📄 কঠোরতাকারী বেদুইনদের সাথে কোমল আচরণ করতেন
কঠোর আচরণকারী বেদুইনদের সঙ্গেও তিনি কোমল ব্যবহার করতেন। মসজিদে পেশাব করে দেওয়া বেদুইনের সাথে তাঁর আচরণে এ নীতি সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিল।
আনাস বিন মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে মসজিদে বসা ছিলাম। তখন সেখানে এক বেদুইন আসলো। এসেই সে মসজিদে দাঁড়িয়ে পেশাব করতে লাগল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবিগণ তাকে বললেন, “থামো, থামো, করছটা কী!"
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমরা তাকে বাধা দিও না। তাকে ছেড়ে দাও।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদেশ অনুযায়ী সাহাবিগণ তাকে আর কিছু বললেন না। তার প্রস্রাব করা শেষ হলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কাছে ডাকলেন। বললেন, "এ মসজিদগুলো পেশাব করার জন্য নয়। আর মসজিদে কোনো নোংরা ফেলাও ঠিক নয়। মসজিদ হচ্ছে আল্লাহর জিকির, সালাত ও কুরআন তিলাওয়াতের জন্য।"
অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশক্রমে এক ব্যক্তি এক বালতি পানি এনে জায়গাটির ওপর ঢেলে দিলেন (অর্থাৎ ধুয়ে দিলেন)। '৩১৭
আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'এক বেদুইন মসজিদে ঢুকল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন মসজিদেই বসা ছিলেন। বেদুইন লোকটা মসজিদে ঢুকে সালাত পড়ে দোয়া করতে লাগল, "হে আল্লাহ, আমার ওপর ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর দয়া করুন। আমাদের প্রতি দয়া করায় অন্য কাউকে অন্তর্ভুক্ত করবেন না।"
তার দোয়া শুনে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে মনোযোগী হলেন। বললেন, "তুমি প্রশস্ত রহমতকে সংকীর্ণ করে দিলে!"
এরপর বেদুইন লোকটা মসজিদের ভেতরে পেশাব করে দিলে মানুষজন তাকে থামাতে তার দিকে ছুটল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তার পেশাবের ওপর এক বালতি পানি ঢেলে দাও।" এরপর বললেন, "তোমাদের দয়াশীল করে পাঠানো হয়েছে, কঠোরতাকারী হিসেবে নয়।"৩১৮
অন্য বর্ণনায় এসেছে, 'বেদুইন লোকটা তার অশোভন কাজের কথা বুঝতে পেরে আমার নিকট সরে এসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলল, "আপনার জন্য আমার পিতামাতা কুরবান হোক!" এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ধমকও দিলেন না, কঠোর কিছুও বললেন না। শুধু বললেন, "মসজিদ পেশাব করার জন্য নয়; বরং তা আল্লাহর জিকির ও সালাতের জন্য। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক বালতি পানি এনে পেশাবের ওপর ঢালার নির্দেশ দিলেন। "৩১৯
হাদিস থেকে বোঝা যায়:
* মূর্খের প্রতি দয়ার্দ্র হওয়া। এমন লোকদের শেখানোর সময় তাদের তিরস্কার না করা। যদি তারা দ্বীনবিরুদ্ধ কোনো কাজ করে বসে এবং তা দ্বীনের প্রতি অবজ্ঞা বা হঠকারিতাবশত না হয়, তবে তাদের কষ্ট না দেওয়া। বিশেষ করে যদি ইসলামের প্রতি তাদের আকৃষ্ট করার ব্যাপার থাকে, তবে তাদের প্রতি কঠোর না হয়ে কোমল আচরণে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করতে হবে।
* রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোমল আচরণ ও উত্তম চরিত্র।
* দুটি ক্ষতির কোনো একটি অনিবার্য হলে তুলনামূলক কমটিকে বেছে নিতে হবে। এ ঘটনায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম 'তাকে ছেড়ে দাও' বলে সেটাই করেছেন। উলামায়ে কিরাম বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুটি কারণে এই কথা বলেছেন। ১. পেশাব করার সময় মাঝখানে বাধা দিলে তার শারীরিক ক্ষতি হতো। এদিকে নাপাক হওয়াটা তাকে বাধা দেওয়ার পূর্বেই হয়ে গেল। সুতরাং এখানে দুটি ক্ষতির কোনো একটি অনিবার্য হয়ে উঠল-নাপাক আরও বৃদ্ধি পাওয়া ও তার শারীরিক ক্ষতি। তুলনামূলক কম ক্ষতিকর হওয়ায় প্রথমটিকে বেছে নেওয়া হয়েছে। ২. তার পেশাব করার ফলে মসজিদের ছোট একটি অংশ নাপাক হয়েছে। যদি পেশাব করার মাঝখানে তাকে থামিয়ে দেওয়া হয়, তখন তার কাপড়, শরীর ও মসজিদের আরও অধিক জায়গায় নাপাকি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল।'
* নাপাকি থেকে দূরে থাকা সাহাবিদের মাঝে প্রোথিত হয়ে গিয়েছিল। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে অনুমতি নেওয়ার আগেই তারা সে বেদুইনকে নিষেধ করতে উদ্যত হয়েছিলেন। অন্যদিকে, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধের নীতিটাও তাদের মাঝে শক্তভাবে প্রোথিত হয়েছিল, যার ফলে তারা সে লোকটিকে বাধা দিতে এগিয়ে এসেছিলেন।
* রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে সাহাবিদের বেদুইন লোকটাকে বাধা না দিতে নিষেধ করলেন। তার পেশাব করার পর আবার তিনি আদেশ দিলেন পানি ঢালতে। এ থেকে বোঝা গেল, প্রতিবন্ধক চলে গেলে দ্রুতই অনিষ্টতা দূর করতে হবে।
* মসজিদের সম্মান করতে হবে। নোংরা ও ময়লা থেকে মসজিদ পরিষ্কার রাখতে হবে।
* মাটিতে নাপাক থাকলে পানি ঢেলে দিলেই তা পবিত্র হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে মাটি খুঁড়ে তা ফেলে দেওয়া শর্ত নয়। ৩২০
টিকাঃ
৩১৭. সহিহুল বুখারি: ২১৯, সহিহু মুসলিম: ২৮৫।
৩১৮. সহিহুল বুখারি: ২২০, সুনানুত তিরমিজি: ১৪৭। শব্দউৎস: সুনানুত তিরমিজি।
৩১৯. সুনানু ইবনি মাজাহ: ৫২৯।
৩২০. ফাতহুল বারি: ১/৩২৫, ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৩/১৯১।
📄 বেদুইনদের মন্দ ও রুক্ষ আচরণে রুষ্ট হতেন না
আনাস বিন মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'একদিন আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পাশাপাশি হাঁটছিলাম। তাঁর পরনে মোটা পাড়বিশিষ্ট একটি নাজরানি চাদর ছিল। তখন এক বেদুইন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে তাঁর চাদর ধরে জোরে টান দিল। চাদরটা ফেটে গেল এবং চাদরের পাড় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘাড়ের ওপর রয়ে গেল। আমি তাঁর কাঁধের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, জোরে টান দেওয়ার কারণে তাতে দাগ পড়ে গেছে।'
এরপর লোকটা বলল, "হে মুহাম্মাদ, আল্লাহর দেওয়া যে সম্পদ আপনার কাছে আছে, তা থেকে একটা অংশ আমাকে দিতে বলুন।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। অতঃপর তাকে দেওয়ার আদেশ দিলেন। '৩২১
হাদিস থেকে বোঝা যায়:
* রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উন্নত চরিত্র, সহনশীলতা, সহিষ্ণুতা ও ধৈর্য। শরীর ও সম্পদের ওপর কোনো বিপদ আসলে তিনি ধৈর্য ধরতেন।
* কাউকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করতে চাইলে তার রুক্ষতা উপেক্ষা করে তার সাথে উত্তম আচরণ করতে হবে।
* মূর্খদের থেকে আসা কষ্ট সহ্য করতে হবে। তাদের মোকাবিলা করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
টিকাঃ
৩২১. সহিহুল বুখারি: ৩১৪৯, সহিহু মুসলিম ১০৫৭।
📄 বেদুইনদের অসংলগ্ন আচরণের ধৈর্যধারণের দৃষ্টান্ত
আবু মুসা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে জিইরানা নামক স্থানে অবস্থান করছিলাম। জায়গাটি মক্কা ও মদিনার মাঝখানে অবস্থিত ৩২৩। তাঁর সাথে তখন বিলাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-ও ছিলেন। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এক বেদুইন এসে বলল, "আপনি কি আমাকে ওয়াদাকৃত বস্তু থেকে দেবেন না?"৩২৪
তিনি উত্তর দিলেন, "সুসংবাদ গ্রহণ করো।"
বেদুইন লোকটা বলল, "এ কথাটি আপনি অনেকবারই বলেছেন।"
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাগান্বিত চেহারা নিয়ে বিলাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও আবু মুসা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর দিকে তাকালেন। তাঁদের বললেন, "সে সুসংবাদ ফিরিয়ে দিয়েছে। তোমরা তা গ্রহণ করো।"
তাঁরা বললেন, "আমরা গ্রহণ করলাম।"
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পানিভর্তি পাত্র আনার জন্য বললেন। পাত্র আনা হলে তিনি দুহাত ও মুখ ধুলেন। পানি দিয়ে কুলি করলেন। এরপর বললেন, "তোমরা এ পানির কিছু অংশ পান করো। কিছুটা তোমাদের মুখে ও বুকে ছিটিয়ে দাও এবং সুসংবাদ গ্রহণ করো।"
তাঁরা পাত্রটা নিয়ে তা-ই করলেন। ওদিকে উম্মে সালামা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) পর্দার ভেতর থেকে বললেন, "তোমাদের মায়ের জন্য কিছুটা রেখো।" তারা উম্মে সালামা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর জন্য কিছুটা রাখলেন। '৩২৫
কুরতুবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'বেদুইনের এমন কথা বলার কারণ হচ্ছে, তিনি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্পর্কে জানতেন না, জানতেন না তাঁর দেওয়া সুসংবাদের মাহাত্ম্য সম্পর্কেও। তখন সে সুসংবাদ অন্যদের জন্য সাব্যস্ত হয়ে গেল, তারাও তা গ্রহণ করে নিলেন। ফলে তিনি তা ফিরিয়ে দিয়ে বঞ্চিত হলেন।
البُشْرَى হচ্ছে আনন্দদায়ক সংবাদ। সুসংবাদপ্রাপ্ত ব্যক্তির মুখে আনন্দের রেখা ফুটে উঠে বলে সুসংবাদকে بُشْرَى শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা হয়। এ শব্দটি মৌলিকভাবে ভালো সংবাদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু অর্থের প্রশস্ততার কারণে মন্দ সংবাদের ক্ষেত্রেও কখনো সখনো ব্যবহৃত হয়।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবল বললেন, "সুসংবাদ নাও।" কিন্তু সুসংবাদটা ঠিক কী, তা স্পষ্ট করেননি। কারণ, তিনি এর মাধ্যমে ব্যাপকভাবে দুনিয়া ও আখিরাতের সকল কল্যাণকে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। কিন্তু বেদুইন নিজের অজ্ঞতাবশত তা ফিরিয়ে দিয়ে বঞ্চিত হয়ে গেল। পক্ষান্তরে যারা তার মাহাত্ম্য বুঝতে পেরেছেন, তারা ঠিকই তা লুফে নিলেন এবং বড় কল্যাণের সুসংবাদ ও মহাসৌভাগ্য অর্জন করে নিলেন।
আর তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে পানিতে মুখ ধুয়ে তাতে কুলি করলেন এবং সাহাবিগণকে তা পান করতে এবং শরীরে মাখতে বললেন, এটা তাদের নিকট ভালোভাবে কল্যাণ পৌঁছে দেওয়ার জন্য করলেন। '৩২৬
টিকাঃ
৩২২. ফাতহুল বারি: ১০/৫০৬, ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৭/১৪৭।
৩২৩. অধিকাংশ ব্যাখ্যাকারের মতে, জায়গাটি মক্কার অধিক নিকটে মক্কা ও তায়িফের মাঝামাঝি অবস্থিত।
৩২৪. হতে পারে গনিমতের অংশ দেওয়ার ওয়াদাটা কেবল এ বেদুইন সাহাবির জন্য ছিল। আবার এও সম্ভাবনা আছে যে, ওয়াদাটা ব্যাপকভাবে সকলের জন্য প্রযোজ্য ছিল। আর এ বেদুইন সাহাবি তার অংশটা দ্রুত চেয়ে বসেছেন। কারণ, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ততক্ষণে হুনাইনের গনিমত জিইরানা নামক স্থানে একত্র করার আদেশ দিয়েছিলেন। আর তিনি মুসলিম সেনাদল নিয়ে তায়িফ অভিমুখী ছিলেন তখন। যখন সেখান থেকে ফিরলেন, তখন তিনি গনিমত বণ্টনের আদেশ দিলেন জিইরানাতে। কিন্তু অনেক নওমুসলিম গনিমতের বণ্টন ও তাদের অংশ পেতে দেরি হওয়ার কারণে তাদের এমন অবস্থা দেখা যায়। দেখুন, ফাতহুল বারি: ৮/৪৬।
৩২৫. সহিহুল বুখারি: ৪৩২৮, সহিহ মুসলিম: ৫০৩।
৩২৬. আল-মুফহিম: ৬/৪৪৮।
📄 হত্যা করার চেষ্টাকারী বেদুইনকেও মাফ করে দিতেন
জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে নাজদ অভিমুখে একটি যুদ্ধে গিয়েছিলেন। (যুদ্ধ শেষে) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ফিরে আসছিলেন, তিনিও তাঁর সাথে ফিরে আসছিলেন। ফেরার পথে দুপুরে প্রখর রোদ তাঁদের অসংখ্য কাঁটাওয়ালা বৃক্ষসংবলিত একটি উপত্যকায় নিয়ে আসলো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে যাত্রাবিরতি দিলেন। কাফেলার লোকজন আলাদা আলাদা হয়ে গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিতে লাগল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘন পাতাবিশিষ্টি একটি গাছের নিচে বসলেন এবং তাঁর তলোয়ারটি গাছের সাথে ঝুলিয়ে রাখলেন।'
জাবির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আমরা একচোট ঘুমিয়ে নিলাম। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের ডাকলেন। আমরা তাঁর নিকট আসলাম এবং দেখতে পেলাম, সেখানে একজন বেদুইন ৩২৭ বসে আছে।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আমি যখন ঘুমে ছিলাম, তখন এ লোকটি আমার তরবারি কোষমুক্ত করেছিল। আমি ঘুম থেকে জেগে উঠে তাকে কোষমুক্ত তলোয়ার হাতে দেখলাম। সে আমাকে বলল, "আমাকে আপনি ভয় করেন?" আমি বললাম, "না।” সে বলল, "আমার হাত থেকে আপনাকে কে বাঁচাবে?” আমি তিনবার বললাম, "আল্লাহই বাঁচাবেন।" এরপর তার হাত থেকে তলোয়ার পড়ে যায়। আর এখন সে তোমাদের সামনে বসে আছে।"
তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে বেদুইনকে কোনো শাস্তি দিলেন না। '৩২৮
অন্য বর্ণনায় আরও এসেছে, তার হাত থেকে তলোয়ার পড়ে গেলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা উঠিয়ে নিয়ে বলেন, 'এবার তোমাকে কে বাঁচাবে?' সে বলল, 'আপনি ভালোর ধারক হোন।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তুমি সাক্ষ্য দাও আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো মাবুদ নেই আর আমি আল্লাহর রাসুল।'
বেদুইন উত্তর দিল, 'আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, কখনো আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না। এমন সম্প্রদায়ের সাথেও যোগ দেবো না, যারা আপনার সাথে যুদ্ধ করে।'
অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে যেতে দিলেন। তখন সে নিজের সম্প্রদায়ের কাছে গিয়ে বলল, 'আমি তোমাদের নিকট এলাম সবচেয়ে উত্তম মানুষটির কাছ থেকে। '৩২৯
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে শাস্তি দেননি, এর কারণ হলো, তিনি চেয়েছিলেন, এর মাধ্যমে যেন বেদুইনরা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে নেয়।
হাদিস থেকে বোঝা যায়:
* আমিরের প্রতি কেউ রুক্ষ আচরণ করলে চাইলে তিনি শাস্তি দিতে পারেন, আবার চাইলে তিনি মাফও করে দিতে পারেন।
* রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুপম ধৈর্য ও সহনশীলতা।
* তাঁর বীরত্ব ও প্রতিপত্তির প্রমাণ। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, আল্লাহ তাঁকে সাহায্য করবেন এবং সকল দ্বীনের ওপর তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করবেন। ৩৩০
টিকাঃ
৩২৭. সে বেদুইনের নাম ছিল, গাওরাস বিন হারিস।
৩২৮. সহিহুল বুখারি: ২৯১০, সহিহু মুসলিম: ৮৪৩।
৩২৯. মুসতাদরাকুল হাকিম: ৪৩২২; শাইখাইনের শর্তমতে সহিহ। হাফিজ জাহাবি (রাহিমাহুল্লাহ)-ও সনদ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। আলবানি (রাহিমাহুল্লাহ)-ও এ হাদিসকে সহিহ বলেছেন।
৩৩০. শারহু সহিহিল বুখারি: ৫/১০১।