📄 পুনরায় পাপে লিপ্ত না হওয়ার জন্য গুনাহের কদর্যতা তুলে ধরতেন
গুনাহ থেকে তাওবা করে আবার যাতে গুনাহে লিপ্ত না হয়, সে জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুনাহগারের সামনে গুনাহর কদর্যতা তুলে ধরতেন।
আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'একবার আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললাম, "সাফিয়্যা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর ক্ষেত্রে আপনার জন্য এতটুকুই তো যথেষ্ট যে, সে এমন এমন-অর্থাৎ খাটো।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, "তুমি এমন একটি কথা বলেছ, যদি এ কথা সমুদ্রের পানিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে পানির রং বদলে যাবে।"৪৩০
অর্থাৎ গিবত এতই ভয়ংকর যে, সমুদ্রের বিশালতা ও গভীরতা এবং তাতে এত বেশি পানি থাকা সত্ত্বেও গিবতের এ কথাটা যদি সে পানির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়, তবে সমুদ্রের অবস্থা পাল্টে যাবে। ৪৩১
টিকাঃ
৪২৯. ফাতহুল বারি: ১২/১৯৬।
৪৩০. সুনানু আবি দাউদ: ৪৮৭৫, সুনানুত তিরমিজি: ২৫০২।
৪৩১. তুহফাতুল আহওয়াজি: ৭/১৭৭।
📄 কতিপয় গুনাহগারকে তাওবা কবুল হওয়া পর্যন্ত বয়কট করেছেন
কোনো কোনো গুনাহগারের ব্যাপারে আল্লাহর বিধান নাজিল না হওয়া পর্যন্ত অথবা তাওবা কবুল না হওয়া পর্যন্ত তাদের বয়কট করেছেন।
গাজওয়ায়ে তাবুকে অংশগ্রহণ না করা তিনজন সাহাবির সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাময়িক সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন। কাব বিন মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মুখে শুনুন সে ঘটনার বিবরণ। তিনি বলেন:
'আমি যখন জানতে পেলাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুক থেকে মদিনা অভিমুখে রওনা দিয়েছেন, তখন চিন্তা আমাকে ঘিরে ধরল। আমি বলার মতো মিথ্যা অজুহাত খুঁজতে শুরু করলাম। আগামীকাল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রাগ থেকে বাঁচার জন্য কী বলব, ভাবতে শুরু করলাম। সাহায্যপ্রার্থী হলাম বংশের জ্ঞানী-গুণীদের।'
কিন্তু এরপর আমার মন থেকে এ ভ্রান্ত চিন্তা দূর হয়ে গেল। আমি কখনো মিথ্যা বলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রাগ প্রশমিত করতে পারব না। তাই আমি দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলাম যে, সত্যই বলব।'
পরদিন সকালবেলা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় এলেন। তাঁর নিয়ম ছিল, সফর থেকে ফিরে আসলে তিনি প্রথমে মসজিদে প্রবেশ করতেন। দুই রাকআত সালাত পড়ে মানুষের সামনে বসতেন।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাত পড়ে বসলেন। তখন জিহাদ থেকে পেছনে থাকা লোকগুলো আসতে থাকল। তারা এটা সেটা বলে ওজর পেশ করতে থাকল, শপথ করতে থাকল। সংখ্যায় তারা ছিল আশিজনের অধিক। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের প্রকাশ্য ওজর গ্রহণ করলেন, তাদের বাইআত করলেন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। আর তাদের অভ্যন্তরীণ অবস্থা আল্লাহর কাছে সোপর্দ করলেন।'
সবশেষে আমি আসলাম। সালাম দিলে তিনি মুচকি হাসলেন। কিন্তু সে হাসিতে সন্তুষ্টি ছিল না। আমাকে বললেন, "আসো।” এগিয়ে গিয়ে আমি তাঁর সামনে বসলাম। তিনি আমাকে বললেন, "কেন তুমি পেছনে থেকে গেলে? তুমি কি বাহন ক্রয় করোনি?"
আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর শপথ, আমি যদি দুনিয়ার অন্য কারও সামনে বসতাম এখন, তাহলে কোনো না কোনো আপত্তি পেশ করে তার ক্রোধ থেকে বের হয়ে আসতাম। আর আমি তর্কে বেশ পটুও। কিন্তু আল্লাহর কসম, আমি জানি, আজ যদি আপনার সামনে মিথ্যে বলে আপনাকে সন্তুষ্টও করি, এমন একদিন অচিরেই আসবে, যেদিন আল্লাহ আপনাকে আমার ওপর অসন্তুষ্ট করে দেবেন। যদি সত্যটা বলি, তবে অবশ্যই তা আপনাকে অসন্তুষ্ট করবে, কিন্তু আশা করি আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহর শপথ, আমার কোনো ওজর ছিল না। সে সময়টাতে এমন শক্তিশালী ও সামর্থ্যবান ছিলাম যে, এর আগে কখনই এমন ছিলাম না।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "সত্য বলেছ। এখন চলে যাও, যতদিন না আল্লাহ তোমার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত দেন।"
আমি উঠে আসলাম। বনি সালামার কিছু লোক আমার পেছনে আসলো। আমাকে বলল, "তুমি অন্যদের মতো ওজর দেখাতে পারতে। অন্যরা যেভাবে ওজর দেখাল, তুমি অক্ষম হলে তেমন ওজর দেখাতে!” আল্লাহর কসম, তারা আমাকে তিরস্কার করেই যাচ্ছিল। এমনকি আমার তখন মনে হচ্ছিল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে ফিরে গিয়ে মিথ্যা বলে ওজর পেশ করি।'
কিন্তু আমি তাদের বললাম, "আমার মতো কি অন্য কেউ এমনটা করেছে?"
তাঁরা জবাব দিল, “হাঁ। তোমার মতো আরও দুজন এমন বলেছে। তাদেরকেও সে জবাব দেওয়া হয়েছে, যেমন তোমাকে দেওয়া হয়েছে।"
আমি জানতে চাইলাম, "সে দুজন কে?"
তারা জানাল, "মুরারা বিন রাবিআ আমিরি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আর হিলাল বিন উমাইয়া ওয়াকিফি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)।"
তারা আমাকে আরও জানাল, "তারা দুজন উত্তম লোক। বদরে অংশ নিয়েছিলেন তারা। তারা আদর্শবান লোক।"
তাদের কথা শুনে আমি অটল রইলাম আগের মতো। এদিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমদের নিষেধ করে দিয়েছেন, যে তিনজন তাবুকে অংশগ্রহণ করেনি, তাদের সাথে যেন কেউ কথা না বলে। মানুষজন আমাদের পরিত্যাগ করল। আমাদের সাথে তাদের আচরণ পাল্টে গেল। এমনকি মনে হচ্ছিল, এ যেন চেনা-পরিচিত সে পৃথিবী নয়। এতদিনের পরিচিত পৃথিবী অপরিচিত আকার ধারণ করল। এ অবস্থায় আমাদের পঞ্চাশ দিন কাটল।'
আমার মতো অন্য দুজনও ভেঙে পড়লেন। ঘরে বসে তারা কাঁদতে থাকলেন। আমি তাদের চেয়ে বেশি যুবক ও শক্তিশালী ছিলাম। আমি ঘর থেকে বের হয়ে সালাতের জামাআতে শরিক হতাম। বাজারে ঘোরাফেরা করতাম। কেউ আমার সাথে কথা বলত না। সালাত শেষে মজলিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে তাঁকে সালাম দিতাম। নিজেকে নিজে প্রশ্ন করতাম, আমার সালামের উত্তরে কি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ঠোঁট নাড়িয়েছেন, না নাড়াননি?
আমি তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে সালাত পড়তাম। গোপনে আড়চোখে তাকাতাম তাঁর দিকে। যখন আমি সালাতে মগ্ন হতাম, তিনি আমার দিকে তাকাতেন। কিন্তু যখন আমি তাঁর দিকে তাকাতাম, তিনি দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতেন আমার থেকে।'
আমার প্রতি অন্যদের এ কঠোরতা অনেকদিন চলল। এমনকি একদিন আমি আমার প্রিয়জন ও চাচাতো ভাই আবু কাতাদা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর বাগানপ্রাচীর টপকে ভেতরে গেলাম। তাকে সালাম দিলাম। কিন্তু সে আমার সালামের উত্তর দিল না।
আমি তাকে বললাম, "আবু কাতাদা, আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, তুমি কি জানো না যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ভালোবাসি?"
সে চুপ করে থাকল। আমি আবারও একই কথা বললাম আল্লাহর কসম দিয়ে। কিন্তু সে কিছুই বলল না। এরপর আবারও আল্লাহর কসম দিয়ে একই কথা বললাম। এবার সে এতটুকু বলল যে, "আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই ভালো জানেন।"
তখন আমার দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। বাগানপ্রাচীর টপকে সেখান থেকে চলে এলাম।'
আরেকদিনের কথা। আমি বাজারে হাঁটছিলাম। তখন শুনলাম, সিরিয়া থেকে আগত খাবার বিক্রেতা এক বেনিয়া আমার সম্পর্কে জানতে চেয়ে লোকদের বলছে, "কেউ কি আমাকে কাব বিন মালিকের সন্ধান দেবে?"
মানুষ তখন ইশারা করল আমার দিকে। লোকটা আমার কাছে এসে হাতে একটি চিঠি ধরিয়ে দিল। চিঠিটা গাসসানের রাজার তরফ থেকে। তাতে লেখা, "আমার কাছে খবর এসেছে যে, আপনার সঙ্গী আপনার প্রতি অন্যায় আচরণ করেছে। কিন্তু আল্লাহ আপনাকে এমন লাঞ্ছনা ও অপমানের মাঝে থাকার জন্য সৃষ্টি করেননি। আমাদের কাছে চলে আসুন। আমরা আপনার পাশে আছি।"
চিঠি পড়ে আমি বললাম, এটা আরেকটি পরীক্ষা। উনুন খুঁজতে থাকলাম তখন আমি। চিঠিটা উনুনে নিক্ষেপ করে ক্ষান্ত হলাম।'
আল্লাহর পক্ষ থেকে ফয়সালা আসার অপেক্ষায় এ শাস্তির মেয়াদ চল্লিশ দিন পার হলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষ থেকে একজন দূত আসলো। জানাল, স্ত্রী থেকে পৃথক হওয়ার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে আদেশ দিয়েছেন।'
আমি তাকে বললাম, "আমি কি তাকে তালাক দিয়ে দেবো, না অন্য কিছু করব?"
সে বলল, "না। পৃথক থাকুন, তার নিকটে যাবেন না।"
আমার মতো অন্য দুজনকেও একই আদেশ দেওয়া হলো। আমি স্ত্রীকে ডেকে বললাম, "তোমার পরিবারের কাছে চলে যাও। আমার সম্পর্কে আল্লাহর ফয়সালা আসা পর্যন্ত সেখানে থাকো।"
আরও দশ রাত পরের কথা। সেদিন পঞ্চাশ রাত পূর্ণ হলো আমার শাস্তির। সেদিন সকালে ফজরের সালাত আদায় করে আমাদের একটি ঘরের ছাদে বসে আছি আমি। যে অবস্থার কথা আল্লাহ কুরআনে বর্ণনা করেছেন। যে পৃথিবীটা প্রশস্ত ছিল অনেক, সে পৃথিবীটা আমার জন্য ছিল সংকীর্ণ। এমন সময় শুনতে পেলাম এক চিৎকারকারীর চিৎকার। সে সালা পর্বতের ওপর চড়ে উচ্চস্বরে ঘোষণা করছে-“ওহে কাব বিন মালিক, সুসংবাদ গ্রহণ করো!"
সাথে সাথে সিজদায় পড়ে গেলাম আমি। আমার মুক্তির সংবাদ এসে গেছে। আজ আমি মুক্ত হয়েছি। আমাদের তাওবা আল্লাহ গ্রহণ করেছেন বলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের সালাতের পর মানুষের সামনে ঘোষণা দিলেন।'
এরপর আমি যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে তাঁকে সালাম দিলাম, দেখলাম, তাঁর চেহারা আনন্দে জ্বলজ্বল করছে। তিনি আমাকে বললেন, "সুসংবাদ গ্রহণ করো উত্তম এক দিনের, যেদিনটি তোমার জন্মের পর থেকে অতিবাহিত দিনগুলোর মাঝে সবচেয়ে উত্তম।"
আমি তখন বললাম, "এটা কি আল্লাহর পক্ষ থেকে, নাকি আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষ থেকে?"
তিনি বললেন, "না; বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে। আল্লাহ তাআলা নাজিল করেছেন:
وَعَلَى الثَّلَاثَةِ الَّذِينَ خُلِفُوا حَتَّى إِذَا ضَاقَتْ عَلَيْهِمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ وَضَاقَتْ عَلَيْهِمْ أَنفُسُهُمْ وَظَنُّوا أَن لَّا مَلْجَأَ مِنَ اللَّهِ إِلَّا إِلَيْهِ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوبُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
"আর (তিনি অনুগ্রহ করলেন) সে তিনজনের প্রতিও, যারা (তাবুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা থেকে) পেছনে থেকে গিয়েছিল। তারা অনুশোচনার আগুনে এমনই দগ্ধীভূত হয়েছিল যে, শেষ পর্যন্ত পৃথিবী পূর্ণ বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল। তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠল। তারা বুঝতে পারল যে, আল্লাহ ছাড়া তাদের কোনো আশ্রয়স্থল নেই। তাঁর পথে ফিরে যাওয়া ব্যতীত তাদের জন্য কোনো পথ খোলা নেই। অতঃপর তিনি তাদের প্রতি অনুগ্রহ করলেন, যাতে তারা অনুশোচনায় তার দিকে ফিরে আসে। আল্লাহ অতিশয় তাওবা কবুলকারী, বড়ই দয়ালু।"
[সুরা আত-তাওবা, ৯ : ১১৮]'৪৩২
কাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ঘটনাটি স্পষ্ট ও প্রসিদ্ধ একটি ঘটনা। তাদের অপরাধের কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বর্জন করেছিলেন। এ ঘটনাতে তাদের জন্য উত্তম শিক্ষা ছিল, ছিল উত্তম প্রশিক্ষণ। যাতে তারা ভবিষ্যতে কখনো আর আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনুগত্য ভঙ্গ না করে, দ্বীনবিরোধী কাজে লিপ্ত না হয়ে পড়ে। এ ঘটনায় আমাদের জন্যও রয়েছে উত্তম শিক্ষা ও নির্দেশনা।
টিকাঃ
৪৩২. সহিহুল বুখারি ৪৪১৮, সহিহু মুসলিম: ২৭৬৯।
📄 হদের কোনো বিচার নিয়ে আসলে অপছন্দ করতেন
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'মুসলিমদের মধ্যে প্রথম যার হাত কেটে হদ প্রয়োগ করা হয়, সে লোকটাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে নিয়ে আসা হলো। বলা হলো, "হে আল্লাহর রাসুল, এ লোকটা চুরি করেছে।” এ কথা শুনে চিন্তায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়।'
তখন লোকেরা বলল, “হে আল্লাহর রাসুল, মনে হচ্ছে তার হাত কর্তন করা আপনি অপছন্দ করেছেন?"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, "এখন হাত না কেটে আমার আর কী উপায় আছে?! তোমরা তোমাদের সাথির বিরুদ্ধে শয়তানের সহযোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছ। আল্লাহ হলেন ক্ষমাশীল। তিনি ক্ষমা করা পছন্দ করেন। কিন্তু কোনো কর্তৃত্বশীলের জন্য উচিত নয় যে, তার কাছে হদের বিচার আনা হলো; অথচ সে হদ প্রয়োগ করল না।" এতটুকু বলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিলাওয়াত করলেন:
وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُواء أَلَا تُحِبُّونَ أَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
"তারা যেন তাদের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করেন? আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" [সুরা আন-নূর, ২৪: ২২]'৪৩৩
টিকাঃ
৪৩৩. মুসনাদু আহমাদ: ৩৯৬৭। হাদিসের মান: হাসান।
📄 হদ প্রয়োগের ক্ষেত্রে সুপারিশ গ্রহণ করতেন না
ওয়াজিব হদের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক বিন্দু ছাড় দিতেন না। এ ব্যাপারে তাঁর সবচেয়ে প্রিয়জনের সুপারিশও গ্রহণ করতেন না।
আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'মাখজুম গোত্রের এক মহিলা চুরি করল। এখন তার ওপর চুরি করার শাস্তি প্রয়োগ হবে। বিষয়টি কুরাইশদের ভাবিয়ে তুলল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুরি করার হদ হিসেবে তার হাত কাটার আদেশ দিলেন। কুরাইশরা এ বিষয়টি নিয়ে নিজেদের মাঝে আলোচনা করতে লাগল যে, কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কথা বলতে পারে? আলোচনায় ঠিক হলো, একমাত্র রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভালোবাসার পাত্র উসামা বিন জাইদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-ই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে বলার সাহস করতে পারে। উসামা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কথা বললেন এ ব্যাপারে। তার কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। তিনি বললেন, "তুমি কি আল্লাহর হদ বর্জনের ব্যাপারে সুপারিশ করছ?"
উসামা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, "আমার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন, হে আল্লাহর রাসুল।"
সেদিন বিকেলবেলা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বক্তব্য রাখলেন। শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা করে বলা শুরু করেন-"হামদ ও সালাতের পর। নিশ্চয় তোমাদের পূর্ববর্তীদের ধ্বংসের কারণ ছিল, তাদের মাঝে যখন সম্ভ্রান্ত কেউ চুরি করত, তারা তাকে ছেড়ে দিত। আর যখন দুর্বল কেউ চুরি করত, তার ওপর তারা হদ প্রয়োগ করত। আল্লাহর শপথ, যদি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কন্যা ফাতিমা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-ও চুরি করত, তবে অবশ্যই আমি তার হাত কাটতে দ্বিধা করতাম না।" তারপর মহিলাটির হাত কর্তনের নির্দেশ দিলেন; ফলে তার হাত কাটা হলো।'
আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'এরপর সে মহিলা উত্তমরূপে তাওবা করল। তার বিয়ে হলো। সে আমার কাছে মাঝে মাঝে আসত। তার কোনো প্রয়োজন থাকলে আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে তা তুলে ধরতাম। '৪৩৪
অন্য বর্ণনায় এসেছে, আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'হদ প্রয়োগের পর সে নারী বলল, "আমার কি তাওবার কোনো সুযোগ আছে, হে আল্লাহর রাসুল?"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি আজ গুনাহ থেকে সে রকম নিষ্কলুষ, যেমন নিষ্কলুষ থাকে শিশু তার জন্মের দিন।"৪৩৫
হাদিস থেকে বোঝা যায়:
* উলুল আমর তথা দায়িত্বশীলের নিকট যখন হদের বিচার চলে যায়, তখন সুপারিশ নিষিদ্ধ।
ইবনে আব্দুল বার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত গুনাহের বিচার সুলতানের কাছে না পৌঁছে, ততক্ষণ পর্যন্ত একজন গুনাহগারের পক্ষে সুপারিশ করা উত্তম ও নেক কাজ। সুলতানের কাছে বিচার পৌঁছালে সে গুনাহের হদ প্রয়োগ করতে তিনি বাধ্য।
যার ওপর হদ ওয়াজিব হয়েছে, তার পক্ষপাতিত্ব করা নিষিদ্ধ; চাই সে নিজের সন্তান হোক বা নিকটতম আত্মীয়স্বজন হোক কিংবা হোক উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। হদ প্রয়োগ করা ওয়াজিব হয়ে গেছে-এমন লোকের ব্যাপারে যে সুপারিশ করবে বা ছাড় দিতে বলবে, সে তিরস্কারের পাত্র হবে। ৪৩৬
টিকাঃ
৪৩৪. সহিহুল বুখারি ৪৩০৪, সহিহু মুসলিম: ১৬৮৮।
৪৩৫. মুসনাদু আহমাদ: ৬৬১৯। আহমাদ শাকিরের মতে হাদিসের সনদ সহিহ। অন্যদিকে শুআইব আরনাউত হাদিসটিকে জইফ বলেছেন।
৪৩৬. ফাতহুল বারি: ১২/৯৫।