📄 ইবনে সালুলের ধোঁকাবাজি ও প্রতারণা
বদর যুদ্ধের পর মুসলিমদের শক্তি বৃদ্ধি পেলে ইবনে সালুল ও অনেক মুশরিক প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিলেও বস্তুত তারা নিফাকি করে মুসলিমদের ধোঁকা দিচ্ছিল।
উসামা বিন জাইদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বদরে যুদ্ধ করলেন, তখন আল্লাহ তাআলা সে যুদ্ধে কাফিরদের বড় বড় ও কুরাইশদের নেতৃস্থানীয় লোকদের ধ্বংস করলেন। যুদ্ধ শেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবিগণ গনিমতের সাথে কাফিরদের বড় বড় ও কুরাইশদের নেতৃস্থানীয় লোকদের বিশাল একটি দলকে বন্দী করে বিজয়ী বেশে মদিনায় ফিরে আসলেন। তখন ইবনে উবাই এবং তার সাথের মুশরিক ও মূর্তিপূজারিরা বলল, "ইসলাম তো বিজয়ী হয়ে গেছে। (এটি পরিবর্তন করার শক্তি তো আমাদের নেই, আমাদের কোনো আশাও আর বাকি নেই।") এরপর তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে ইসলামের ওপর বাইআত হয়ে নিজেদের মুসলিম হিসেবে উপস্থাপন করল। '৪৯১
মূলত ইবনে উবাই ও তার সঙ্গীরা ভয় ও শঙ্কার কারণে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। এ হাদিস থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে, মুসলিমরা যখন বিজয়ী ও শক্তিশালী থাকে, মুনাফিকরা তখন ভীত ও শঙ্কিত থাকে। ফলে তারা নিফাকি করে তাদের প্রাণ বাঁচায় এবং নিজেদের ষড়যন্ত্র চালিয়ে যায়। আর মুসলিমরা যখন দুর্বল থাকে, তখন মুনাফিকরা তাদের ক্ষতি করতে থাকে এবং বিবিধ কষ্টে নিপতিত করে তাদের।
মুনাফিকরা যদিও ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছিল, কিন্তু মুসলমান ও ইসলামের প্রতি তাদের শত্রুতা এতটুকুও কমেনি। তাদের গোপন ষড়যন্ত্র একটুও থামেনি। তারা ষড়যন্ত্রের নীলনকশা এঁকে চলছিল নিজেদের মধ্যে। মুসলিমদের ওপর আক্রমণ করার জন্য ওত পেতে থাকল একটা মোক্ষম সময়ের আশায়।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'মুহাজিরদের মধ্যে কেউ মুনাফিক ছিলেন না। মুনাফিক সম্প্রদায়টি আনসারদের মধ্য থেকে উদ্ভূত হয়। কারণ, আনসাররা ছিলেন মদিনার অধিবাসী। যখন মদিনার সম্মানিত ব্যক্তিগণ ও অধিকাংশ মানুষজন ইসলাম গ্রহণ করলেন, তখন বাকিদের নিফাকের রাস্তা অবলম্বন করে ইসলাম ঘোষণা করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকল না। কেননা, তখন ইসলাম সম্মানিত ও তাদের গোত্রের মাঝে বিজয়ী।
অন্যদিকে মক্কার সম্মানিত ব্যক্তিরা ও অধিকাংশ মানুষ ছিল কাফির। তাদের মধ্যে যে মনেপ্রাণে ইসলাম গ্রহণ করেছে, সে-ই ইমান গ্রহণের কথা প্রকাশ করতেন। কারণ, যে-ই ইসলামের ঘোষণা দিত, সে নির্যাতিত হতো এবং হিজরত করতে হতো তাকে। মক্কায় ইসলাম গ্রহণের ঘোষণার অর্থ ছিল দুনিয়ার বিষয়ে বিপদাপন্ন হওয়া। আর মুনাফিকরা তাদের দুনিয়া বাঁচানোর জন্যই ইসলামের ঘোষণা দিয়েছিল। '৪৯২
টিকাঃ
৪৯১. সহিহুল বুখারি: ৪৫৬৬।
৪৯২. আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা ৩/৪৫০।
📄 মুনাফিকরা ইহুদিদের সাথে মিলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করত
ইহুদিদের সাথে আঁতাত করে মুসলিমদের সমূলে উৎখাত করার জন্য মুনাফিকরা এক ঘোর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল। ইহুদিদের সাথে তাদের আঁতাত থাকার বিষয়টা বনি কাইনুকার অপরাধের পরও তাদের প্রতি মুনাফিকদের পক্ষাবলম্বনের আচরণ থেকে স্পষ্ট বুঝে আসে। বনি কাইনুকার সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সন্ধি ছিল যে, কেউ কারও ওপর আক্রমণ করবে না এবং সীমালঙ্ঘন করবে না। কিন্তু বনি কাইনুকা সন্ধি ভঙ্গ করল।
আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'বদরের যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশদের পরাজিত করে মদিনায় এলেন। বনি কাইনুকার বাজারে ইহুদিদের একত্র করলেন। তাদের উদ্দেশে বললেন, "হে ইহুদিজাতি, কুরাইশদের মতো পরিণতি বরণ করার আগেই তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো।"৪৯৩
তারা বলল, “হে মুহাম্মাদ, আপনি নিজেই ধোঁকায় পড়বেন না। আপনি মূর্খ কুরাইশ জাতির সাথে যুদ্ধ করেছেন। তারা তো যুদ্ধই করতে জানে না। যদি আমাদের সাথে যুদ্ধ করতেন, তবে জানতেন, আসল যোদ্ধা কাকে বলে। আমাদের মতো কারও সাথে ইতিপূর্বে আপনার সাক্ষাৎ হয়নি।"
এরপর আল্লাহ তাআলা এ ব্যাপারে নাজিল করলেন:
قُل لِلَّذِينَ كَفَرُوا سَتُغْلَبُونَ وَتُحْشَرُونَ إِلَى جَهَنَّمَ، وَبِئْسَ الْمِهَادُ
“যারা কুফরি করে তাদের বলে দাও, তোমরা অচিরেই পরাজিত হবে আর জাহান্নামের দিকে নীত হবে তোমরা। আর সেটা কতই না নিকৃষ্ট আবাসস্থান।" [সুরা আলি ইমরান, ৩: ১২]'৪৯৪
আবু আওন মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ সাকাফি (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে ইবনে হিশাম (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেছেন, 'এক বেদুইন মুসলিম নারী তার উটের জিন নিয়ে বনি কাইনুকার বাজারে আসলো। জিনটি বাজারে বিক্রি করে স্বর্ণকারের দোকানে গিয়ে বসল। দোকানের কিছু লোক তার চেহারা দেখতে চাইলে তিনি পরিষ্কার অস্বীকার করে দিলেন। এদিকে স্বর্ণকার তার কাপড়ের একটি কোণা তার পিঠের দিকে বেঁধে দিল। এ মহীয়সী নারী উঠে দাঁড়ালে তার আবরণ প্রকাশ হয়ে পড়ে। এতে সে লোকগুলো হেসে উঠল। আর মুসলিম সে নারী জোরে চিৎকার করে উঠলেন।'
এক মুসলিম পুরুষ এগিয়ে এসে সে স্বর্ণকারের ওপর হামলে পড়লেন। তাকে হত্যা করলেন। স্বর্ণকার ছিল জাতে ইহুদি। এবার ইহুদিরা চড়াও হলো এ মুসলিমের ওপর। তাকে হত্যা করে ফেলল। মুসলিমরা তখন ইহুদিদের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য অপর মুসলিমদের প্রতি সাহায্যের আবেদন করে চিৎকার করে উঠলেন। তারা ঘটনা শুনে প্রচণ্ড রেগে গেলেন। মুসলিমদের মাঝে ও বনি কাইনুকার মাঝে লড়াই অবধারিত হয়ে পড়ল। '৪৯৫
ইহুদিদের এ কাণ্ডের ফলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধনীতি গ্রহণ করলেন। তাদের দুর্গ অবরোধ করল মুসলিমরা। তাদের ওপর প্রচণ্ড অবরোধ আরোপ করলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। শেষ পর্যন্ত তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সিদ্ধান্ত মেনে নেবে বলে আত্মসমর্পণ করল।
ইমাম ইবনে ইসহাক (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আসিম বিন উমর বিন কাতাদা (রাহিমাহুল্লাহ) আমাকে বলেছেন, "এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের অবরোধ করলেন। শেষ পর্যন্ত তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সিদ্ধান্ত মেনে নেবে বলে আত্মসমর্পণ করল। আল্লাহ তাআলা ইহুদিদের ওপর তাঁকে বিজয়ী করলেন। তখন ইবনে উবাই কাছে এগিয়ে এসে বলল, "হে মুহাম্মাদ, আমার মিত্রদের প্রতি সদ্ব্যবহার করুন।"
ইতিপূর্বে বনি কাইনুকা ও ইবনে উবাইয়ের গোত্র খাজরাজের মাঝে মিত্রতা ছিল।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো জবাব দিলেন না।
সে আবার বলল, “হে মুহাম্মাদ, আমার মিত্রদের প্রতি সদ্ব্যবহার করুন।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
ইবনে উবাই এবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বর্মের পকেটে তার হাত প্রবেশ করালো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ছাড়তে বললেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারায় তখন রাগের প্রভাব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। ৪৯৬ তিনি বলে উঠলেন, “তোমার ধ্বংস হোক, ছাড়ো আমাকে!"
ইবনে উবাই বলল, "না, আল্লাহর কসম, আমি আপনাকে ততক্ষণ ছাড়ব না, যতক্ষণ না আপনি আমার মিত্রদের প্রতি সদ্ব্যবহার করছেন। তাদের মাঝে বর্মহীন চারশ লোক, বর্ম পরিহিত তিনশ ব্যক্তি আছে। তারা আমাকে আরব-আজমের লোকদের থেকে রক্ষা করে আসছে। আর আপনি তাদের এক সকালেই অনায়াসে হত্যা করে ফেলবেন?! আমি সামনেও বিপদের ভয় করি। (তখন আমার সহযোগী তো এরাই হবে। যদি আপনি তাদের হত্যা করে ফেলেন, তবে তো আমি বিপদে ফেঁসে যাব।)"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, "ঠিক আছে।"৪৯৭
ইবনে উবাই তখনো তার গোত্রের মাঝে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ছিল। তাই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সুপারিশ গ্রহণ করে বনি কাইনুকার লোকগুলোকে হত্যা না করে মদিনার বাইরে বিতাড়িত করলেন। তাদের সাথে অস্ত্র ব্যতীত কেবল তাদের সম্পদ নেওয়ার অনুমতি দিলেন।
টিকাঃ
৪৯৩. অন্য একটি রিওয়ায়াতে এসেছে, 'নিশ্চয়ই তোমরা জানো, আমি আল্লাহর প্রেরিত নবি। আল্লাহ তোমাদের এ বিষয়ে ওয়াদা দিয়েছেন। তোমরা তা তোমাদের কিতাবেই পেয়েছ।' ইবনে ইসহাক কৃত আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ১/৩১৩।
৪৯৪. সুনানু আবি দাউদ: ৩০০১। ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) ফাতহুল বারিতে এ হাদিসটিকে হাসান বলেছেন। আবার আহমাদ শাকির (রাহিমাহুল্লাহ) উমদাতুত তাফসিরে এ হাদিসকে সহিহ বলেছেন। আর আলবানি (রাহিমাহুল্লাহ) এ হাদিসকে জইফ বলেছেন।
৪৯৫. ইবনে হিশাম কৃত আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ২/৪৮।
৪৯৬. সে সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিরস্ত্রাণ পরিহিত ছিলেন না।
৪৯৭. ইবনে হিশাম কৃত আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ ২/৪৮। সনদ হাসান, তবে মুরসাল।
📄 উহুদ যুদ্ধে মুনাফিকরা প্রতারণার করে পথ থেকে ফিরে এল
উহুদ যুদ্ধের দিন মুনাফিকরা যুদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে এক-তৃতীয়াংশ সৈন্য নিয়ে চলে গেলেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কোনো শাস্তি দেননি।
জাইদ বিন সাবিত (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদের ময়দানের উদ্দেশ্যে বের হলেন। এদিকে ময়দানের উদ্দেশ্যে বের হওয়া সৈন্যের একাংশ ফিরে চলে যায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবিদের মাঝে তখন দুভাগ হয়ে যায়। একভাগ বলল, "আমরা যুদ্ধ করব।" আরেক ভাগ বলল, "আমরা যুদ্ধ করব না।" তখন নাজিল হলো:
فَمَا لَكُمْ فِي الْمُنَافِقِينَ فِئَتَيْنِ وَاللَّهُ أَرْكَسَهُم بِمَا كَسَبُوا أَتُرِيدُونَ أَن تَهْدُوا مَنْ أَضَلَّ اللَّهُ وَمَن يُضْلِلِ اللَّهُ فَلَن تَجِدَ لَهُ سَبِيلًا
“তোমাদের কী হলো যে, মুনাফিকদের ব্যাপারে (কী নীতি অবলম্বন করা হবে, তা নিয়ে) তোমরা দুদলে বিভক্ত হয়ে গেলে? বস্তুত আল্লাহ তাদের এ কার্যকলাপের কারণে তাদের উল্টো মুখে (ইসলাম থেকে কুফরের দিকে) ফিরিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, তোমরা কি তাকে সুপথ দেখাতে চাও? বস্তুত আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তার জন্য কখনো পথ খুঁজে পাবে না।” [সুরা আন-নিসা, ৪: ৮৮]৪৯৮
'ময়দানের উদ্দেশ্যে বের হওয়া সৈন্যের একাংশ ফিরে চলে যায়'-অর্থাৎ আব্দুল্লাহ বিন উবাই ও তার সঙ্গী মুনাফিকরা ফিরে চলে যায়। এ বর্ণনায় নাম স্পষ্ট না এলেও মুসা বিন উকবা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর বর্ণনায় নাম স্পষ্টভাবে এসেছে। উহুদ যুদ্ধের প্রাক্কালে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় মুসলিমদের সাথে পরামর্শে বসলেন। তখন একদল মুসলমান পরামর্শ দিলেন মদিনার ভেতরে থেকে যুদ্ধ করার। কিন্তু যুবকরা পরামর্শ দিল মদিনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করার। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মত ছিল প্রথম পরামর্শের পক্ষে। আব্দুল্লাহ বিন উবাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে একমত হয়েছিল তখন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিদ্ধান্ত দিলেন দ্বিতীয় পরামর্শের ওপর। তখন ইবনে উবাইও মদিনা থেকে বের হতে বাধ্য হলো। আব্দুল্লাহ বিন উবাই তার সঙ্গীদের উদ্দেশে বলেছিল, 'তিনি তাদের কথা মেনে নিলেন। আর আমার কথাটা ফেলে দিলেন। তবে কেনই-বা আমরা নিজেদের প্রাণ দিয়ে যুদ্ধ করব?' এরপর সৈন্যদের এক-তৃতীয়াংশ নিয়ে ফিরে গেল সে।
ইমাম ইবনে ইসহাক (রাহিমাহুল্লাহ) তার বর্ণনায় উল্লেখ করেন, 'জাবির (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর পিতা আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন হারাম (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ছিলেন খাজরাজ গোত্রের। তিনি ইবনে উবাইয়ের পেছনে এসে তাদেরকে আল্লাহর নামে শপথ করে ফিরে আসার অনুরোধ করলেন। কিন্তু তারা ফিরে আসতে অস্বীকৃতি জানাল। তখন তিনি বললেন, "আল্লাহ তোমাদের দূরে রাখুন, হে আল্লাহর দুশমনেরা! নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তোমাদের থেকে অমুখাপেক্ষী রাখবেন। "৪৯৯
টিকাঃ
৪৯৮. সহিহুল বুখারি: ৪০৫০, সহিহু মুসলিম: ২৭৭৬।
৪৯৯. ইবনে হিশাম কৃত আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ ২/৬৪, ফাতহুল বারি: ৭/৩৫৬।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ দ্বীনের স্বার্থে মুনাফিকদের হত্যা করেননি
ইসলামের স্বার্থে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুনাফিকদের হত্যা করা থেকে বিরত থেকেছেন। মুনাফিকরা মুসলিমদের ভেতরেই আনাগোনা করত। মসজিদে নববিতে সালাত পড়ত। মুসলমানদের সাথে সুন্দর আচার-ব্যবহার করত। কিন্তু পরস্পর মিলিত হয়ে মুসলিমদের নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ থেকে শুরু করে মারাত্মক সব ষড়যন্ত্র করত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতেন, তার সামনে হেঁটে যাওয়া এ আব্দুল্লাহ বিন উবাই মুনাফিক। ইবনে উবাইয়ের এ সঙ্গীটি মুনাফিক, ওই সঙ্গীটিও মুনাফিক। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুনাফিকদের সকল দুরভিসন্ধি সম্পর্কেও ছিলেন সম্যক অবগত। কিন্তু তার পরেও দাওয়াতি কল্যাণের স্বার্থে তিনি মুনাফিকদের হত্যা করতেন না, হত্যা করার আদেশও দিতেন না।
জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আমরা একটি অভিযানে ছিলাম। ৫০০ মুহাজিরদের একজন এক আনসারিকে কৌতুকবশত আঘাত করলেন। কিন্তু আনসারি সাহাবি বিরূপভাবে নিল বিষয়টি। মুহাজির সাহাবির বিরুদ্ধে নিজ গোত্রের লোকদের সাহায্য কামনায় ডাক দিয়ে বললেন, "ওহে আনসার!" এদিকে মুহাজির সাহাবিও নিজ গোত্রের লোকদের ডাক দিয়ে বললেন, “ওহে মুহাজিরগণ!"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের আওয়াজ শুনে বললেন, "জাহিলি যুগের ডাকাডাকি কেন?"
সাহাবিগণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানালেন, "হে আল্লাহর রাসুল, এক মুহাজির একজন আনসারিকে কৌতুকবশত কোমরে আঘাত করেছেন।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এ রকম আহ্বান তোমরা ত্যাগ করো। এগুলো জঘন্য ও ঘৃণ্য।"৫০১
ইবনে উবাইয়ের কথা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে পৌঁছাল। তখন উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) দাঁড়িয়ে বললেন, “আল্লাহর রাসুল, আমাকে অনুমতি দিন, আমি এ মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দিই।"
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, "ছেড়ে দাও। নয়তো পরে মানুষরা বলবে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের সাথিদের হত্যা করে।"৫০২
ইমাম ইবনে ইসহাক (রাহিমাহুল্লাহ) আরও যোগ করেন, 'এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "না; বরং সৈন্যদের সামনে চলার ঘোষণা দাও।" যদিও তখন চলার উপযুক্ত সময় ছিল না, তবুও মুসলিম সেনাদল সামনে এগিয়ে চলল। '৫০৩
উসাইদ বিন হুজাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলেন। তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ঘটনা জানালেন। উসাইদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনিই হচ্ছেন সম্মানিত, আর সে হচ্ছে নিচু লোক।'
ইবনে উবাইয়ের পুত্রের নাম আব্দুল্লাহ। তিনি নিজ পিতার এমন কাণ্ডের কথা শুনতে পেয়ে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলেন। বললেন, 'আমি জানতে পেরেছি, আপনি আমার বাবাকে নিহত দেখতে চান। যদি তা-ই সত্যি হয়, তবে আমাকে আদেশ দিন। আমিই তার মাথা আপনার সামনে এনে হাজির করি।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, 'বরং আমরা তার সাথে সদয় ব্যবহার করব এবং তার সাথে সদ্ভাব বজায় রাখব, যতদিন সে আমাদের সাথে এ দুনিয়াতে থাকে। '৫০৪
অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, 'এরপর ইবনে উবাইয়ের উদ্দেশে তার পুত্র বললেন, 'আল্লাহর কসম, আপনি ততক্ষণ পর্যন্ত মদিনায় ফিরে যেতে পারবেন না, যতক্ষণ না স্বীকার করেন যে, আপনি হচ্ছেন নিচু আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন সম্মানিত। অবশেষে ইবনে উবাই তা-ই স্বীকার করল। '৫০৫
ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এ হাদিসটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহিষ্ণুতার অনুপম নিদর্শন বহন করে।'
যখন বড় কোনো ক্ষতি প্রতিহত করতে গিয়ে কোনো প্রশংসনীয় কাজ ত্যাগ করতে হয় কিংবা ছোট কোনো ক্ষতি স্বীকার করে নিতে হয়, তখন তা-ই করতে হবে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষদের সাথে আকৃষ্টময় আচরণ করতেন। বেদুইন ও মুনাফিকরা তাকে যে কষ্ট দিত, তার ওপর তিনি ধৈর্যধারণ করতেন; যাতে মুসলিমদের দাপট বিরাজমান থাকে। ইসলামের দাওয়াত পূর্ণতায় পৌঁছে, যারা ইসলাম গ্রহণ করার মতো অবস্থায় আছে, তাদের অন্তর যেন ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়, অন্যরাও যেন ইসলামের প্রতি আগ্রহী হয়। মানুষকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের অর্থ দিয়েও সাহায্য করতেন।
এ কারণেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুনাফিকদের হত্যা করেননি। তারা ওপরে ওপরে নিজেদের মুসলিম হিসেবে জাহির করত। আর শরিয়ত আদেশ দিয়েছে মানুষের বাহ্যিকতা দেখে তার বিচার করতে এবং মানুষের অভ্যন্তরীণ বিষয়াদি আল্লাহর কাছে সোপর্দ করতে। এ সকল মুনাফিককেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবিদের মাঝে গণনা করা হতো। মুনাফিকরাও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে যুদ্ধ করত। যদিও তাদের কারও উদ্দেশ্য থাকত দেশপ্রেম, জাতীয়তার চেতনা ও দুনিয়া অর্জন। '৫০৬
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'অনিষ্টতার পথ রুদ্ধ করার তৃতীয় দলিল: মদিনার মুনাফিকদের হত্যা করাই ছিল কল্যাণকর। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের হত্যা করেননি। কারণ, হত্যা করলে মানুষ বলত, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ সাথিদের হত্যা করে। এর ফলে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে, তারা ইসলামের প্রতি বিরূপ ধারণা পোষণ করবে। যারা মুসলিম হয়নি, তারা এর কারণে ইসলাম থেকে দূরে সরে যাবে। আর এমন বিরূপতা সৃষ্টি করা হারাম। '৫০৭
টিকাঃ
৫০০. যুদ্ধটি ছিল বনু মুসতালিকের যুদ্ধ।
৫০১. আব্দুর রাজ্জাক (রাহিমাহুল্লাহ)-এর বর্ণনায় এসেছে, তিনি মা'মার বিন কাতাদা (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে মুরসাল সনদে বর্ণনা করেন, '... সকল মুনাফিক এরপর আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের কাছে ছুটল। তাকে বলল, তিনি আশা করেছিলেন তুমি তাদের ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু তুমি তো তাদের কোনো ক্ষতি-উপকার কিছুই করতে পারলে না। তখন ইবনে উবাই বলল, মদিনাতে ফিরে গেলে আমরা সম্মানিতরা সেখান থেকে নিচু লোকদের বের করে দেবো।' সনদ মুরসাল জাইয়িদ। ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ)-ও এমনই বলেছেন। দেখুন, ফাতহুল বারি: ৮/৬৪৯। ইমাম ইবনে ইসহাক (রাহিমাহুল্লাহ)-এর বর্ণনায় এসেছে, 'ইবনে উবাই তার সাঙ্গোপাঙ্গোদের প্রত্যুত্তরে বলল, তারা (মুহাজিররা) এমন করেছে? আমাদের দেশে থেকে তারা আমাদের বিরোধিতায় লিপ্ত? আমরা ও এসব কুরাইশ বণিকদের উদাহরণ এমন, যেমন নাকি প্রবাদে বলা হয়, سمن كلبك يأكلك দুধ কলা খাইয়ে কাল সাপ পোষা।।' আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ ৪/৩৫৯।
৫০২. সহিহুল বুখারি: ৩৫১৮, সহিহু মুসলিম: ২৫৮৩।
৫০৩. অস্বাভাবিক সময়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অগ্রসর হওয়ার আদেশ দেওয়ার পেছনের হিকমতটি পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। আর সেটা হচ্ছে, দুই সাহাবির মাঝে ঝগড়া ও ইবনে উবাইয়ের এমন স্পর্ধাজনক মন্তব্য যদি তখন মুসলিম শিবিরে ছড়িয়ে পড়ত, তবে তা সৈন্যদের আসল চিন্তায় ব্যাঘাত ঘটাত। মুসলিম সৈন্যদের মাঝে তখন বিতর্কের সৃষ্টি হতো। এমনটা মোটেও শোভনীয় নয়। এ জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামনে অগ্রসর হওয়ার আদেশ দিয়েছিলেন। মুসলিমগণ একদিন-একরাত হাঁটার পর তারা বেশ ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। দীর্ঘ ক্লান্তির সফর শেষে একটু বিশ্রামের সুযোগ হয়েছিল তাদের। তাই গভীরভাবে ঘুমিয়ে পড়েন তারা। ফলে তাদের মাঝে যে ফিতনা প্রসারের আশঙ্কা ছিল তা দমে যায়। মারবিয়্যাতু গাজওয়াতি বনি মুসতালিক: ১/১৯০।
৫০৪. ইবনু হিশাম কৃত আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ: ২/২৯১।
৫০৫. সুনানুত তিরমিজি: ১৫৮২।
৫০৬. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৬/১৩৯।
৫০৭. ইকামাতুদ দলিল আলা ইবতালিত তাহলিল: ৩/৪৭১।