📄 সত্যাবাদী ও মুজাহিদ বেদুইনদের প্রশংসা করতেন
শাদ্দাদ বিন হাদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'এক বেদুইন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে ইমান আনলেন এবং তাঁর অনুসারী হলেন। অতঃপর বললেন, "আমি কি আপনার কাছে হিজরত করব?" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এক সাহাবিকে তার ব্যাপারে অসিয়ত করলেন।'
এরপর এক যুদ্ধের কথা। যুদ্ধে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে গনিমত হিসেবে বন্দী আসলো। তিনি সাহাবিদের মাঝে গনিমত বণ্টন করে দিলেন। বেদুইনের জন্যও গনিমতের অংশ বণ্টন করা হলো। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার অংশটা তার কিছু নিকটতম সাথির কাছে দিয়ে দিলেন তাকে দেওয়ার জন্য। তিনি পেছনের দিকে ছিলেন। যখন সামনে আসলেন, তার সাথিরা তার ভাগটা এগিয়ে দিল তার দিকে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "এটা কী?"
তারা উত্তর দিল, এটা তোমার অংশ, যা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমার জন্য বণ্টন করেছেন। তিনি তার অংশ নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বললেন, "এটা কী?"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, "গনিমত থেকে তোমার অংশ।"
তিনি বললেন, “এগুলোর জন্য আমি আপনার অনুসারী হইনি; বরং আমি আপনার অনুসারী হয়েছি এ কারণে যে, আমার এ স্থানে তির বিদ্ধ হবে-এটা বলার সময় তিনি তার গলার দিকে ইশারা করলেন-আর আমি শহিদ হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করব।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যদি তুমি আল্লাহর কাছে সত্যিই এ ইচ্ছে পোষণ করো, তবে আল্লাহ তা সত্যে পরিণত করবেন।"
এরপর সে লোকটি সেখানে কিছু সময় অবস্থান করে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য উঠে গেলেন। অতঃপর গলায় তিরবিদ্ধ অবস্থায় তাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে আনা হলো।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এ কি ওই লোকটাই?” তারা বললেন, "জি।” তিনি বললেন, “সে আল্লাহর কাছে সত্য বলেছে, আল্লাহও তার কথা সত্যে পরিণত করেছেন।"
এরপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জুব্বা দিয়ে তাকে কাফন পরালেন। তাকে সামনে রেখে জানাজা আদায় করলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতে তার জন্য যে দোয়া করেছিলেন, তার মাঝে যেটুকু শোনা গিয়েছিল, তা হলো:
اللهُمَّ هَذَا عَبْدُكَ خَرَجَ مُهَاجِرًا فِي سَبِيلِكَ فَقُتِلَ شَهِيدًا أَنَا شَهِيدٌ عَلَى ذَلِكَ
"হে আল্লাহ, আপনার এ বান্দাটি মুহাজির অবস্থায় বের হয়েছে, এরপর শহিদ হয়েছে। আমি নিজে এ ব্যাপারে সাক্ষী।"৩৪৭
জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'মুআজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ইশার সালাত পড়ে বাড়িতে ফিরে গিয়ে তার সাথিদের নিয়ে আবার সালাত আদায় করতেন। এমনই একদিন ফিরে গিয়ে তিনি তার সাথিদের নিয়ে সালাত আদায় করতে লাগলেন। ইত্যবসরে তার সম্প্রদায়ের এক যুবক এসে সালাতে দাঁড়াল। কিন্তু সালাত লম্বা হওয়ার কারণে সে যুবক নিজেই সালাত পড়ে বের হয়ে যায়। উটের লাগাম ধরে উট হাঁকিয়ে চলে যায় সেখান থেকে। সালাত পড়া শেষে মুআজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে তা জানালে তিনি বললেন, "নিশ্চয় এটা নিফাক। আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ ব্যাপারে জানাব অবশ্যই।"
মুআজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সে যুবকের ঘটনা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জানালেন।
যুবকটি তখন বলল, “হে আল্লাহর রাসুল, আপনার কাছ থেকে তিনি লম্বা সময় ধরে সালাত পড়ে যান। এরপর ফিরে গিয়ে আমাদের নিয়েও লম্বা সময় নিয়ে সালাত আদায় করেন।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন মুআজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর উদ্দেশে বললেন, "হে মুআজ, তুমি কি ফিতনাকারী?"
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুবককে লক্ষ করে বললেন, "ভাতিজা, তুমি কীভাবে সালাত পড়ো?"
যুবক উত্তর দিল, "আমি ফাতিহা পড়ি, আল্লাহর কাছে জান্নাত চাই, জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি। কিন্তু আমি জানি না আপনি গুনগুন করে কী পড়েন এবং মুআজই-বা সালাতে গুনগুন করে কী পড়েন!"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আমি ও মুআজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) প্রায় তা-ই করি।"
যুবকটি বলল, "কিন্তু মুআজ অচিরেই জেনে যাবেন (আমি মুনাফিক কি না), যখন শত্রুবাহিনী আসবে।"
এদিকে খবর আসলো যে, শত্রুরা কাছে চলে এসেছে। মুসলিমরা অগ্রসর হলো এবং যুদ্ধে যুবক শহিদ হয়ে গেল।
যুদ্ধ শেষে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুআজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে জিজ্ঞেস করলেন, "আমার ও তোমার সে বিবাদীর কী হলো?"
মুআজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তখন বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল, সে সত্য ছিল, আমিই মিথ্যা ছিলাম। আর সে শাহাদাত বরণ করেছে। "৩৪৮
টিকাঃ
৩৪৭. সুনানুন নাসায়ি: ১৯৫৩।
৩৪৮. সহিহু ইবনি খুজাইমা ১৬৩৪, সনদ জাইয়িদ। এ হাদিসটি সংক্ষিপ্ত আকারে বর্ণিত হয়েছে, বুখারি: ৭০৫ ও সহিহু মুসলিম: ৪৬৫-এ।
📄 বেদুইনদের কারও কারও সাথে উট-দৌড় প্রতিযোগিতা করতেন
আনাস বিন মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর "আজবা” নামের একটি উট ছিল। কোনো উটই তার আগে যেতে পারত না। একদিন এক বেদুইন সওয়ারির উপযুক্ত একটি উটে চড়ে আসলেন। এ উট দিয়ে তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও প্রতিযোগিতা করলেন তার সাথে। বেদুইনের সে উট "আজবা”-এর আগে চলে গেল। এ দেখে মুসলিমরা মনে মনে বেশ কষ্ট পেল এবং (দুঃখভরা কণ্ঠে) বলল, "আজবা" হেরে গেল!
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের মুখে কষ্টের রেখা দেখে বললেন, "আল্লাহর নীতি হলো, দুনিয়ার যে বস্তুরই উত্থান ঘটবে, তিনি অবশ্যই তার পতন ঘটাবেন।"৩৪৯
হাদিস থেকে বোঝা যায়:
* বিনম্রতার প্রতি উৎসাহ।
* উটের ওপর সওয়ার হয়ে প্রতিযোগিতা করা বৈধ।
* রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উন্নত চরিত্র ও নম্রতার প্রমাণ। কারণ, একজন সামান্য বেদুইনের সাথে প্রতিযোগিতা করতে তিনি কুণ্ঠাবোধ করেননি।
* দুনিয়াবিমুখতার শিক্ষা। কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইঙ্গিত করেছেন যে, প্রত্যেক উত্থানের পতন আছে।
টিকাঃ
৩৪৯. সহিহুল বুখারি: ২৮৭২।
📄 নিজের হকের ক্ষেত্রে শিথিল এবং আল্লাহর হকের ক্ষেত্রে কঠোর ছিলেন
বেদুইনরা তাঁর হক আদায় না করলেও তিনি নম্র আচরণ করতেন, কিন্তু আল্লাহর হক লঙ্ঘন করলে তিনি কঠোর হতেন এবং আল্লাহর হুকুম ও হদ প্রয়োগ করতেন।
মুগিরা বিন শুবা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'দুই সতিন নিজেদের মধ্যে লড়াই করল। তাদের একজন তাঁবুর খুটি দিয়ে আঘাত করে তার সতিনকে হত্যা করে ফেলল। [অন্য বর্ণনায় শব্দ এসেছে: মৃত মহিলা গর্ভবতী ছিল।]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলার হত্যার কারণে হত্যাকারিণীর গোত্রের ওপর দিয়াত আদায়ের ফয়সালা করলেন। আর পেটের সন্তান হত্যার জন্য দাস মুক্ত করার সিদ্ধান্ত শোনালেন। ৩৫০
তখন এক বেদুইন বলে উঠল, "দাস মুক্ত করা হবে-এমন এক শিশুর হত্যার কারণে, যে পানও করেনি, খায়ওনি, কথাও বলেনি, একটু শব্দও করেনি!? শিশুর বিষয়টা তো প্রতিশোধহীন থাকতে পারে, নাকি!"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এটা জাহিলি যুগের ছন্দাবৃত্তির মতো ছন্দাবৃত্তি।" এই বলে তিনি শিশুর ক্ষেত্রে দাস মুক্ত করার সিদ্ধান্ত বহাল রাখলেন। '৩৫১
আলিমগণ বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ছন্দের মতো কথাগুলোর দুকারণে নিন্দা করেছেন:
১. এর মাধ্যমে সে শরিয়তের বিধানের বিরুদ্ধে কথা বলেছিল এবং তা বাতিল করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল।
২. সে শরিয়ত-বহির্ভূত একটা বিষয় চাপিয়ে দিতে চাইছিল।
ছন্দযুক্ত কথায় এ দুটি দিক নিন্দনীয়। পক্ষান্তরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন সময় যেসব ছন্দযুক্ত কথা বলেছেন, যা হাদিসের মাঝে প্রসিদ্ধ-তা নিন্দিত ছন্দের অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা, সেগুলো শরিয়তের বিরুদ্ধে যায় না এবং শরিয়ত-বহির্ভূত কোনো বিষয় চাপিয়ে দেয় না; বরং তা ভালো অর্থবহ হয়ে থাকে। ৩৫২
অন্য একটি বর্ণনা মতে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে বেদুইনকে গণকের সাথে তুলনা দিয়েছেন। কারণ, গণকরা অন্তরসমূহকে প্রভাবিত ও আকৃষ্ট করার জন্য তাদের বাতিল কথাগুলো ছন্দোবদ্ধভাবে বলে থাকে। ৩৫৩
তবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে বেদুইন সাহাবিকে কোনো শাস্তি দেননি। কারণ, মূর্খদের ক্ষমা করার ব্যাপারে তিনি আদিষ্ট ছিলেন। ৩৫৪
আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'এক বেদুইন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসলো। তার গায়ে সবুজ রঙের একটি আলখেল্লা পরিহিত ছিল, যাতে রেশমের ঝালর অথবা বোতাম লাগানো ছিল।'
সে বলল, "তোমাদের এ বন্ধুটি (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রত্যেক রাখালের ছেলে রাখালকে ওপরে তুলতে চায়; আর প্রত্যেক বীরের ছেলে বীরকে নিচে ফেলতে চায়।"
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাগান্বিত হয়ে তার দিকে তেড়ে গেলেন এবং তার জামার কলার ধরে তাঁর দিকে টেনে আনলেন আর বললেন, "আমি তোমার শরীরে নির্বোধদের পোশাক দেখতে পাচ্ছি না।"
তারপর তিনি বসে পড়লেন এবং বললেন, "নুহ (আলাইহিস সালাম) যখন মৃত্যুর নিকটবর্তী হলেন, তখন তাঁর দুই সন্তানকে ডেকে বললেন, "আমি সংক্ষেপে তোমাদের উপদেশ দিচ্ছি। তোমাদের আমি দুটি বিষয়ের নির্দেশ দিচ্ছি এবং দুটি বিষয় থেকে নিষেধ করছি। তোমাদের আমি শিরক ও অহংকার থেকে নিষেধ করছি এবং “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" পাঠের নির্দেশ দিচ্ছি। কেননা, আসমান-জমিন ও এতদুভয়ের মাঝে যা কিছু আছে, সবকিছুকে যদি এক পাল্লায় রাখা হয় আর "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ"-কে অপর পাল্লায় রাখা হয়, তবে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর পাল্লা ভারী হবে। আর যদি আসমান ও জমিনকে বৃত্ত আকারে রাখা হয়, অতঃপর তার ওপর "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" রাখা হয়, তবে (এটার ভারে) ওই বৃত্ত ভেঙে যাবে।"
আর তোমাদের "সুবাহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি" পাঠের নির্দেশ দিচ্ছি। কারণ, এটি প্রত্যেক বস্তুর দোয়া এবং প্রত্যেক বস্তুকে এটির কারণে রিজিক দেওয়া হয়।"৩৫৫
টিকাঃ
৩৫০. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গর্ভে থাকা শিশু হত্যার কারণে একটি দাস বা দাসী মুক্ত করার ফয়সালা দিলেন। দাস মুক্ত করা দিয়াতের বিশ ভাগের এক ভাগ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এমন ফয়সালার কারণ হতে পারে, হত্যাকারিণী তাঁবুর খুঁটি দিয়ে আঘাত করলেও মূলত হত্যা করার মানসে এমনটা করেনি। তাই এটা কতলে শিবহে আমাদ হয়েছে। জ্ঞানবোধসম্পন্ন ব্যক্তির ওপর এ ক্ষেত্রে দিয়াত ওয়াজিব হয়। অন্যথায় কিসাস ওয়াজিব হতো। কারণ, স্বেচ্ছায় অপরাধ করে এমন অপরাধীর ওপর দিয়াত প্রযোজ্য হয় না। দেখুন, ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১১/১৭৬-১৭৭।
৩৫১. সহিহুল বুখারি: ৬৯০৬, সহিহু মুসলিম: ১৬৮২, সুনানুন নাসায়ি ৪৮৩৩।
৩৫২. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১১/১৭৮।
৩৫৩. লিসানুল আরব: ১৩/৩৬৩।
৩৫৪. ফাতহুল বারি: ১০/২১৮।
৩৫৫. মুসনাদু আহমাদ: ৭০৬১।
📄 বাইআত ভাঙার অনুমতি দিতেন না
ইসলাম ও হিজরতের বাইআতের পর তা ভেঙে ফেলতে চাইলে তাতে রাজি হতেন না।
জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'এক বেদুইন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলো এবং ইসলামের ওপর বাইআত হলো। অতঃপর মদিনার জ্বরে সে আক্রান্ত হলো। তাই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে সে বলল, "হে মুহাম্মাদ, আমার বাইআত প্রত্যাহার করে নিন।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অস্বীকৃতি জানালেন।
কিন্তু সে বেদুইন আবারও এসে বলল, "আমার বাইআত প্রত্যাহার করে নিন।"
তিনি অস্বীকৃতি জানালেন।
সে বেদুইন আবার এসে বলল, "আমার বাইআত প্রত্যাহার করে নিন।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবারও অস্বীকৃতি জানালেন।
অতঃপর সে বেদুইন মদিনা থেকে বেরিয়ে গেল।
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
إِنَّمَا المَدِينَةُ كَالكِيرِ، تَنْفِي خَبَثَهَا، وَيَنْصَعُ طِيبُهَا
“মদিনা হচ্ছে হাপরের মতো। কদর্য দূর করে স্বচ্ছতাকে স্পষ্ট করে তোলে।”৩৫৬
আলিমগণ বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইআত প্রত্যাহার না করার কারণ হচ্ছে, ইসলাম ত্যাগ করা জায়িজ নেই। আর কেউ যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে থাকার উদ্দেশ্যে হিজরত করে, তার জন্য হিজরত ত্যাগ করে নিজের দেশে বা অন্য কোথাও যাওয়ার বৈধতা নেই। আর এ বেদুইন লোকটা হিজরত করেছিল এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে থাকার ওপর বাইআত হয়েছিল। '৩৫৭
(মদিনা হাপরের মতো): অর্থাৎ মাটি দ্বারা তৈরিকৃত কামারের হাপরের মতো। কেউ কেউ হাদিসের শব্দ 'কির' থেকে আগুনে ফুঁক দেওয়ার ভিস্তি বুঝেছেন। এ অর্থ ধরলে শব্দটা الكور মূলধাতু থেকে গঠিত হবে।৩৫৮
(কদর্য দূর করে): অর্থাৎ রুপা, তামা ইত্যাদিতে যে ময়লা লেগে থাকে, হাপর তা দূর করে দেয়। এ বাক্যের মর্মার্থ হচ্ছে, মদিনা এমন ব্যক্তিকে তাড়িয়ে দেয়, যার মাঝে কোনো কল্যাণ নেই।
(স্বচ্ছতাকে স্পষ্ট করে তোলে) অর্থাৎ ময়লা থেকে পরিষ্কার ও শুদ্ধ করে ভালো অংশটা রাখে। এর মর্মার্থ হচ্ছে, যার মাঝে ইমানের পরিশুদ্ধতা নেই, মদিনা তাকে বের করে দেয়। ফলে পরিশুদ্ধ ইমানের অধিকারীরাই মদিনাতে বাকি থাকে। ৩৫৯
ইবনে মুনির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, মদিনা থেকে বের হয়ে যাওয়া নিন্দনীয়। তাই হাদিসের ওপর এ আপত্তি উত্থাপিত হয় যে, পরবর্তী সময়ে অনেক সাহাবি মদিনা থেকে বের হয়ে অন্য দেশে গিয়ে বাস করেছেন। সাহাবিদের পর অনেক গুণী ব্যক্তিও একইভাবে মদিনা ছেড়ে ভিন্ন জায়গায় গিয়ে বাস করেছেন। তাহলে তারা কি এ নিন্দার অন্তর্ভুক্ত?
আপত্তির জবাব: নিন্দিত সেই ব্যক্তি, যে মদিনাকে অপছন্দ করে মদিনা থেকে বেরিয়ে যায়। যেমনটি হাদিসে উল্লেখিত বেদুইন লোকটি করেছিল। অন্যথায়, যারা উত্তম উদ্দেশ্যে বেরিয়েছেন; যেমন কেউ ইলম প্রসারের উদ্দেশ্যে, কেউ মুশরিকদের দেশ বিজয়ের উদ্দেশ্যে, কেউ সীমান্তে পাহারা দেওয়ার অভিপ্রায়ে, কেউ শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার মানসে মদিনা থেকে বের হয়েছিল-এরা কেউই হাদিসে বর্ণিত নিন্দার পাত্র নন; বরং তারা তো মদিনার শ্রেষ্ঠজন ও শ্রেষ্ঠ অধিবাসী। '৩৬০
টিকাঃ
৩৫৬. সহিহুল বুখারি: ১৮৮৩, সহিহু মুসলিম: ১৩৮৩।
৩৫৭. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৯/১৫৬।
৩৫৮. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৪/২১৭।
৩৫৯. তুহফাতুল আহওয়াজি: ১০/২৮৯।
৩৬০. ফাতহুল বারি: ১৩/২০০।