📄 অসুস্থ বেদুইনকে দেখতে যেতেন
বেদুইনদের কেউ অসুস্থ হলে তিনি দেখতে যেতেন এবং তাদের জন্য দোয়া করতেন।
আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক বেদুইন রোগীকে দেখতে গেলেন। সাধারণত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো রোগীকে দেখতে গেলে বলতেন:
لَا بَأْسَ، طَهُورُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ
“দুশ্চিন্তার কারণ নেই। এই অসুখ তোমাকে গুনাহ থেকে পবিত্র করে তুলবে ইনশাআল্লাহ।”
এবারও তা-ই বললেন। তখন বেদুইন লোকটি বললেন:
طَهُورُ؟ كَلَّا ، بَلْ هِيَ حُتَّى تَفُورُ، أَوْ تَفُورُ، عَلَى شَيْءٍ كَبِيرٍ
'আপনি অসুখকে গুনাহ থেকে পবিত্রকারী বলছেন! তা কক্ষনো নয়; বরং এ তো এমন জ্বর, যা বয়োবৃদ্ধের ওপর টগবগ করে ফুটছে বা জ্বলছে।'
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তবে তা-ই হোক।"৩৬৪
অন্য বর্ণনায় আছে, পরদিন সন্ধ্যাবেলা সে লোকটি মৃত্যুবরণ করলেন। ৩৬৫
(এই জ্বর তোমাকে গুনাহ থেকে পবিত্র করে তুলবে ইনশাআল্লাহ): নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে 'ইনশাআল্লাহ' বলেছেন। কারণ, তার এ কথাটা জুমলায়ে খাবারিয়্যাহ (বিবৃতিমূলক বাক্য)। জুমলায়ে দুআইয়্যাহ (প্রার্থনামূলক বাক্য) নয়। কারণ, দোয়ার সময় দৃঢ় হয়ে দোয়া করতে হয়। সে ক্ষেত্রে 'ইচ্ছা করা'-জাতীয় কোনো শব্দ থাকে না।
এ জন্যই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়ার সময় 'হে আল্লাহ আপনি ইচ্ছে করলে আমাকে ক্ষমা করে দিন, ইচ্ছে করলে আমার ওপর দয়া করুন' এমন করে বলতে নিষেধ করেছেন। ৩৬৬
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে হাদিসে বলেছেন, এ রকম করে বলবে না। কেননা, আল্লাহকে বাধ্য করবে-এমন কেউ নেই যে, যদি তিনি চান, তবে তোমাকে ক্ষমা করে দেবেন, যদি তিনি চান তোমাকে ক্ষমা করবেন না, তোমার প্রতি দয়া করবেন না। কারণ 'তুমি চাইলে' কথাটি তাকেই বলা হয়, যাকে বাধ্যকারী কেউ আছে অথবা যার চেয়ে বড় দানবীর অন্য কেউ আছে। তাই যখন তুমি আল্লাহর কাছে চাইবে, তখন 'আপনি চাইলে' এমন করে বলবে না।
অন্যদিকে এ হাদিসের মাঝে রোগীর উদ্দেশে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, )،لا بأس طَهُورُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ( । এখানে বাক্যটি বিবৃতিমূলক। আশাবাদ অর্থে এসেছে। তিনি আশা ব্যক্ত করেছেন যে, সামনে রোগীর কোনো কষ্ট হবে না। এরপর 'ইনশাআল্লাহ' বলেছেন। কারণ, রোগীর কষ্ট হওয়া না-হওয়া আল্লাহর ইচ্ছাধীন। ৩৬৭
فَنَعَمْ إِذَا-এ বাক্যের 'ফা' অক্ষর উহ্য একটি কথার জামিন। সে উহ্য কথাটি হচ্ছে, 'তুমি যদি সুস্থতা না-ই চাও, তবে তোমার ধারণা অনুযায়ী তা-ই হোক।'
হাদিস থেকে বোঝা যায়:
* অসুস্থ কাউকে দেখতে গেলে )لَا بَأْسَ، طَهُورُ إِنْ شَاءَ اللهُ( বলা উচিত।
* শাসক তার শাসিতদের মধ্যে একদম গ্রাম্য লোককেও তার রোগশয্যায় দেখতে যেতে পারেন। একইভাবে আলিম ব্যক্তি মূর্খ লোককে দেখতে যেতে পারেন, যাতে তাকে তার জন্য উপকারী বিষয় শিক্ষা দিতে পারেন এবং সবর করার প্রতি উৎসাহিত করতে পারেন। কারণ, তা না হলে আল্লাহর তাকদিরের প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে তাঁর ক্রোধের শিকার হতে পারে সে।
* অসুস্থ ব্যক্তির উচিত, কেউ উপদেশ দিলে তা উত্তমরূপে গ্রহণ করা এবং উপদেশদাতাকে উত্তম ভাষায় প্রত্যুত্তর করা। ৩৬৮
টিকাঃ
৩৬৪. সহিহুল বুখারি: ৩৬১৬।
৩৬৫. তাবারানি: ৭২১৩।
৩৬৬. সহিহুল বুخারি: ৬৩৩৯, সহিহু মুসলিম: ২৬৭৯।
৩৬৭. শারহু রিয়াজিস সালিহিন: ৪/৪৮৪।
৩৬৮. ফাতহুল বারি: ১০/১১৯, শারহু রিয়াজিস সালিহিন ৪/৪৮৪।
📄 বেদুইন সাহাবিদের সঙ্গে হাদিয়া বিনিময় করতেন
আনাস বিন মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'বেদুইন এক লোকের নাম ছিল জাহির। গ্রাম থেকে সে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য হাদিয়া আনত। গ্রামে ফিরে যাওয়ার সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও তাকে হাদিয়া দিয়ে সজ্জিত করতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, )إِنَّ زَاهِرًا بَادِيَتُنَا، وَنَحْنُ حَاضِرُوهُ( "জাহির গ্রামে আমাদের প্রতিনিধি, আর আমরা শহরে তার প্রতিনিধি।"
লোকটি দেখতে কুৎসিত ছিল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অনেক ভালোবাসতেন। একদিন সে বাজারে তার পণ্য বিক্রি করছিল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুপিচুপি পেছন থেকে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। সে টেরও পেল না তার পেছনে কে। তাই বলে উঠল, "কে? আমাকে ছাড়ো!"
এরপর পেছনে ফিরে দেখে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তখন নিজের পিঠকে সে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বুকের সাথে আরও বেশি লাগিয়ে দিল। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলছিলেন, "এ গোলামটি কে কিনবে?"৩৬৯
সে বলল, "আমাকে বিক্রি করে তেমন দাম পাবেন না আপনি, হে আল্লাহর রাসুল। কারণ, আমি অচলপণ্য।"
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "কিন্তু আল্লাহর কাছে তুমি অচলপণ্য নও।" অথবা বললেন, "কিন্তু আল্লাহর কাছে বহু মূল্যবান তুমি।"৩৭০
بَادِيتُنَا-অর্থাৎ আমাদের গ্রামবাসী। অথবা সে আমাদের গ্রামের ফল-ফসলাদি হাদিয়া দেয়, তাই যেন সে আমাদের গ্রামের মতো। অথবা সে আমাদের গ্রাম্য পণ্যের দরকার হলে নিয়ে আসে, যদ্দরুন আমাদের আর গ্রামে যেতে হয় না; তাই সে আমাদের গ্রামের প্রতিনিধি।
وَنَحْنُ حَاضِرُوهُ -অর্থাৎ শহর থেকে তার যা কিছু প্রয়োজন, আমরা তাকে সেগুলো প্রস্তুত করে দিই। অথবা গ্রাম থেকে সে শহরে কেবল আমাদের দেখার জন্যই আসে। ৩৭১
وَكَانَ رَجُلًا دَمِيمًا অর্থাৎ দেখতে কুৎসিত, কিন্তু মনোরম চরিত্রের।
হাদিস থেকে শিক্ষা
মানুষের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যই আসল সৌন্দর্য। বাইরের রূপটা মন্দ হলেও ভেতরের মানুষটা ভালো হওয়াই কাম্য। এ জন্যই হাদিসে এসেছে-
إِنَّ اللَّهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ، وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ
'আল্লাহ তোমাদের চেহারা ও সম্পদ দেখেন না; তিনি দেখেন তোমাদের অন্তর ও আমল। '৩৭২
আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'এক বেদুইন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে একটি পূর্ণবয়স্ক উট হাদিয়া দিল। বিনিময়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ছয়টি পূর্ণবয়স্কা উটনী দিলেন। কিন্তু বেদুইন লোকটা এতেও সন্তুষ্ট হতে পারল না। ৩৭৩
তার নারাজ হওয়ার কথা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে পারলেন। তিনি তখন আল্লাহর প্রশংসা করে লোকদের উদ্দেশে বললেন, "অনেক বেদুইন আমাকে হাদিয়া দেয়। এমনই একজন আমাকে হাদিয়া দিলে আমিও বিনিময়ে তাকে আমার কাছে যতটুকু ছিল, ততটুকু হাদিয়া দিলাম। কিন্তু সে আমার ওপর সন্তুষ্ট হতে পারল না। তাই আমি নিয়ত করেছি, আজ থেকে কুরাইশ, আনসার, সাকাফি ও দাওসি ছাড়া অন্য কারও হাদিয়া গ্রহণ করব না।"৩৭৪
তুরিবিশতি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'যারা হাদিয়া দিয়ে বেশি বিনিময় চায়, তাদের হাদিয়া গ্রহণ করা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপছন্দ করতেন। হাদিয়া গ্রহণের সুযোগ উল্লিখিত শ্রেণির লোকদের জন্য রেখেছেন। কারণ, তাদের আত্মিক ধনাঢ্যতা, উচ্চ মনোবল এবং বিনিময় নেওয়ার প্রতি অনীহার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতেন। '৩৭৫
টিকাঃ
৩৬৯. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কৌতুক করে বলেছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্য কথায় কৌতুক করতেন। যেহেতু প্রতিটা মানুষ আল্লাহর গোলাম। তাই সে বেদুইন স্বাধীন হলেও তাকে গোলাম বলতে অসুবিধে ছিল না।
৩৭০. মুসনাদু আহমাদ: ১২২৩৭।
৩৭১. ফাইজুল কাদির: ২/৪৫২।
৩৭২. সহিহু মুসলিম: ২৫৬৪।
৩৭৩. বেদুইন লোকটার অসন্তুষ্টির কারণ ছিল, সে আশা করছিল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আরও বেশি বিনিময় দেবেন। কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উদারতার বিষয়ে সে পূর্বে শুনেছিল। -তুহফাতুল আহওয়াজি: ১০/৩০৮।
৩৭৪. সুনানুত তিরমিজি: ৩৯৪৫, সুনানু আবি দাউদ: ৩৪৩৭।
৩৭৫. তুহফাতুল আহওয়াজি: ১০/৩০৮।
📄 তাদের অন্যায় আচরণ সহ্য করতেন
তাদের কেউ তাঁর সাথে অন্যায় আচরণ করলে, তিনি সবর করতেন এবং ঝগড়া করলেও তা সহ্য করতেন। উমারা বিন খুজাইমা (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত,
'তার চাচা, যিনি সাহাবি ছিলেন, তিনি তাকে বলেছেন যে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার এক বেদুইনের কাছ থেকে একটি ঘোড়া কিনেছিলেন। ঘোড়ার দাম দেওয়ার জন্য তাকে তাঁর সাথে আসতে বললেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জোর গতিতে হেঁটে গেলেন। কিন্তু বেদুইন লোকটি ধীরে হাঁটছিল বলে একটু পিছিয়ে পড়ল।'
এদিকে লোকজন বেদুইনের কাছে সে ঘোড়াটির মূল্য হাঁকাতে শুরু করেছে। তারা বুঝতে পারেনি যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটু আগেই ঘোড়াটি কিনে নিয়েছেন। লোকেরা দাম বলতে বলতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে বিক্রিত মূল্যের চেয়ে বেশি বলে ফেললে সে বেদুইন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ডেকে বলল, "আপনি যদি এ ঘোড়া কিনতে চান, তবে বলুন। অন্যথায় আমি বিক্রি করে দিচ্ছি।"
বেদুইন লোকটার ডাক শুনে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে গেলেন। বললেন, “তোমার কাছ থেকে একটু আগেই না ঘোড়াটা কিনলাম!"
বেদুইন বলল, "না, আল্লাহর কসম, আমি আপনার কাছে বিক্রি করিনি।"
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "একটু আগেই আমি তোমার কাছ থেকে ঘোড়াটা কিনে নিয়েছি।"
মানুষজন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও বেদুইনের মাঝে চলমান কথোপকথনের প্রতি মনোযোগী হলো। তখন বেদুইন বলতে শুরু করল, "আমি আপনার কাছে ঘোড়াটি বিক্রি করেছি-এমন কোনো সাক্ষী আনুন।"
খুজাইমা বিন সাবিত (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তখন বলল, "আমি সাক্ষী আছি। তুমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এ ঘোড়াটি বিক্রি করেছ।"
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন খুজাইমা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর উদ্দেশে বললেন, "কীসের ভিত্তিতে সাক্ষ্য দিচ্ছ তুমি?"
খুজাইমা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলল, "হে আল্লাহর রাসুল, আপনাকে সত্যবাদী বলে বিশ্বাস করি, এই ভিত্তিতে সাক্ষ্য দিচ্ছি।"
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুজাইমা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর একার সাক্ষ্যকে দুজনের সাক্ষ্যের সমান বলে ঘোষণা করলেন। "৩৭৬
খুজাইমা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর একার সাক্ষ্য দুটি সাক্ষ্য গণ্য করার ফলাফল আমরা দেখতে পেয়েছি কুরআন সংকলনের সময়। খারিজা বিন জাইদ (রাহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত, 'জাইদ বিন সাবিত (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, "কুরআন সংকলনের সময় একটি আয়াতের লিপি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে সে আয়াতটি আমি শুনেছিলাম। এ আয়াতটি একমাত্র খুজাইমা বিন সাবিত আনসারি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে পেয়েছিলাম। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার একার সাক্ষ্যকে দুজনের সাক্ষ্য বলে গণ্য করেছিলেন। সে আয়াতটি হচ্ছে : )مِنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ عَلَيْهِ( “মুমিনদের মধ্যে কতক আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছে।" [সুরা আল-আহজাব: ২৩]'৩৭৭
টিকাঃ
৩৭৬. মুসনাদু আহমাদ: ২১৩৭৬, সুনানু আবি দাউদ: ৩৬০৭, সুনানুন নাসায়ি: ৪৬৪৭।
৩৭৭. সহিহুল বুখারি: ২৮০৭।
📄 বেদুইনরা শক্ত কথা বললে তিনি ধৈর্যধারণ করতেন
আবু সাইদ খুদরি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'এক বেদুইন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে তার ঋণ পরিশোধ করতে বলল কঠোর ভাষায়। এমনকি সে বলল, "আমার পাওনা আদায় না করলে আমি আপনার অবস্থা কঠিন করে তুলব।"
সাহাবিগণ তখন তাকে তিরস্কার করে বললেন, "ধ্বংস হোক তোমার, তুমি কি জানো, কার সাথে তুমি কথা বলছ?"
বেদুইন বলল, "আমি আমার পাওনা চাইছি।"
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমরা কেন পওনাদারের পক্ষ নিলে না!"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরপর খাওলা বিনতে কাইস (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর কাছে খবর পাঠালেন এ বলে যে, "যদি তোমার কাছে খেজুর থাকে, তবে আমাকে কিছু ঋণ দাও। আমার খেজুর আসলে তোমাকে দিয়ে দেবো।"
খাওলা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) তখন বললেন, "জি, অবশ্যই হে আল্লাহর রাসুল! আপনার জন্য আমার বাবা উৎসর্গ হোক।"
খাওলা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) ধার দিলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে বেদুইনের ঋণ পরিশোধ করলেন এবং তাকে খাওয়ালেন। তখন সে বেদুইন বলল, "আপনি পরিপূর্ণ পরিশোধ করেছেন, আল্লাহ আপনাকে পরিপূর্ণ দান করুন।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, "এরাই হলো উত্তম মানুষ। যে জাতির দুর্বলরা কষ্ট করা ব্যতীত তাদের পাওনা আদায় করতে পারে না, সে জাতি পবিত্র নয়।"৩৭৮
আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'এক বেদুইনের কাছ থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক অসাক আজওয়া খেজুরের বিনিময়ে একটি জবাইয়ের উট কিনলেন। বিক্রয় চুক্তি করে তাকে নিয়ে বাড়িতে এলেন। বাড়িতে এসে দেখলেন খেজুর নেই। তখন তিনি বাইরে এসে বেদুইন লোকটাকে বললেন, "আল্লাহর বান্দা, এক অসাক আজওয়া খেজুরের বিনিময়ে তোমার কাছ থেকে জবাইয়ের উটটা কিনলাম, কিন্তু খুঁজে দেখলাম, ঘরে কোনো খেজুর নেই।"
বেদুইন লোকটা বলল, "প্রতারণা!"
বেদুইনের কথা শুনে আশপাশের মানুষ তার প্রতি গর্জন করে উঠল। বলল, "আল্লাহ তোমাকে ধ্বংস করুন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি প্রতারণা করবেন!?"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, "তাকে ছেড়ে দাও। পাওনাদারের কথা বলার অধিকার আছে।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরপর আবার বললেন, "আল্লাহর বান্দা, তোমার কাছ থেকে আমি একটি উট কিনেছিলাম। আমার ধারণা ছিল তোমাকে দেওয়ার মূল্যটা আমার কাছে আছে। কিন্তু খুঁজে দেখে পেলাম না।"
বেদুইন লোকটা বলল, "ওহ, প্রতারণা!"
তখন আশপাশের মানুষ তার প্রতি গর্জে উঠে বলল, "আল্লাহ তোমায় ধ্বংস করুন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতারণা করবেন!?"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের উদ্দেশে বললেন, "তাকে তোমরা ছেড়ে দাও। পাওনাদারের কথা বলার অধিকার আছে।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে বেদুইনের কাছে বিষয়টা দুবার বা তিনবার বলেছিলেন। কিন্তু যখন দেখলেন, লোকটা বুঝতে পারছে না, তখন তিনি তাঁর সাহাবিদের একজনকে বললেন, "খুয়াইলা বিনতে হাকিম বিন উমাইয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর কাছে যাও। তাকে বলো, “রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাকে বলেছেন, যদি তোমার কাছে এক অসাক আজওয়া খেজুর থাকে, তাহলে তা আমাদের ঋণ দাও; পরে আমি পরিশোধ করে দেবো ইনশাআল্লাহ।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদেশ অনুযায়ী সে লোকটা গিয়ে খুয়াইলা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-কে বলে ফিরে এসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলল, "সে বলেছে, জি, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার কাছে আছে। যে নেবে, তাকে পাঠিয়ে দিন।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন লোকটাকে বলল, "একে নিয়ে যাও। তাকে তার পাওনা দিয়ে দাও।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদেশমতো সে লোকটা বেদুইনকে নিয়ে গেল।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের নিয়ে বসে আছেন-এমন সময় সে বেদুইন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলল, "আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন। আপনি উত্তমরূপে পরিপূর্ণ পাওনা মিটিয়ে দিয়েছেন।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, "কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে তারাই উত্তম বান্দা হিসেবে পরিগণিত হবে, যারা উত্তম ও পূর্ণরূপে পাওনা পরিশোধকারী। "৩৭৯
টিকাঃ
৩৭৮. সুনানু ইবনি মাজাহ: ২৪২৬।
৩৭৯. মুসনাদু আহমাদ: ২৫৭৮০।