📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 নিজের হকের ক্ষেত্রে শিথিল এবং আল্লাহর হকের ক্ষেত্রে কঠোর ছিলেন

📄 নিজের হকের ক্ষেত্রে শিথিল এবং আল্লাহর হকের ক্ষেত্রে কঠোর ছিলেন


বেদুইনরা তাঁর হক আদায় না করলেও তিনি নম্র আচরণ করতেন, কিন্তু আল্লাহর হক লঙ্ঘন করলে তিনি কঠোর হতেন এবং আল্লাহর হুকুম ও হদ প্রয়োগ করতেন।

মুগিরা বিন শুবা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'দুই সতিন নিজেদের মধ্যে লড়াই করল। তাদের একজন তাঁবুর খুটি দিয়ে আঘাত করে তার সতিনকে হত্যা করে ফেলল। [অন্য বর্ণনায় শব্দ এসেছে: মৃত মহিলা গর্ভবতী ছিল।]

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলার হত্যার কারণে হত্যাকারিণীর গোত্রের ওপর দিয়াত আদায়ের ফয়সালা করলেন। আর পেটের সন্তান হত্যার জন্য দাস মুক্ত করার সিদ্ধান্ত শোনালেন। ৩৫০

তখন এক বেদুইন বলে উঠল, "দাস মুক্ত করা হবে-এমন এক শিশুর হত্যার কারণে, যে পানও করেনি, খায়ওনি, কথাও বলেনি, একটু শব্দও করেনি!? শিশুর বিষয়টা তো প্রতিশোধহীন থাকতে পারে, নাকি!"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এটা জাহিলি যুগের ছন্দাবৃত্তির মতো ছন্দাবৃত্তি।" এই বলে তিনি শিশুর ক্ষেত্রে দাস মুক্ত করার সিদ্ধান্ত বহাল রাখলেন। '৩৫১

আলিমগণ বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ছন্দের মতো কথাগুলোর দুকারণে নিন্দা করেছেন:

১. এর মাধ্যমে সে শরিয়তের বিধানের বিরুদ্ধে কথা বলেছিল এবং তা বাতিল করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল।
২. সে শরিয়ত-বহির্ভূত একটা বিষয় চাপিয়ে দিতে চাইছিল।

ছন্দযুক্ত কথায় এ দুটি দিক নিন্দনীয়। পক্ষান্তরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন সময় যেসব ছন্দযুক্ত কথা বলেছেন, যা হাদিসের মাঝে প্রসিদ্ধ-তা নিন্দিত ছন্দের অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা, সেগুলো শরিয়তের বিরুদ্ধে যায় না এবং শরিয়ত-বহির্ভূত কোনো বিষয় চাপিয়ে দেয় না; বরং তা ভালো অর্থবহ হয়ে থাকে। ৩৫২

অন্য একটি বর্ণনা মতে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে বেদুইনকে গণকের সাথে তুলনা দিয়েছেন। কারণ, গণকরা অন্তরসমূহকে প্রভাবিত ও আকৃষ্ট করার জন্য তাদের বাতিল কথাগুলো ছন্দোবদ্ধভাবে বলে থাকে। ৩৫৩

তবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে বেদুইন সাহাবিকে কোনো শাস্তি দেননি। কারণ, মূর্খদের ক্ষমা করার ব্যাপারে তিনি আদিষ্ট ছিলেন। ৩৫৪

আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'এক বেদুইন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসলো। তার গায়ে সবুজ রঙের একটি আলখেল্লা পরিহিত ছিল, যাতে রেশমের ঝালর অথবা বোতাম লাগানো ছিল।'

সে বলল, "তোমাদের এ বন্ধুটি (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রত্যেক রাখালের ছেলে রাখালকে ওপরে তুলতে চায়; আর প্রত্যেক বীরের ছেলে বীরকে নিচে ফেলতে চায়।"

তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাগান্বিত হয়ে তার দিকে তেড়ে গেলেন এবং তার জামার কলার ধরে তাঁর দিকে টেনে আনলেন আর বললেন, "আমি তোমার শরীরে নির্বোধদের পোশাক দেখতে পাচ্ছি না।"

তারপর তিনি বসে পড়লেন এবং বললেন, "নুহ (আলাইহিস সালাম) যখন মৃত্যুর নিকটবর্তী হলেন, তখন তাঁর দুই সন্তানকে ডেকে বললেন, "আমি সংক্ষেপে তোমাদের উপদেশ দিচ্ছি। তোমাদের আমি দুটি বিষয়ের নির্দেশ দিচ্ছি এবং দুটি বিষয় থেকে নিষেধ করছি। তোমাদের আমি শিরক ও অহংকার থেকে নিষেধ করছি এবং “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" পাঠের নির্দেশ দিচ্ছি। কেননা, আসমান-জমিন ও এতদুভয়ের মাঝে যা কিছু আছে, সবকিছুকে যদি এক পাল্লায় রাখা হয় আর "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ"-কে অপর পাল্লায় রাখা হয়, তবে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর পাল্লা ভারী হবে। আর যদি আসমান ও জমিনকে বৃত্ত আকারে রাখা হয়, অতঃপর তার ওপর "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" রাখা হয়, তবে (এটার ভারে) ওই বৃত্ত ভেঙে যাবে।"

আর তোমাদের "সুবাহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি" পাঠের নির্দেশ দিচ্ছি। কারণ, এটি প্রত্যেক বস্তুর দোয়া এবং প্রত্যেক বস্তুকে এটির কারণে রিজিক দেওয়া হয়।"৩৫৫

টিকাঃ
৩৫০. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গর্ভে থাকা শিশু হত্যার কারণে একটি দাস বা দাসী মুক্ত করার ফয়সালা দিলেন। দাস মুক্ত করা দিয়াতের বিশ ভাগের এক ভাগ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এমন ফয়সালার কারণ হতে পারে, হত্যাকারিণী তাঁবুর খুঁটি দিয়ে আঘাত করলেও মূলত হত্যা করার মানসে এমনটা করেনি। তাই এটা কতলে শিবহে আমাদ হয়েছে। জ্ঞানবোধসম্পন্ন ব্যক্তির ওপর এ ক্ষেত্রে দিয়াত ওয়াজিব হয়। অন্যথায় কিসাস ওয়াজিব হতো। কারণ, স্বেচ্ছায় অপরাধ করে এমন অপরাধীর ওপর দিয়াত প্রযোজ্য হয় না। দেখুন, ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১১/১৭৬-১৭৭।
৩৫১. সহিহুল বুখারি: ৬৯০৬, সহিহু মুসলিম: ১৬৮২, সুনানুন নাসায়ি ৪৮৩৩।
৩৫২. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১১/১৭৮।
৩৫৩. লিসানুল আরব: ১৩/৩৬৩।
৩৫৪. ফাতহুল বারি: ১০/২১৮।
৩৫৫. মুসনাদু আহমাদ: ৭০৬১।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 বাইআত ভাঙার অনুমতি দিতেন না

📄 বাইআত ভাঙার অনুমতি দিতেন না


ইসলাম ও হিজরতের বাইআতের পর তা ভেঙে ফেলতে চাইলে তাতে রাজি হতেন না।

জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'এক বেদুইন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলো এবং ইসলামের ওপর বাইআত হলো। অতঃপর মদিনার জ্বরে সে আক্রান্ত হলো। তাই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে সে বলল, "হে মুহাম্মাদ, আমার বাইআত প্রত্যাহার করে নিন।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অস্বীকৃতি জানালেন।

কিন্তু সে বেদুইন আবারও এসে বলল, "আমার বাইআত প্রত্যাহার করে নিন।"

তিনি অস্বীকৃতি জানালেন।

সে বেদুইন আবার এসে বলল, "আমার বাইআত প্রত্যাহার করে নিন।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবারও অস্বীকৃতি জানালেন।

অতঃপর সে বেদুইন মদিনা থেকে বেরিয়ে গেল।

তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:

إِنَّمَا المَدِينَةُ كَالكِيرِ، تَنْفِي خَبَثَهَا، وَيَنْصَعُ طِيبُهَا

“মদিনা হচ্ছে হাপরের মতো। কদর্য দূর করে স্বচ্ছতাকে স্পষ্ট করে তোলে।”৩৫৬

আলিমগণ বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইআত প্রত্যাহার না করার কারণ হচ্ছে, ইসলাম ত্যাগ করা জায়িজ নেই। আর কেউ যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে থাকার উদ্দেশ্যে হিজরত করে, তার জন্য হিজরত ত্যাগ করে নিজের দেশে বা অন্য কোথাও যাওয়ার বৈধতা নেই। আর এ বেদুইন লোকটা হিজরত করেছিল এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে থাকার ওপর বাইআত হয়েছিল। '৩৫৭

(মদিনা হাপরের মতো): অর্থাৎ মাটি দ্বারা তৈরিকৃত কামারের হাপরের মতো। কেউ কেউ হাদিসের শব্দ 'কির' থেকে আগুনে ফুঁক দেওয়ার ভিস্তি বুঝেছেন। এ অর্থ ধরলে শব্দটা الكور মূলধাতু থেকে গঠিত হবে।৩৫৮

(কদর্য দূর করে): অর্থাৎ রুপা, তামা ইত্যাদিতে যে ময়লা লেগে থাকে, হাপর তা দূর করে দেয়। এ বাক্যের মর্মার্থ হচ্ছে, মদিনা এমন ব্যক্তিকে তাড়িয়ে দেয়, যার মাঝে কোনো কল্যাণ নেই।

(স্বচ্ছতাকে স্পষ্ট করে তোলে) অর্থাৎ ময়লা থেকে পরিষ্কার ও শুদ্ধ করে ভালো অংশটা রাখে। এর মর্মার্থ হচ্ছে, যার মাঝে ইমানের পরিশুদ্ধতা নেই, মদিনা তাকে বের করে দেয়। ফলে পরিশুদ্ধ ইমানের অধিকারীরাই মদিনাতে বাকি থাকে। ৩৫৯

ইবনে মুনির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, মদিনা থেকে বের হয়ে যাওয়া নিন্দনীয়। তাই হাদিসের ওপর এ আপত্তি উত্থাপিত হয় যে, পরবর্তী সময়ে অনেক সাহাবি মদিনা থেকে বের হয়ে অন্য দেশে গিয়ে বাস করেছেন। সাহাবিদের পর অনেক গুণী ব্যক্তিও একইভাবে মদিনা ছেড়ে ভিন্ন জায়গায় গিয়ে বাস করেছেন। তাহলে তারা কি এ নিন্দার অন্তর্ভুক্ত?

আপত্তির জবাব: নিন্দিত সেই ব্যক্তি, যে মদিনাকে অপছন্দ করে মদিনা থেকে বেরিয়ে যায়। যেমনটি হাদিসে উল্লেখিত বেদুইন লোকটি করেছিল। অন্যথায়, যারা উত্তম উদ্দেশ্যে বেরিয়েছেন; যেমন কেউ ইলম প্রসারের উদ্দেশ্যে, কেউ মুশরিকদের দেশ বিজয়ের উদ্দেশ্যে, কেউ সীমান্তে পাহারা দেওয়ার অভিপ্রায়ে, কেউ শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার মানসে মদিনা থেকে বের হয়েছিল-এরা কেউই হাদিসে বর্ণিত নিন্দার পাত্র নন; বরং তারা তো মদিনার শ্রেষ্ঠজন ও শ্রেষ্ঠ অধিবাসী। '৩৬০

টিকাঃ
৩৫৬. সহিহুল বুখারি: ১৮৮৩, সহিহু মুসলিম: ১৩৮৩।
৩৫৭. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৯/১৫৬।
৩৫৮. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৪/২১৭।
৩৫৯. তুহফাতুল আহওয়াজি: ১০/২৮৯।
৩৬০. ফাতহুল বারি: ১৩/২০০।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 বিনা অনুমতিতে অন্যের ঘরে দৃষ্টি দিলে ধমক দিতেন

📄 বিনা অনুমতিতে অন্যের ঘরে দৃষ্টি দিলে ধমক দিতেন


আনাস বিন মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'এক বেদুইন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরোজার ফাঁক দিয়ে ভেতরে দেখছিল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা দেখে ফেললে লোহা বা কাঠের দণ্ড চাইলেন সে লোকের চোখ ফুঁড়ে দেওয়ার জন্য। বেদুইন লোকটা যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখতে পেল, তখন নিজের চোখ সরিয়ে নিল। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, "যদি তুমি এভাবে তাকিয়েই থাকতে, তাহলে আমি তোমার চোখ ফুঁড়ে দিতাম।"৩৬১

সাহল বিন সাদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো একটা কক্ষের ছিদ্র গলিয়ে এক লোক ভেতরে উঁকি দিচ্ছিল। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিরুনি হাতে মাথা আঁচড়াচ্ছিলেন।'

সে লোকের কাণ্ড শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তখন যদি আমি জানতে পারতাম, তবে চিরুনি দিয়ে তোমার চোখ ফুঁড়ে দিতাম। চোখের কারণেই তো অনুমতির বিধান দেওয়া হয়েছে।"৩৬২

নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'অনুমতি নেওয়া শরিয়তের নির্দেশ। যাতে হারাম কিছু বা কোনো গাইরে মাহরাম মহিলার ওপর দৃষ্টি না পড়ে। তাই কারও ঘরের দরোজার ফুঁটো বা অন্য কোনো জায়গা দিয়ে ভেতরে উঁকি দেওয়া জায়িজ নেই।'

এই হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়, উঁকিঝুঁকি দেওয়া ব্যক্তির চোখ লক্ষ্য করে হালকা কিছু নিক্ষেপ করা জায়িজ। ওই ঘরে গাইরে মাহরাম মহিলা না থাকা সত্ত্বেও কেউ যদি উঁকি দেওয়া ব্যক্তির চোখে হালকা কিছু নিক্ষেপ করে এবং এতে তার চোখ ফুঁড়ে যায়, তবুও এতে কোনো ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না। '৩৬৩

টিকাঃ
৩৬১. সুনানুন নাসায়ি: ৪৮৫৮।
৩৬২. সহিহুল বুখারি ৫৯২৪, সহিহু মুসলিম: ২১৫৬।
৩৬৩. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৪/১৩৭।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 অসুস্থ বেদুইনকে দেখতে যেতেন

📄 অসুস্থ বেদুইনকে দেখতে যেতেন


বেদুইনদের কেউ অসুস্থ হলে তিনি দেখতে যেতেন এবং তাদের জন্য দোয়া করতেন।

আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক বেদুইন রোগীকে দেখতে গেলেন। সাধারণত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো রোগীকে দেখতে গেলে বলতেন:

لَا بَأْسَ، طَهُورُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ

“দুশ্চিন্তার কারণ নেই। এই অসুখ তোমাকে গুনাহ থেকে পবিত্র করে তুলবে ইনশাআল্লাহ।”

এবারও তা-ই বললেন। তখন বেদুইন লোকটি বললেন:

طَهُورُ؟ كَلَّا ، بَلْ هِيَ حُتَّى تَفُورُ، أَوْ تَفُورُ، عَلَى شَيْءٍ كَبِيرٍ

'আপনি অসুখকে গুনাহ থেকে পবিত্রকারী বলছেন! তা কক্ষনো নয়; বরং এ তো এমন জ্বর, যা বয়োবৃদ্ধের ওপর টগবগ করে ফুটছে বা জ্বলছে।'

তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তবে তা-ই হোক।"৩৬৪

অন্য বর্ণনায় আছে, পরদিন সন্ধ্যাবেলা সে লোকটি মৃত্যুবরণ করলেন। ৩৬৫

(এই জ্বর তোমাকে গুনাহ থেকে পবিত্র করে তুলবে ইনশাআল্লাহ): নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে 'ইনশাআল্লাহ' বলেছেন। কারণ, তার এ কথাটা জুমলায়ে খাবারিয়‍্যাহ (বিবৃতিমূলক বাক্য)। জুমলায়ে দুআইয়্যাহ (প্রার্থনামূলক বাক্য) নয়। কারণ, দোয়ার সময় দৃঢ় হয়ে দোয়া করতে হয়। সে ক্ষেত্রে 'ইচ্ছা করা'-জাতীয় কোনো শব্দ থাকে না।

এ জন্যই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়ার সময় 'হে আল্লাহ আপনি ইচ্ছে করলে আমাকে ক্ষমা করে দিন, ইচ্ছে করলে আমার ওপর দয়া করুন' এমন করে বলতে নিষেধ করেছেন। ৩৬৬

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে হাদিসে বলেছেন, এ রকম করে বলবে না। কেননা, আল্লাহকে বাধ্য করবে-এমন কেউ নেই যে, যদি তিনি চান, তবে তোমাকে ক্ষমা করে দেবেন, যদি তিনি চান তোমাকে ক্ষমা করবেন না, তোমার প্রতি দয়া করবেন না। কারণ 'তুমি চাইলে' কথাটি তাকেই বলা হয়, যাকে বাধ্যকারী কেউ আছে অথবা যার চেয়ে বড় দানবীর অন্য কেউ আছে। তাই যখন তুমি আল্লাহর কাছে চাইবে, তখন 'আপনি চাইলে' এমন করে বলবে না।

অন্যদিকে এ হাদিসের মাঝে রোগীর উদ্দেশে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, )،لا بأس طَهُورُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ( । এখানে বাক্যটি বিবৃতিমূলক। আশাবাদ অর্থে এসেছে। তিনি আশা ব্যক্ত করেছেন যে, সামনে রোগীর কোনো কষ্ট হবে না। এরপর 'ইনশাআল্লাহ' বলেছেন। কারণ, রোগীর কষ্ট হওয়া না-হওয়া আল্লাহর ইচ্ছাধীন। ৩৬৭

فَنَعَمْ إِذَا-এ বাক্যের 'ফা' অক্ষর উহ্য একটি কথার জামিন। সে উহ্য কথাটি হচ্ছে, 'তুমি যদি সুস্থতা না-ই চাও, তবে তোমার ধারণা অনুযায়ী তা-ই হোক।'

হাদিস থেকে বোঝা যায়:

* অসুস্থ কাউকে দেখতে গেলে )لَا بَأْسَ، طَهُورُ إِنْ شَاءَ اللهُ( বলা উচিত।
* শাসক তার শাসিতদের মধ্যে একদম গ্রাম্য লোককেও তার রোগশয্যায় দেখতে যেতে পারেন। একইভাবে আলিম ব্যক্তি মূর্খ লোককে দেখতে যেতে পারেন, যাতে তাকে তার জন্য উপকারী বিষয় শিক্ষা দিতে পারেন এবং সবর করার প্রতি উৎসাহিত করতে পারেন। কারণ, তা না হলে আল্লাহর তাকদিরের প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে তাঁর ক্রোধের শিকার হতে পারে সে।
* অসুস্থ ব্যক্তির উচিত, কেউ উপদেশ দিলে তা উত্তমরূপে গ্রহণ করা এবং উপদেশদাতাকে উত্তম ভাষায় প্রত্যুত্তর করা। ৩৬৮

টিকাঃ
৩৬৪. সহিহুল বুখারি: ৩৬১৬।
৩৬৫. তাবারানি: ৭২১৩।
৩৬৬. সহিহুল বুخারি: ৬৩৩৯, সহিহু মুসলিম: ২৬৭৯।
৩৬৭. শারহু রিয়াজিস সালিহিন: ৪/৪৮৪।
৩৬৮. ফাতহুল বারি: ১০/১১৯, শারহু রিয়াজিস সালিহিন ৪/৪৮৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00