📄 কখনো জিজ্ঞাসার জবাবে সতর্কতা অবলম্বন করতে বলতেন
উকবা বিন হারিস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত যে, 'তিনি আবু ইহাব বিন আজিজের কন্যাকে বিয়ে করলেন। তখন এক মহিলা এসে তাকে বললেন, "উকবা ও তার স্ত্রী-দুজনকে আমি দুধ পান করিয়েছি।"
উকবা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মহিলাকে বললেন, "আপনি আমাকে দুধ পান করিয়েছেন এমনটা তো আমি জানি না! আর এর আগেও আমাকে এমন কিছু আপনি বলেননি।"
অতঃপর উকবা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আবু ইহাবের পরিবারের কাছে এ তথ্যটি যাচাইয়ের জন্য লোক পাঠালেন। তারা বলল, "এ মহিলা আমাদের কন্যাকে দুধ পান করিয়েছে এমনটা আমরা জানি না।"
তারপর উকবা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বাহনে আরোহণ করে মদিনায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলেন এবং এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জানতে চাইলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন এবং মুচকি হাসলেন। এরপর বললেন, "কীভাবে তুমি এ নারীর সাথে সংসার করবে, অথচ তোমাদের ব্যাপারে ভিন্ন কিছু রটে গেছে?"২২৬
এরপর উকবা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সে নারীর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ করে অন্য নারীকে বিয়ে করলেন। '২২৭
এ হাদিসের শিক্ষা হচ্ছে, অপবাদ ও সন্দেহ আরোপ হতে পারে-এমন সব ক্ষেত্র থেকে বিরত থাকতে হবে। বিষয়টি যদিও পরিষ্কার থাকে, তবুও এমন বিষয় থেকে সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। অধিকাংশ আলিমের মত এটাই। ২২৮
ইবনে বাত্তাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'জুমহুর উলামায়ে কিরামের মতে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উকবা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে সন্দেহজনক বিষয় থেকে সতর্কতা অবলম্বনের ফতোয়া দিয়েছিলেন। তাকে সন্দেহযুক্ত বিষয় থেকে দূরে থাকতে আদেশ দিয়েছিলেন এ শঙ্কায় যে, ভবিষ্যতে হয়তো এমন কোনো দলিল বেরিয়ে আসবে যে, সত্যিই এ মহিলা তাদের দুধ পান করিয়েছে। যদিও বিষয়টি অকাট্য ও শক্তিশালী নয়, তবুও সতর্কতা অবলম্বনই শ্রেয়। '২২৯
টিকাঃ
২২৬. অর্থাৎ কী করে তুমি এমন এক নারীর কাছে যাবে, যার ব্যাপারে বলা হচ্ছে যে, সে তোমার দুধবোন? এটা তো দ্বীনদারি ও ভদ্রতার বিপরীত। দেখুন, ফাইজুল কাদির: ৫/৫৯।
২২৭. সহিহুল বুখারি: ৮৮।
২২৮. মিরকাতুল মাফাতিহ: ১০/১০৮।
২২৯. উমদাতুল কারি: ২/১০২।
📄 অসহনশীল প্রশ্ন এড়িয়ে মুখ ফিরিয়ে নিতেন, যাতে প্রশ্নকারী নিজেই চুপ হয়ে যায়
ওয়ায়িল বিন হাজরামি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'সালামা বিন ইয়াজিদ জুফি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলেন, "হে আল্লাহর নবি, যদি আমাদের ওপর এমন কতক আমির কর্তৃত্ব করে, যারা নিজেদের অধিকার আমাদের কাছ থেকে চেয়ে নেয়, কিন্তু আমাদের অধিকার আদায় করতে না চায়, তবে এ ক্ষেত্রে আপনার আদেশ কী?"
এ প্রশ্নের পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তিনি প্রশ্নটি আবার করলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবারও তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তৃতীয়বার একই প্রশ্ন করলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমরা তাদের কথা শোনো ও মানো। তাদের দায়িত্ব অনাদায়ের শাস্তি তাদের ওপর আরোপিত হবে। তোমাদের দায়িত্ব অনাদায়ের শাস্তি তোমাদের ওপর আরোপিত হবে।"২৩০
অর্থাৎ তাদের দায়িত্ব হচ্ছে, ন্যায় প্রতিষ্ঠা, প্রজাদের হক আদায় করা। আর তোমাদের দায়িত্ব হচ্ছে, মান্য করা ও বিপদে সবর করা। ২০১
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রশ্নকারী থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। যেন তিনি এ মাসআলাটি অপছন্দ করলেন। এ বিষয়ে মুখ খুলতে তিনি অপছন্দ করলেন। কিন্তু প্রশ্নকারী বারবার প্রশ্নটি করে গেলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে আমিরের প্রতি আমাদের কর্তব্য আদায় করা। আমিরগণ যে কাজ করেন, তারা সে কাজের দায়ভার নেবেন। আর আমরা যা করি, তার দায়ভার আমাদের নিতে হবে। আমিরদের কর্তব্য হচ্ছে, তাদের দায়িত্ব আদায় করা। আর আমাদের কর্তব্য হচ্ছে, আমাদের দায়িত্ব আদায় করা।
আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে, আমিরের কথা শোনা ও মানা। আর আমিরদের দায়িত্ব হচ্ছে, আমাদের মাঝে ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচার করা, কারও ওপর জুলুম না করা, আল্লাহর বান্দাদের ওপর আল্লাহর হদ প্রতিষ্ঠা করা, আল্লাহর জমিনে আল্লাহর শরিয়ত প্রতিষ্ঠা করা, আল্লাহর শত্রুদের সাথে জিহাদ করা। ২৩২
এগুলো হচ্ছে আমিরদের দায়িত্ব। এগুলো তাদের নিকট শরয়িভাবে কাম্য।
যদি তারা এগুলো প্রতিষ্ঠা না করেন, তবে আমরা বলতে পারব না যে, তোমরা নিজেদের দায়িত্ব আদায় করলে না, তাই আমরাও তোমাদের প্রতি থাকা আমাদের দায়িত্ব আদায় করব না। বরং আমাদের কর্তব্য হচ্ছে, তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব আদায় করা। তাই আমরা আমিরের কথা শুনব ও মানব, তাদের সাথে জিহাদে বের হব, তাদের পেছনে জুমআ ও ইদের সালাত আদায় করব-ইত্যাদি সকল দায়িত্ব আদায় করব। ২০০
টিকাঃ
২৩০. সহিহু মুসলিম: ১৮৪৬।
২৩১. তুহফাতুল আহওয়াজি: ৬/৩৬৮।
২৩২. এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। আমির যখন প্রজার ওপর জুলুম করে, তখন আমিরের আনুগত্য করার হুকুম অটুট থাকে। কিন্তু যদি আমির আল্লাহর শরিয়ত প্রতিষ্ঠা না করে, আল্লাহর শরিয়তের স্থলে অন্য কিছুকে বসায়, আমিরের মাঝে যদি কুফরে বাওয়াহ বা প্রকাশ্য কুফর দেখা দেয়, তবে মুসলিমদের ওপর আমিরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা ওয়াজিব হয়ে পড়ে। (-সম্পাদক)
২৩৩. শারহু রিয়াজিস সালিহিন: ৩/৬৬৬।
📄 বিধানের কারণ বলে দিতেন
কুরআনুল কারিমের রীতিও এ রকম। কুরআনে হুকুম বর্ণনার সময় হুকুমের কারণ বলে দেওয়া হয়। যেন যেকোনো মুমিন কোনো সমস্যা ব্যতিরেকে দ্রুত তা গ্রহণ করে নিতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَزِلُوا النِّسَاءَ فِي الْمَحِيضِ وَلَا تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّى يَطْهُرْنَ
'লোকেরা আপনাকে হায়িজ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে। বলুন, "এ সময়টা কষ্টকর মহিলাদের জন্য। কাজেই ঋতুকালে স্ত্রী-সহবাস হতে বিরত থাকো এবং যে পর্যন্ত পবিত্র না হয়, তাদের নিকটবর্তী হোয়ো না।"২৩৪
এ আয়াতে লক্ষ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বিধান বর্ণনার আগে এমন বিধান হওয়ার কারণ বর্ণনা করে দিয়েছেন।
আবার কখনো কখনো নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও বিধান বর্ণনার আগেই প্রশ্নকারীকে তা গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত করে নিতেন। নতুন কোনো বিধান বর্ণনার আগে কিংবা মানুষ বিস্মিত হবে-এমন বিধান বর্ণনার আগেই তিনি উপস্থিত লোকদের সামনে ভূমিকাস্বরূপ কিছু বলতেন। যাতে প্রশ্নকারী সহজে ও সন্তুষ্টচিত্তে বিধানটি গ্রহণ করে নিতে পারে।
ফতোয়া বলার ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ পদ্ধতিটি গ্রহণ করেছেন এ আয়াতের ওপর আমল করে-
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
'কিন্তু না, আপনার রবের শপথ, তারা মুমিন হবে না, যে পর্যন্ত না তারা তাদের বিবাদ-বিসম্বাদের মীমাংসার ভার তোমার ওপর ন্যস্ত করে, অতঃপর তোমার ফয়সালার ব্যাপারে তাদের মনে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ না থাকে, আর তারা তার সামনে নিজেদেরকে পূর্ণরূপে সমর্পণ করে।'২৩৫
সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'শুকনো খেজুরের বিনিময়ে তাজা খেজুর বিক্রি বিষয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করতে শুনেছি আমি। তখন তিনি উপস্থিত লোকদের জিজ্ঞেস করলেন, "তাজা খেজুর যখন শুকিয়ে যায়, তখন কি ওজনে কমে যায়?"
উপস্থিত সাহাবিগণ উত্তর দিলেন, "জি।"
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন বিক্রয় থেকে নিষেধ করলেন। '২৩৬
ইবনুল কাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রদত্ত ফতোয়াগুলোর প্রতি খেয়াল করলে দেখা যায়, তাঁর কথাটি সপ্রমাণ উপস্থাপিত। লক্ষ করলে দেখা যায়, তাঁর দেওয়া ফতোয়া বা প্রশ্নের উত্তরের মাঝে বিধানের কারণ, এ বিধান প্রদানের প্রজ্ঞা, এ বিধান শরিয়তসম্মত হওয়ার যৌক্তিকতা বর্ণিত হয়েছে।
এ হাদিসটি এমন ফতোয়াগুলোর একটি। আরেকটু পরিষ্কার করে বললে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জানতে চাওয়া হলো, তাজা খেজুরের বিনিময়ে শুকনো খেজুর বিক্রি বিষয়ে। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উল্টো জিজ্ঞেস করলেন, খেজুর শুকিয়ে গেলে কি ওজনে কমে যায়? সাহাবিদের ইতিবাচক উত্তর পেয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন বিক্রি নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন।
খেজুর শুকিয়ে গেলে ওজন কমে যায়, এমনটা তো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগে থেকেই জানতেন। কিন্তু নিষিদ্ধ হওয়ার কারণের প্রতি অবহিত করার জন্য তিনি প্রশ্নটি করলেন। '২৩৭
কাজি ইয়াজ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রশ্নটি এ জন্য করেননি যে, তিনি বিষয়টি জানতে চেয়েছেন। খেজুর শুকিয়ে গেলে ওজন কমে যায়, এ বিষয়টা তো স্পষ্ট। কেবল জানার জন্য এটা জিজ্ঞেস করার কোনো প্রয়োজনই নেই। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ জিজ্ঞসা ছিল একটি শর্ত বর্ণনা করার জন্য। দ্রব্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে অনুরূপ হওয়া শর্ত। ফলে বোঝা গেল, তাজা খেজুরের বিনিময়ে শুকনো খেজুর বিক্রি করা যাবে না। কেননা, এখানে শর্ত পূরণ হয়নি। কারণ, এমন বিক্রয়-চুক্তি অনুমাননির্ভর হয়ে পড়ে।'২৩৮
আবু ওয়ালিদ সুলাইমান আল-বাজি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'কারও কাছে অজানা নয় যে, তাজা কিছু যখন শুকিয়ে যায়, তখন ওজন কমে যায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন বিক্রয় চুক্তি নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ বর্ণনা করার জন্যই প্রশ্নটি করেছিলেন। আর সেই কারণ হলো, পণ্যদ্বয় পরস্পর সমান না হওয়া। এভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, এখানে যেহেতু বিক্রয় নিষিদ্ধ হওয়ার সর্বসম্মত কারণ উপস্থিত আছে, তাই এ বিক্রি নিষিদ্ধ। '২৩৯
উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'একদিন সিয়াম অবস্থায় কামাসক্ত হয়ে আমি স্ত্রীকে চুমু খেলাম। এরপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বললাম, "আমি আজ এক জঘন্য কাজ করে ফেলেছি। আমি সিয়াম অবস্থায় স্ত্রীকে চুমু দিয়েছি।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি যদি সিয়াম অবস্থায় পানি দিয়ে কুলি করতে, তবে কি তা জঘন্য হতো?"
আমি বললাম, "না। তাতে কোনো সমস্যা হতো না।"
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তাহলে এ চুমুতে কোথায় অসুবিধে পেলে?"২৪০
মারিজি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এ হাদিস থেকে অপূর্ব একটি ফিকহি মাসআলা প্রতীয়মান হয়। কুলি করলে সিয়াম ভাঙে না। কেননা, কুলি করা মানে পানি পান করা নয়। কুলি মানে হলো মুখে পানি নিয়ে তা ফেলে দেওয়া। একে পানি পান করার ভূমিকা বলা যায়। পানি পান করা বলা যায় না। তেমনই স্ত্রীকে চুমু দেওয়া সহবাসের প্রাথমিক কাজ। এ তো সহবাস নয় যে, এতে করে সিয়াম ভেঙে যবে। '২৪১
ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'চুমু দিলে যে ব্যক্তি কামনার বশবর্তী হয়ে পড়ে না, তার ক্ষেত্রে স্ত্রীকে চুমু দেওয়া হারাম নয়। কিন্তু সিয়াম অবস্থায় চুমু না দেওয়াই শ্রেয়। কিন্তু যে কামনার বশবর্তী হয়ে যাবে, বিশুদ্ধ মতানুসারে তার জন্য চুমু দেওয়া হারাম। অনেকে মাকরুহ বলেছেন। তবে এ বিষয়ে দ্বিমত নেই যে, চুমু দিলে যদি বীর্যপাত না হয়, তবে সে চুমুর কারণে সিয়াম নষ্ট হবে না।'২৪২
রাফি বিন খাদিজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললাম, “হে আল্লাহর রাসুল, আমরা আগামী দিনে শত্রুর মোকাবিলায় যাব। তখন যদি পশু জবাইয়ের জন্য আমাদের সাথে ছুরি না থাকে, তবে আমরা কী করব?"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এমন বস্তু দিয়ে জবাই করবে, যা দিয়ে কাটলে রক্ত প্রবাহিত হয়। সাথে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করবে, এরপর খাবে। তবে দাঁত ও নখ দিয়ে জবাই করবে না। কেননা, দাঁত হচ্ছে হাড্ডি, আর নখ দিয়ে জবাই করা হচ্ছে হাবশাবাসীর স্বভাব।"২৪৩-২৪৪
এখানে লক্ষ করুন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দুই বস্তু দিয়ে জবাই করা নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ বর্ণনা করে বলেন, এখানে একটি হচ্ছে হাড়। আর হাড় দিয়ে জবাই করা নিষিদ্ধ-হয়তো হাড়টি নাপাক হওয়ার কারণে, অথবা মুমিন জিনদের জন্য তা নাপাক হয়ে যাওয়ার কারণে। আর নখ দিয়ে জবাই করা নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ হলো, তা কাফিরদের সাথে সাদৃশ্য রাখে। ২৪৫
আব্দুল্লাহ বিন মুগাফফাল মুজানি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নুড়ি পাথর নিক্ষেপ ২৪৬ করা থেকে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, "কারণ এর মাধ্যমে না শিকার করা যায়, না শত্রুকে ঘায়েল করা যায়। বরং এর মাধ্যমে কারও চোখ উপড়ে যায় অথবা দাঁত ভেঙে যায়।"২৪৭
হাদিস থেকে বোঝা যায়:
* নুড়ি পাথর নিক্ষেপ করা নিষেধ। কেননা, সাধারণত এতে কোনো কল্যাণ নেই; বরং এতে অনিষ্ট রয়েছে।
* কিন্তু যদি এ পাথর নিক্ষেপের মাঝে কোনো কল্যাণ থাকে অথবা এর মাধ্যমে শত্রুর বিরুদ্ধে কিতাল করা যায় অথবা যদি শিকার করা যায়, তবে তা বৈধ। ২৪৮
ইয়ালা বিন উমাইয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'তাবুকের যুদ্ধে আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে অংশগ্রহণ করেছি। একটি বাচ্চা উটের ওপর আমি সওয়ার হয়েছিলাম। এটিই ছিল যুদ্ধক্ষেত্রে আমার সবচেয়ে ভরসাযোগ্য কর্ম। তখন আমি একজন লোককে ভাড়া করেছিলাম। এ লোকটি আরেকজনের সাথে লড়াই শুরু করে সেখানে। তাদের একজন অপরজনের হাত কামড়ে ধরে। ইত্যবসরে অপরজন নিজের হাত টান দিয়ে কামড়ে থাকা লোকটির মুখ থেকে বের করে আনে। ফলে সে লোকটির দাঁত পড়ে যায়।
দাঁত পড়ে যাওয়া লোকটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বিচার দিল। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে বিচার নাকচ করে দিয়ে বললেন, "সে তোমার মুখে হাত দিয়ে রাখত আর তুমি উটের মতো তা চিবোতে- এমনটাই কি তোমার মনে ছিল?"২৪৯
এখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিচার প্রত্যাখ্যান করে দেওয়ার সুন্দর ও স্পষ্ট কারণ বর্ণনা করে দিয়েছেন। তা হচ্ছে, কেউ যদি কারও হাত কামড়ে ধরে, তখন ওই লোক তার হাত ছাড়িয়ে নিতে পারবে। এতে তার দাঁত ভেঙে গেলে যাক। কারণ, তার দাঁতটি একটি শরিয়ত অনুমোদিত কর্মের মাধ্যমে ভেঙেছে। তাই এখানে কোনো দিয়ত বা ক্ষতিপূরণ সাব্যস্ত হবে না। ২৫০
টিকাঃ
২৩৪. সুরা আল-বাকারা, ২: ২২২।
২৩৫. সুরা আন-নিসা, ৪: ৬৫।
২৩৬. সুনানু আবি দাউদ: ৩৩৫৯, সুনানুত তিরমিজি: ১২২৫, সুনানুন নাসায়ি ৪৫৪৫, সুনানু ইবনি মাজাহ: ২২৬৪।
২৩৭. ইলামুল মুয়াক্কিয়িন: ৪/১২৩।
২৩৮. আওনুল মাবুদ: ৯/১৫১।
২৩৯. আল-মুনতাকা শারহুল মুয়াত্তা: ৪/২৪৩।
২৪০. সুনানু আবি দাউদ: ৩২৮৫।
২৪১. ফাতহুল বারি: ৪/১৫২।
২৪২. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৭/২১৫।
২৪৩. হাবশার অধিবাসীগণ ছাগলকে যেখান দিয়ে জবাই করে, সেখানটাতে নখ দিয়ে রক্ত ঝরায়। সবশেষে পশুটা শ্বাসরোধে মারা পড়ে।
২৪৪. সহিহুল বুখারি: ২৪৮৮, সহিহু মুসলিম: ১৯৬৮।
২৪৫. ইলামুল মুয়াক্কিয়িন: ৪/১২৪।
২৪৬. ছোট পাথর বা নুড়ি-কঙ্করজাতীয় পাথর নিয়ে তর্জনীর দুই আঙুল দিয়ে নিক্ষেপ করাকে خذف বলে। অথবা গুলতি দিয়ে বৃদ্ধাঙ্গুল ও তর্জনীর আঙুলে ধরে কঙ্কর নিক্ষেপ করাকে خذف বলে। দেখুন, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ২/১৬।
২৪৭. সহিহুল বুখারি ৪৮৪২, সহিহু মুসলিম: ১৯৪৫।
২৪৮. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৩/১০৬।
২৪৯. সহিহুল বুখারি: ২২৬৬, সহিহু মুসলিম: ১৬৭৪।
২৫০. ইলামুল মুয়াক্কিয়িন: ৪/১২৪।
📄 ফতোয়াপ্রার্থীর অবস্থার প্রতি খেয়াল করতেন
আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে রোজা অবস্থায় স্ত্রীকে স্পর্শ করা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অনুমতি দিলেন।'
এরপর আরেক ব্যক্তি এসে একই প্রশ্ন করলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিষেধ করলেন।
যার ক্ষেত্রে অনুমতি দিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন বৃদ্ধ। আর যাকে নিষেধ করেছেন, তিনি ছিলেন যুবক।'২৫১
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফতোয়া দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় বৃদ্ধ ও যুবকের মধ্যে পার্থক্য করতেন।
এ হাদিস থেকে উলামায়ে কিরাম মাসআলা বের করেছেন যে, যুবক ও যুবকের মতো যৌবনধারী পুরুষদের ক্ষেত্রে রোজা অবস্থায় স্ত্রীকে চুমু দেওয়া বা স্পর্শ করা মাকরুহ। কারণ, এমন সময় তারা উত্তেজিত হয়ে পড়ে বিধায় হারামে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু যাদের ক্ষেত্রে এমন আশঙ্কা নেই, তাদের জন্য মাকরুহ নয়। ২৫২
ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এ বিষয়ে দ্বিমত নেই যে, যদি চুমু দিলে বীর্য না পড়ে, তবে সে চুমুতে সিয়াম বিনষ্ট হবে না।'২৫৩
টিকাঃ
২৫১. সুনানু আবি দাউদ: ২৩৮৭।
২৫২. মাজমুউ ফাতাওয়া বিন বাজ: ১৫/৩১৫।
২৫৩. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৭/২১৫।