📄 গুনাহের উপকরণ নিজ হাতে দূর করতেন
কখনো গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি থেকে গুনাহের উপকরণটি তিনি নিজ হাতে দূর করতেন, যাতে তারা তার কদর্যতা অনুভব করতে পারে।
আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক লোকের হাতে স্বর্ণের আংটি দেখলেন। তিনি আংটিটা তার হাত থেকে খুলে দূরে নিক্ষেপ করলেন। অতঃপর বললেন, "তোমাদের কেউ কেউ আগুনের টুকরো নিয়ে হাতে ধরে রাখে!"
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চলে গেলে সে লোককে বলা হলো, "আংটিটা তুলে নাও। অন্য কাজে লাগাও।"
কিন্তু সে বলল, "কখনো না। যে জিনিস রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে নিক্ষেপ করেছেন, সেটি কখনো আমি নেব না।"৪৪৪
ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদেশ ও নিষেধের অনুগত হওয়া, দুর্বল ব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়ে আদেশ-নিষেধ লঙ্ঘন না করার ক্ষেত্রে এ হাদিসটি অত্যন্ত শিক্ষণীয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন, তাই এ সাহাবি তাঁর আদেশ পালনে এতটুকু খুঁত রাখতেও রাজি হননি। সাহাবির এ আচরণ আমাদেরকে শরিয়তের আদেশ-নিষেধ একনিষ্ঠভাবে মানার গুরুত্ব শিখিয়ে যায়।'
সাহাবি আংটিটা ত্যাগ করলেন অন্যদের জন্য বৈধ করে। দরিদ্র বা অন্য কেউ যদি সে আংটি নিতে চাইলে নিতে পারত। কেউ নিলে নিজের মতো ব্যবহার করতে পারে সে আংটিকে।
যদি আংটির মালিক সে সাহাবিও আংটিটা পরবর্তী সময়ে নিতেন, তবুও তাতে কোনো সমস্যা ছিল না। তার জন্য পুনরায় আংটিটা নিয়ে বিক্রি করে দেওয়া বা অন্য কাজে ব্যবহার করা জায়িজ হতো। কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব দিক থেকে স্বর্ণের আংটির ব্যবহার নিষেধ করেননি; কেবল তা পরতে নিষেধ করেছিলেন। হাতে-গলায় পরা ব্যতীত বিক্রি করে দেওয়া বা অন্য কোনোভাবে তা ব্যবহার করা জায়িজ ছিল। কিন্তু তার দ্বীনদারি তাকে বাধা দিয়েছে। ফলে তিনি কোনো অভাবীর জন্য তা সাদাকা করার নিয়ত করে পরিত্যাগ করলেন। '৪৪৫
এ রকম আরেকটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে, আবু সালাবা খুশানি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ঘটনা। 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার হাতে স্বর্ণের আংটি দেখলে সাথে থাকা লাঠি দিয়ে আঘাত করতে লাগলেন তার হাতে। এরপর তিনি যখন অন্যদিকে মনোযোগ দিলেন, এ ফাঁকে আবু সালাবা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আংটিটি খুলে ফেলে দিলেন। কিছুক্ষণ পর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাকিয়ে দেখেন, তার আঙুলে আংটিটি নেই। তিনি বললেন, "মনে হচ্ছে, আমি তোমাকে কষ্টে ফেলে দিলাম, তোমার আর্থিক ক্ষতি করলাম!"৪৪৬
ইমাম ইবনে হিব্বান (রাহিমাহুল্লাহ) এ হাদিসটি যে অধ্যায়ে এনেছেন, সে অধ্যায়ের নামকরণ করেছেন, 'বাড়াবাড়ি না করেই মুখে না বলে হাত দিয়ে কাউকে মন্দ থেকে নিষেধ করা জায়িজ। '৪৪৭
টিকাঃ
৪৪৪. সহিহু মুসলিম: ২০৯০।
৪৪৫. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৪/৬৬।
৪৪৬. সুনানুন নাসায়ি ৫১৯০, মুসনাদু আহমাদ: ১৭২৯৫।
৪৪৭. সহিহু ইবনি হিব্বান: ১/৫৩৮।
📄 গুনাহের কদর্যতা বোঝাতে মুখ ফিরিয়ে নিতেন
আবু সাইদ খুদরি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'নাজরানের এক লোক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলেন। হাতে তার স্বর্ণের একটি আংটি ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বললেন, "তুমি আমার কাছে আসলে; অথচ তোমার হাতে আগুনের একটি টুকরো রয়েছে!"৪৪৮
টিকাঃ
৪৪৮. সুনানুন নাসায়ি: ৫১৮৮।
📄 গুনাহগারের নাম সবার সামনে স্পষ্ট করে বলতেন
প্রায় সময় অপরাধের তিরস্কারের সময় কারও নাম স্পষ্ট করে না বলে 'লোকদের কী হলো?'-এভাবে বলতেন।
আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'তার কাছে বারিরা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) আসলেন কিতাবাতের ৪৪৯ ব্যাপারে কিছু সাহায্য চাইতে।' আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) তাকে বললেন, 'তুমি চাইলে আমি তোমার মনিবের পাওনা পরিশোধ করে দেবো। তবে শর্ত হচ্ছে, তোমার উত্তরাধিকার-স্বত্ব থাকবে আমার। বারিরা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর মনিব বললেন, 'আপনি ইচ্ছে করলে তাকে মুক্ত করে দিন, তবে তার উত্তরাধিকার-স্বত্ব থাকবে আমাদের।'
আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসলে আমি বিষয়টা তাঁকে জানালাম।' তিনি বললেন, 'তাকে কিনে নিয়ে মুক্ত করে দাও। দাস-মুক্তকারীই আজাদকৃত দাসের উত্তরাধিকারী হয়।'
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে এসে মিম্বারে উঠলেন এবং বললেন, 'লোকদের কী হলো যে, তারা এমন শর্ত আরোপ করে, যে শর্ত আল্লাহর কিতাবে নেই?! আল্লাহর কিতাবে নেই-এমন শর্ত যে আরোপ করবে, সে শর্তের কোনো মূল্য নেই; যদিও এরূপ শর্ত সে শতবার করুক। '৪৫০
আবু হুমাইদ সায়িদি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে বনি সুলাইম গোত্রের জাকাত উত্তোলনের জন্য নিয়োগ করলেন। তার নাম ছিল ইবনে লাতবিয়া। জাকাত উত্তোলন শেষে সে আসলো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিসেব চাইলে সে বলল, "এটা আপনাদের। আর এটা আমাকে হাদিয়া দেওয়া হয়েছে।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, "তাহলে তুমি তোমার বাবা-মায়ের ঘরে বসে থাকলেই পারতে? সেখানেও তোমার হাদিয়া পৌঁছে দেওয়া হতো, যদি তুমি সত্যবাদী হও!"
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের উদ্দেশে খুতবা দিলেন। আল্লাহর প্রশংসা আদায় করে তিনি বললেন, "হামদ ও সালাতের পর। সে কর্মচারীর কী হলো, যাকে আমরা নিয়োগ দিলাম!? সে আমাদের কাছে এসে বলে, "এটা আপনাদের আর এটা আমাকে হাদিয়া দেওয়া হয়েছে।" সে কেন তার বাবা-মায়ের ঘরে বসে থাকল না? এরপর সে দেখত, তার হাদিয়া আসে কি না!
যাঁর হাতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রাণ-তাঁর শপথ, তোমাদের যে-ই কিছু আত্মসাৎ করবে, কিয়ামতের দিন নিজ কাঁধে বয়ে সে তা নিয়ে উপস্থিত হবে। যদি কেউ উট আত্মসাৎ করে, তবে সে উট তার কাঁধে বয়ে আসবে গরগর করে গর্জন করা অবস্থায়। যদি তা গাভি হয়, তবে সে গাভি কাঁধে বয়ে আসবে গর্জন করা অবস্থায়। যদি তা ছাগল হয়, তবে সে ছাগল কাঁধে বয়ে আসবে আওয়াজ করা অবস্থায়।” এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুহাত ওঠালেন। এমনকি তাঁর বগলের শুভ্রতা দেখতে পেলাম আমরা। হাত উঠিয়ে তিনি তিনবার বললেন, “হে আল্লাহ, আমি কি পৌঁছে দিয়েছি?”"৪৫১
আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে (অপছন্দনীয়) কোনো খবর আসলে, তিনি নাম ধরে বলতেন না যে, অমুকের কী হলো? বরং তিনি বলতেন, “লোকদের কী হলো যে, তারা এমন এমন বলে?!"৪৫২
ইবনুল কাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'কারও মাঝে অপছন্দনীয় কিছু দেখলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সরাসরি তাকে সম্বোধন করতেন না; বরং তিনি নাম উল্লেখ না করে বলতেন, "লোকদের কী হলো, তারা এমন এমন বলে, এমন এমন করে?!"৪৫৩
টিকাঃ
৪৪৯. কিতাবাত হচ্ছে, অর্থের বিনিময়ে দাসত্ব থেকে মুক্তিসংক্রান্ত মনিবের সাথে কৃত চুক্তি।
৪৫০. সহিহুল বুখারি: ৪৫৬, সহিহু মুসলিম ১৫০৪।
৪৫১. সহিহুল বুখারি: ২৫৯৭, সহিহু মুসলিম: ১৮৩২।
৪৫২. সুনানু আবি দাউদ: ৪৭৮৮।
৪৫৩. জাদুল মুহাজির ইলা রব্বিহি: ৬৭।
📄 কখনো রাগান্বিত হতেন এবং কঠোর নিন্দা করতেন
ইমরান বিন হুসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আনসারদের একজন মৃত্যুর সময় তার ছয় দাসকে মুক্ত করে দেওয়ার অসিয়ত করে। এ ছয় দাস ছাড়া তার আর কোনো সম্পদ ছিল না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়টা জানতে পেরে রেগে গিয়ে তাকে কঠিন কথা বললেন। বললেন, "আমি ইচ্ছে করেছি, তার জানাজা পড়ব না। "৪৫৪
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দাসগুলোকে ডেকে পাঠালেন। তাদের তিনটি ভাগে বিভক্ত করলেন। লটারি করলেন তাদের মাঝে। লটারিতে উত্তীর্ণ দুজনকে মুক্ত করে দিলেন। বাকি চারজনকে দাস করে রাখলেন। '৪৫৫
টিকাঃ
৪৫৪. 'এ সাহাবির মতো যেন অন্যরা এমনটা না করে; তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জানাজা না পড়ার কথা ব্যক্ত করেছিলেন। নতুবা কয়েকজন সাহাবি তার জানাজা আদায় করে ফরজ দায়িত্ব আদায় করছেন।' -ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১১/১৪০।
৪৫৫. সহিহু মুসলিম: ১৬৬৮, সুনানুন নাসায়ি ১৯৫৮। 'আমি ইচ্ছে করেছি, তার জানাজা পড়ব না' এ অংশটা কেবল নাসায়িতে আছে। আর নাসায়ির হাদিসটিও সহিহ।