📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 বেদুইনদের সঙ্গে সহজভাবে মিশতেন

📄 বেদুইনদের সঙ্গে সহজভাবে মিশতেন


তিনি বেদুইনদের সাথে বসতেন, হাসি-কৌতুক করতেন, তাদের সাথে কথা বলতেন, মেহমান বানাতেন এবং সুন্দর করে তাদের আপ্যায়ন করতেন।

আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'একদিন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথা বলছিলেন। সেখানে তখন এক বেদুইন লোকও বসেছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "জান্নাতের এক অধিবাসী আল্লাহর কাছে চাষাবাদ করার অনুমতি চাইবে। আল্লাহ তাআলা বলবেন, "তুমি যা চাচ্ছ, তা কি পাচ্ছ না?"

সে লোক জবাব দেবে, “অবশ্যই। কিন্তু আমার চাষ করতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "এরপর লোকটা বীজ রোপণ করবে। সাথে সাথেই বীজ থেকে অঙ্কুর বের হবে, গাছ বড় হবে, ফসলও কাটা হয়ে যাবে, ফসল হবে পাহাড়ের মতো বিশাল। এসবই হবে চোখের পলকে।"

তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, "আদম-সন্তান, তোমাকে কিছুই তৃপ্ত করতে পারে না।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা শেষ হলে সে বেদুইন বলে উঠল, "এমন লোক আপনি কেবল কুরাইশ বা আনসার সাহাবিদের মাঝেই পাবেন। কারণ, তারা কৃষি কাজ করে। আমরা বেদুইনরা কৃষক নই।"

তার কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে দিলেন। ৩৪৩

অর্থাৎ বেদুইন লোকটার বুদ্ধিমত্তা ও চমৎকার জবাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে উঠলেন। ৩৪৪

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আজাদকৃত দাস সাওবান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'একবার আমাদের বাড়িতে এক বেদুইন মেহমান এলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিয়ে বাড়ির সামনে বসলেন। তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে মানুষের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন যে, "ইসলামে এসে তারা কেমন খুশি? সালাতের সাথে তাদের কেমন সখ্যতা গড়ে উঠেছে?” তিনি তাঁকে প্রশ্নের উত্তর দিতে লাগলেন। এতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠতে দেখলাম।

তারপর যখন দিন বেড়ে খাবারের সময় হলো, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ডেকে চুপিচুপি বললেন, "আয়িশার ঘরে যাও আর তাকে বলো যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একজন মেহমান আছে।"

আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলে পাঠালেন, "সে সত্তার শপথ-যিনি হিদায়াত ও সত্য দ্বীন প্রেরণ করেছেন, আমাদের ঘরে মানুষের খাওয়ার মতো কিছুই নেই।"

এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এক এক করে তাঁর সকল স্ত্রীর কাছে পাঠালেন। কিন্তু সকলেই আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর মতো ওজর পেশ করলেন। এতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুখ মলিন হয়ে উঠতে দেখলাম।

বেদুইন বুদ্ধিমান ছিলেন। তিনি বুদ্ধি খাটিয়ে কথার মোড় ঘুরিয়ে দিয়ে বললেন, "এ যুগের বেদুইনরা কষ্ট সহ্য করতে পারে বেশ। আমরা শহরবাসীর মতো নই। একটি খেজুর ও একটু দুধই আমাদের জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়।"৩৪৫

তখন সামনে দিয়ে সদ্য দুধ দোহনকৃত আমাদের একটি ছাগী হেঁটে যাচ্ছিল। তাকে আমরা "সামরা" বলে ডাকতাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নাম ধরে ডাক দিলেন।

ছাগীটি ম্যাঁ ম্যাঁ করতে করতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম "বিসমিল্লাহ” বলে তার পায়ের পাশ দিয়ে হাত গলিয়ে ওলান স্পর্শ করলেন। সাথে সাথে ছাগীর ওলান দুধে ভরপুর হয়ে গেল।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ডেকে পাত্র আনতে বললেন। পাত্র নিয়ে আসলে তিনি বিসমিল্লাহ বলে দুধ দোহন করলেন। পাত্রটি তখনই ভরে গেল দুধে।

এরপর বললেন, "বিসমিল্লাহ” বলে তাকে দাও।

আমি মেহমানকে তা দিলাম। তিনি লম্বা এক চুমুক দিয়ে তা থেকে পান করলেন। অতঃপর পাত্র রেখে দেওয়ার ইচ্ছা করলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আবার পান করো।" তিনি আবার পান করলেন। এরপর রেখে দেওয়ার ইচ্ছে করলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার বললেন, "আবার পান করো।” এভাবে কয়েকবার পান করে তার পেটভর্তি হয়ে গেল। আল্লাহ যতটুকু চাইলেন ততটুকু সে সাহাবি পান করলেন।

এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম "বিসমিল্লাহ” বলে আবারও দুধ দোহন করলেন। সাথে সাথে পাত্রটি ভরে গেল। অতঃপর বললেন, "এগুলো আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর কাছে নিয়ে যাও। তারপর যে পরিমাণ সম্ভব, সে পরিমাণ যেন সে এখান থেকে পান করে।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদেশ পালনের পর আমি ফিরে এলাম। তিনি আগের মতো "বিসমিল্লাহ” বলে দুধ দোহন করলেন। পাত্র পূর্ণ হলো। অতঃপর আমাকে এক এক করে তাঁর প্রত্যেক স্ত্রীর নিকট পাঠালেন। যখনই কোনো স্ত্রী পান করতেন, "বিসমিল্লাহ” বলে পুনরায় দুধ দোহন করে আমাকে আরেকজনের কাছে পাঠাতেন। এভাবে একে একে আমাকে তাঁর সকল স্ত্রীর কাছে পাঠালেন। সবার কাছ থেকে ফিরে এসে আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলাম।

তিনি বললেন, "আমার দিকে বাটিটি উত্তোলন করো। আমি বাটি ওঠালাম। তিনি "বিসমিল্লাহ” বলে আল্লাহ যতটুকু চান পান করলেন। এরপর আমাকে দিলেন। আমি পাত্রে ঠোঁট লাগিয়ে পান করলাম। দুধটা মধুর চাইতেও মিষ্টি ছিল। মিশকের চাইতেও বেশি সুগন্ধযুক্ত ছিল। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “হে আল্লাহ, এ ছাগীর মাঝে তার পরিবারের জন্য বরকত দিন। "৩৪৬

টিকাঃ
৩৪৩. সহিহুল বুখারি: ২৩৪৮।
৩৪৪. মিরকাতুল মাফাতিহ: ৯/৩৬০০।
৩৪৫. অর্থাৎ 'যখন কোনো বেদুইন খাবার হিসেবে একটি খেজুর এবং সাথে একটু পানি বা দুধ পায়, তা-ই তখন তার জন্য উত্তম হয় এবং তার জন্য যথেষ্ট হয়।' এ বেদুইনের কথার মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে, তিনি বেশ বুদ্ধিমান ও সুন্দর কথার অধিকারী ছিলেন।
৩৪৬. আজুরি কিতাবুশ শরিয়া: ১০৪৮-এ উল্লেখ করেছেন। হাদিসটি সহিহ।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 সত্যাবাদী ও মুজাহিদ বেদুইনদের প্রশংসা করতেন

📄 সত্যাবাদী ও মুজাহিদ বেদুইনদের প্রশংসা করতেন


শাদ্দাদ বিন হাদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'এক বেদুইন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে ইমান আনলেন এবং তাঁর অনুসারী হলেন। অতঃপর বললেন, "আমি কি আপনার কাছে হিজরত করব?" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এক সাহাবিকে তার ব্যাপারে অসিয়ত করলেন।'

এরপর এক যুদ্ধের কথা। যুদ্ধে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে গনিমত হিসেবে বন্দী আসলো। তিনি সাহাবিদের মাঝে গনিমত বণ্টন করে দিলেন। বেদুইনের জন্যও গনিমতের অংশ বণ্টন করা হলো। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার অংশটা তার কিছু নিকটতম সাথির কাছে দিয়ে দিলেন তাকে দেওয়ার জন্য। তিনি পেছনের দিকে ছিলেন। যখন সামনে আসলেন, তার সাথিরা তার ভাগটা এগিয়ে দিল তার দিকে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "এটা কী?"

তারা উত্তর দিল, এটা তোমার অংশ, যা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমার জন্য বণ্টন করেছেন। তিনি তার অংশ নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বললেন, "এটা কী?"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, "গনিমত থেকে তোমার অংশ।"

তিনি বললেন, “এগুলোর জন্য আমি আপনার অনুসারী হইনি; বরং আমি আপনার অনুসারী হয়েছি এ কারণে যে, আমার এ স্থানে তির বিদ্ধ হবে-এটা বলার সময় তিনি তার গলার দিকে ইশারা করলেন-আর আমি শহিদ হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করব।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যদি তুমি আল্লাহর কাছে সত্যিই এ ইচ্ছে পোষণ করো, তবে আল্লাহ তা সত্যে পরিণত করবেন।"

এরপর সে লোকটি সেখানে কিছু সময় অবস্থান করে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য উঠে গেলেন। অতঃপর গলায় তিরবিদ্ধ অবস্থায় তাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে আনা হলো।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এ কি ওই লোকটাই?” তারা বললেন, "জি।” তিনি বললেন, “সে আল্লাহর কাছে সত্য বলেছে, আল্লাহও তার কথা সত্যে পরিণত করেছেন।"

এরপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জুব্বা দিয়ে তাকে কাফন পরালেন। তাকে সামনে রেখে জানাজা আদায় করলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতে তার জন্য যে দোয়া করেছিলেন, তার মাঝে যেটুকু শোনা গিয়েছিল, তা হলো:

اللهُمَّ هَذَا عَبْدُكَ خَرَجَ مُهَاجِرًا فِي سَبِيلِكَ فَقُتِلَ شَهِيدًا أَنَا شَهِيدٌ عَلَى ذَلِكَ

"হে আল্লাহ, আপনার এ বান্দাটি মুহাজির অবস্থায় বের হয়েছে, এরপর শহিদ হয়েছে। আমি নিজে এ ব্যাপারে সাক্ষী।"৩৪৭

জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'মুআজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ইশার সালাত পড়ে বাড়িতে ফিরে গিয়ে তার সাথিদের নিয়ে আবার সালাত আদায় করতেন। এমনই একদিন ফিরে গিয়ে তিনি তার সাথিদের নিয়ে সালাত আদায় করতে লাগলেন। ইত্যবসরে তার সম্প্রদায়ের এক যুবক এসে সালাতে দাঁড়াল। কিন্তু সালাত লম্বা হওয়ার কারণে সে যুবক নিজেই সালাত পড়ে বের হয়ে যায়। উটের লাগাম ধরে উট হাঁকিয়ে চলে যায় সেখান থেকে। সালাত পড়া শেষে মুআজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে তা জানালে তিনি বললেন, "নিশ্চয় এটা নিফাক। আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ ব্যাপারে জানাব অবশ্যই।"

মুআজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সে যুবকের ঘটনা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জানালেন।

যুবকটি তখন বলল, “হে আল্লাহর রাসুল, আপনার কাছ থেকে তিনি লম্বা সময় ধরে সালাত পড়ে যান। এরপর ফিরে গিয়ে আমাদের নিয়েও লম্বা সময় নিয়ে সালাত আদায় করেন।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন মুআজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর উদ্দেশে বললেন, "হে মুআজ, তুমি কি ফিতনাকারী?"

এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুবককে লক্ষ করে বললেন, "ভাতিজা, তুমি কীভাবে সালাত পড়ো?"

যুবক উত্তর দিল, "আমি ফাতিহা পড়ি, আল্লাহর কাছে জান্নাত চাই, জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি। কিন্তু আমি জানি না আপনি গুনগুন করে কী পড়েন এবং মুআজই-বা সালাতে গুনগুন করে কী পড়েন!"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আমি ও মুআজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) প্রায় তা-ই করি।"

যুবকটি বলল, "কিন্তু মুআজ অচিরেই জেনে যাবেন (আমি মুনাফিক কি না), যখন শত্রুবাহিনী আসবে।"

এদিকে খবর আসলো যে, শত্রুরা কাছে চলে এসেছে। মুসলিমরা অগ্রসর হলো এবং যুদ্ধে যুবক শহিদ হয়ে গেল।

যুদ্ধ শেষে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুআজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে জিজ্ঞেস করলেন, "আমার ও তোমার সে বিবাদীর কী হলো?"

মুআজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তখন বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল, সে সত্য ছিল, আমিই মিথ্যা ছিলাম। আর সে শাহাদাত বরণ করেছে। "৩৪৮

টিকাঃ
৩৪৭. সুনানুন নাসায়ি: ১৯৫৩।
৩৪৮. সহিহু ইবনি খুজাইমা ১৬৩৪, সনদ জাইয়িদ। এ হাদিসটি সংক্ষিপ্ত আকারে বর্ণিত হয়েছে, বুখারি: ৭০৫ ও সহিহু মুসলিম: ৪৬৫-এ।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 বেদুইনদের কারও কারও সাথে উট-দৌড় প্রতিযোগিতা করতেন

📄 বেদুইনদের কারও কারও সাথে উট-দৌড় প্রতিযোগিতা করতেন


আনাস বিন মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর "আজবা” নামের একটি উট ছিল। কোনো উটই তার আগে যেতে পারত না। একদিন এক বেদুইন সওয়ারির উপযুক্ত একটি উটে চড়ে আসলেন। এ উট দিয়ে তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও প্রতিযোগিতা করলেন তার সাথে। বেদুইনের সে উট "আজবা”-এর আগে চলে গেল। এ দেখে মুসলিমরা মনে মনে বেশ কষ্ট পেল এবং (দুঃখভরা কণ্ঠে) বলল, "আজবা" হেরে গেল!

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের মুখে কষ্টের রেখা দেখে বললেন, "আল্লাহর নীতি হলো, দুনিয়ার যে বস্তুরই উত্থান ঘটবে, তিনি অবশ্যই তার পতন ঘটাবেন।"৩৪৯

হাদিস থেকে বোঝা যায়:

* বিনম্রতার প্রতি উৎসাহ।
* উটের ওপর সওয়ার হয়ে প্রতিযোগিতা করা বৈধ।
* রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উন্নত চরিত্র ও নম্রতার প্রমাণ। কারণ, একজন সামান্য বেদুইনের সাথে প্রতিযোগিতা করতে তিনি কুণ্ঠাবোধ করেননি।
* দুনিয়াবিমুখতার শিক্ষা। কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইঙ্গিত করেছেন যে, প্রত্যেক উত্থানের পতন আছে।

টিকাঃ
৩৪৯. সহিহুল বুখারি: ২৮৭২।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 নিজের হকের ক্ষেত্রে শিথিল এবং আল্লাহর হকের ক্ষেত্রে কঠোর ছিলেন

📄 নিজের হকের ক্ষেত্রে শিথিল এবং আল্লাহর হকের ক্ষেত্রে কঠোর ছিলেন


বেদুইনরা তাঁর হক আদায় না করলেও তিনি নম্র আচরণ করতেন, কিন্তু আল্লাহর হক লঙ্ঘন করলে তিনি কঠোর হতেন এবং আল্লাহর হুকুম ও হদ প্রয়োগ করতেন।

মুগিরা বিন শুবা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'দুই সতিন নিজেদের মধ্যে লড়াই করল। তাদের একজন তাঁবুর খুটি দিয়ে আঘাত করে তার সতিনকে হত্যা করে ফেলল। [অন্য বর্ণনায় শব্দ এসেছে: মৃত মহিলা গর্ভবতী ছিল।]

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলার হত্যার কারণে হত্যাকারিণীর গোত্রের ওপর দিয়াত আদায়ের ফয়সালা করলেন। আর পেটের সন্তান হত্যার জন্য দাস মুক্ত করার সিদ্ধান্ত শোনালেন। ৩৫০

তখন এক বেদুইন বলে উঠল, "দাস মুক্ত করা হবে-এমন এক শিশুর হত্যার কারণে, যে পানও করেনি, খায়ওনি, কথাও বলেনি, একটু শব্দও করেনি!? শিশুর বিষয়টা তো প্রতিশোধহীন থাকতে পারে, নাকি!"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এটা জাহিলি যুগের ছন্দাবৃত্তির মতো ছন্দাবৃত্তি।" এই বলে তিনি শিশুর ক্ষেত্রে দাস মুক্ত করার সিদ্ধান্ত বহাল রাখলেন। '৩৫১

আলিমগণ বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ছন্দের মতো কথাগুলোর দুকারণে নিন্দা করেছেন:

১. এর মাধ্যমে সে শরিয়তের বিধানের বিরুদ্ধে কথা বলেছিল এবং তা বাতিল করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল।
২. সে শরিয়ত-বহির্ভূত একটা বিষয় চাপিয়ে দিতে চাইছিল।

ছন্দযুক্ত কথায় এ দুটি দিক নিন্দনীয়। পক্ষান্তরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন সময় যেসব ছন্দযুক্ত কথা বলেছেন, যা হাদিসের মাঝে প্রসিদ্ধ-তা নিন্দিত ছন্দের অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা, সেগুলো শরিয়তের বিরুদ্ধে যায় না এবং শরিয়ত-বহির্ভূত কোনো বিষয় চাপিয়ে দেয় না; বরং তা ভালো অর্থবহ হয়ে থাকে। ৩৫২

অন্য একটি বর্ণনা মতে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে বেদুইনকে গণকের সাথে তুলনা দিয়েছেন। কারণ, গণকরা অন্তরসমূহকে প্রভাবিত ও আকৃষ্ট করার জন্য তাদের বাতিল কথাগুলো ছন্দোবদ্ধভাবে বলে থাকে। ৩৫৩

তবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে বেদুইন সাহাবিকে কোনো শাস্তি দেননি। কারণ, মূর্খদের ক্ষমা করার ব্যাপারে তিনি আদিষ্ট ছিলেন। ৩৫৪

আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'এক বেদুইন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসলো। তার গায়ে সবুজ রঙের একটি আলখেল্লা পরিহিত ছিল, যাতে রেশমের ঝালর অথবা বোতাম লাগানো ছিল।'

সে বলল, "তোমাদের এ বন্ধুটি (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রত্যেক রাখালের ছেলে রাখালকে ওপরে তুলতে চায়; আর প্রত্যেক বীরের ছেলে বীরকে নিচে ফেলতে চায়।"

তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাগান্বিত হয়ে তার দিকে তেড়ে গেলেন এবং তার জামার কলার ধরে তাঁর দিকে টেনে আনলেন আর বললেন, "আমি তোমার শরীরে নির্বোধদের পোশাক দেখতে পাচ্ছি না।"

তারপর তিনি বসে পড়লেন এবং বললেন, "নুহ (আলাইহিস সালাম) যখন মৃত্যুর নিকটবর্তী হলেন, তখন তাঁর দুই সন্তানকে ডেকে বললেন, "আমি সংক্ষেপে তোমাদের উপদেশ দিচ্ছি। তোমাদের আমি দুটি বিষয়ের নির্দেশ দিচ্ছি এবং দুটি বিষয় থেকে নিষেধ করছি। তোমাদের আমি শিরক ও অহংকার থেকে নিষেধ করছি এবং “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" পাঠের নির্দেশ দিচ্ছি। কেননা, আসমান-জমিন ও এতদুভয়ের মাঝে যা কিছু আছে, সবকিছুকে যদি এক পাল্লায় রাখা হয় আর "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ"-কে অপর পাল্লায় রাখা হয়, তবে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর পাল্লা ভারী হবে। আর যদি আসমান ও জমিনকে বৃত্ত আকারে রাখা হয়, অতঃপর তার ওপর "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" রাখা হয়, তবে (এটার ভারে) ওই বৃত্ত ভেঙে যাবে।"

আর তোমাদের "সুবাহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি" পাঠের নির্দেশ দিচ্ছি। কারণ, এটি প্রত্যেক বস্তুর দোয়া এবং প্রত্যেক বস্তুকে এটির কারণে রিজিক দেওয়া হয়।"৩৫৫

টিকাঃ
৩৫০. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গর্ভে থাকা শিশু হত্যার কারণে একটি দাস বা দাসী মুক্ত করার ফয়সালা দিলেন। দাস মুক্ত করা দিয়াতের বিশ ভাগের এক ভাগ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এমন ফয়সালার কারণ হতে পারে, হত্যাকারিণী তাঁবুর খুঁটি দিয়ে আঘাত করলেও মূলত হত্যা করার মানসে এমনটা করেনি। তাই এটা কতলে শিবহে আমাদ হয়েছে। জ্ঞানবোধসম্পন্ন ব্যক্তির ওপর এ ক্ষেত্রে দিয়াত ওয়াজিব হয়। অন্যথায় কিসাস ওয়াজিব হতো। কারণ, স্বেচ্ছায় অপরাধ করে এমন অপরাধীর ওপর দিয়াত প্রযোজ্য হয় না। দেখুন, ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১১/১৭৬-১৭৭।
৩৫১. সহিহুল বুখারি: ৬৯০৬, সহিহু মুসলিম: ১৬৮২, সুনানুন নাসায়ি ৪৮৩৩।
৩৫২. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১১/১৭৮।
৩৫৩. লিসানুল আরব: ১৩/৩৬৩।
৩৫৪. ফাতহুল বারি: ১০/২১৮।
৩৫৫. মুসনাদু আহমাদ: ৭০৬১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00