📄 সাহাবিরাও ফতোয়াপ্রার্থীর অবস্থা বিবেচনা করতেন
সাদ বিন উবাইদা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'এক ব্যক্তি ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট এলেন। তাকে বললেন, "যে ব্যক্তি কোনো মুমিনকে হত্যা করে, তার জন্য তাওবার সুযোগ আছে কি?"
ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, "না। তার জন্য জাহান্নাম অবধারিত।"
এ ব্যক্তি চলে গেলে তার ছাত্ররা প্রশ্ন করলেন, "আপনি তো আমাদের ভিন্ন ফতোয়া দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, কোনো মুমিনকে হত্যা করলেও হত্যাকারী মুমিনের তাওবা কবুল হয়। কিন্তু আজ কেন ভিন্ন ফতোয়া দিলেন?”
ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, "আমার ধারণা, এ লোকটি রাগের বশবর্তী হয়ে কোনো মুমিনকে হত্যা করতে উদ্যত (তাই ফতোয়া জানতে এসেছিল)।”
এ কথা শুনে ছাত্ররা লোকটির পিছু নিল এবং সত্যিসত্যিই তাকে এমন কর্মে উদ্যত পেল। '২৫৪
টিকাঃ
২৫৪. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৭/২১৫।
📄 জিজ্ঞাসিত বস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইতেন
আবু মুসা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ইয়ামান পাঠালেন। আমি তখন বললাম, "হে আল্লাহর রাসুল, অনেক ধরনের পানীয় আছে সেখানে। কোনটা পান করব, আর কোনটা থেকে বিরত থাকব?"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে চাইলেন, "কী কী ধরনের পানীয়?"
আমি বললাম, "বিতউ ও মিজর।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "বিতউ ও মিজর কী?"
আমি বললাম, "বিতউ মধু থেকে তৈরি হয়, আর মিজর তৈরি হয় ভুট্টা থেকে।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার জানতে চাইলেন, "এ পানীয়তে নেশা হয় কি?"
আমি বললাম, "জি।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "নেশাজাতীয় কিছু পান করবে না। আমি প্রত্যেক নেশাজাতীয় বস্তু হারাম ঘোষণা করেছি।"২৫৫
টিকাঃ
২৫৫. সুনানুন নাসায়ি: ৫৬০৩। সংক্ষেপে এসেছে, সহিহুল বুখারি: ৪৩৪৩, সহিহু মুসলিম: ১৭৩৩।
📄 জিজ্ঞাসিত বস্তুর স্বরূপ ও প্রকৃতি জানতে চাইতেন
আওফ বিন মালিক আশজায়ি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমরা জাহিলি যুগে ঝাড়ফুঁক করতাম। এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জানতে চেয়ে আমরা বললাম, “হে আল্লাহর রাসুল, এ বিষয়ে আপনি কী বলেন?"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমাদের ঝাড়ফুঁকের ধরন আমার সামনে উপস্থাপন করো। যদি তোমাদের ঝাড়ফুঁকে কোনো শিরক না থাকে, তবে তাতে কোনো সমস্যা নেই।"২৫৬
জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের ঝাড়ফুঁক থেকে নিষেধ করলেন। এরপর আমর বিন হাজম (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর পরিবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমরা বিচ্ছুর কামড় দিলে একপ্রকার ঝাড়ফুঁক করি। আর আপনি ঝাড়ফুঁক থেকে নিষেধ করেছেন।" এ কথা বলে তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে ঝাড়ফুঁক করে দেখাল।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আমি কোনো সমস্যা দেখছি না। তোমাদের কেউ তার ভাইয়ের উপকার করতে পারলে, সে যেন তা করে।"২৫৭
ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, '(রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঝাড়ফুঁক নিষিদ্ধ করেছিলেন)-উলামায়ে কিরাম এর কয়েকটি উত্তর দিয়েছেন।
১. ঝাড়ফুঁক প্রথমে নিষিদ্ধ করেছিলেন। অতঃপর নিষেধাজ্ঞা রহিত করে তার অনুমতি দিয়েছেন।
২. নিষেধাজ্ঞা মূলত অজানা রুকইয়া সম্পর্কে ছিল।
৩. নিষেধাজ্ঞা মূলত সে লোকদের জন্য, যারা বিশ্বাস করে যে, রুকইয়া নিজেই প্রভাব বিস্তার করতে পারে এবং উপকার করতে পারে, যেমনটা জাহিলি যুগের মানুষের বিশ্বাস ছিল। '২৫৮
ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আলিমদের মাঝে ইজমা রয়েছে যে, ঝাড়ফুঁক জায়িজ হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত পূরণ করা বাধ্যতামূলক। যথা:
১. তা আল্লাহর কালাম, আল্লাহর নাম ও গুণবাচক নামসমূহের মাধ্যমে করতে হবে।
২. আরবি ভাষায় করতে হবে; অথবা অন্য ভাষায় হলে স্পষ্ট অর্থ বোঝা যেতে হবে।
৩. এ বিশ্বাস রাখতে হবে যে, ঝাড়ফুঁক নিজে থেকে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না; বরং আল্লাহই মূল আরোগ্য দানকারী।' ২৫৯
টিকাঃ
২৫৬. সহিহু মুসলিম: ২২০০।
২৫৭. সহিহু মুসলিম: ২১৯৯।
২৫৮. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৪/১৬৮।
২৫৯. ফাতহুল বারি: ১০/১৯৫।
📄 প্রশ্নকারীদের জন্য যথাসম্ভব সহজ পদ্ধতিই বেছে নিতেন
আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আমি দেখলাম, জামরার নিকট রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিভিন্ন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হচ্ছে। তখন এক ব্যক্তি বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, পাথর নিক্ষেপের আগেই আমি কুরবানির পশু জবাই করে ফেলেছি।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "সমস্যা নেই, তুমি এখন পাথর নিক্ষেপের কার্যক্রম সম্পন্ন করে নাও।"
আরেকজন বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, পশু জবাইয়ের আগেই আমি মাথা মুণ্ডন করে ফেলেছি।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "সমস্যা নেই, তুমি পশু জবাই করে নাও।"
এভাবে হজের বিধান পালনে আগপিছ করা সম্পর্কে যত প্রশ্ন করা হয়েছে, প্রত্যেকটির জবাবে তিনি বললেন, "সমস্যা নেই, তুমি পরের কাজটি করে নাও। ২৬০
জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'মক্কা-বিজয়ের দিন এক ব্যক্তি দাঁড়ালেন এবং বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল, আপনার হাতে আল্লাহ মক্কা-বিজয় দিলে বাইতুল মাকদিসে দুই রাকআত সালাত পড়ব বলে মানত করেছিলাম আমি।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এখানে আদায় করে নাও।"
লোকটি প্রশ্নটি আবার করলেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবারও বললেন, "এখানে আদায় করে নাও।"
তৃতীয়বার একই প্রশ্ন করলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এখন তুমি যা মানত করেছিলে, তা-ই পূরণ করো (অর্থাৎ বাইতুল মাকদিসে গিয়ে সালাত পড়ো)। "২৬১
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মানহাজ ছিল এমনই। তিনি সবচেয়ে সহজ পন্থাটা বাতলে দিতেন সাহাবিদের। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন : )وَنُيَسِرُكَ لِلْيُسْرَى( 'আমি আপনার জন্য দ্বীন পালন করা সহজতর করে দেবো। '২৬২ অর্থাৎ আমি কল্যাণের কাজ করা ও কল্যাণের কথা বলা সহজ করে দেবো। আপনার জন্য সহজ, সুন্দর ও অটল শরিয়ত প্রদান করব। যার মাঝে থাকবে না কোনো বক্রতা, সমস্যা ও কাঠিন্য। ২৬৩
আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, 'দ্বীন সহজ। দ্বীনের ইবাদতসমূহ আদায় করা কারও জন্য কষ্টকর নয়; বরং তা সহজ ও অনায়াসে পালনযোগ্য। '২৬৪
আবু উমামা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আমি বদান্যপূর্ণ ও একনিষ্ঠ দ্বীন নিয়ে প্রেরিত হয়েছি।'২৬৫
আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দুটো বিষয়ের একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ দিলে গুনাহ না হয়ে থাকলে তিনি তুলনামূলক সহজটা বেছে নিতেন। আর যদি কোনোটি গুনাহ হতো, তবে সে জিনিস থেকে তিনি সবচেয়ে বেশি দূরে থাকতেন।'২৬৬
টিকাঃ
২৬০. সহিহুল বুখারি: ১২৪, সহিহু মুসলিম: ১৩০৬।
২৬১. সুনানু আবি দাউদ: ৩৩০৫।
২৬২. সুরা আল-আলা, ৮৭: ০৮।
২৬৩. তাফসিরু ইবনি কাসির: ৮/৩৭২।
২৬৪. সহিহুল বুখারি: ৩৯, সহিহু মুসলিম: ২৮১৬।
২৬৫. মুসনাদু আহমাদ: ২১৭৮৮।
২৬৬. সহিহুল বুখারি: ৩৫৬০, সহিহু মুসলিম: ২৩২৭।