📄 তাদের উদ্দেশ্যে করে সূরা মুনাফিকুন তিলাওয়াত করতেন
মুনাফিকদের ভর্ৎসনা ও তাওবার প্রতি তাদের উৎসাহিত করতে প্রতি জুমআর সালাতে সুরা মুনাফিকুন তিলাওয়াত করতেন।
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমআর দিন ফজরের সালাতে الم) - تَنزِيلُ الْكِتَابِ لَا رَيْبَ فِيهِ مِن رَّبِّ الْعَالَمِينَ) ও ( هَلْ أَتَى عَلَى الْإِنْسَانِ حِينٌ مِنَ الدَّهْرِ لَمْ يَكُن شَيْئًا مَّذْكُورًا) তিলাওয়াত করতেন। আর জুমআর সালাতে সুরা জুমুআ ও সুরা মুনাফিকুন তিলাওয়াত করতেন। '৫১৮
হাদিসের ব্যাখ্যা
ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আলিমগণ বলেন, সুরা জমুআ পড়ার পেছনে হিকমত হচ্ছে, এ সুরাটিতে জুমআর ওয়াজিব করণীয়সহ অন্যান্য বিধান বর্ণিত হয়েছে। এ ছাড়াও বিবিধ নিয়মনীতি বর্ণিত হয়েছে। তাওয়াক্কুল, জিকিরসহ নানা বিষয়ে উৎসাহিত করা হয়েছে।'
অন্যদিকে সুরা মুনাফিকুন তিলাওয়াত করতেন উপস্থিত লোকদের সাবধান করার জন্য, তাওবা করার প্রতি উৎসাহিত করার জন্য, এ ছাড়াও বিবিধ নিয়মনীতি জানানোর জন্য। কারণ, এ দিনই মসজিদে বেশি সংখ্যক মানুষ একত্রিত হতেন। '৫১৯
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদিও ইবনে উবাইকে ক্ষমা করে দিতেন, তার সাথে কোমল আচরণ করতেন, তার দেওয়া প্রতিটি কষ্টে ধৈর্য ধরতেন, পরিশেষে ইবনে উবাইয়ের কটু আচরণের শিকার হলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-পরিবারের অন্যতম একজন সদস্য। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মুনাফিকের সাথে আচরণে কঠোরতা করলেন এবং তার বিরুদ্ধে সাহায্য চাইলেন।
গাজওয়ায়ে বনি মুসতালিকের সময় মুনাফিকরা দুটি ষড়যন্ত্র করে। প্রথমটি ব্যর্থ হয়ে যায়। এরপর তারা জাহিলি যুগের নিকৃষ্ট গোত্রপ্রীতি ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য এক ঘোর ষড়যন্ত্র করে। মুনাফিকরা এবার আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর বিরুদ্ধে অপবাদ আনল। এটাকে কুরআনে 'ইফক' (অপকর্মের অপবাদ) বলা হয়েছে। এ ষড়যন্ত্রের মূলভাগে ছিল মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুল। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ جَاءُوا بِالْإِفْكِ عُصْبَةٌ مِّنكُمْ لَا تَحْسَبُوهُ شَرًّا لَّكُم بَلْ هُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُم مَّا اكْتَسَبَ مِنَ الْإِثْمِ، وَالَّذِي تَوَلَّى كِبْرَهُ مِنْهُمْ لَهُ عَذَابٌ عَظِيمٌ
'যারা এ অপবাদ উত্থাপন করেছে, তারা তোমাদেরই একটি দল। এটাকে তোমাদের জন্য ক্ষতিকর মনে কোরো না; বরং তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। তাদের প্রত্যেকের জন্য আছে প্রতিফল যতটুকু পাপ সে করেছে। আর এ ব্যাপারে যে নেতৃত্ব দিয়েছে, তার জন্য আছে মহাশাস্তি। '৫২০
ইফকের ঘটনায় প্রথম ইবনে সালুলই মুখ খোলে। লোকদের কাছে বলে বেড়ায়। তার মতাদর্শের মানুষগুলোকে একত্র করে তাদের কাছে বলে। প্রচার করতে থাকে। নিজের সাঙ্গোপাঙ্গোদের কাছে বারবার এটি তুলে ধরে।
তারা যখন এ কথাটি রটিয়ে দিতে সক্ষম হয়, তখন কিছু মুমিনের ওপরও প্রভাব ফেলে এটি। এ সকল মুমিনদের পদস্খলন ঘটে। তারাও মুনাফিকদের মতো বিষয়টি বলতে থাকে। যাচাই-বাছাই ছাড়াই এবং ইবনে উবাইয়ের কূটকৌশল না বুঝেই কয়েকজন মুমিন এ মারাত্মক গুনাহে জড়িত হয়ে পড়ে।
বিষয়টি একসময় গুরুতর রূপ ধারণ করতে শুরু করে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলমানগণ বেশ কষ্ট অনুভব করতে লাগলেন। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখলেন। বললেন, 'কে আমাকে সাহায্য করবে এমন এক লোকের বিরুদ্ধে, যে কষ্ট দিতে দিতে এবার আমার পরিবার নিয়েও আমাকে কষ্টে ফেলে দিয়েছে। আল্লাহর কসম, আমি আমার পরিবারের ব্যাপারে উত্তম বৈ মন্দ কিছু জানি না। তারা এমন এক ব্যক্তিকে জড়িয়ে বলছে, যার ব্যাপারে উত্তম বৈ মন্দ কিছু জানি না আমি। সে আমার পরিবারের কাছে আমার সাথেই আসত।'
আওস গোত্রের সাদ বিন মুআজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) দাঁড়িয়ে বললেন, 'আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর শপথ, আমি আপনাকে সাহায্য করব তার বিরুদ্ধে। যদি সে আওস গোত্রের কেউ হয়, তবে আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেবো। আর যদি সে খাজরাজ গোত্রের আমাদের ভাইদের কেউ হয়, তবে আপনি যেভাবে আদেশ দেন, সেভাবেই আমরা পালন করব।'
আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'খাজরাজ গোত্রের নেতা সাদ বিন উবাদা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-তিনি সজ্জন ব্যক্তি ছিলেন, কিন্তু তার গোত্রপ্রীতি তাকে মূর্খামিতে উদ্যত করেছে-তখন দাঁড়িয়ে গেলেন। সাদ বিন মুআজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর উদ্দেশে বললেন, “আল্লাহর শপথ, তুমি মিথ্যে বলছ। তুমি তাকে হত্যা করবে না। তুমি তাকে হত্যা করতে পারবে না।” এবার সাদ বিন মুআজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর চাচাতো ভাই উসাইদ বিন হুজাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) দাঁড়িয়ে সাদ বিন উবাদাকে বললেন, "আল্লাহর শপথ, তুমি মিথ্যা বলছ। আমরা অবশ্যই তাকে হত্যা করব। তুমি একজন মুনাফিক, আরেকজন মুনাফিকের পক্ষে তর্ক করছ।"
আওস ও খাজরাজ একে অপরের বিরুদ্ধে উত্তেজিত হয়ে উঠল। এমনকি তাদের ঝগড়া যুদ্ধের ইচ্ছে পর্যন্ত গড়াল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখনো মিম্বরের ওপর। তিনি নেমে এসে তাদের শান্ত করলেন। তারাও চুপ হয়ে গেলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও আর কিছু বললেন না। '৫২১
হাদিস থেকে শিক্ষা
* বাতিলদের প্রতি পক্ষপাতিত্বের ফলে একজন ব্যক্তি মন্দ নামে ভূষিত হতে পারে।
* ঝগড়া হলে তা থামিয়ে দিতে হবে। ফিতনার আগুন নির্বাপণ করতে হবে। ফিতনার মাধ্যম ও কারণগুলো প্রতিহত করতে হবে।
টিকাঃ
৫১৮. সহিহু মুসলিম: ৮৭৯।
৫১৯. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৬/১৬৭।
৫২০. সুরা আন-নুর, ২৪: ১১।
৫২১. সহিহুল বুখারি: ২৬৬১, সহিহু মুসলিম: ২৭৭০।
📄 একদল মুনাফিক তাবুক যুদ্ধে না যাওয়ার অনুমতি চাইল
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুক যুদ্ধের প্রস্তুতি সম্পন্ন করলে একদল মুনাফিক জিহাদে না যাওয়ার জন্য অনুমতি চাইল। সময়টা ছিল নবম হিজরির রজব মাস। এ সময়ে সফর করা কষ্টকর ছিল, তখন চারদিকে খরাও ছিল প্রবল। সময়টা ছিল ফল পাকার। মানুষ এ সময়টা তাদের নতুন তোলা ফলের মাঝে, রৌদ্র ছেড়ে ছায়ায় কাটাতে চাইছিল। তাদের দৃষ্টি থেকেই বোঝা যেত, এ অবস্থায় যুদ্ধযাত্রা করা মোটেই তাদের জন্য সুখকর নয়।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোনো যুদ্ধে বের হতেন, তখন কোন স্থানে যুদ্ধ করবেন, কোন দিকে যুদ্ধ করবেন যাবতীয় বিষয় গোপন রাখতেন। দেখাতেন একটা, কিন্তু করতেন ভিন্নটা। যেমন যদি তিনি পূর্ব দিকে কোথাও যুদ্ধে যাওয়ার মনস্থ করতেন, তখন পশ্চিম দিকের বিভিন্ন বিষয় জিজ্ঞেস করতেন। সফরের জন্য প্রস্তুতি নিতেন। সকলে মনে করত তিনি পশ্চিম দিকেই যাত্রা করবেন। ৫২৩ কিন্তু তাবুক যুদ্ধের সময় তিনি স্পষ্ট সবকিছু উল্লেখ করে দিলেন। কারণ, একে তো দূরত্ব বেশি ছিল, তার ওপর সময়টা বেশ কষ্টকর ছিল।
অনেক মুনাফিক এসে যুদ্ধে না যাওয়ার জন্য সামান্য সামান্য ওজর দিতে লাগল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ওজর কবুল করলেন, তাদের অব্যাহতি দিলেন।
অব্যাহতি যারা চেয়েছিল, আব্দুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুল ও জাদ বিন কাইস তাদের অন্যতম। মুনাফিকরা পরস্পর বলতে লাগল, তোমরা এ গরমে বের হোয়ো না। আল্লাহ তাআলা তাদের এ গোপন সলা-পরামর্শের কথা ফাঁস করে দিলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের একাংশকে অনুমতি দিয়েছিলেন, সে জন্য আল্লাহ তাঁর নবিকে তিরস্কার করলেন:
فَرِحَ الْمُخَلَّفُونَ بِمَقْعَدِهِمْ خِلَافَ رَسُولِ اللَّهِ وَكَرِهُوا أَن يُجَاهِدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَقَالُوا لَا تَنفِرُوا فِي الْحَرِّءِ قُلْ نَارُ جَهَنَّمَ أَشَدُّ حَرًّا لَّوْ كَانُوا يَفْقَهُونَ - فَلْيَضْحَكُوا قَلِيلًا وَلْيَبْكُوا كَثِيرًا جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
'পেছনে থেকে যাওয়া লোকেরা আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বসে থাকতে পেরে আনন্দ লাভ করেছে, আর জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর রাহে জিহাদ করতে অপছন্দ করেছে এবং বলেছে, "এই গরমের মধ্যে অভিযানে বের হোয়ো না।" বলে দাও, "উত্তাপে জাহান্নামের আগুন প্রচণ্ডতম; যদি তাদের বিবেচনা শক্তি থাকত।" অতএব, তারা (দুনিয়ায়) সামান্য হেসে নিক। অতঃপর তারা (আখিরাতে) প্রচুর কাঁদবে সেসব কাজের বিনিময়ে, যা তারা অর্জন করেছিল।"৫২৪
لَوْ كَانَ عَرَضًا قَرِيبًا وَسَفَرًا قَاصِدًا لَّا تَّبَعُوكَ وَلَكِن بَعُدَتْ عَلَيْهِمُ الشُّقَّةُ ، وَسَيَحْلِفُونَ بِاللهِ لَوِ اسْتَطَعْنَا لَخَرَجْنَا مَعَكُمْ يُهْلِكُونَ أَنفُسَهُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ
'দুনিয়াবি কোনো স্বার্থ থাকলে আর যাত্রা সহজ হলে তারা অবশ্যই তোমার সাথে যেত। কিন্তু পথ তাদের কাছে দীর্ঘ ও ভারী মনে হয়েছে। অচিরেই তারা আল্লাহর নামে শপথ করে বলবে, "আমরা যদি পারতাম, তাহলে অবশ্যই তোমাদের সঙ্গে বের হতাম।" আসলে তারা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করছে। আর আল্লাহ জানেন যে, তারা অবশ্যই মিথ্যাবাদী। '৫২৫
'আমরা যদি পারতাম, তাহলে অবশ্যই তোমাদের সঙ্গে বের হতাম।' অর্থাৎ অচিরেই তারা শপথ করে করে বলবে যে, থেকে যাওয়ার পেছনে তাদের অনেক ওজর ছিল। তারা সেসব ডিঙিয়ে যুদ্ধ যাত্রা করতে সক্ষম ছিল না।
'আসলে তারা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করছে'-জিহাদ না করে বসে থেকে, মিথ্যা বলে ও অবাস্তব কথা বলে তারা নিজেরা নিজেদের ধ্বংস করছে।
এরপর আল্লাহ তাআলা তাঁর নবিকে তিরস্কার করে বলেন:
عَفَا اللَّهُ عَنكَ لِمَ أَذِنتَ لَهُمْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَتَعْلَمَ الْكَاذِبِينَ
'আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করেছেন। কারা সত্য বলেছে, তা স্পষ্ট না হতেই আর মিথ্যাবাদীদের তুমি না চিনেই কেন তাদের অব্যাহতি দিয়ে দিলে! '৫২৬
অর্থাৎ জিহাদ থেকে পেছনে থেকে যাওয়ার অনুমতি তাদের দিয়েছিলে তুমি, সে জন্য আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। তাদের মাঝে যে সত্য বলছে, তার সত্য ওজর আছে না আছে, এসব পরীক্ষা না করেই তুমি তাদের অব্যাহতি দিয়ে দিলে! ৫২৭
তারা অব্যাহতির অনুমতি চাওয়ার সাথে সাথে কেন তুমি তাদের অনুমতি দিয়ে দিলে! যদি তুমি তাদের কাউকে অনুমতি না দিতে, তখন জানতে পারতে তাদের মাঝে সত্যিকারার্থে তোমার অনুসারী কে আর কে নয়। কারণ, তারা এর আগেও জিহাদে না গিয়ে বসে থেকেছে অনুমতি নেওয়া ছাড়াই। ৫২৮
টিকাঃ
৫২২. ফাতহুল বারি: ৮/৪৮০।
৫২৩. ফাতহুল বারি: ৬/১৫৯। ঈষৎ পরিমার্জিত।
৫২৪. সুরা আত-তাওবা, ৯: ৮১-৮২।
৫২৫. সুরা আত-তাওবা, ৯: ৪২।
৫২৬. সুরা আত-তাওba, ৯: ৪৩।
৫২৭. তাফসিরুস সাদি: ১/৩৩৮।
৫২৮. তাফসিরু ইবনি কাসির: ৪/১৩৯।
📄 তাবুক থেকে ফেরার পথে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে ব্যর্থ হত্যাচেষ্টা
তাবুক অভিযানে অংশগ্রহণকারী কিছু মুনাফিক যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হত্যাচেষ্টা করলেও আল্লাহ তাঁর নবিকে রক্ষা করেছেন।
পনেরোজন লোক এ কথায় একমত হলো, তারা রাতের বেলা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাহনকে পাহাড়ি পথে নিয়ে যাবে। তারা সেখানেই তাদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করবে।
আবু তুফাইল (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'তাবুক অভিযান থেকে ফেরার পথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন ঘোষণাকারীকে আদেশ দিলে সে ঘোষণা করল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আকাবার ৫২৯ পথ ধরে সামনে এগোবেন। অন্য কেউ যেন এ পথে না আসে।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে পথে এগোলেন। পেছনে ছিলেন হুজাইফা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)। আর আম্মার (রাদিয়াল্লাহু আনহু) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাহন সামনে থেকে টেনে নিচ্ছিলেন। এ সময় হঠাৎ করে একদল মুখোশপরা অশ্বারোহীদল কোথা থেকে যেন উঠে এল। তারা আম্মার (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে ঘিরে ধরল। আম্মার (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাদের সওয়ারিগুলোর মুখের ওপর অনবরত আঘাত করতে থাকলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুজাইফা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে বললেন, "যথেষ্ট হয়েছে। যথেষ্ট হয়েছে।" একসময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহন থেকে নেমে এলেন। ততক্ষণে আম্মার (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-ও ফিরে এসেছেন। রাসulullah সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আম্মার (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে বললেন, "আম্মার, তুমি কি জানো এরা কারা?"
"এরা মুখোশ পরে এলেও তাদের অধিকাংশ বাহন আমার চেনা।" উত্তর দিলেন আম্মার (রাদিয়াল্লাহু আনহু)।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি কি জানো, তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল?"
আম্মার (রাদিয়াল্লাহু আনহু) উত্তর দিলেন, "আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিক জ্ঞাত।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তারা আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিয়ে পালিয়ে গিয়ে তাকে হত্যা করতে চাইছিল।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে লোকদের থেকে তিনজনের ওজর কবুল করলেন। তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, "আল্লাহর কসম, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘোষণাকারীর ঘোষণা শুনিনি। আর আমরা জানিও না, এ দলটা কী উদ্দেশ্যে এসেছিল।"
আম্মার (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তখন বললেন, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, বাকি বারোজন দুনিয়ার জীবনে এবং সাক্ষ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দিন আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করল।"৫৩০
এ মুনাফিকগুলোর ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা নাজিল করেন: وَهَمُّوا بِمَا لَمْ يَنَالُوا
'তারা ষড়যন্ত্র করেছিল কিন্তু তাতে সফল হয়নি।'৫৩১
ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
'এ হাদিসে বর্ণিত আকাবা অঞ্চল মিনা প্রান্তরের প্রসিদ্ধ সে আকাবা নয়, যেখানে আনসার সাহাবিদের বাইআত সংঘটিত হয়েছিল। এ আকাবাটি তাবুকের পথে অবস্থিত। মুনাফিকরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হত্যা করার জন্য এ স্থানে একত্রিত হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তাদের ষড়যন্ত্র থেকে তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে রক্ষা করলেন। '৫৩২
ইমাম ইবনে আসির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
'কিছু মূর্খ বলে, হাদিসে উল্লিখিত এ আকাবাটি হচ্ছে সে-ই আকাবা, ইসলামের প্রথম যুগে যেখানে বাইআত নেওয়া হয়েছিল। এসব মূর্খদের মতে বাইআত প্রদানকারীদের মধ্য থেকেই একদল মুখোশ পরে এসেছিল আক্রমণের উদ্দেশ্যে।
কিন্তু এমনটা মোটেই নয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুক অভিযান থেকে ফেরার পথে এ আকাবাটিতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে ঘোষণাকারী বলেছিল, কেউ যেন আকাবায় আবির্ভূত না হয়। যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আকাবার পথ ধরে চলছিলেন, তখন মুখোশ পরে উপস্থিত হয় মুনাফিকদের এ দলটি। যেন তাদের কেউ না চিনতে পারে। তারা নিশ্চয়ই গুরুতর কোনো মন্দের ইচ্ছে নিয়েই এসেছিল। কিন্তু আল্লাহ তাদের সফল হতে দেননি। '৫৩৩
টিকাঃ
৫২৯. আকাবা দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, পাহাড়ের পথ।
৫৩০. মুসনাদু আহমাদ: ২৩২৮০। হাইসামি কৃত মাজমাউজ জাওয়ায়িদ: ৬/১৯৫; তার সনদের বর্ণনাকারী সহিহ হাদিসের বর্ণনাকারী। শাইখ শুআইব আরনাউত বলেন, ইমাম মুসলিমের শর্তানুযায়ী তার সনদটি শক্তিশালী। এ ঘটনার সারাংশ সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। দেখুন, সহিহু মুসলিম: ২৭৭৯।
৫৩১. সুরা আত-তাওবা: ৭৪।
৫৩২. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৭/১২৬।
৫৩৩. জামিউল উসুল মিন আহাদিসির রাসুল: ১/৯৩০৬।
📄 মুনাফিকদের ভীতি প্রদর্শন করতেন
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো মুখোশধারী এ মুনাফিক দলটিকে ভীতি প্রদর্শন করতেন। হুজাইফা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "আমার সাহাবিদের মাঝে বারোজন মুনাফিক আছে। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। জান্নাতের ঘ্রাণও তারা পাবে না। এদের জন্য জান্নাতে প্রবেশ করা এতটাই অসম্ভব, যেমন সুচের ছিদ্র দিয়ে উট প্রবেশ করা অসম্ভব। তাদের আটজনের জন্য দুবাইলাহ-ই যথেষ্ট হবে। দুবাইলাহ হচ্ছে একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। এটি তাদের কাঁধে উত্থিত হয়ে তাদের বুকের ভেতর ছড়িয়ে পড়বে। এরপর তাদের মৃত্যু হবে।"৫৩৪
'আমার সাহাবিদের মাঝে'- অর্থাৎ তারা আমার সাহাবি বেশে তাদের মাঝে লুকিয়ে আছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা আমার সাহাবিদের মধ্যে পরিগণিত নয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمِمَّنْ حَوْلَكُم مِّنَ الْأَعْرَابِ مُنَافِقُونَ وَمِنْ أَهْلِ الْمَدِينَةِ مَرَدُوا عَلَى النِّفَاقِ لَا تَعْلَمُهُمْ نَحْنُ نَعْلَمُهُمْ : سَنُعَذِّبُهُم مَّرَّتَيْنِ ثُمَّ يُرَدُّونَ إِلَى عَذَابٍ عَظِيمٍ
'তোমাদের চারপাশে কতক বেদুইন হলো মুনাফিক। আর মদিনাবাসীদের কেউ কেউ নিফাকিতে অনঢ়। তুমি তাদের চেনো না, আমি তাদের চিনি। আমি তাদের দ্বিগুণ শাস্তি দেবো, (ক্ষুধা বা নিহত হওয়া এবং কবরের শাস্তি)। অতঃপর তাদের মহাশাস্তির দিকে ফিরিয়ে আনা হবে। '৫৩৫
এসব লোক আমার সাহাবিদের বেশ ধরে আছে। বাহ্যিকভাবে তারা আমার সাহাবি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তারা আমার বিপক্ষে।
'বারোজন মুনাফিক'-এরা সেসব লোক, যারা মুখোশ পরে এসেছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এ কথার মাধ্যমে আকাবার রাতে ঘটা সে ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। যেখানে আল্লাহ তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে রক্ষা করেছেন এবং তাকে সেসব আক্রমণকারীর নাম জানিয়ে দিয়েছেন। '৫৩৬
'তাদের জন্য যথেষ্ট হবে'- অর্থাৎ তাদের অনিষ্টতা প্রতিহত করবে।
'এটি তাদের কাঁধে উত্থিত হবে'- অর্থাৎ তাদের কাঁধে গরম ফোঁড়া উঠবে। এ থেকে যে উত্তাপ বের হবে, তার তাপ তাদের বুকে ছড়িয়ে পড়বে। ফোঁড়াটিকে আগুনের বাতির সাথে তুলনা দেওয়া হয়েছে এ হাদিসে। যার অর্থ হচ্ছে, আগুনের শিখা। ৫৩৭
টিকাঃ
৫৩৪. সহিহু মুসলিম: ২৭৭৯।
৫৩৫. সুরা আত-তাওবা, ৯: ১০১।
৫৩৬. ফাইজুল কাদির: ৪/৪৫৪।
৫৩৭. মিরকাতুল মাফাতিহ: ৯/৩৮১৬।