বেঁধে রাখার শাস্তি দিয়েছেন।
আব্দুল্লাহ বিন উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'গাজওয়ায়ে তাবুকের এক মজলিসে একদিন এক লোক বলল, "আমি এ বেদুইনদের মতো এত পেটুক, এত মিথ্যুক, শত্রুসম্মুখে এত ভীতু লোক কখনো দেখিনি। "৫৪৪
তখন মজলিসে উপস্থিত একজন বলে উঠলেন, "তুমিই মিথ্যুক। তুমিই তো আসলে মুনাফিক। অবশ্যই আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অবহিত করব।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে সে মুনাফিকের ঠাট্টার কথা পৌঁছাল। এ ব্যাপারে কুরআন নাজিল হলো।'
ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'এরপর আমি তাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উটের পেটের সাথে বাঁধা অবস্থায় দেখিছি। মাটির পাথরের সাথে সে আহত হচ্ছিল আর বলছিল, “হে আল্লাহর রাসুল, আমরা তো কেবল কথার কথা বলছিলাম এবং একটু কৌতুক করছিলাম।"৫৪৫
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ “তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর হুকুম-আহকামের সাথে এবং তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ঠাট্টা করছিলে?" [সুরা আত-তাওবা, ৯: ৬৫]৫৪৬
وَلَئِن سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ ، قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ - لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُم بَعْدَ إِيمَانِكُمْ إِن نَّعْفُ عَن طَائِفَةٍ مِّنكُمْ نُعَذِّبْ طَائِفَةً بِأَنَّهُمْ كَانُوا مُجْرِمِينَ
'আর যদি তুমি তাদের কাছে জিজ্ঞেস করো, তবে তারা বলবে, "আমরা তো কথার কথা বলছিলাম এবং কৌতুক করছিলাম।" আপনি বলুন, "তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর হুকুম-আহকামের সাথে এবং তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ঠাট্টা করছিলে!" তোমরা এখন অজুহাত দেখিয়ো না। তোমরা তো ইমান আনার পর কুফরি করেছ। যদিও আমি তোমাদের মধ্য হতে কতককে ক্ষমা করে দিই, তবুও কতককে শাস্তি দেবোই। কারণ, তারা অপরাধী ছিল। '৫৪৭
আল্লাহর দ্বীন নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা নিফাকের আলামত। আল্লাহকে নিয়ে, তাঁর হুকুম-আহকাম নিয়ে ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিয়ে ঠাট্টা করা কুফর। এমন কর্ম দ্বীন থেকে বের করে দেয়। কারণ, দ্বীনের মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে আল্লাহকে সম্মান করা, তাঁর দ্বীন ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সম্মান করার ওপর। এসব ভিত্তির কোনোটিকে নিয়ে ঠাট্টা করা মূলভিত্তির বিরোধী ও বিপরীত। ইমান ভঙ্গের কারণগুলোর অন্যতম কারণ এটি।
হাদিসে আমরা দেখেছি, মুনাফিকটি যদিও ওজর পেশ করেছিল, কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবল এতটুকুই বলেছিলেন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর হুকুম-আহকামের সাথে এবং তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ঠাট্টা করছিলে! তোমরা এখন অজুহাত দেখিয়ো না, তোমরা তো ইমান আনার পর কুফরি করেছ।
কেউ হয়তো বলতে পারেন, এ ঘটনায় তো দ্বীন নিয়ে সরাসরি কোনো বিদ্রুপ করেনি লোকটি; বরং মুমিনদের একটা অংশকে নিয়ে ঠাট্টা করা হয়েছে।
উত্তরে আমরা বলব, মুমিনদের সে অংশটাকে তাদের ব্যক্তিত্ব বা গোত্রের কারণে ঠাট্টা করা হয়নি; বরং তাদের দ্বীনের কারণে ঠাট্টা করেছিল সে লোকটি।
সুরা তাওবার একটি নাম الفَاضِحَة )ফাঁসকারী/মুখোশ উন্মোচনকারী)। কারণ, এ সুরাটি মুনাফিকদের মুখোশ উন্মোচন করে দিয়ে তাদের আসল চেহারা উপস্থাপন করেছে সকলের সামনে। তাদের গোপন কথা, তাদের ষড়যন্ত্র, তাদের নিকৃষ্ট লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, তাদের বিদ্রুপ ও হিংসাত্মক কথাবার্তা, মুসলিম সমাজের ধ্বংসসাধনে তাদের গৃহীত পদক্ষেপ সব ফাঁস করে দেওয়া হয়েছে।
সাইদ বিন জুবাইর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
'আমি ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে বললাম, "সুরা তাওবা।" তিনি বললেন, "এটি الفَاضِحَة )ফাঁসকারী/মুখোশ উন্মোচনকারী)।” এ সুরাটি وَمِنْهُمْ وَمِنْهُمْ (তাদের একদল এ করেছে, তাদের একদল এ করেছে) বলে বলে আয়াত নাজিল হয়েই যাচ্ছিল। ফলে সবাই ধারণা করছিল, এমন কোনো লোক বাকি থাকবে না, যার সম্পর্কে সব বলা হবে না। সবারই কথা প্রকাশ করে দেওয়া হবে। '৫৪৮
টিকাঃ
৫৪৪. এত পেটুক তথা এসব বেদুইনরা বেশি বেশি খায়, তাই তাদের পেট বড় হয়। তারা খাদ্যলোভী, তাই সব সময় খাবারকে ঘিরেই তাদের যত চিন্তা। এত মিথ্যুক তথা তারা কেবল মিথ্যা কথাই বলে বেড়ায়। এত ভীতু তথা শত্রুদের সামনে তারা ভীত থাকে। শত্রুদের সাথে লড়াই না করে তাদের সামনে থেকে পালায়। আদতে এসব দোষ পূর্ণরূপে মুনাফিকদের মাঝে পাওয়া যায়, মুমিনদের মধ্যে নয়। ইবনে উসাইমিন কৃত শারহু রিয়াজিস সালিহিন ২/১০১।
৫৪৫. অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, আমরা তো সফরের ক্লান্তি দূর করছিলাম কিছু কৌতুক করে।
৫৪৬. তাফসিরুত তাবারি: ১৬৯১২।
৫৪৭. সুরা আত-তাওবা, ৯: ৬৫-৬৬।
৫৪৮. সহিহুল বুখারি: ৪৮৮২।