📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 গোপন রাখার নিমিত্তে গুনাহর স্বরূপ জানতে চাইতেন না

📄 গোপন রাখার নিমিত্তে গুনাহর স্বরূপ জানতে চাইতেন না


আবু উমামা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে বসা ছিলেন। আমরাও তাঁর পাশে বসা ছিলাম। ইত্যবসরে এক লোক এসে বলল, “হে আল্লাহর রাসুল, আমি হদযোগ্য; আমার ওপর হদ প্রয়োগ করুন।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুপ করে থাকলেন। তাকে কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। কিন্তু লোকটি আবারও বলল, "হে আল্লাহর রাসুল, আমি হদযোগ্য; আমার ওপর হদ প্রয়োগ করুন।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবারও চুপ করে থাকলেন।

সালাতের জামাআত দাঁড়াল। সালাত শেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরের দিকে চলে যাচ্ছিলেন। সে লোকটিও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পেছন পেছন গেল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কী উত্তর দেন, তা জানার জন্য আমিও তখন তাঁদের অনুসরণ করলাম।

লোকটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটবর্তী হলো। তাঁকে আগের মতোই বলল, “হে আল্লাহর রাসুল, আমি হৃদযোগ্য; আমার ওপর হদ প্রয়োগ করুন।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবার উত্তর দিলেন, "তুমি কি বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় ভালোভাবে অজু করোনি?"

লোকটি বলল, "জি, ভালোভাবে অজু করেছি।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এরপর আমাদের সাথে সালাত আদায় করোনি?"

লোকটি উত্তর দিল, "জি করেছি, ইয়া রাসুলাল্লাহ।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবার বললেন, "তাহলে আল্লাহ তোমার গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। অথবা বলেছেন, তোমার হদ ক্ষমা করে দিয়েছেন।"৩৯৭

বুখারি (রাহিমাহুল্লাহ) এই হাদিসের অধ্যায়ের নাম দিয়েছেন, 'অধ্যায়: কেউ হদযোগ্য অপরাধ করেছে বলে স্বীকারোক্তি দিলেও স্পষ্ট বিবরণ না দিলে আমির কি তার সে গুনাহ গোপন রাখবে?'

ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'বুখারি (রাহিমাহুল্লাহ)-এর অধ্যায় শিরোনাম থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, কেউ হদযোগ্য অপরাধ করার কথা স্বীকার করলেও অপরাধটি সুস্পষ্টরূপে বিবৃত না করলে এবং সে তাওবা করে নিলে ইমামের ওপর হদ প্রয়োগ করা ওয়াজিব নয়। '৩৯৮

হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়:

* ইমাম হদসংক্রান্ত বিষয়ে খুব বেশি খোলাসা করতে চাইবেন না; বরং যথাসাধ্য তা প্রতিহত করার চেষ্টা করবেন। এই হাদিসে লোকটি স্পষ্টভাবে এমন কোনো অপরাধের স্বীকারোক্তি দেননি, যা হদকে আবশ্যক করে। তাই এটা হওয়া সম্ভব যে, হয়তো তিনি কোনো ছোট অপরাধ করেছেন, আর সেটাকেই তিনি হদ আবশ্যককারী বড় অপরাধ বলে ধারণা করছেন। এ জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপরাধটি খোলাসা করে জানতে চাননি। কারণ, সন্দেহের ভিত্তিতে হদ প্রযোজ্য হয় না।
* রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়টিতে গুনাহ গোপন রাখাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাই তাকে কিছু জিজ্ঞেস করেননি। কারণ, তিনি দেখেছেন, লোকটি তার কাছে লজ্জিত হয়ে ও তাওবা করে নিজের ওপর হদ প্রয়োগ করতে বলছেন। তার তাওবাই তার জন্য যথেষ্ট। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয় গোপন রাখাকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
* আলিমরা বলেন, কেউ যদি নিজেকে হদযোগ্য অপরাধী বলে, তবে তার সামনে 'হদ কী ও কেন প্রযোজ্য হয়' ইত্যাদি উপস্থাপন করে বা আরও স্পষ্টভাবে জানিয়ে হদ বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া মুসতাহাব। যাতে সে লোকটা নিজেকে হৃদযোগ্য অপরাধী সাব্যস্ত করার দাবি থেকে সরে আসে। ৩৯৯

ইবনুল কাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) হদের ক্ষেত্রে অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, অপরাধী যদি পাকড়াও হওয়ার আগেই তাওবা করে নেয়, তবে তার থেকে হদ রহিত হয়ে যাবে। ৪০০

ইবনুল কাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'যদি কেউ বলে, মায়িজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও গামিদি মহিলা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) উভয়ই তাওবা করার পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলেন। তাহলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেন তাদের ওপর হদ প্রয়োগ করলেন?

তাদের প্রশ্নের জবাব হচ্ছে, নিঃসন্দেহে তারা দুজন তাওবা করার পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসেছিলেন, আর নিঃসন্দেহে তাদের দুজনের ওপর হদ প্রয়োগ করা হয়েছে-এ দুটি কথা দিয়ে অন্য একদল লোক প্রমাণ দিয়ে থাকেন। বিষয়টি নিয়ে আমি আমাদের শাইখের কাছে জানতে চাইলে তিনি যা বলেছিলেন, তার সারসংক্ষেপ হচ্ছে, হদ মানুষকে পবিত্রকারী, তাওবাও মানুষকে পবিত্রকারী। এ দুটি জিনিস মানুষের পাপ ধুয়েমুছে সাফ করে দেয়। মায়িজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও গামিদি মহিলা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) উভয়ে কেবল তাওবা করেই সন্তুষ্ট ছিলেন না; বরং তারা হদ প্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের পরিশুদ্ধ করতে চাইছিলেন। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ফিরে যেতে বললেও তারা ফিরে যাননি। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ওপর হদ প্রয়োগ করলেন।

এ ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিন্তু তাওবার মাধ্যমে পরিশুদ্ধ হওয়াকে প্রাধান্য দিয়েছেন। মায়িজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) যখন বাকি প্রান্তর থেকে দৌড় দিয়েছিলেন, সাহাবিগণও তখন তার পিছু পিছু ছুটে গিয়েছিলেন। এ কথাটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে বললে তিনি বললেন, "তোমরা কেন তাকে ছেড়ে দিলে না? সে তো আল্লাহর কাছে তাওবা করেছে। আল্লাহও তাকে ক্ষমা করে দিতেন। তার তাওবা কবুল করে নিতেন।" যদি তাওবার পরেও হদই একমাত্র শরিয়াহ-নির্ধারিত পথ হতো, তাহলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মায়িজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে ছাড়তে বলতেন না।

এ ক্ষেত্রে শরয়ি নির্দেশনা হচ্ছে, হদ প্রয়োগ করা না-করার বিষয়ে আমির স্বাধীন। তিনি যেটা ভালো মনে করেন, সেটাই প্রাধান্য দেবেন। যেমন: হৃদযোগ্য অপরাধ করার স্বীকৃতিদানকারীকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যাও, আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।" আবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই মায়িজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও গামিদি নারীর ক্ষেত্রে হদ প্রয়োগ করাকে বেছে নিয়েছেন। কারণ, তারা নিজেদের ওপর হদ প্রয়োগ করার ব্যাপারে অটল ছিলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বারবার ফিরিয়ে দিলেও তারা যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।'

* হদ প্রয়োগের ব্যাপারে ইমাম স্বাধীন। হদ প্রয়োগ ভালো মনে করলে তিনি প্রয়োগ করবেন, আর ভালো মনে না করলে প্রয়োগ করবেন না।

এটা দুটি মতের মধ্যবর্তী ও মধ্যমপন্থা। আলিমদের একটি মত হচ্ছে, পূর্ণাঙ্গ তাওবার পর হদ প্রয়োগ করা জায়িজ নয়। আরেকটি অভিমত হচ্ছে, পূর্ণাঙ্গ তাওবা করলেও হদ রহিত হওয়ার ক্ষেত্রে তাওবা কোনো প্রভাব ফেলে না।

কিন্তু আপনি যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহর প্রতি গভীর দৃষ্টি দেন, তাহলে বুঝতে পারবেন, বিষয়টি আমিরের ইচ্ছাধীন হওয়াটাই প্রাধান্যপ্রাপ্ত। আল্লাহই অধিক জ্ঞাত। '৪০১

এ মতের সমর্থনে আরেকটি হাদিস রয়েছে। আলকামা বিন ওয়ায়িল (রাহিমাহুল্লাহ) নিজের পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তার পিতা বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময়ে এক মহিলা মসজিদে সালাতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয়। পথিমধ্যে একজন লোক তাকে ধরে কাপড় দিয়ে পেছিয়ে তার সাথে সংগম করে। মহিলাটি তখন চিৎকার করে ওঠে। ফলে লোকটি পালিয়ে যায় সেখান থেকে।'

সে সময় আরেকজন লোক সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। মহিলাটি তাকে বলল, "ওই লোকটি আমার সাথে এমন এমন কাজ করেছে।" এ লোকটি ধর্ষণকারীর খোঁজে চলে যায় সেখান থেকে। ওদিকে মহিলাটি একদল মুহাজির সাহাবির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলে, "ওই লোকটি আমার সাথে এমন এমন করেছে।” মুহাজির সাহাবিরাও লোকটির সন্ধানে গেল। কিন্তু যে লোকটি ধর্ষকের খোঁজে প্রথম গিয়েছিল, তাকে ধরে আনলেন তারা।'

এ লোককে নিয়ে মুহাজির সাহাবিদের সে দলটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলেন। মহিলাটি তখন বললেন, "এ-ই সে লোক।” কিন্তু লোকটি বলল, "আমি সে লোক, যে তোমাকে সাহায্য করেছিল। ধর্ষক তো পালিয়ে গেছে।" সাহাবিদের সেই দলটি জানাল যে, "তারা এ লোককে দৌড়ে যেতে দেখেছে।"

লোকটি আবার বলল, "আমি তো ধর্ষককে ধরে আনার জন্য এ মহিলার সাহায্য করছিলাম। কিন্তু এরা আমাকে ধরে আনল।"

কিন্তু মহিলাটি বলল, "মিথ্যা কথা। এ লোকটিই আমাকে ধর্ষণ করেছে।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবার লোকটির ওপর রজম করার জন্য আদেশ দিলেন। তখন আসল ধর্ষক দাঁড়িয়ে বলল, "আল্লাহর রাসুল, আমিই ধর্ষক।"

তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাকে বললেন, "যাও, তোমাকে আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন।" আর ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির উদ্দেশে সুন্দর কথা বললেন। তখন জানতে চাওয়া হলো, "আল্লাহর নবি, আপনি কি তাকে রজম করবেন না?"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "সে এমন তাওবা করেছে, যদি সে তাওবা মদিনাবাসীর মাঝে ভাগ করে দেওয়া হয়, তবে তাদের জন্য যথেষ্ট হবে। "৪০২

একটি প্রশ্ন ও তার জবাব

এ হাদিসের ব্যাপারে একটি প্রশ্ন করা হয়, মহিলার প্রথম সাহায্যকারী তো জিনার স্বীকারোক্তি দেয়নি, আর তার ওপর আনা অভিযোগটি স্পষ্ট প্রমাণিতও ছিল না, তাহলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ওপর হদ প্রয়োগের আদেশ কীভাবে দিলেন?

জবাব হচ্ছে:

১. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সরাসরি তখনো রজমের আদেশ দেননি; বরং তিনি রজমের আদেশ দেওয়ার নিকটবর্তী হয়েছিলেন। তাই বর্ণনাকারী রজমের আদেশ দিয়েছেন বলে শব্দ ব্যবহার করেছেন। আজিমাবাদি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'ঘটনা থেকেই বোঝা যাচ্ছে, বিষয়টি স্পষ্ট ছিল না; বরং জটিল আকার ধারণ করেছিল। যেহেতু জিনাকারীর স্বীকার করা ব্যতীত এবং স্পষ্ট প্রমাণ ছাড়া হদের সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক নয়। আর ধৃত লোকটিও জিনার ব্যাপারে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। অন্যদিকে মহিলার কথাও স্পষ্ট প্রমাণ হওয়ার যোগ্য ছিল না। তাই অস্পষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রজমের আদেশ দেওয়ার নিকটবর্তী ছিলেন। সে কারণেই হয়তো বর্ণনাকারী "তিনি যখন রজমের আদেশ দিলেন" শব্দে ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন। '৪০৩

২. অকাট্য নয় কিন্তু প্রকাশ্য-এমন প্রমাণ থাকায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'হদের এ নির্দেশটি মূলত অকাট্য নয়, কিন্তু শক্তিশালী ও প্রকাশ্য প্রমাণের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছিল। প্রথম প্রমাণ হচ্ছে, লোকটি দৌড়ানো অবস্থায় সাহাবিদের কাছে ধরা পড়েন। দ্বিতীয় প্রমাণ হচ্ছে, তিনি স্বীকার করেছেন যে, তিনি মহিলাটির কাছে ছিলেন। কিন্তু নিজেকে সাহায্যকারী বলে বাঁচতে চাইছেন। তৃতীয়ত, মহিলাটি বলেছিলেন, এ-ই সে লোক। এটা স্পষ্ট প্রমাণ। আর সাহাবিগণও এমন প্রমাণের ভিত্তিতে মদ ও জিনার হদ প্রয়োগ করেছেন। সেগুলোও এ ঘটনার অনুরূপ বা কাছাকাছি। সাহাবিদের বিচারের ক্ষেত্রে প্রমাণ ছিল, জিনার ফলে মহিলার গর্ভবতী হওয়া ও মদপানের কারণে মুখ থেকে গন্ধ আসা। '৪০৪

৩. নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাজিরের হুকুম দিয়েছিলেন, রজমের নয়। বাইহাকি (রাহিমাহুল্লাহ) এ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন এ শব্দে যে, যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাস্তির আদেশ দিলেন, তখন আসল ধর্ষক দাঁড়িয়ে যায়। বাইহাকি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, এ রিওয়ায়াত অনুযায়ী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাজিরের আদেশ দিয়েছিলেন। ৪০৫

৪. হয়তো মুহাজির সাহাবিদের সে দল ভুলে সে সাহায্যকারী লোকটির বিরুদ্ধে জিনার সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। ৪০৬

৫. এ হাদিসটি জইফ। জইফ হওয়ার কারণ হচ্ছে, সাম্মাক বিন হারব (রাহিমাহুল্লাহ)। নাসায়ি (রাহিমাহুল্লাহ) তার সম্পর্কে বলেন, যদি সনদের কোথাও বর্ণনাকারী হিসেবে সাম্মাক এককভাবে থাকে, তবে হাদিসটি প্রমাণযোগ্য হবে না; দলিল হবে না। কারণ, তার নামে কোনো হাদিস বর্ণনা করা হলে (বাস্তবে তা তার বর্ণিত হাদিস না হওয়া সত্ত্বেও) তিনি তা নিজের বলে স্বীকৃতি দিতেন। ৪০৭

বাইহাকি (রাহিমাহুল্লাহ)-ও এ হাদিসটি জইফ হওয়ার ব্যাপারে ইঙ্গিত দিয়েছেন। এ হাদিস বর্ণনার পর তিনি বলেন, 'মায়িজ জুহানি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও গামিদি মহিলা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) স্বীকৃতি দিলে তাদের ওপর হদ কায়িম হয়। তাদের হাদিসগুলো অনেক বর্ণনায় এসেছে, আর সেগুলো প্রসিদ্ধও। আল্লাহই অধিক জ্ঞাত। '৪০৮

টিকাঃ
৩৯৭. সহিহুল বুখারি: ৬৮২৩, সহিহু মুসলিম: ২৭৬৪।
৩৯৮. ফাতহুল বারি: ১২/১৩৪।
৩৯৯. ফাতহুল বারি: ১২/১৩৪।
৪০০. ইলামুল মুয়াক্কিয়িন: ৩/১৭।
৪০১. ইলামুল মুয়াক্কিয়িন: ২/৬০-৬১।
৪০২. সুনানুত তিরমিজি: ১৪৫৪, সুনানু আবি দাউদ: ৪৩৭৯, মুসনাদু আহমাদ: ২৬৬৯৮।
৪০৩. আওনুল মাবুদ: ১২/১৬৫।
৪০৪. হাশিয়াতু ইবনিল কাইয়িম মাআ আওনিল মাবুদ: ১২/১৬৫।
৪০৫. সুনানুল বাইহাকি: ৮/২৮৪।
৪০৬. সুনানুল বাইহাকি: ৮/২৮৪।
৪০৭. আল-আহাদিসুল মুখতারা: ১২/২০, তাহজিবুত তাহজিব: ৪/২৩৪।
৪০৮. সুনানুল বাইহাকি: ৮/২৮৪।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 হদপ্রাপ্তকে গালি, তিরস্কার কিংবা অভিশাপ দিতে নিষেধ করতেন

📄 হদপ্রাপ্তকে গালি, তিরস্কার কিংবা অভিশাপ দিতে নিষেধ করতেন


বুরাইদা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মায়িজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ঘটনা বর্ণনার পর বলেন, 'এরপর গামিদি মহিলা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) এসে বলল, "হে আল্লাহর রাসুল, আমি জিনা করেছি। আমাকে এ গুনাহ থেকে পবিত্র করুন।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ফিরিয়ে দিলেন।'

পরবর্তী দিন সে নারী আবার আসলো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলল, "হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আমাকে কেন ফিরিয়ে দিচ্ছেন? হয়তো আপনি আমাকে সেভাবে ফিরিয়ে দিচ্ছেন, যেমন ফিরিয়ে দিয়েছিলেন মায়িজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে। আল্লাহর কসম করে বলছি, জিনার কারণে আমি এখন গর্ভবতী।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, "হয়তো না। এখন যাও। যদি সত্যিই তুমি সন্তান প্রসব করে থাকো, তবে তখন এসো।"

সন্তান প্রসবের পর সন্তানকে একটি কাপড়ে জড়িয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, "এ সন্তানটি আমি প্রসব করেছি।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যাও, দুধ ছাড়ানো পর্যন্ত তার প্রতিপালন করো।"

একসময় দুধ ছাড়ানো হলো শিশুটির। তখন সে শিশুটিকে নিয়ে এল। শিশুর হাতে তখন রুটির ছেঁড়া একটা টুকরো। বলল, "হে আল্লাহর নবি, তার দুধ ছাড়ানো হয়েছে। সে এখন খেতে পারে।" তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুটিকে এক মুসলিমের দায়িত্বে দিয়ে দিলেন। আর মহিলাটিকে রজমের আদেশ দিলেন। প্রথমে গর্ত খোঁড়া হলো। তাকে বুক পর্যন্ত গর্তে ঢোকানোর পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদেশ দিলে মানুষ তাকে রজম করল।'

খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) একটি পাথর নিয়ে চুমু দিল তাতে। মহিলাটির মাথা লক্ষ করে ছুড়ল সে পাথরটি। রক্ত এসে লাগল খালিদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মুখে। খালিদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মহিলাটিকে গালি দিলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা শুনতে পেয়ে বললেন, “সাবধান, হে খালিদ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ-তাঁর শপথ, এ নারী এমন তাওবা করেছে, যদি এমন তাওবা ট্যাক্স আদায়কারী করত, তবে তার জন্য যথেষ্ট হতো এবং তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হতো।"

এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলার মৃতদেহ উঠিয়ে আনার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর তার জানাজা আদায় করে তাকে দাফন করা হলো। '৪০৯

এক বর্ণনায় এসেছে, 'জানাজা পড়ার আগে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললেন, “হে আল্লাহর নবি, সে জিনা করেছে; অথচ আপনি তার জানাজা পড়বেন?"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন উত্তর দিলেন, "এ নারী এমন তাওবা করেছে, যদি সে তাওবা মদিনার সত্তরজন লোকের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া হয়, তবে তাদের জন্য যথেষ্ট হবে। তুমি কি এর চেয়ে উত্তম তাওবা দেখেছ, যে তাওবায় সে তার প্রাণ পর্যন্ত দিয়ে দিয়েছে?"৪১০

হাদিস থেকে বোঝা যায়:

* মানুষের কাছ থেকে অন্যায়ভাবে ট্যাক্স আদায় করা নিকৃষ্ট গুনাহ ও মারাত্মক ধ্বংসাত্মক পাপ। কারণ, এতে মানুষের কাছ থেকে অনেক পরিমাণে ট্যাক্স নেওয়া হয়, তাদের ওপর জুলুম করা হয়। আর এ জুলুম চলতেই থাকে এবং মানুষের অধিকার লঙ্ঘিত হয়। তাদের সম্পদ অন্যায়ভাবে দখল করা হয় এবং খরচ করা হয় অপাত্রে।
* সাধারণ মানুষের মতো ইমাম ও নামিদামি মানুষজনও রজমের শাস্তিতে মৃত ব্যক্তির জানাজা পড়বে।
* তাওবা কবিরা গুনাহকে মিটিয়ে দেয়। ৪১১

ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এ ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন আসতে পারে যে, যদি তাওবাই হদযোগ্য গুনাহের ক্ষেত্রে যথেষ্ট হতো, তাহলে কেন মায়িজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও গামিদি মহিলা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বারবার শাস্তির আবেদন করলেন এবং নিজেদের জন্য রজম বেছে নিলেন?

উত্তর হলো, হদ প্রয়োগের মাধ্যমে গুনাহ মাফ হয়ে যাওয়া সুনিশ্চিত। তদুপরি তা যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশে হয়, তাহলে তো কোনো কথাই নেই। কিন্তু তাওবার ব্যাপারে এ আশঙ্কা থেকে যায় যে, তা খাঁটি নাও হতে পারে অথবা তার কোনো একটি শর্ত অপূর্ণ থেকে যেতে পারে। ফলে গুনাহ অবশিষ্ট থেকে যেত। তাই তারা দুজন এমন সুনিশ্চিতভাবে গুনাহ থেকে মুক্ত হতে চেয়েছেন, যার পরে গুনাহ থেকে যাওয়ার কোনো অবকাশই বাকি না থাকে। আল্লাহই অধিক জ্ঞাত। '৪১২

একটি প্রশ্ন ও তার জবাব

প্রশ্ন: এ বর্ণনায় এসেছে, মহিলাটি বাচ্চা প্রসবের পর দুধ ছাড়ানো পর্যন্ত তাকে রজম করা হয়নি। কিন্তু এর আগের বর্ণনায় এসেছে, বাচ্চা প্রসবের পর এক আনসারি সাহাবি সে বাচ্চা পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করলে সে মহিলাকে তখনই রজম করা হয়। এ দুটি বর্ণনা পরস্পর বিরোধী।

জবাব: ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এ দুটি রিওয়ায়াত বাহ্যিকভাবে বিপরীত মনে হচ্ছে। কারণ, দ্বিতীয় বর্ণনায় এসেছে, দুধ ছাড়ানোর পর শিশুটিকে রুটি হাতে নিয়ে আসার পর মহিলাকে রজম করা হয়। অন্যদিকে প্রথম বর্ণনায় এসেছে, বাচ্চা প্রসবের পরপরই মহিলাকে রজম করা হয়। তাই এখানে প্রথম বর্ণনাটিকে দ্বিতীয় বর্ণনার সাথে সামঞ্জস্যশীল করতে হবে। কারণ, ঘটনা একটিই। আর উভয় বর্ণনাই সহিহ। দুটি বর্ণনার মাঝে দ্বিতীয়টি স্পষ্ট। এতে ভিন্ন ব্যাখ্যার কোনো সুযোগ নেই। অন্যদিকে প্রথম বর্ণনাটি এটার মতো স্পষ্ট নয়। তাই ব্যাখ্যার জন্য সেটাকেই বেছে নেওয়া হলো।

প্রথম বর্ণনায় এসেছে যে, আনসারদের এক লোক দাঁড়িয়ে বললেন, "আমি তার দুধপান করানোর দায়িত্ব নিচ্ছি।" এ কথাটি সে আনসারি সাহাবি মূলত তার দুধ ছাড়ানোর পরে বলেছেন। আনসারি সাহাবি রূপক অর্থে দুধপান শব্দটি ব্যবহার করেছেন। رَضَاعَة )দুধপান) শব্দ দ্বারা মূলত তার উদ্দেশ্য ছিল, كَفَالَة 3 تَرْبِيّة তথা প্রতিপালন ও তত্ত্বাবধান। '৪১৩

টিকাঃ
৪০৯. সহিহু মুসলিম: ১৬৯৫।
৪১০. সহিহু মুসলিম: ১৬৯৬।
৪১১. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১১/১৯৯।
৪১২. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১১/১৯৯।
৪১৩. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১১/২০২।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 শাস্তিযোগ্য মদ্যাপকে গালি দিতে নিষেধ করতেন

📄 শাস্তিযোগ্য মদ্যাপকে গালি দিতে নিষেধ করতেন


আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'এক মদ্যপকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে নিয়ে আসা হলো। তিনি প্রহার করার নির্দেশ দিলেন। আমাদের কেউ তাকে হাত দিয়ে মারতে শুরু করল, তো কেউ পায়ের জুতো দিয়ে তাকে পেটাল। কেউ আবার কাপড় দিয়ে তাকে মারতে লাগল। সে যখন চলে যেতে লাগল, তখন এক লোক বলল, "আল্লাহ তোমাকে অপদস্থ করুক।"

তা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমরা নিজের ভাইয়ের বিরুদ্ধে শয়তানের সহযোগী হয়ো না। "৪১৪

অন্য বর্ণনায় এসেছে, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বললেন, "বরং তোমরা বলো, হে আল্লাহ, তাকে ক্ষমা করে দিন। তার ওপর দয়া করুন। "৪১৫

ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'শয়তানের সাহায্য হওয়ার কারণ হচ্ছে, শয়তান চায় গুনাহকে তার সামনে চাকচিক্যময় করে তুলে ধরতে। যাতে সে আবারও লাঞ্ছিত হয়। তাই যদি কেউ অপরাধীর জন্য লাঞ্ছনার বদদোয়া করে, তাহলে যেন সে শয়তানের উদ্দেশ্য পূরণ করে দিয়েছে।

এ হাদিস থেকে বোঝা যাচ্ছে, লানত দিয়ে কোনো অপরাধীর বিরুদ্ধে বদদোয়া করা নিষেধ। '৪১৬

আবু কালাবা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর বর্ণিত একটি আসার এই হাদিসটির কাছাকাছি। সেটা হলো, 'আবু দারদা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এক লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। লোকটি গুনাহ করার কারণে মানুষ তাকে গালি দিচ্ছিল। তিনি লোকগুলোর উদ্দেশে বললেন, "যদি তোমরা তাকে কুয়োর ভেতরে বিপদাপন্ন দেখতে, তাহলে কি সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করতে না?"

তারা বলল, "অবশ্যই করতাম।"

আবু দারদা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, "তাহলে তোমাদের ভাইকে গালি দিয়ো না; বরং তোমরা যে পাপ থেকে বিরত আছ, সে জন্য আল্লাহর প্রশংসা করো।"

তারা জানতে চাইল, "আমরা কি তাকে ঘৃণা করব না?"

আবু দারদা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, "বরং আমি তার কর্মকে ঘৃণা করব। যদি সে পাপকর্ম থেকে বিরত থাকে, তবে সে আমার ভাই। "৪১৭

টিকাঃ
৪১৪. সহিহুল বুখারি: ৬৭৮১।
৪১৫. সুনানু আবি দাউদ: ৪৪৭৮।
৪১৬. ফাতহুল বারি: ১২/৬৭। পরিমার্জিত।
৪১৭. আবু দাউদ কৃত আজ-জুহদ: ২৩২, মুসান্নাফু আব্দির রাজ্জাক: ২০২৬৭, হিলইয়াতুল আওলিয়া: ১/২২৫।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 নির্দিষ্ট কোনো গুনাহগারের ওপর বদদোয়া করতে নিষেধ করতেন

📄 নির্দিষ্ট কোনো গুনাহগারের ওপর বদদোয়া করতে নিষেধ করতেন


উমর বিন খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবদ্দশায় এক ব্যক্তির নাম ছিল আব্দুল্লাহ। তার উপাধি ছিল হিমার (গাধা)। লোকটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হাসাত। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগেও তাকে মদপানের কারণে বেত্রাঘাতের শাস্তি দিয়েছিলেন। কিন্তু আরেক দিন সে মদপান করে আসলো এবং এবারও তাকে বেত্রাঘাতের শাস্তি দেওয়া হলো। তখন এক ব্যক্তি বদদোয়া করে বলল, "হে আল্লাহ, তাকে আপনার দয়া থেকে বঞ্চিত করুন। তার ওপর লানত পড়ুক! কতবারই-না সে এ পাপ করছে!"

তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমরা তাকে অভিশাপ দিয়ো না। আল্লাহর কসম, আমি জানি, সে আল্লাহ ও তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ভালোবাসে।"৪১৮

হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়:

* পাপী ব্যক্তির অন্তরে পাপ এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ভালোবাসা একত্রে থাকাটা অসম্ভব কিছু নয়। কারণ, এ লোকটি থেকে মদপানের মতো একটি পাপ প্রকাশিত হলেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন যে, তার অন্তরে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ভালোবাসা আছে।
* যদি কোনো পাপী ও গুনাহগারের অন্তরে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভালোবাসা অনবরত বিদ্যমান থাকে, তবে সে যখন লজ্জিত হবে বা তার ওপর হদ প্রয়োগ করা হবে, তখন উক্ত গুনাহ মুছে যাবে। অন্যদিকে কারও অন্তর যদি পাপ করার কারণে লজ্জিত না হয়, তবে আশঙ্কা আছে যে, বারবার গুনাহ করার কারণে তার অন্তর থেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভালোবাসা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আল্লাহর কাছে আমরা ক্ষমা ও নিষ্কলুষতা প্রার্থনা করছি। ৪১৯

শাইখুল ইসলাম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কারও ওপর নির্দিষ্ট করে লানত করতে নিষেধ করেছেন। যেমন এ লোকটি মদপানের কারণে শাস্তিপ্রাপ্ত হয়েও আবার একই পাপ করেছে। তার অধিক মদপানের কারণে কেউ একজন তাকে লানত করলে, তিনি লানত করতে নিষেধ করলেন। কারণ হিসেবে বলেন, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ভালোবাসে। যদিও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যাপকভাবে মদখোরদের ওপর লানত করেছেন।

এ থেকে বোঝা যায়, ব্যাপকভাবে লানত করা জায়িজ আছে। কিন্তু যদি কেউ আল্লাহ ও তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ভালোবাসে, তবে তাকে নির্দিষ্ট করে লানত করা জায়িজ নেই। আর প্রতিটি মুমিনই তো আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ভালোবাসে। তাই কোনো মুমিনকেই নির্দিষ্ট করে লানত করা জায়িজ নেই। '৪২০

প্রশ্ন হতে পারে, এ হাদিস ও আনাস বিন মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত হাদিসের মাঝে সমন্বয় হয় কীভাবে? আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদ-সংশ্লিষ্ট দশ শ্রেণির লোককে লানত করেছেন-যথা: মদ তৈরিকারী, মদের ফরমায়েশকারী, মদ পানকারী, মদ বহনকারী, যার জন্য মদ বহন করা হয়, মদ পরিবেশনকারী, মদ বিক্রয়কারী, মদের মূল্য ভোগকারী, মদ ক্রেতা, যার জন্য মদ ক্রয় করা হয়। '৪২১

উত্তর হচ্ছে, এখানে উল্লিখিত হাদিসটিতে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লানত করা হয়েছে, যা জায়িজ নেই। আর আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর বর্ণিত হাদিসটিতে ব্যাপকভাবে মদের কারবারিতে যুক্ত বিভিন্ন শ্রেণিকে লানত করা হয়েছে। এটা জায়িজ। আদতে দুই হাদিসের মাঝে কোনো বৈপরীত্য নেই।

টিকাঃ
৪১৮. সহিহুল বুখারি: ৬৭৮০।
৪১৯. ফাতহুল বারি: ১২/৭৮।
৪২০. মানহাজুস সুন্নাতিন নাবাবিয়্যা: ৪/৫৬৯-৫৭০।
৪২১. সুনানুত তিরমিজি: ১২৯৫, সুনানু ইবনি মাজাহ : ৩৩৮১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00