📄 মুনাফিকদের কতিপয় নিদর্শন
মুমিন হওয়ার মিথ্যা দাবি
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَقُولُ آمَنَّا بِاللَّهِ وَبِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَمَا هُم بِمُؤْمِنِينَ
'আর মানুষের মধ্যে এমন কিছু লোক রয়েছে, যারা বলে, "আমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ইমান এনেছি"-অথচ আদৌ তারা ইমানদার নয়। '৪৬৫
يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَمَا يَخْدَعُونَ إِلَّا أَنفُسَهُمْ وَمَا يَشْعُرُونَ
'তারা আল্লাহ ও মুমিনদের প্রতারিত করার অপচেষ্টা করে। আসলে তারা নিজেদের অজান্তে নিজেরাই নিজেদের প্রতারিত করে। কিন্তু এটা তারা উপলব্ধি করতে পারে না। '৪৬৬
পৃথিবীর বুকে বিশৃঙ্খলা ছড়ানো
আল্লাহ তাআলা বলেন
وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ قَالُوا إِنَّمَا نَحْنُ مُصْلِحُونَ - أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ الْمُفْسِدُونَ وَلَكِن لَّا يَشْعُرُونَ
'তাদের যখন বলা হয়, পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করো না, তারা বলে, “আমরা তো সংশোধনকারী।” মূলত তারাই অশান্তি সৃষ্টিকারী, কিন্তু তারা তা বুঝতে পারে না। '৪৬৭
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يُعْجِبُكَ قَوْلُهُ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيُشْهِدُ اللَّهَ عَلَى مَا فِي قَلْبِهِ وَهُوَ أَلَهُ الْخِصَامِ - وَإِذَا تَوَلَّى سَعَى فِي الْأَرْضِ لِيُفْسِدَ فِيهَا وَيُهْلِكَ الحَرْثَ وَالنَّسْلَ وَاللهُ لَا يُحِبُّ الْفَسَادَ - وَإِذَا قِيلَ لَهُ اتَّقِ اللَّهَ أَخَذَتْهُ الْعِزَّةُ بِالْإِثْمِ فَحَسْبُهُ جَهَنَّمُ وَلَبِئْسَ الْمِهَادُ
'আর এমন কিছু লোক রয়েছে, যাদের পার্থিব জীবনের কথাবার্তা তোমাকে চমৎকৃত করবে। আর আল্লাহকে নিজের মনের কথার ব্যাপারে সাক্ষ্য স্থাপন করে সে। প্রকৃতপক্ষে সে কঠিন ঝগড়াটে লোক। যখন তোমার কাছ থেকে সে ব্যক্তি ফিরে যায়, তখন দেশের মধ্যে অনিষ্ট ঘটাতে এবং শস্যাদি ও পশুসমূহকে ধ্বংস করতে চেষ্টা করে। আর আল্লাহ ফাসাদ পছন্দ করেন না। যখন তাকে বলা হয়, আল্লাহকে ভয় করো, তখন অহংকার তাকে গুনাহর দিকে আকর্ষিত করে। জাহান্নামই তার জন্য যথেষ্ট। আর তা কতই-না জঘন্য আবাসস্থল! '৪৬৮
ইবাদতে অলসতা করা
আল্লাহ তাআলা বলেন
إِنَّ الْمُنَافِقِينَ يُخَادِعُونَ اللهَ وَهُوَ خَادِعُهُمْ وَإِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلَاةِ قَامُوا كُسَالَى يُرَاءُونَ النَّاسَ وَلَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلًا
'নিশ্চয়ই মুনাফিকরা আল্লাহর সাথে প্রতারণা করার মানস পোষণ করে। আর আল্লাহও তাদের সে প্রতারণার সমুচিত জবাব দেন। যখন তারা সালাতে দাঁড়ায়, তখন আলস্যভরে দাঁড়ায়। তাদের সালাতের উদ্দেশ্য হয় লোকদের দেখানো। আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে তারা। '৪৬৯
* মুমিনদের নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذَا لَقُوا الَّذِينَ آمَنُوا قَالُوا آمَنَّا وَإِذَا خَلَوْا إِلَى شَيَاطِينِهِمْ قَالُوا إِنَّا مَعَكُمْ إِنَّمَا نَحْنُ مُسْتَهْزِئُونَ
'আর তারা যখন ইমানদারদের সাথে মিশে, তখন বলে, "আমরা ইমান এনেছি।” আবার যখন তাদের শয়তানদের সাথে একান্তে সাক্ষাৎ করে, তখন বলে, "আমরা তোমাদের সাথে রয়েছি। আমরা তো (মুসলমানদের সাথে) উপহাস করি মাত্র।”৪৭০
الَّذِينَ يَلْمِرُونَ الْمُطَّوِّعِينَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ فِي الصَّدَقَاتِ وَالَّذِينَ لَا يَجِدُونَ إِلَّا جُهْدَهُمْ فَيَسْخَرُونَ مِنْهُمْ سَخِرَ اللَّهُ مِنْهُمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
'যারা (যেসব মুনাফিক) মুমিনদের মধ্যে স্বেচ্ছায় দান-সাদাকাকারীদের কটাক্ষ করে এবং (কটাক্ষ করে) যারা কষ্টার্জিত সামান্য বস্তু ছাড়া (দান করার মতো) কিছু পায় না তাদেরকে এবং তাদের নিয়ে বিদ্রুপ করে, আল্লাহ তাদের পাল্টা বিদ্রুপ করবেন। আর তাদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি। '৪৭১
* মুমিনদের বিরুদ্ধে শত্রুতা ও ষড়যন্ত্র করে
আল্লাহ তাআলা বলেন:
قَدْ بَدَتِ الْبَغْضَاءُ مِنْ أَفْوَاهِهِمْ وَمَا تُخْفِي صُدُورُهُمْ أَكْبَرُ
'শত্রুতাপ্রসূত বিদ্বেষ তাদের মুখ ফুটে বেরোয়। আর যা কিছু তাদের মনে লুকিয়ে রয়েছে, তা আরও অনেকগুণ বেশি জঘন্য। '৪৭২
إِن تَمْسَسْكُمْ حَسَنَةٌ تَسُؤْهُمْ وَإِن تُصِبْكُمْ سَيِّئَةٌ يَفْرَحُوا بِهَا وَإِن تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا إِنَّ اللَّهَ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطٌ
'যদি তোমাদের কল্যাণ হয়, তা তাদের দুঃখ দেয়; আর যদি তোমাদের অকল্যাণ হয়, তাতে তারা আনন্দিত হয়। যদি তোমরা ধৈর্যশীল হও এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, তবে তাদের চক্রান্ত তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। নিশ্চয় তারা যা কিছু করছে, আল্লাহ তা পরিবেষ্টন করে আছেন। '৪৭৩
الَّذِينَ يَتَرَبَّصُونَ بِكُمْ فَإِن كَانَ لَكُمْ فَتْحٌ مِّنَ اللَّهِ قَالُوا أَلَمْ نَكُن مَّعَكُمْ وَإِن كَانَ لِلْكَافِرِينَ نَصِيبٌ قَالُوا أَلَمْ نَسْتَحْوِذْ عَلَيْكُمْ وَنَمْنَعْكُم مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ
'মুনাফিকরা তোমাদের কল্যাণ-অকল্যাণের প্রতীক্ষায় ওত পেতে থাকে। আল্লাহর ইচ্ছায় তোমরা বিজয়ী হলে তারা বলে, "আমরাও কি তোমাদের সাথে ছিলাম না?” অন্যদিকে কাফিরদের যদি আংশিক বিজয় হয়, তবে বলে, "আমরা কি তোমাদের আগলে রাখিনি এবং মুমিনদের কবল থেকে রক্ষা করিনি?"৪৭৪
কাফিরদের সাথে মৈত্রী স্থাপন ও সহযোগিতা করা
بَشِّرِ الْمُنَافِقِينَ بِأَنَّ لَهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا - الَّذِينَ يَتَّخِذُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِن دُونِ الْمُؤْمِنِينَ أَيَبْتَغُونَ عِندَهُمُ الْعِزَّةَ فَإِنَّ الْعِزَّةَ لِلَّهِ جَمِيعًا
'মুনাফিকদের সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। যারা মুমিনদের পরিত্যাগ করে কাফিরদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তারা কি কাফিরদের নিকট সম্মান অনুসন্ধান করে? কিন্তু যাবতীয় সম্মানই আল্লাহর। '৪৭৫
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ نَافَقُوا يَقُولُونَ لِإِخْوَانِهِمُ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَئِنْ أُخْرِجْتُمْ لَنَخْرُجَنَّ مَعَكُمْ وَلَا تُطِيعُ فِيكُمْ أَحَدًا أَبَدًا وَإِن قُوتِلْتُمْ لَتَنصُرَنَّكُمْ وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ
'আপনি কি মুনাফিকদের দেখেননি? তারা তাদের আহলে কিতাবের কাফির হয়ে যাওয়া ভাইদের বলে, "তোমরা যদি বহিষ্কৃত হও, তবে আমরা অবশ্যই তোমাদের সাথে দেশ থেকে বের হয়ে যাব এবং তোমাদের ব্যাপারে আমরা কখনো কারও কথা মানব না। আর যদি তোমরা আক্রান্ত হও, তবে আমরা অবশ্যই তোমাদের সাহায্য করব।" আল্লাহ তাআলা সাক্ষ্য দেন যে, ওরা 'নিশ্চয়ই মিথ্যাবাদী। '৪৭৬
শরিয়ত ত্যাগ করা ও তাগুতের নিকট বিচার চাওয়া
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَيَقُولُونَ آمَنَّا بِاللَّهِ وَبِالرَّسُولِ وَأَطَعْنَا ثُمَّ يَتَوَلَّى فَرِيقٌ مِنْهُمْ مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ وَمَا أُولَئِكَ بِالْمُؤْمِنِينَ - وَإِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ إِذَا فَرِيقٌ مِنْهُمْ مُعْرِضُونَ - وَإِنْ يَكُنْ لَهُمُ الْحَقُّ يَأْتُوا إِلَيْهِ مُذْعِنِينَ - أَفِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ أَمِ ارْتَابُوا أَمْ يَخَافُونَ أَنْ يَحِيفَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَرَسُولُهُ بَلْ أُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
'তারা বলে, "আমরা আল্লাহর প্রতি ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ইমান আনলাম এবং আনুগত্য করলাম।" কিন্তু এরপরও তাদের মধ্যেকার একদল মুখ ফিরিয়ে নেয়। (প্রকৃতপক্ষে) তারা মুমিন নয়। তাদের মধ্যে ফয়সালা করার জন্য যখন তাদের আল্লাহ ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দিকে আহ্বান করা হয়, তখন তাদের একদল মুখ ফিরিয়ে নেয়। কিন্তু সত্য তাদের স্বপক্ষে হলে তারা বিনীতভাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে ছুটে আসে। তাদের অন্তরে কি রোগ আছে, না তারা ধোঁকায় পড়ে আছে? নাকি তারা ভয় করে যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের প্রতি অবিচার করবেন? বরং তারাই তো অবিচারকারী!' ৪৭৭
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَنْ يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَنْ يَكْفُرُوا بِهِ وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُضِلَّهُمْ ضَلَالًا بَعِيدًا - وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَى مَا أَنْزَلَ اللهُ وَإِلَى الرَّسُولِ رَأَيْتَ الْمُنَافِقِينَ يَصُدُّونَ عَنْكَ صُدُودًا - فَكَيْفَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيهِمْ ثُمَّ جَاءُوكَ يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ إِنْ أَرَدْنَا إِلَّا إِحْسَانًا وَتَوْفِيقًا - أُولَئِكَ الَّذِينَ يَعْلَمُ اللَّهُ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ وَعِظْهُمْ وَقُلْ لَهُمْ فِي أَنْفُسِهِمْ قَوْلًا بَلِيعًا
'তুমি কি তাদের প্রতি লক্ষ করোনি, যারা দাবি করে যে-তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং তোমার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছিল-তার প্রতি তারা বিশ্বাস রাখে! অথচ তারা নিজেদের বিচার-মোকদ্দমা তাগুতের নিকট নিয়ে যেতে চায়। অথচ তাদের আদেশ করা হয়েছিল, যেন তাগুতকে অবিশ্বাস করে। পক্ষান্তরে শয়তান তাদের প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করতে চায়। আর যখন তাদের বলা হয় যে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন সেই দিকে এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দিকে এসো, তখন তুমি মুনাফিকদের দেখবে, তারা তোমার থেকে মুখ ফিরিয়ে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। যখন তাদের কৃতকার্যের জন্য তাদের ওপর বিপদ আপতিত হবে, তখন কী অবস্থা হবে? তখন তারা আল্লাহর নামে শপথ করতে করতে তোমার কাছে এসে বলবে, "কল্যাণ ও সম্প্রীতি ব্যতীত আমরা কিছুই কামনা করিনি।" এরা হলো সেসব লোক, যাদের মনের গোপন বিষয় সম্পর্কে আল্লাহ অবগত। অতএব, আপনি ওদের উপেক্ষা করুন এবং ওদের সদুপদেশ দিয়ে এমন কোনো কথা বলুন, যা তাদের জন্য কল্যাণকর। '৪৭৮
তাওবা-ইসতিগফারকে তুচ্ছ মনে করে বিমুখ থাকা
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا يَسْتَغْفِرْ لَكُمْ رَسُولُ اللَّهِ لَوْوْا رُءُوسَهُمْ وَرَأَيْتَهُمْ يَصُدُّونَ وَهُم مُّسْتَكْبِرُونَ
'যখন তাদের বলা হয়, তোমরা এসো, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবেন, তখন তারা মাথা ঘুরিয়ে নেয় এবং আপনি তাদের দেখেন যে, তারা অহংকার করে মুখ ফিরিয়ে নেয়। '৪৭৯
* মুমিনদের মাঝে অশ্লীলতার প্রচার-প্রসার করতে পছন্দ করা
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَن تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
'যারা পছন্দ করে যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার বিস্তৃতি ঘটুক, তাদের জন্য আছে ভয়াবহ শাস্তি দুনিয়া ও আখিরাতে। আর আল্লাহ জানেন, কিন্তু তোমরা জানো না। '৪৮০
* মুমিনদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক যুদ্ধ চালানো
আল্লাহ তাআলা বলেন:
هُمُ الَّذِينَ يَقُولُونَ لَا تُنفِقُوا عَلَى مَنْ عِندَ رَسُولِ اللَّهِ حَتَّى يَنفَضُّوا وَلِلَّهِ خَزَائِنُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَفْقَهُونَ
'তারা বলে, "রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গী-সাথিদের জন্য অর্থ ব্যয় করো না; শেষে তারা এমনিতেই সরে পড়বে।" আসমান ও জমিনের ধন-ভান্ডার তো কেবল আল্লাহরই। কিন্তু মুনাফিকরা তা বোঝে না। '৪৮১
অসৎ কাজের আদেশ করা এবং সৎ কাজে নিষেধ করা
আল্লাহ তাআলা বলেন:
الْمُنَافِقُونَ وَالْمُنَافِقَاتُ بَعْضُهُم مِّن بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمُنكَرِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمَعْرُوفِ وَيَقْبِضُونَ أَيْدِيَهُمْ ، نَسُوا اللَّهَ فَنَسِيَهُمْ إِنَّ الْمُنَافِقِينَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
'মুনাফিক পুরুষ আর মুনাফিক নারী সব একরকম। তারা অন্যায় কাজের নির্দেশ দেয় আর সৎ কাজ করতে নিষেধ করে এবং (আল্লাহর পথে ব্যয় করার ব্যাপারে) হাত গুটিয়ে রাখে। তারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, তাই তিনিও তাদের ভুলে গেছেন। মুনাফিকরাই তো ফাসিক। '৪৮২
উম্মাহর বিপর্যয়ের পেছনে সবচেয়ে ক্ষতিকর হচ্ছে মুনাফিকরা। কারণ, তারা মুসলিমদের সাথে একই সমাজে থাকে। মুসলিমদের শক্তি ও দুর্বলতার কথা জানে। নিফাক সম্পর্কে ইবনুল কাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) যথার্থ উক্তি করেছেন। তিনি বলেন, 'নিফাক হচ্ছে অদৃশ্য এক দুরারোগ্য ব্যাধি। '৪৮৩
কিছু মানুষ দাবি করে, এসব মুনাফিক ইসলামের প্রথম যুগে ছিল। বর্তমানে তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই। বলা বাহুল্য, এটি ভ্রান্ত দাবি। প্রতিটি যুগেই মুনাফিকদের অস্তিত্ব ছিল। যেমন শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'মুনাফিকরা এখনো বর্তমান। কিয়ামত পর্যন্ত এদের অস্তিত্ব থাকবে। '৪৮৪
মক্কি জীবনে নিফাক সম্পর্কে কারও কোনো ধারণাই ছিল না। কেননা, হিজরতের পরেই এ শ্রেণিটির আবির্ভাব ঘটে। মক্কায় মুসলিমদের কোনো শক্তি ছিল না, তাদের আধিপত্য ছিল না; বরং মুশরিকরা ছিল শক্তিশালী ও আধিপত্যকারী। তাই এখানে কোনো মুশরিকের জন্য নিজের শিরক গোপন রাখার কোনো কারণ নেই।
মদিনায় যখন মুসলিমরা শক্তিশালী হলেন, তখনই উদ্ভব হয় মুনাফিক শ্রেণিটির। ভেতরে কুফরি পোষণ করত, আর ভীরুতার কারণে ও মুসলিমদের ধোঁকা দেওয়ার নিমিত্তে বাইরে ইসলাম প্রকাশ করত। এদের নেতা ছিল আব্দুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুল। ৪৮৫ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হিজরতের আগে সে ছিল আওস ও খাজরাজের ভাবী নেতা। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হিজরত করে মদিনায় এলেন, তখন তার নেতা হওয়ার সম্ভাবনা পুরো শেষ হয়ে গেল। এরপর সে নিফাকের রাস্তা বেছে নিয়ে নিজেকে মুসলিম হিসেবে প্রকাশ করল।
ইবনে উবাই ওপরে ইসলাম প্রকাশ করত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরত। মুসলিমদের বিরুদ্ধে গোপনে ষড়যন্ত্র কষতে থাকত। মুসলিমদের ক্ষতি করার মোক্ষম সুযোগের অপেক্ষায় থাকত। মৃত্যু পর্যন্ত মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়ে গেছে সে। এতদসত্ত্বেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবনে উবাইয়ের মনকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য তার সাথে কোমল ব্যবহার করতেন। ক্ষমা ও ধৈর্যের সাথে আচরণ করতেন।
ইসলামের প্রতি আব্দুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুলের শত্রুতার প্রথম ঘটনা ঘটেছে বদরের আগে। তখনো সে নিফাকের পথ গ্রহণ করে ইসলামের প্রকাশ করেনি।
উসামা বিন জাইদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'একদিনের কথা। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গাধায় চড়লেন। গাধার পিঠে একটি জিন ছড়ানো ছিল। তার নিচে ছিল একটি ফাদকি মখমল। পেছনে তিনি উসামা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে বসিয়ে নিলেন। গন্তব্য ছিল বনু হারিস বিন খাজরাজ। উদ্দেশ্য-অসুস্থ সাদ বিন উবাদা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে দেখতে যাওয়া। এ ঘটনা বদরের আগেকার।'
যাওয়ার পথে একটি মজলিসের দেখা পেলেন। মুসলিম, মূর্তিপূজক মুশরিক ও ইহুদিদের মিশেল ছিল সে মজলিসটি। তাদের মাঝে যেমন আব্দুল্লাহ বিন উবাই ছিল, তেমনই ছিলেন আব্দুল্লাহ বিন রওয়াহা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)। ইবনে উবাই তখনো ইসলাম প্রকাশ করেনি।'
বাহন চলার ফলে উড়ন্ত ধুলা এসে মজলিসের লোকদের ঘিরে ধরল। ইবনে উবাই চাদরে মুখ-নাক ঢাকল। এরপর বলল, "আমাদের ওপর ধুলা উড়াবেন না।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সালাম দিলেন। ৪৮৬ সেখানে থামলেন। বাহন থেকে নেমে তাদের দাওয়াত দিলেন আল্লাহর পথে। তিলাওয়াত করলেন কুরআনের আয়াত। তখন আব্দুল্লাহ বিন উবাই বলে উঠল, "হে লোক, যদি আপনার কথা সত্য হয়ে থাকে, তবে তা বেশ উত্তম কথা। কিন্তু আমাদের কষ্ট না দিয়ে এ মজলিসকে বিরক্ত না করে আপনার বাহনে ফিরে যান। আমাদের মধ্যকার যে আপনার কাছে যাবে, তাকে আপনি এসব শুনাবেন।"
এদিকে আব্দুল্লাহ বিন রওয়াহা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উদ্দেশে বললেন, "আমাদের মজলিস ধুলোয় ভরে দিন। আমরা সেটাই পছন্দ করি।"
তখন মুসলিম, মুশরিক ও ইহুদি-পরস্পরের মাঝে বিবাদ লেগে গেল। একজন আরেকজনকে মারতে উদ্যত হলো।'
অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, 'যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবনে উবাইয়ের কাছে আসলেন। সে বলে উঠল, "আমার থেকে দূরে থাকুন। আল্লাহর শপথ, আপনার গাধার দুর্গন্ধে আমি কষ্ট পাচ্ছি।"
তখন আনসারদের একজন জবাবে বললেন, "আল্লাহর শপথ, ইবনে উবাই, তোমার গায়ের গন্ধ থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গাধাটির গন্ধ অধিক উত্তম ও পবিত্র।"
তখন ইবনে উবাইয়ের গোত্রের এক লোক রেগে এসে সে আনসারি সাহাবিকে গালি দিল। তখন উভয়ের সাথি-সঙ্গীরা রাগে ফেটে পড়ল। কেউ খেজুরের ডাল দিয়ে মারতে লাগল, কেউ হাত দিয়ে, তো কেউ জুতো দিয়ে। আর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের শান্ত করার চেষ্টা করতে থাকলেন। '৪৮৭
উসামা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদিসে ফিরে যাই, 'এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহনে চড়ে সাদ বিন উবাদা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে চলে এলেন। তাকে বললেন, "সাদ, তুমি কি আবু হুবাবের কথা শুনোনি? সে এমন এমন বলেছে।"৪৮৮
সাদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, "তাকে মাফ করে দিন, হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহর কসম, আপনাকে আল্লাহ যা দেওয়ার দিয়েছেন। কিন্তু এ লোককে জনগণ নেতৃত্বের মুকুট পরাতে চাইছিল। কিন্তু এরপর আল্লাহ সে নেতৃত্ব আপনার হাতে দিয়ে দিলেন। আর সে রাগে ফেটে পড়ল। সে রাগের কারণেই তার এমন আচরণ।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবনে উবাইকে ক্ষমা করে দিলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবিগণ মুশরিক ও আহলে কিতাবদের ক্ষমা ও মার্জনা করতেন। তাদের কষ্টের ওপর ধৈর্যধারণ করতেন। কেননা, এমনটাই তখন পর্যন্ত আল্লাহর আদেশ ছিল।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَتُبْلَوُنَّ فِي أَمْوَالِكُمْ وَأَنفُسِكُمْ وَلَتَسْمَعُنَّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِن قَبْلِكُمْ وَمِنَ الَّذِينَ أَشْرَكُوا أَذًى كَثِيرًا، وَإِن تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ ذُلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ
"অবশ্যই তোমরা তোমাদের ধনসম্পদ ও জীবনের ক্ষেত্রে পরীক্ষিত হবে। আহলে কিতাব ও মুশরিকদের নিকট থেকে তোমাদের বহু দুঃখজনক বাক্য শুনতে হবে। যদি তোমরা ধৈর্যধারণ করো এবং সংযমী হও, তাহলে অবশ্যই এটা দৃঢ় সংকল্পের অন্তর্গত।” [সুরা আলি ইমরান, ৩: ১৮৬]
আল্লাহ তাআলা এ আয়াতে ধৈর্যধারণ করতে ও সংযমী হতে আদেশ করেছেন। যতদিন না কিতালের আয়াত নাজিল হলো, ততদিন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াত অনুযায়ী মুশরিক ও ইহুদিদের ক্ষমা করে ধৈর্যধারণ করেছেন। '৪৮৯
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক মুশরিক ও ইহুদির প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। তাদের অনেককে বন্দিত্ব থেকে মুক্ত করেছিলেন। অনেক মুনাফিককে তিনি অকাতরে ক্ষমা করে দিয়েছেন। হাদিস ও সিরাতের গ্রন্থগুলোতে এ রকম অনেক প্রসিদ্ধ ঘটনা এসেছে।
এ হাদিসের মাঝে আমরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহিষ্ণুতার অনুপম এক বর্ণনা দেখলাম। মুনাফিকদের সরদার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কষ্ট দিলেও তিনি কিন্তু রেগে যাননি। ইবনে উবাই এখানে কয়েকবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি কটু আচরণ করেছে। প্রথমে সে বলল, 'আমাদের ওপর ধুলা উড়াবেন না।' এরপর সে চাদরে নিজের নাক ঢেকে নিল। এরপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বেয়াদবি পর্যন্ত করল। তাঁকে অবজ্ঞা করে 'হে লোক' বলে সম্বোধন করল।
ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
'আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অন্যের কষ্টের ওপর ধৈর্যধারণ করা, তাকে ক্ষমা করে দেওয়া, সংযমী হওয়ার সাথে সাথে তাকে আল্লাহর পথে আহ্বান করা ও তার অন্তর ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার বিষয়ে এ হাদিসটি এক অনুপম বর্ণনা। '৪৯০
দাওয়াতের প্রথম যুগে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি আদেশ ছিল ক্ষমা ও মার্জনার।
فَاعْفُوا وَاصْفَحُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ - 'আল্লাহর নির্দেশ আসা পর্যন্ত তোমরা তাদের ক্ষমা করো এবং উপেক্ষা করো।' [সুরা আল-বাকারা, ২: ১০৯] فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ -'তুমি যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছ, তা প্রকাশ্যে প্রচার করো এবং মুশরিকদের উপেক্ষা করো।' [সুরা আল-হিজর, ১৫: ৯৪]
মুসলিমদের শক্তিশালী হওয়া ও যুদ্ধ করার সামর্থ্য হওয়ার আগ পর্যন্ত কাফির, মুশরিক ও মুনাফিকদের ক্ষমা করার আদেশ ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কিতালের আয়াতের মাধ্যমে তা রহিত হয়ে যায়।
টিকাঃ
৪৬৫. সুরা আল-বাকারা, ২:৮।
৪৬৬. সুরা আল-বাকারা, ২: ৯।
৪৬৭. সুরা আল-বাকারা, ২: ১১-১২।
৪৬৮. সুরা আল-বাকারা, ২: ২০৪-২০৬।
৪৬৯. সুরা আন-নিসা, ৪: ১৪২।
৪৭০. সুরা আল-বাকারা, ২: ১৪।
৪৭১. সুরা আত-তাওবা, ৯: ৭৯।
৪৭২. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১১৮।
৪৭৩. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১২০।
৪৭৪. সুরা আন-নিসা, ৪: ১৪১।
৪৭৫. সুরা আন-নিসা, ৪: ১৩৮-১৩৯।
৪৭৬. সুরা আল-হাশর, ৫৯: ১১।
৪৭৭. সুরা আন-নুর, ২৪: ৪৭-৫০।
৪৭৮. সুরা আন-নিসা, ৪: ৬০-৬৩।
৪৭৯. সুরা আল-মুনাফিকুন, ৬৩: ৫।
৪৮০. সুরা আন-নূর, ২৪: ১৯।
৪৮১. সুরা আল-মুনাফিকুন, ৬৩: ৭।
৪৮২. সুরা আত-তাওবা, ৯: ৬৭।
৪৮৩. মাদারিজুস সালিকিন: ১/৩৫৪।
৪৮৪. মাজমুউল ফাতওয়া: ৭/২১২।
৪৮৫. তার বাবার নাম, উবাই; মায়ের নাম, সাদুল। পিতামাতা উভয়ের দিকে তাকে সম্বন্ধ করে ডাকা হতো।
৪৮৬. মুসলিম ও কাফির একত্র হয়ে আছে এমন স্থানে তাদের সালাম দেওয়া জায়িজ। দেখুন, ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১২/১৫৮।
৪৮৭. সহিহুল বুখারি: ২৬৯৯, সহিহু মুসলিম: ১৭৯৯।
৪৮৮. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের কুনিয়াত ধরে কথা বলছিলেন। কারণ, সে এ কুনিয়াতেই প্রসিদ্ধ ছিল। অথবা কারণটা ছিল ইবনে উবাইকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করা।
৪৮৯. সহিহুল বুখারি: ৬২৫৪, সহিহু মুসলিম: ১৭৯৮।
৪৯০. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১২/১৫৯।
📄 ইবনে সালুলের ধোঁকাবাজি ও প্রতারণা
বদর যুদ্ধের পর মুসলিমদের শক্তি বৃদ্ধি পেলে ইবনে সালুল ও অনেক মুশরিক প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিলেও বস্তুত তারা নিফাকি করে মুসলিমদের ধোঁকা দিচ্ছিল।
উসামা বিন জাইদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বদরে যুদ্ধ করলেন, তখন আল্লাহ তাআলা সে যুদ্ধে কাফিরদের বড় বড় ও কুরাইশদের নেতৃস্থানীয় লোকদের ধ্বংস করলেন। যুদ্ধ শেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবিগণ গনিমতের সাথে কাফিরদের বড় বড় ও কুরাইশদের নেতৃস্থানীয় লোকদের বিশাল একটি দলকে বন্দী করে বিজয়ী বেশে মদিনায় ফিরে আসলেন। তখন ইবনে উবাই এবং তার সাথের মুশরিক ও মূর্তিপূজারিরা বলল, "ইসলাম তো বিজয়ী হয়ে গেছে। (এটি পরিবর্তন করার শক্তি তো আমাদের নেই, আমাদের কোনো আশাও আর বাকি নেই।") এরপর তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে ইসলামের ওপর বাইআত হয়ে নিজেদের মুসলিম হিসেবে উপস্থাপন করল। '৪৯১
মূলত ইবনে উবাই ও তার সঙ্গীরা ভয় ও শঙ্কার কারণে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। এ হাদিস থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে, মুসলিমরা যখন বিজয়ী ও শক্তিশালী থাকে, মুনাফিকরা তখন ভীত ও শঙ্কিত থাকে। ফলে তারা নিফাকি করে তাদের প্রাণ বাঁচায় এবং নিজেদের ষড়যন্ত্র চালিয়ে যায়। আর মুসলিমরা যখন দুর্বল থাকে, তখন মুনাফিকরা তাদের ক্ষতি করতে থাকে এবং বিবিধ কষ্টে নিপতিত করে তাদের।
মুনাফিকরা যদিও ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছিল, কিন্তু মুসলমান ও ইসলামের প্রতি তাদের শত্রুতা এতটুকুও কমেনি। তাদের গোপন ষড়যন্ত্র একটুও থামেনি। তারা ষড়যন্ত্রের নীলনকশা এঁকে চলছিল নিজেদের মধ্যে। মুসলিমদের ওপর আক্রমণ করার জন্য ওত পেতে থাকল একটা মোক্ষম সময়ের আশায়।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'মুহাজিরদের মধ্যে কেউ মুনাফিক ছিলেন না। মুনাফিক সম্প্রদায়টি আনসারদের মধ্য থেকে উদ্ভূত হয়। কারণ, আনসাররা ছিলেন মদিনার অধিবাসী। যখন মদিনার সম্মানিত ব্যক্তিগণ ও অধিকাংশ মানুষজন ইসলাম গ্রহণ করলেন, তখন বাকিদের নিফাকের রাস্তা অবলম্বন করে ইসলাম ঘোষণা করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকল না। কেননা, তখন ইসলাম সম্মানিত ও তাদের গোত্রের মাঝে বিজয়ী।
অন্যদিকে মক্কার সম্মানিত ব্যক্তিরা ও অধিকাংশ মানুষ ছিল কাফির। তাদের মধ্যে যে মনেপ্রাণে ইসলাম গ্রহণ করেছে, সে-ই ইমান গ্রহণের কথা প্রকাশ করতেন। কারণ, যে-ই ইসলামের ঘোষণা দিত, সে নির্যাতিত হতো এবং হিজরত করতে হতো তাকে। মক্কায় ইসলাম গ্রহণের ঘোষণার অর্থ ছিল দুনিয়ার বিষয়ে বিপদাপন্ন হওয়া। আর মুনাফিকরা তাদের দুনিয়া বাঁচানোর জন্যই ইসলামের ঘোষণা দিয়েছিল। '৪৯২
টিকাঃ
৪৯১. সহিহুল বুখারি: ৪৫৬৬।
৪৯২. আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা ৩/৪৫০।
📄 মুনাফিকরা ইহুদিদের সাথে মিলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করত
ইহুদিদের সাথে আঁতাত করে মুসলিমদের সমূলে উৎখাত করার জন্য মুনাফিকরা এক ঘোর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল। ইহুদিদের সাথে তাদের আঁতাত থাকার বিষয়টা বনি কাইনুকার অপরাধের পরও তাদের প্রতি মুনাফিকদের পক্ষাবলম্বনের আচরণ থেকে স্পষ্ট বুঝে আসে। বনি কাইনুকার সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সন্ধি ছিল যে, কেউ কারও ওপর আক্রমণ করবে না এবং সীমালঙ্ঘন করবে না। কিন্তু বনি কাইনুকা সন্ধি ভঙ্গ করল।
আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'বদরের যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশদের পরাজিত করে মদিনায় এলেন। বনি কাইনুকার বাজারে ইহুদিদের একত্র করলেন। তাদের উদ্দেশে বললেন, "হে ইহুদিজাতি, কুরাইশদের মতো পরিণতি বরণ করার আগেই তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো।"৪৯৩
তারা বলল, “হে মুহাম্মাদ, আপনি নিজেই ধোঁকায় পড়বেন না। আপনি মূর্খ কুরাইশ জাতির সাথে যুদ্ধ করেছেন। তারা তো যুদ্ধই করতে জানে না। যদি আমাদের সাথে যুদ্ধ করতেন, তবে জানতেন, আসল যোদ্ধা কাকে বলে। আমাদের মতো কারও সাথে ইতিপূর্বে আপনার সাক্ষাৎ হয়নি।"
এরপর আল্লাহ তাআলা এ ব্যাপারে নাজিল করলেন:
قُل لِلَّذِينَ كَفَرُوا سَتُغْلَبُونَ وَتُحْشَرُونَ إِلَى جَهَنَّمَ، وَبِئْسَ الْمِهَادُ
“যারা কুফরি করে তাদের বলে দাও, তোমরা অচিরেই পরাজিত হবে আর জাহান্নামের দিকে নীত হবে তোমরা। আর সেটা কতই না নিকৃষ্ট আবাসস্থান।" [সুরা আলি ইমরান, ৩: ১২]'৪৯৪
আবু আওন মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ সাকাফি (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে ইবনে হিশাম (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেছেন, 'এক বেদুইন মুসলিম নারী তার উটের জিন নিয়ে বনি কাইনুকার বাজারে আসলো। জিনটি বাজারে বিক্রি করে স্বর্ণকারের দোকানে গিয়ে বসল। দোকানের কিছু লোক তার চেহারা দেখতে চাইলে তিনি পরিষ্কার অস্বীকার করে দিলেন। এদিকে স্বর্ণকার তার কাপড়ের একটি কোণা তার পিঠের দিকে বেঁধে দিল। এ মহীয়সী নারী উঠে দাঁড়ালে তার আবরণ প্রকাশ হয়ে পড়ে। এতে সে লোকগুলো হেসে উঠল। আর মুসলিম সে নারী জোরে চিৎকার করে উঠলেন।'
এক মুসলিম পুরুষ এগিয়ে এসে সে স্বর্ণকারের ওপর হামলে পড়লেন। তাকে হত্যা করলেন। স্বর্ণকার ছিল জাতে ইহুদি। এবার ইহুদিরা চড়াও হলো এ মুসলিমের ওপর। তাকে হত্যা করে ফেলল। মুসলিমরা তখন ইহুদিদের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য অপর মুসলিমদের প্রতি সাহায্যের আবেদন করে চিৎকার করে উঠলেন। তারা ঘটনা শুনে প্রচণ্ড রেগে গেলেন। মুসলিমদের মাঝে ও বনি কাইনুকার মাঝে লড়াই অবধারিত হয়ে পড়ল। '৪৯৫
ইহুদিদের এ কাণ্ডের ফলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধনীতি গ্রহণ করলেন। তাদের দুর্গ অবরোধ করল মুসলিমরা। তাদের ওপর প্রচণ্ড অবরোধ আরোপ করলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। শেষ পর্যন্ত তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সিদ্ধান্ত মেনে নেবে বলে আত্মসমর্পণ করল।
ইমাম ইবনে ইসহাক (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আসিম বিন উমর বিন কাতাদা (রাহিমাহুল্লাহ) আমাকে বলেছেন, "এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের অবরোধ করলেন। শেষ পর্যন্ত তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সিদ্ধান্ত মেনে নেবে বলে আত্মসমর্পণ করল। আল্লাহ তাআলা ইহুদিদের ওপর তাঁকে বিজয়ী করলেন। তখন ইবনে উবাই কাছে এগিয়ে এসে বলল, "হে মুহাম্মাদ, আমার মিত্রদের প্রতি সদ্ব্যবহার করুন।"
ইতিপূর্বে বনি কাইনুকা ও ইবনে উবাইয়ের গোত্র খাজরাজের মাঝে মিত্রতা ছিল।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো জবাব দিলেন না।
সে আবার বলল, “হে মুহাম্মাদ, আমার মিত্রদের প্রতি সদ্ব্যবহার করুন।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
ইবনে উবাই এবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বর্মের পকেটে তার হাত প্রবেশ করালো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ছাড়তে বললেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারায় তখন রাগের প্রভাব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। ৪৯৬ তিনি বলে উঠলেন, “তোমার ধ্বংস হোক, ছাড়ো আমাকে!"
ইবনে উবাই বলল, "না, আল্লাহর কসম, আমি আপনাকে ততক্ষণ ছাড়ব না, যতক্ষণ না আপনি আমার মিত্রদের প্রতি সদ্ব্যবহার করছেন। তাদের মাঝে বর্মহীন চারশ লোক, বর্ম পরিহিত তিনশ ব্যক্তি আছে। তারা আমাকে আরব-আজমের লোকদের থেকে রক্ষা করে আসছে। আর আপনি তাদের এক সকালেই অনায়াসে হত্যা করে ফেলবেন?! আমি সামনেও বিপদের ভয় করি। (তখন আমার সহযোগী তো এরাই হবে। যদি আপনি তাদের হত্যা করে ফেলেন, তবে তো আমি বিপদে ফেঁসে যাব।)"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, "ঠিক আছে।"৪৯৭
ইবনে উবাই তখনো তার গোত্রের মাঝে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ছিল। তাই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সুপারিশ গ্রহণ করে বনি কাইনুকার লোকগুলোকে হত্যা না করে মদিনার বাইরে বিতাড়িত করলেন। তাদের সাথে অস্ত্র ব্যতীত কেবল তাদের সম্পদ নেওয়ার অনুমতি দিলেন।
টিকাঃ
৪৯৩. অন্য একটি রিওয়ায়াতে এসেছে, 'নিশ্চয়ই তোমরা জানো, আমি আল্লাহর প্রেরিত নবি। আল্লাহ তোমাদের এ বিষয়ে ওয়াদা দিয়েছেন। তোমরা তা তোমাদের কিতাবেই পেয়েছ।' ইবনে ইসহাক কৃত আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ১/৩১৩।
৪৯৪. সুনানু আবি দাউদ: ৩০০১। ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) ফাতহুল বারিতে এ হাদিসটিকে হাসান বলেছেন। আবার আহমাদ শাকির (রাহিমাহুল্লাহ) উমদাতুত তাফসিরে এ হাদিসকে সহিহ বলেছেন। আর আলবানি (রাহিমাহুল্লাহ) এ হাদিসকে জইফ বলেছেন।
৪৯৫. ইবনে হিশাম কৃত আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ২/৪৮।
৪৯৬. সে সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিরস্ত্রাণ পরিহিত ছিলেন না।
৪৯৭. ইবনে হিশাম কৃত আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ ২/৪৮। সনদ হাসান, তবে মুরসাল।
📄 উহুদ যুদ্ধে মুনাফিকরা প্রতারণার করে পথ থেকে ফিরে এল
উহুদ যুদ্ধের দিন মুনাফিকরা যুদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে এক-তৃতীয়াংশ সৈন্য নিয়ে চলে গেলেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কোনো শাস্তি দেননি।
জাইদ বিন সাবিত (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদের ময়দানের উদ্দেশ্যে বের হলেন। এদিকে ময়দানের উদ্দেশ্যে বের হওয়া সৈন্যের একাংশ ফিরে চলে যায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবিদের মাঝে তখন দুভাগ হয়ে যায়। একভাগ বলল, "আমরা যুদ্ধ করব।" আরেক ভাগ বলল, "আমরা যুদ্ধ করব না।" তখন নাজিল হলো:
فَمَا لَكُمْ فِي الْمُنَافِقِينَ فِئَتَيْنِ وَاللَّهُ أَرْكَسَهُم بِمَا كَسَبُوا أَتُرِيدُونَ أَن تَهْدُوا مَنْ أَضَلَّ اللَّهُ وَمَن يُضْلِلِ اللَّهُ فَلَن تَجِدَ لَهُ سَبِيلًا
“তোমাদের কী হলো যে, মুনাফিকদের ব্যাপারে (কী নীতি অবলম্বন করা হবে, তা নিয়ে) তোমরা দুদলে বিভক্ত হয়ে গেলে? বস্তুত আল্লাহ তাদের এ কার্যকলাপের কারণে তাদের উল্টো মুখে (ইসলাম থেকে কুফরের দিকে) ফিরিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, তোমরা কি তাকে সুপথ দেখাতে চাও? বস্তুত আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তার জন্য কখনো পথ খুঁজে পাবে না।” [সুরা আন-নিসা, ৪: ৮৮]৪৯৮
'ময়দানের উদ্দেশ্যে বের হওয়া সৈন্যের একাংশ ফিরে চলে যায়'-অর্থাৎ আব্দুল্লাহ বিন উবাই ও তার সঙ্গী মুনাফিকরা ফিরে চলে যায়। এ বর্ণনায় নাম স্পষ্ট না এলেও মুসা বিন উকবা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর বর্ণনায় নাম স্পষ্টভাবে এসেছে। উহুদ যুদ্ধের প্রাক্কালে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় মুসলিমদের সাথে পরামর্শে বসলেন। তখন একদল মুসলমান পরামর্শ দিলেন মদিনার ভেতরে থেকে যুদ্ধ করার। কিন্তু যুবকরা পরামর্শ দিল মদিনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করার। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মত ছিল প্রথম পরামর্শের পক্ষে। আব্দুল্লাহ বিন উবাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে একমত হয়েছিল তখন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিদ্ধান্ত দিলেন দ্বিতীয় পরামর্শের ওপর। তখন ইবনে উবাইও মদিনা থেকে বের হতে বাধ্য হলো। আব্দুল্লাহ বিন উবাই তার সঙ্গীদের উদ্দেশে বলেছিল, 'তিনি তাদের কথা মেনে নিলেন। আর আমার কথাটা ফেলে দিলেন। তবে কেনই-বা আমরা নিজেদের প্রাণ দিয়ে যুদ্ধ করব?' এরপর সৈন্যদের এক-তৃতীয়াংশ নিয়ে ফিরে গেল সে।
ইমাম ইবনে ইসহাক (রাহিমাহুল্লাহ) তার বর্ণনায় উল্লেখ করেন, 'জাবির (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর পিতা আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন হারাম (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ছিলেন খাজরাজ গোত্রের। তিনি ইবনে উবাইয়ের পেছনে এসে তাদেরকে আল্লাহর নামে শপথ করে ফিরে আসার অনুরোধ করলেন। কিন্তু তারা ফিরে আসতে অস্বীকৃতি জানাল। তখন তিনি বললেন, "আল্লাহ তোমাদের দূরে রাখুন, হে আল্লাহর দুশমনেরা! নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তোমাদের থেকে অমুখাপেক্ষী রাখবেন। "৪৯৯
টিকাঃ
৪৯৮. সহিহুল বুখারি: ৪০৫০, সহিহু মুসলিম: ২৭৭৬।
৪৯৯. ইবনে হিশাম কৃত আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ ২/৬৪, ফাতহুল বারি: ৭/৩৫৬।