📄 হদের কোনো বিচার নিয়ে আসলে অপছন্দ করতেন
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'মুসলিমদের মধ্যে প্রথম যার হাত কেটে হদ প্রয়োগ করা হয়, সে লোকটাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে নিয়ে আসা হলো। বলা হলো, "হে আল্লাহর রাসুল, এ লোকটা চুরি করেছে।” এ কথা শুনে চিন্তায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়।'
তখন লোকেরা বলল, “হে আল্লাহর রাসুল, মনে হচ্ছে তার হাত কর্তন করা আপনি অপছন্দ করেছেন?"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, "এখন হাত না কেটে আমার আর কী উপায় আছে?! তোমরা তোমাদের সাথির বিরুদ্ধে শয়তানের সহযোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছ। আল্লাহ হলেন ক্ষমাশীল। তিনি ক্ষমা করা পছন্দ করেন। কিন্তু কোনো কর্তৃত্বশীলের জন্য উচিত নয় যে, তার কাছে হদের বিচার আনা হলো; অথচ সে হদ প্রয়োগ করল না।" এতটুকু বলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিলাওয়াত করলেন:
وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُواء أَلَا تُحِبُّونَ أَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
"তারা যেন তাদের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করেন? আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" [সুরা আন-নূর, ২৪: ২২]'৪৩৩
টিকাঃ
৪৩৩. মুসনাদু আহমাদ: ৩৯৬৭। হাদিসের মান: হাসান।
📄 হদ প্রয়োগের ক্ষেত্রে সুপারিশ গ্রহণ করতেন না
ওয়াজিব হদের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক বিন্দু ছাড় দিতেন না। এ ব্যাপারে তাঁর সবচেয়ে প্রিয়জনের সুপারিশও গ্রহণ করতেন না।
আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'মাখজুম গোত্রের এক মহিলা চুরি করল। এখন তার ওপর চুরি করার শাস্তি প্রয়োগ হবে। বিষয়টি কুরাইশদের ভাবিয়ে তুলল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুরি করার হদ হিসেবে তার হাত কাটার আদেশ দিলেন। কুরাইশরা এ বিষয়টি নিয়ে নিজেদের মাঝে আলোচনা করতে লাগল যে, কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কথা বলতে পারে? আলোচনায় ঠিক হলো, একমাত্র রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভালোবাসার পাত্র উসামা বিন জাইদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-ই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে বলার সাহস করতে পারে। উসামা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কথা বললেন এ ব্যাপারে। তার কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। তিনি বললেন, "তুমি কি আল্লাহর হদ বর্জনের ব্যাপারে সুপারিশ করছ?"
উসামা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, "আমার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন, হে আল্লাহর রাসুল।"
সেদিন বিকেলবেলা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বক্তব্য রাখলেন। শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা করে বলা শুরু করেন-"হামদ ও সালাতের পর। নিশ্চয় তোমাদের পূর্ববর্তীদের ধ্বংসের কারণ ছিল, তাদের মাঝে যখন সম্ভ্রান্ত কেউ চুরি করত, তারা তাকে ছেড়ে দিত। আর যখন দুর্বল কেউ চুরি করত, তার ওপর তারা হদ প্রয়োগ করত। আল্লাহর শপথ, যদি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কন্যা ফাতিমা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-ও চুরি করত, তবে অবশ্যই আমি তার হাত কাটতে দ্বিধা করতাম না।" তারপর মহিলাটির হাত কর্তনের নির্দেশ দিলেন; ফলে তার হাত কাটা হলো।'
আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'এরপর সে মহিলা উত্তমরূপে তাওবা করল। তার বিয়ে হলো। সে আমার কাছে মাঝে মাঝে আসত। তার কোনো প্রয়োজন থাকলে আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে তা তুলে ধরতাম। '৪৩৪
অন্য বর্ণনায় এসেছে, আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'হদ প্রয়োগের পর সে নারী বলল, "আমার কি তাওবার কোনো সুযোগ আছে, হে আল্লাহর রাসুল?"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি আজ গুনাহ থেকে সে রকম নিষ্কলুষ, যেমন নিষ্কলুষ থাকে শিশু তার জন্মের দিন।"৪৩৫
হাদিস থেকে বোঝা যায়:
* উলুল আমর তথা দায়িত্বশীলের নিকট যখন হদের বিচার চলে যায়, তখন সুপারিশ নিষিদ্ধ।
ইবনে আব্দুল বার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত গুনাহের বিচার সুলতানের কাছে না পৌঁছে, ততক্ষণ পর্যন্ত একজন গুনাহগারের পক্ষে সুপারিশ করা উত্তম ও নেক কাজ। সুলতানের কাছে বিচার পৌঁছালে সে গুনাহের হদ প্রয়োগ করতে তিনি বাধ্য।
যার ওপর হদ ওয়াজিব হয়েছে, তার পক্ষপাতিত্ব করা নিষিদ্ধ; চাই সে নিজের সন্তান হোক বা নিকটতম আত্মীয়স্বজন হোক কিংবা হোক উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। হদ প্রয়োগ করা ওয়াজিব হয়ে গেছে-এমন লোকের ব্যাপারে যে সুপারিশ করবে বা ছাড় দিতে বলবে, সে তিরস্কারের পাত্র হবে। ৪৩৬
টিকাঃ
৪৩৪. সহিহুল বুখারি ৪৩০৪, সহিহু মুসলিম: ১৬৮৮।
৪৩৫. মুসনাদু আহমাদ: ৬৬১৯। আহমাদ শাকিরের মতে হাদিসের সনদ সহিহ। অন্যদিকে শুআইব আরনাউত হাদিসটিকে জইফ বলেছেন।
৪৩৬. ফাতহুল বারি: ১২/৯৫।
📄 হদ প্রয়োগে অপরাধীর দুর্বলতা বিবেচনা করতেন
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হদ প্রয়োগের ক্ষেত্রে অপরাধীর দুর্বলতা বিবেচনা করতেন এবং শরিয়তে কোনো ছাড় থাকলে সে অনুযায়ী নির্দেশ দিতেন।
সাইদ বিন সাদ বিন উবাদা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'তাদের মধ্যকার এক ব্যক্তি রোগে আক্রান্ত হয়ে হাড্ডিসার হয়ে পড়ে। তাদেরই কারও একজনের দাসী সে লোকের নিকট গেলে উত্তেজিত হয়ে সে দাসীর সাথে সংগম করে বসে। গোত্রের লোকজন তাকে দেখতে গেলে সে তাদের জানাল বিষয়টা। বলল, "আমার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জেনে নাও। আমি অন্যের দাসীর সাথে সংগম করে ফেলেছি।"
তারা বিষয়টি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে উত্থাপন করলেন। তিনি বললেন, "তোমরা তাকে একশ বেত্রাঘাত করো।"
বলা হলো, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, তার মতো রুগ্ন কাউকে ইতিপূর্বে আমরা দেখিনি। যদি আমরা তাকে একশ বেত্রাঘাত করি, তবে সে মারা যাবে। যদি আপনার কাছে তাকে উঠিয়ে নিয়ে আসি, তবে তার হাড়গোড় ভেঙে যাবে। তার গায়ে গোশত বলতে কিছুই নেই। কেবল হাড়ের ওপর কিছুটা চামড়া।"
তাদের কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদেশ দিলেন, তারা যেন একশ পাতলা ডালবিশিষ্ট একটি বড় ডাল দিয়ে তাকে একবার প্রহার করে। '৪৩৭
ইমাম ইবনে হুমাম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'রুগ্ন ব্যক্তি জিনা করলে যদি সে বিবাহিত হয়, তবে সে হত্যাযোগ্য। তাকে রজম করে হত্যা করতে হবে। এমন অবস্থায় জিনা করার কারণে সে রজমের অধিক যোগ্যও বটে।'
পক্ষান্তরে রুগ্ন ব্যক্তি যদি অবিবাহিত অবস্থায় জিনা করে, তবে সুস্থ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। সুস্থ হলে তাকে বেত্রাঘাত করা হবে। কারণ, রুগ্ন অবস্থায় বেত্রাঘাতের শাস্তি প্রয়োগে তার মৃত্যু হতে পারে। কিন্তু যদি অপরাধী আরোগ্যহীন কোনো রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে, যেমন: কেউ যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হলে বা সময়ের পূর্বে জন্ম নেওয়ার কারণে রুগ্ন হলে, তাকে একশ পাতলা ডালবিশিষ্ট বড় একটি ডাল দিয়ে একবার প্রহার করবে। একশটির প্রতিটি ডাল তার গায়ে অবশ্যই লাগতে হবে। তাই বলা হয়ে থাকে যে, মারার সময় ডালসমষ্টিকে চওড়া করে রাখতে হবে। '৪৩৮
ইবনুল কাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এ হাদিস থেকে বোঝা গেল, যার ওপর হদ প্রয়োগ করা হবে, সে যদি ওজরগ্রস্ত হয়, তবে তার ক্ষেত্রে শিথিলতা আছে। তাকে একশ ডাল দিয়ে বা একশ চাবুক একত্রে একবার মারলে হদ আদায় হয়ে যাবে। '৪৩৯
টিকাঃ
৪৩৭. সুনানু আবি দাউদ: ৪৪৭২, সুনানু ইবনি মাজাহ: ২৮৭৪।
৪৩৮. ফাতহুল কাদির: ৫/২৪৫।
৪৩৯. ইগাসাতুল লাহফান: ২/৯৮।
📄 না বুঝে গুনাহ করলে শাস্তি দিতেন না
কেউ ভুলে বা না জেনে গুনাহ করলে তাকে শাস্তিও দিতেন না, তিরস্কারও করতেন না; বরং কোমল আচরণ দিয়ে তাকে সঠিকটা শিখিয়ে দিতেন।
মুআবিয়া বিন হাকাম সুলামি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'একদিন আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে জামাআতে সালাত আদায় করছিলাম। তখন এক লোক হাঁচি দিলে হাঁচির জবাবে আমি "ইয়ারহামুকাল্লাহ” বললাম। অন্যরা তখন আমার প্রতি ক্রুদ্ধ দৃষ্টি ফেলল। আমি তখন বললাম, "আমার মা আমাকে হারিয়ে ফেলুক! ৪৪০ তোমরা এভাবে আমার দিকে তাকাচ্ছ কেন?" কিন্তু তারা কিছু না বলে, নিজেদের উরুর ওপর হাত দিয়ে প্রহার করল কয়েকবার। ৪৪১
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি আমার মা-বাবা কুরবান হোক! তাঁর মতো উত্তম শিক্ষক আমি এর আগেও দেখিনি, এর পরেও দেখিনি। সালাত শেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে না তিরস্কার করলেন, না প্রহার করলেন আর না গালি দিলেন। তিনি কোমল স্বরে বললেন, "সালাতের মাঝে কথা বলা উচিত নয়। সালাত কেবল তাসবিহ, তাকবির ও কুরআন তিলাওয়াতের জন্য।"৪৪২
এই হাদিসে বিবৃত হয়েছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুপম চরিত্রের ছোট্ট একটি ঝলক। যে অনুপম চরিত্রের সাক্ষ্য দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা। অজ্ঞের প্রতি তাঁর কোমলতা, উম্মাহর প্রতি তাঁর দরদ ও স্নেহ-এগুলো তো তাঁর মহান চরিত্রের দু-একটি দিকমাত্র। ৪৪৩
টিকাঃ
৪৪০. অর্থাৎ আমি নিজের প্রতি ভর্ৎসনা করলাম।
৪৪১. মুআবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে চুপ করার জন্য সাহাবিগণ উরুর ওপর হাত মেরেছিলেন। চুপ করানোর এ ধরনটা পূর্বে অনুমোদিত ছিল। পরবর্তী সময়ে এমন কেউ করলে 'সুবহানাল্লাহ' বলে তাকে চুপ করানোর বিধান স্থির হয়।
৪৪২. সহিহু মুসলিম: ৫৩৭।
৪৪৩. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৫/২০।