📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ দ্বীনের স্বার্থে মুনাফিকদের হত্যা করেননি
ইসলামের স্বার্থে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুনাফিকদের হত্যা করা থেকে বিরত থেকেছেন। মুনাফিকরা মুসলিমদের ভেতরেই আনাগোনা করত। মসজিদে নববিতে সালাত পড়ত। মুসলমানদের সাথে সুন্দর আচার-ব্যবহার করত। কিন্তু পরস্পর মিলিত হয়ে মুসলিমদের নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ থেকে শুরু করে মারাত্মক সব ষড়যন্ত্র করত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতেন, তার সামনে হেঁটে যাওয়া এ আব্দুল্লাহ বিন উবাই মুনাফিক। ইবনে উবাইয়ের এ সঙ্গীটি মুনাফিক, ওই সঙ্গীটিও মুনাফিক। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুনাফিকদের সকল দুরভিসন্ধি সম্পর্কেও ছিলেন সম্যক অবগত। কিন্তু তার পরেও দাওয়াতি কল্যাণের স্বার্থে তিনি মুনাফিকদের হত্যা করতেন না, হত্যা করার আদেশও দিতেন না।
জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আমরা একটি অভিযানে ছিলাম। ৫০০ মুহাজিরদের একজন এক আনসারিকে কৌতুকবশত আঘাত করলেন। কিন্তু আনসারি সাহাবি বিরূপভাবে নিল বিষয়টি। মুহাজির সাহাবির বিরুদ্ধে নিজ গোত্রের লোকদের সাহায্য কামনায় ডাক দিয়ে বললেন, "ওহে আনসার!" এদিকে মুহাজির সাহাবিও নিজ গোত্রের লোকদের ডাক দিয়ে বললেন, “ওহে মুহাজিরগণ!"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের আওয়াজ শুনে বললেন, "জাহিলি যুগের ডাকাডাকি কেন?"
সাহাবিগণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানালেন, "হে আল্লাহর রাসুল, এক মুহাজির একজন আনসারিকে কৌতুকবশত কোমরে আঘাত করেছেন।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এ রকম আহ্বান তোমরা ত্যাগ করো। এগুলো জঘন্য ও ঘৃণ্য।"৫০১
ইবনে উবাইয়ের কথা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে পৌঁছাল। তখন উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) দাঁড়িয়ে বললেন, “আল্লাহর রাসুল, আমাকে অনুমতি দিন, আমি এ মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দিই।"
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, "ছেড়ে দাও। নয়তো পরে মানুষরা বলবে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের সাথিদের হত্যা করে।"৫০২
ইমাম ইবনে ইসহাক (রাহিমাহুল্লাহ) আরও যোগ করেন, 'এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "না; বরং সৈন্যদের সামনে চলার ঘোষণা দাও।" যদিও তখন চলার উপযুক্ত সময় ছিল না, তবুও মুসলিম সেনাদল সামনে এগিয়ে চলল। '৫০৩
উসাইদ বিন হুজাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলেন। তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ঘটনা জানালেন। উসাইদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনিই হচ্ছেন সম্মানিত, আর সে হচ্ছে নিচু লোক।'
ইবনে উবাইয়ের পুত্রের নাম আব্দুল্লাহ। তিনি নিজ পিতার এমন কাণ্ডের কথা শুনতে পেয়ে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলেন। বললেন, 'আমি জানতে পেরেছি, আপনি আমার বাবাকে নিহত দেখতে চান। যদি তা-ই সত্যি হয়, তবে আমাকে আদেশ দিন। আমিই তার মাথা আপনার সামনে এনে হাজির করি।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, 'বরং আমরা তার সাথে সদয় ব্যবহার করব এবং তার সাথে সদ্ভাব বজায় রাখব, যতদিন সে আমাদের সাথে এ দুনিয়াতে থাকে। '৫০৪
অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, 'এরপর ইবনে উবাইয়ের উদ্দেশে তার পুত্র বললেন, 'আল্লাহর কসম, আপনি ততক্ষণ পর্যন্ত মদিনায় ফিরে যেতে পারবেন না, যতক্ষণ না স্বীকার করেন যে, আপনি হচ্ছেন নিচু আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন সম্মানিত। অবশেষে ইবনে উবাই তা-ই স্বীকার করল। '৫০৫
ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এ হাদিসটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহিষ্ণুতার অনুপম নিদর্শন বহন করে।'
যখন বড় কোনো ক্ষতি প্রতিহত করতে গিয়ে কোনো প্রশংসনীয় কাজ ত্যাগ করতে হয় কিংবা ছোট কোনো ক্ষতি স্বীকার করে নিতে হয়, তখন তা-ই করতে হবে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষদের সাথে আকৃষ্টময় আচরণ করতেন। বেদুইন ও মুনাফিকরা তাকে যে কষ্ট দিত, তার ওপর তিনি ধৈর্যধারণ করতেন; যাতে মুসলিমদের দাপট বিরাজমান থাকে। ইসলামের দাওয়াত পূর্ণতায় পৌঁছে, যারা ইসলাম গ্রহণ করার মতো অবস্থায় আছে, তাদের অন্তর যেন ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়, অন্যরাও যেন ইসলামের প্রতি আগ্রহী হয়। মানুষকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের অর্থ দিয়েও সাহায্য করতেন।
এ কারণেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুনাফিকদের হত্যা করেননি। তারা ওপরে ওপরে নিজেদের মুসলিম হিসেবে জাহির করত। আর শরিয়ত আদেশ দিয়েছে মানুষের বাহ্যিকতা দেখে তার বিচার করতে এবং মানুষের অভ্যন্তরীণ বিষয়াদি আল্লাহর কাছে সোপর্দ করতে। এ সকল মুনাফিককেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবিদের মাঝে গণনা করা হতো। মুনাফিকরাও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে যুদ্ধ করত। যদিও তাদের কারও উদ্দেশ্য থাকত দেশপ্রেম, জাতীয়তার চেতনা ও দুনিয়া অর্জন। '৫০৬
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'অনিষ্টতার পথ রুদ্ধ করার তৃতীয় দলিল: মদিনার মুনাফিকদের হত্যা করাই ছিল কল্যাণকর। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের হত্যা করেননি। কারণ, হত্যা করলে মানুষ বলত, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ সাথিদের হত্যা করে। এর ফলে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে, তারা ইসলামের প্রতি বিরূপ ধারণা পোষণ করবে। যারা মুসলিম হয়নি, তারা এর কারণে ইসলাম থেকে দূরে সরে যাবে। আর এমন বিরূপতা সৃষ্টি করা হারাম। '৫০৭
টিকাঃ
৫০০. যুদ্ধটি ছিল বনু মুসতালিকের যুদ্ধ।
৫০১. আব্দুর রাজ্জাক (রাহিমাহুল্লাহ)-এর বর্ণনায় এসেছে, তিনি মা'মার বিন কাতাদা (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে মুরসাল সনদে বর্ণনা করেন, '... সকল মুনাফিক এরপর আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের কাছে ছুটল। তাকে বলল, তিনি আশা করেছিলেন তুমি তাদের ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু তুমি তো তাদের কোনো ক্ষতি-উপকার কিছুই করতে পারলে না। তখন ইবনে উবাই বলল, মদিনাতে ফিরে গেলে আমরা সম্মানিতরা সেখান থেকে নিচু লোকদের বের করে দেবো।' সনদ মুরসাল জাইয়িদ। ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ)-ও এমনই বলেছেন। দেখুন, ফাতহুল বারি: ৮/৬৪৯। ইমাম ইবনে ইসহাক (রাহিমাহুল্লাহ)-এর বর্ণনায় এসেছে, 'ইবনে উবাই তার সাঙ্গোপাঙ্গোদের প্রত্যুত্তরে বলল, তারা (মুহাজিররা) এমন করেছে? আমাদের দেশে থেকে তারা আমাদের বিরোধিতায় লিপ্ত? আমরা ও এসব কুরাইশ বণিকদের উদাহরণ এমন, যেমন নাকি প্রবাদে বলা হয়, سمن كلبك يأكلك দুধ কলা খাইয়ে কাল সাপ পোষা।।' আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ ৪/৩৫৯।
৫০২. সহিহুল বুখারি: ৩৫১৮, সহিহু মুসলিম: ২৫৮৩।
৫০৩. অস্বাভাবিক সময়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অগ্রসর হওয়ার আদেশ দেওয়ার পেছনের হিকমতটি পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। আর সেটা হচ্ছে, দুই সাহাবির মাঝে ঝগড়া ও ইবনে উবাইয়ের এমন স্পর্ধাজনক মন্তব্য যদি তখন মুসলিম শিবিরে ছড়িয়ে পড়ত, তবে তা সৈন্যদের আসল চিন্তায় ব্যাঘাত ঘটাত। মুসলিম সৈন্যদের মাঝে তখন বিতর্কের সৃষ্টি হতো। এমনটা মোটেও শোভনীয় নয়। এ জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামনে অগ্রসর হওয়ার আদেশ দিয়েছিলেন। মুসলিমগণ একদিন-একরাত হাঁটার পর তারা বেশ ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। দীর্ঘ ক্লান্তির সফর শেষে একটু বিশ্রামের সুযোগ হয়েছিল তাদের। তাই গভীরভাবে ঘুমিয়ে পড়েন তারা। ফলে তাদের মাঝে যে ফিতনা প্রসারের আশঙ্কা ছিল তা দমে যায়। মারবিয়্যাতু গাজওয়াতি বনি মুসতালিক: ১/১৯০।
৫০৪. ইবনু হিশাম কৃত আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ: ২/২৯১।
৫০৫. সুনানুত তিরমিজি: ১৫৮২।
৫০৬. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৬/১৩৯।
৫০৭. ইকামাতুদ দলিল আলা ইবতালিত তাহলিল: ৩/৪৭১।
📄 মুনাফিকদের ওপর ইসলামের প্রকাশ্য হুকুমগুলো প্রয়োগ করতেন
মুনাফিকদের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আচরণনীতি ছিল-যতক্ষণ তারা ইসলাম প্রকাশ করত, ততক্ষণ তাদের ওপর ইসলামের প্রকাশ্য হুকুমগুলো প্রয়োগ করতেন।
দুনিয়ার বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন মুসলিমের সাথে যেমন আচরণ করতেন, একই রকম আচরণ করতেন মুনাফিকদের সাথে। প্রকাশ্য বিধানগুলোর ক্ষেত্রে মুসলিম ও মুনাফিকের মাঝে পার্থক্য করতেন না তিনি।
ইমাম শাফিয়ি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'কুফরিতে থাকার পর যে ব্যক্তি ইমানের বহিঃপ্রকাশ করল, তার জন্য একজন মুসলিমের বিধিবিধান প্রযোজ্য হবে। যেমন: ওয়ারিশ হওয়া, বিয়ে করা ইত্যাদি।'৫০৮
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'কেউ বাহ্যিকভাবে ইমান গ্রহণ করলেই পার্থিব জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট ইসলামের হুকুমগুলো প্রযোজ্য হয়ে থাকে। পার্থিব জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট ইসলামের হুকুমগুলো প্রযোজ্য হওয়ার জন্য কারও আন্তরিক ইমান জরুরি নয়। বাহ্যিকভাবে ইমান আনলেই দুনিয়াসংক্রান্ত বিধানগুলো তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। কিন্তু আখিরাতের সৌভাগ্য অর্জন করতে হলে আন্তরিক ইমান অত্যাবশ্যক।'
মুনাফিকরা বলত, আমরা আল্লাহর প্রতি ইমান এনেছি, ইমান এনেছি আখিরাতের ওপর; অথচ আদতে তারা মুমিন ছিল না। তারা যদিও বাহ্যিকভাবে মুসলিমদের মতো চলাফেরা করত, সাহাবিদের সাথে সালাত পড়ত, রোজা রাখত, হজ করত, জিহাদও করত। মুসলিমরাও তাদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক বজায় রাখতেন, একে অপরের ওয়ারিশ হতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগের মুনাফিকদের ক্ষেত্রে এমনটাই দেখা গেছে।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসব মুনাফিকদের ক্ষেত্রে কাফিরদের বিধান আরোপ করেননি। না তাদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক নিষিদ্ধ করেছেন, আর না ওয়ারিশ হওয়ার মতো প্রভৃতি বিধান তাদের ক্ষেত্রে হারাম করেছেন।
এমনকি যখন সবচেয়ে প্রসিদ্ধ মুনাফিক আব্দুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুল মারা গেল তার ছেলে আব্দুল্লাহ তার ওয়ারিশ হলেন। ছেলে আব্দুল্লাহ ছিলেন উত্তম মুমিনদের একজন। এমনিভাবে মুনাফিকদের মধ্য থেকে যে-ই মারা যেত, অন্যরা তার ওয়ারিশ হতো। আবার যখন কোনো মুনাফিকের মুসলিম কোনো আত্মীয় মারা যেতেন, অন্যান্য মুসলিমের সাথে সে মুনাফিকও তার ওয়ারিশ হতো। যদিও অজানা ছিল না যে, এ লোকটি একটা মুনাফিক। যদিও আখিরাতের জীবনে জাহান্নামের নিম্নস্তর তাদের জন্য অবধারিত ছিল, তবুও তারা মুমিনদের ওয়ারিশ হতো, মুমিনরাও তাদের ওয়ারিশ হতেন। এ ছাড়াও অন্যান্য হক ও হদের ক্ষেত্রে তারা মুসলিমদের মতোই বিবেচ্য হতো। '৫০৯
যতদিন এসব মুনাফিকের মাঝে কুফর বা নিফাকের স্পষ্ট আলামত পাওয়া না যেত, ততদিন তাদের সাথে মুসলিমদের মতো আচরণ করা হতো। যদি তাদের কারও মাঝে কুফর বা নিফাকের কোনো আলামত স্পষ্ট পাওয়া যেত এবং তা কুফর বা নিফাক বলে সাব্যস্ত হতো, তবে তখন তাদের সাথে কাফিরদের প্রতি আচরণ করার ন্যায় আচরণ করা হতো। তাদের ওপর রিদ্দার হদ কায়িম করা হতো।
আমাদের বর্তমান সময়ে অনেকের মাঝে স্পষ্ট নিফাক দেখা যায়। অনেক মানুষরূপী শয়তানের মাঝে স্পষ্ট কুফরি দেখা যায়। তারা তো হত্যার উপযুক্ত। কিন্তু একটি ভুল মানুষের মাঝে প্রচলন হয়ে গেছে। 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুনাফিকদের হত্যা করেননি' বলে তারা দলিল দেয় এবং মারাত্মক একটি ভুল করে বসে। এ ফাঁকে সেসব মুনাফিক ও মুরতাদ যা ইচ্ছে তা বলে যায় ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে।
দলিল দিতে গিয়ে ভুল করে বসা এসব লোক আসলে মুনাফিকদের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আচরণনীতি পূর্ণরূপে বুঝতে পারেননি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগের মুনাফিকরা নিজেদের নিফাকি গোপন রাখত। যদিও-বা কখনো সখনো মুখ ফসকে নিফাকিমূলক কিছু বের হয়ে যেত, তবুও তাদের ওপর স্পষ্ট প্রমাণ প্রতিষ্ঠা হতো না। কেননা, তারা সাথে সাথে অস্বীকার করত এবং মিথ্যা শপথ করত। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন:
اتَّخَذُوا أَيْمَانَهُمْ جُنَّةٌ
'তারা তাদের শপথসমূহকে ঢালরূপে ব্যবহার করে। '৫১০
অর্থাৎ তারা মিথ্যা শপথ করে নিজেদের প্রাণ বাঁচিয়ে নেয়।
يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ مَا قَالُوا وَلَقَدْ قَالُوا كَلِمَةَ الْكُفْرِ
'তারা আল্লাহর নামে শপথ করে বলছে যে, তারা কিছুই বলেনি; অথচ নিশ্চিতই তারা কুফরি কথা বলেছিল। '৫১১
টিকাঃ
৫০৮. কিতাবুল উম্ম: ৬/১৬৬।
৫০৯. মাজমুউল ফাতাওয়া: ৭/২০১। ঈষৎ পরিমার্জিত।
৫১০. সুরা আল-মুনাফিকুন, ৬৩: ২।
৫১১. সুরা আত-তাওবা, ৯: ৭৪।
📄 ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করতে তাদের ওজর ও শপথ গ্রহণ করতেন
জাইদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে আমরা এক যুদ্ধের সফরে বের হলাম। এ সফরে বেশ কষ্ট স্বীকার করতে হয়। আমি তখন আব্দুল্লাহ বিন উবাইকে তার সাথিদের উদ্দেশে বলতে শুনলাম, "তোমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গীদের জন্য ব্যয় করো না। এতে তারা তার আশপাশ থেকে চলে যাবে। আর মদিনায় ফিরে গেলে আমরা সম্মানিতরা হীন লোকদের বের করে দেবো।"
এ বিষয়টি আমি আমার চাচার ৫১২ কানে তুললাম। তিনি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ডাকলেন। আমি তাকে যেভাবে শুনেছি, সেভাবে বললাম। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্দুল্লাহ বিন উবাই ও তার সঙ্গীদের ডেকে পাঠালেন। কিন্তু তারা শপথ করে বলল যে, তারা এর কিছুই বলেনি। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সত্যায়ন করলেন এবং আমাকে অবিশ্বাস করলেন। প্রবল এক উদ্বেগ গ্রাস করল আমাকে। এমন উদ্বেগ-বিমর্ষতা ইতিপূর্বে কখনো আমি অনুভব করিনি। আমি বাড়িতে চলে এলাম। '৫০৩
আমার চাচা আমাকে বললেন, "তুমি কি এটাই চাইছিলে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাকে অবিশ্বাস করুক এবং তোমাকে ঘৃণা করুক!?"
তাদের কথায় আমার মনে প্রচণ্ড কষ্ট অনুভূত হলো। কষ্টটা ততক্ষণ ছিল, যতক্ষণ না আল্লাহ তাআলা সুরা মুনাফিকুন নাজিল করলেন:
إِذَا جَاءَكَ الْمُنَافِقُونَ قَالُوا نَشْهَدُ إِنَّكَ لَرَسُولُ اللَّهِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ إِنَّكَ لَرَسُولُهُ وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَكَاذِبُونَ
"মুনাফিকরা যখন তোমার নিকট আসে, তখন তারা বলে, "আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসুল।" আর আল্লাহ জানেন যে, তুমি নিশ্চয়ই তাঁর রাসুল এবং আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, মুনাফিকরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।"
هُمُ الَّذِينَ يَقُولُونَ لَا تُنفِقُوا عَلَى مَنْ عِندَ رَسُولِ اللَّهِ حَتَّى يَنفَضُّوا وَلِلَّهِ خَزَائِنُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَفْقَهُونَ يَقُولُونَ لَئِن رَّجَعْنَا إِلَى الْمَدِينَةِ لَيُخْرِجَنَّ الْأَعَزُّ مِنْهَا الْأَذَلَّ ، وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ
"তারাই বলে, "আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহচর্যে যারা আছে, তাদের জন্য ব্যয় করো না। পরিণামে তারা আপনাআপনি (তার পাশ থেকে) সরে যাবে।” ভূমণ্ডল ও নভোমণ্ডলের ধনভান্ডার তো কেবল আল্লাহরই, কিন্তু মুনাফিকরা তা বোঝে না। তারা বলে, "আমরা মদিনায় প্রত্যাবর্তন করলে সম্মানিতরা হীন লোকদের বহিষ্কার করবেই।" কিন্তু সম্মান তো একমাত্র আল্লাহ, তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুমিনদেরই। কিন্তু মুনাফিকরা এটা জানে না। "৫১৪
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি উপস্থিত হলে তিনি আমাকে আয়াতগুলো পড়ে শুনান এবং বলেন, "আল্লাহ তোমাকে সত্যায়ন করেছে, হে জাইদ। "৫১৫
জাইদ বিন আরকাম (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, "এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেসব লোককে ডেকে পাঠালেন, যাতে তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে পারেন। কিন্তু তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়।"৫১৬
হাদিস থেকে শিক্ষা
যদিও কোনো সম্প্রদায়ের বড়দের থেকে ত্রুটি প্রকাশ পায়। প্রমাণও যদি তাদের ত্রুটির প্রতি ইঙ্গিত করে। তবুও তাদের ও তাদের সম্প্রদায়ের লোকদের আকৃষ্ট করার জন্য তাদের ভর্ৎসনায় শিথিলতা করতে হবে, তাদের ওজর-আপত্তি গ্রহণ করতে হবে, তাদের শপথের সত্যায়ন করতে হবে। দেখা গেছে সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় কাউকে তার ত্রুটির যথোচিত শাস্তি দিলে সম্প্রদায়ের তার অনুসারী সাধারণ লোকগুলো ইসলামের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে পড়বে।
সাধারণ অবস্থায় যেসব কথা বলা জায়িজ নয়, সাধারণ অবস্থায় যেসব কথা গিবত ও চোগলখুরি হয়ে থাকে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করলে ও গibত-চোগলখুরির ক্ষতির চেয়ে অন্য কোনো কল্যাণ অগ্রাধিকার যোগ্য হলে সে ক্ষেত্রে এমন কথা প্রকাশ করা জায়িজ আছে। ৫১৭
টিকাঃ
৫১২. চাচা দ্বারা এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে সাদ বিন উবাদা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)। তিনি জাইদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর আপন চাচা ছিলেন না। তারা দুজন ছিলেন খাজরাজ গোত্রের সদস্য। আর সাদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ছিলেন গোত্রের নেতা।
৫১৩. এক বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাইদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর উদ্দেশে বললেন, 'হয়তো তুমি ভুল শুনেছ। তোমার হয়তো এ বিষয়ে বিভ্রম হয়েছে।' ওয়াকিদি কৃত আল-মাগাজি: ২/৪১৭। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এমন বলার কারণ হচ্ছে, গোত্রের একজন নেতাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা এবং ছোট এক বালকের সত্যায়ন করার মতো পরিস্থিতি তখন ছিল না।
৫১৪. সুরা আল-মুনাফিকুন, ৬৩: ১, ৭-৮
৫১৫. অন্য বর্ণনায় এসেছে, 'আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পেছনে সফর করতে থাকলাম। চিন্তার বিষণ্ণতায় মাথা নত করে নিয়েছিলাম। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে এসে আমার কান মলে দিলেন এবং হাসি দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। যদি এ হাসির পরিবর্তে আমাকে দুনিয়াতে চিরস্থায়ী আবাস দেওয়া হতো, তবুও আমি এতটা খুশি হতাম না। এরপর আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আসলেন আমার কাছে। বললেন, "রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাকে কী বললেন?" আমি বললাম, "তিনি কিছুই বলেননি। কেবল আমার কান মলে হেসে দিলেন।" আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, "সুসংবাদ গ্রহণ করো।" এরপর উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এলেন আমার কাছে। আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে যে উত্তর দিয়েছিলাম, তাকেও একই উত্তর দিলাম। পরদিন সকালবেলা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সুরা মুনাফিকুন শুনালেন। দেখুন, সুনানুত তিরমিজি: ৩৩১৩।
৫১৬. সহিহুল বুখারি: ৪৯০০, সহিহু মুসলিম: ২৭৭২, সুনানুত তিরমিজি: ২৭৭২।
৫১৭. ফাতহুল বারি: ৮/৬৪৬।
📄 তাদের উদ্দেশ্যে করে সূরা মুনাফিকুন তিলাওয়াত করতেন
মুনাফিকদের ভর্ৎসনা ও তাওবার প্রতি তাদের উৎসাহিত করতে প্রতি জুমআর সালাতে সুরা মুনাফিকুন তিলাওয়াত করতেন।
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমআর দিন ফজরের সালাতে الم) - تَنزِيلُ الْكِتَابِ لَا رَيْبَ فِيهِ مِن رَّبِّ الْعَالَمِينَ) ও ( هَلْ أَتَى عَلَى الْإِنْسَانِ حِينٌ مِنَ الدَّهْرِ لَمْ يَكُن شَيْئًا مَّذْكُورًا) তিলাওয়াত করতেন। আর জুমআর সালাতে সুরা জুমুআ ও সুরা মুনাফিকুন তিলাওয়াত করতেন। '৫১৮
হাদিসের ব্যাখ্যা
ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আলিমগণ বলেন, সুরা জমুআ পড়ার পেছনে হিকমত হচ্ছে, এ সুরাটিতে জুমআর ওয়াজিব করণীয়সহ অন্যান্য বিধান বর্ণিত হয়েছে। এ ছাড়াও বিবিধ নিয়মনীতি বর্ণিত হয়েছে। তাওয়াক্কুল, জিকিরসহ নানা বিষয়ে উৎসাহিত করা হয়েছে।'
অন্যদিকে সুরা মুনাফিকুন তিলাওয়াত করতেন উপস্থিত লোকদের সাবধান করার জন্য, তাওবা করার প্রতি উৎসাহিত করার জন্য, এ ছাড়াও বিবিধ নিয়মনীতি জানানোর জন্য। কারণ, এ দিনই মসজিদে বেশি সংখ্যক মানুষ একত্রিত হতেন। '৫১৯
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদিও ইবনে উবাইকে ক্ষমা করে দিতেন, তার সাথে কোমল আচরণ করতেন, তার দেওয়া প্রতিটি কষ্টে ধৈর্য ধরতেন, পরিশেষে ইবনে উবাইয়ের কটু আচরণের শিকার হলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-পরিবারের অন্যতম একজন সদস্য। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মুনাফিকের সাথে আচরণে কঠোরতা করলেন এবং তার বিরুদ্ধে সাহায্য চাইলেন।
গাজওয়ায়ে বনি মুসতালিকের সময় মুনাফিকরা দুটি ষড়যন্ত্র করে। প্রথমটি ব্যর্থ হয়ে যায়। এরপর তারা জাহিলি যুগের নিকৃষ্ট গোত্রপ্রীতি ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য এক ঘোর ষড়যন্ত্র করে। মুনাফিকরা এবার আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর বিরুদ্ধে অপবাদ আনল। এটাকে কুরআনে 'ইফক' (অপকর্মের অপবাদ) বলা হয়েছে। এ ষড়যন্ত্রের মূলভাগে ছিল মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুল। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ جَاءُوا بِالْإِفْكِ عُصْبَةٌ مِّنكُمْ لَا تَحْسَبُوهُ شَرًّا لَّكُم بَلْ هُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُم مَّا اكْتَسَبَ مِنَ الْإِثْمِ، وَالَّذِي تَوَلَّى كِبْرَهُ مِنْهُمْ لَهُ عَذَابٌ عَظِيمٌ
'যারা এ অপবাদ উত্থাপন করেছে, তারা তোমাদেরই একটি দল। এটাকে তোমাদের জন্য ক্ষতিকর মনে কোরো না; বরং তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। তাদের প্রত্যেকের জন্য আছে প্রতিফল যতটুকু পাপ সে করেছে। আর এ ব্যাপারে যে নেতৃত্ব দিয়েছে, তার জন্য আছে মহাশাস্তি। '৫২০
ইফকের ঘটনায় প্রথম ইবনে সালুলই মুখ খোলে। লোকদের কাছে বলে বেড়ায়। তার মতাদর্শের মানুষগুলোকে একত্র করে তাদের কাছে বলে। প্রচার করতে থাকে। নিজের সাঙ্গোপাঙ্গোদের কাছে বারবার এটি তুলে ধরে।
তারা যখন এ কথাটি রটিয়ে দিতে সক্ষম হয়, তখন কিছু মুমিনের ওপরও প্রভাব ফেলে এটি। এ সকল মুমিনদের পদস্খলন ঘটে। তারাও মুনাফিকদের মতো বিষয়টি বলতে থাকে। যাচাই-বাছাই ছাড়াই এবং ইবনে উবাইয়ের কূটকৌশল না বুঝেই কয়েকজন মুমিন এ মারাত্মক গুনাহে জড়িত হয়ে পড়ে।
বিষয়টি একসময় গুরুতর রূপ ধারণ করতে শুরু করে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলমানগণ বেশ কষ্ট অনুভব করতে লাগলেন। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখলেন। বললেন, 'কে আমাকে সাহায্য করবে এমন এক লোকের বিরুদ্ধে, যে কষ্ট দিতে দিতে এবার আমার পরিবার নিয়েও আমাকে কষ্টে ফেলে দিয়েছে। আল্লাহর কসম, আমি আমার পরিবারের ব্যাপারে উত্তম বৈ মন্দ কিছু জানি না। তারা এমন এক ব্যক্তিকে জড়িয়ে বলছে, যার ব্যাপারে উত্তম বৈ মন্দ কিছু জানি না আমি। সে আমার পরিবারের কাছে আমার সাথেই আসত।'
আওস গোত্রের সাদ বিন মুআজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) দাঁড়িয়ে বললেন, 'আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর শপথ, আমি আপনাকে সাহায্য করব তার বিরুদ্ধে। যদি সে আওস গোত্রের কেউ হয়, তবে আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেবো। আর যদি সে খাজরাজ গোত্রের আমাদের ভাইদের কেউ হয়, তবে আপনি যেভাবে আদেশ দেন, সেভাবেই আমরা পালন করব।'
আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'খাজরাজ গোত্রের নেতা সাদ বিন উবাদা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-তিনি সজ্জন ব্যক্তি ছিলেন, কিন্তু তার গোত্রপ্রীতি তাকে মূর্খামিতে উদ্যত করেছে-তখন দাঁড়িয়ে গেলেন। সাদ বিন মুআজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর উদ্দেশে বললেন, “আল্লাহর শপথ, তুমি মিথ্যে বলছ। তুমি তাকে হত্যা করবে না। তুমি তাকে হত্যা করতে পারবে না।” এবার সাদ বিন মুআজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর চাচাতো ভাই উসাইদ বিন হুজাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) দাঁড়িয়ে সাদ বিন উবাদাকে বললেন, "আল্লাহর শপথ, তুমি মিথ্যা বলছ। আমরা অবশ্যই তাকে হত্যা করব। তুমি একজন মুনাফিক, আরেকজন মুনাফিকের পক্ষে তর্ক করছ।"
আওস ও খাজরাজ একে অপরের বিরুদ্ধে উত্তেজিত হয়ে উঠল। এমনকি তাদের ঝগড়া যুদ্ধের ইচ্ছে পর্যন্ত গড়াল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখনো মিম্বরের ওপর। তিনি নেমে এসে তাদের শান্ত করলেন। তারাও চুপ হয়ে গেলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও আর কিছু বললেন না। '৫২১
হাদিস থেকে শিক্ষা
* বাতিলদের প্রতি পক্ষপাতিত্বের ফলে একজন ব্যক্তি মন্দ নামে ভূষিত হতে পারে।
* ঝগড়া হলে তা থামিয়ে দিতে হবে। ফিতনার আগুন নির্বাপণ করতে হবে। ফিতনার মাধ্যম ও কারণগুলো প্রতিহত করতে হবে।
টিকাঃ
৫১৮. সহিহু মুসলিম: ৮৭৯।
৫১৯. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৬/১৬৭।
৫২০. সুরা আন-নুর, ২৪: ১১।
৫২১. সহিহুল বুখারি: ২৬৬১, সহিহু মুসলিম: ২৭৭০।