📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 প্রশ্নকারী পূর্ণরূপে উপকৃত হওয়ার স্বার্থে অধিক প্রশ্নে বিরক্ত হতেন না

📄 প্রশ্নকারী পূর্ণরূপে উপকৃত হওয়ার স্বার্থে অধিক প্রশ্নে বিরক্ত হতেন না


আবু কাসির সুহাইমি (রাহিমাহুল্লাহ) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'একবার আমি আবু জার (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে বললাম, "আমাকে এমন একটি আমলের কথা বলুন, যে আমল করলে মুমিন জান্নাতে প্রবেশ করবে।"

তিনি বললেন, “আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ প্রশ্নটি করলে তিনি উত্তর দিলেন, "আল্লাহর প্রতি ইমান।" তারপর আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলাম, "ইমানের সাথে কোন আমল?"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আল্লাহ-প্রদত্ত রিজিক হতে সামান্য হলেও দান করা।"

- যদি কারও কাছে কিছুই না থাকে?

- তাহলে সে মুখে ভালো কিছু বলবে।

যদি সে অক্ষম হয়?

– তাহলে সে কোনো দুর্বলকে সাহায্য করবে।

যদি সে নিজেই দুর্বল হয়, তার কিছু করার শক্তি না থাকে?

তাহলে সে কোনো বোধহীন ব্যক্তির জন্য কাজ করে দেবে।

- যদি সে নিজেই বোধহীন হয়?

আবু জার (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, এ প্রশ্নের পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার দিকে তাকালেন এবং বললেন, “তুমি তো দেখছি, তোমার সাথির জন্য কল্যাণের কিছুই রাখবে না? যদি সে এমন হয়, তবে তাকে যে মানুষ কষ্ট দেয়, তাকে ক্ষমা করে দেবে।"

এরপর আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললাম, “হে আল্লাহর রাসুল, এ কথাটি সহজ করে বললে ভালো হয়।

এবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যার হাতে আমার প্রাণ-তাঁর শপথ, যে ব্যক্তি কোনো কিছু করে আল্লাহর নিকট থাকা প্রতিদানের আশা করবে, কিয়ামতের দিন সে পুণ্যকর্ম তার হাত ধরে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে।"২২২

হাফিজ ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে মুমিনদের জন্য এ হাদিসটি উত্তম সংশোধনী। এ হাদিস থেকে আমরা শিখতে পাই, মুফতিগণ ফতোয়া দেওয়ার সময়, শিক্ষকগণ ছাত্রদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় অধিক প্রশ্ন আসলেও ধীরেসুস্থে তার জবাব দিয়ে যাবেন। এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন ও মাসআলা যত বেশিই আসুক না কেন, আর তার উত্তর যত লম্বাই হোক না কেন, ধীরেসুস্থে তাদের উত্তর দিয়ে যেতে হবে।'২২৩

টিকাঃ
২২২. সহিহু ইবনি হিব্বান ৩৭৪, সহিহ লি-গাইরিহি। হাদিসটি সংক্ষিপ্তরূপে সহিহুল বুখারি (হাদিস: ২৫১৮) ও সহিহু মুসলিম (হাদিস: ৮৪)-এ এসেছে।
২২৩. ফাতহুল বারি: ৫/১৪৯।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 মিথ্যে থুথবা দেওয়ার সময়ও প্রশ্নের উত্তর দিতেন

📄 মিথ্যে থুথবা দেওয়ার সময়ও প্রশ্নের উত্তর দিতেন


ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বরে খুতবা দিচ্ছিলেন। এমন সময় এক লোক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গুইসাপ খাওয়া সম্পর্কে জানতে চাইলেন।'

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, "আমি এ প্রাণী খাই না এবং হারামও বলি না।"২২৪

এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, গুইসাপ খাওয়া বৈধ। কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা হারাম বলেননি, তা হালাল। যে জিনিস খাওয়া আদতে বৈধ, সে জিনিস রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম না খাওয়ার কারণে হারাম হওয়া বোঝায় না। হতে পারে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপছন্দ করার কারণে বা অন্য কোনো কারণে গুইসাপ খেতেন না। ২২৫

টিকাঃ
২২৪. সহিহুল বুখারি: ৫৫৩৬, সহিহু মুসলিম: ১৯৪৩।
২২৫. তারহুত তাসরিব: ৬/৩।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 কখনো জিজ্ঞাসার জবাবে সতর্কতা অবলম্বন করতে বলতেন

📄 কখনো জিজ্ঞাসার জবাবে সতর্কতা অবলম্বন করতে বলতেন


উকবা বিন হারিস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত যে, 'তিনি আবু ইহাব বিন আজিজের কন্যাকে বিয়ে করলেন। তখন এক মহিলা এসে তাকে বললেন, "উকবা ও তার স্ত্রী-দুজনকে আমি দুধ পান করিয়েছি।"

উকবা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মহিলাকে বললেন, "আপনি আমাকে দুধ পান করিয়েছেন এমনটা তো আমি জানি না! আর এর আগেও আমাকে এমন কিছু আপনি বলেননি।"

অতঃপর উকবা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আবু ইহাবের পরিবারের কাছে এ তথ্যটি যাচাইয়ের জন্য লোক পাঠালেন। তারা বলল, "এ মহিলা আমাদের কন্যাকে দুধ পান করিয়েছে এমনটা আমরা জানি না।"

তারপর উকবা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বাহনে আরোহণ করে মদিনায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলেন এবং এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জানতে চাইলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন এবং মুচকি হাসলেন। এরপর বললেন, "কীভাবে তুমি এ নারীর সাথে সংসার করবে, অথচ তোমাদের ব্যাপারে ভিন্ন কিছু রটে গেছে?"২২৬

এরপর উকবা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সে নারীর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ করে অন্য নারীকে বিয়ে করলেন। '২২৭

এ হাদিসের শিক্ষা হচ্ছে, অপবাদ ও সন্দেহ আরোপ হতে পারে-এমন সব ক্ষেত্র থেকে বিরত থাকতে হবে। বিষয়টি যদিও পরিষ্কার থাকে, তবুও এমন বিষয় থেকে সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। অধিকাংশ আলিমের মত এটাই। ২২৮

ইবনে বাত্তাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'জুমহুর উলামায়ে কিরামের মতে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উকবা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে সন্দেহজনক বিষয় থেকে সতর্কতা অবলম্বনের ফতোয়া দিয়েছিলেন। তাকে সন্দেহযুক্ত বিষয় থেকে দূরে থাকতে আদেশ দিয়েছিলেন এ শঙ্কায় যে, ভবিষ্যতে হয়তো এমন কোনো দলিল বেরিয়ে আসবে যে, সত্যিই এ মহিলা তাদের দুধ পান করিয়েছে। যদিও বিষয়টি অকাট্য ও শক্তিশালী নয়, তবুও সতর্কতা অবলম্বনই শ্রেয়। '২২৯

টিকাঃ
২২৬. অর্থাৎ কী করে তুমি এমন এক নারীর কাছে যাবে, যার ব্যাপারে বলা হচ্ছে যে, সে তোমার দুধবোন? এটা তো দ্বীনদারি ও ভদ্রতার বিপরীত। দেখুন, ফাইজুল কাদির: ৫/৫৯।
২২৭. সহিহুল বুখারি: ৮৮।
২২৮. মিরকাতুল মাফাতিহ: ১০/১০৮।
২২৯. উমদাতুল কারি: ২/১০২।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 অসহনশীল প্রশ্ন এড়িয়ে মুখ ফিরিয়ে নিতেন, যাতে প্রশ্নকারী নিজেই চুপ হয়ে যায়

📄 অসহনশীল প্রশ্ন এড়িয়ে মুখ ফিরিয়ে নিতেন, যাতে প্রশ্নকারী নিজেই চুপ হয়ে যায়


ওয়ায়িল বিন হাজরামি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'সালামা বিন ইয়াজিদ জুফি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলেন, "হে আল্লাহর নবি, যদি আমাদের ওপর এমন কতক আমির কর্তৃত্ব করে, যারা নিজেদের অধিকার আমাদের কাছ থেকে চেয়ে নেয়, কিন্তু আমাদের অধিকার আদায় করতে না চায়, তবে এ ক্ষেত্রে আপনার আদেশ কী?"

এ প্রশ্নের পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তিনি প্রশ্নটি আবার করলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবারও তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তৃতীয়বার একই প্রশ্ন করলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমরা তাদের কথা শোনো ও মানো। তাদের দায়িত্ব অনাদায়ের শাস্তি তাদের ওপর আরোপিত হবে। তোমাদের দায়িত্ব অনাদায়ের শাস্তি তোমাদের ওপর আরোপিত হবে।"২৩০

অর্থাৎ তাদের দায়িত্ব হচ্ছে, ন্যায় প্রতিষ্ঠা, প্রজাদের হক আদায় করা। আর তোমাদের দায়িত্ব হচ্ছে, মান্য করা ও বিপদে সবর করা। ২০১

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রশ্নকারী থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। যেন তিনি এ মাসআলাটি অপছন্দ করলেন। এ বিষয়ে মুখ খুলতে তিনি অপছন্দ করলেন। কিন্তু প্রশ্নকারী বারবার প্রশ্নটি করে গেলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে আমিরের প্রতি আমাদের কর্তব্য আদায় করা। আমিরগণ যে কাজ করেন, তারা সে কাজের দায়ভার নেবেন। আর আমরা যা করি, তার দায়ভার আমাদের নিতে হবে। আমিরদের কর্তব্য হচ্ছে, তাদের দায়িত্ব আদায় করা। আর আমাদের কর্তব্য হচ্ছে, আমাদের দায়িত্ব আদায় করা।

আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে, আমিরের কথা শোনা ও মানা। আর আমিরদের দায়িত্ব হচ্ছে, আমাদের মাঝে ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচার করা, কারও ওপর জুলুম না করা, আল্লাহর বান্দাদের ওপর আল্লাহর হদ প্রতিষ্ঠা করা, আল্লাহর জমিনে আল্লাহর শরিয়ত প্রতিষ্ঠা করা, আল্লাহর শত্রুদের সাথে জিহাদ করা। ২৩২

এগুলো হচ্ছে আমিরদের দায়িত্ব। এগুলো তাদের নিকট শরয়িভাবে কাম্য।

যদি তারা এগুলো প্রতিষ্ঠা না করেন, তবে আমরা বলতে পারব না যে, তোমরা নিজেদের দায়িত্ব আদায় করলে না, তাই আমরাও তোমাদের প্রতি থাকা আমাদের দায়িত্ব আদায় করব না। বরং আমাদের কর্তব্য হচ্ছে, তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব আদায় করা। তাই আমরা আমিরের কথা শুনব ও মানব, তাদের সাথে জিহাদে বের হব, তাদের পেছনে জুমআ ও ইদের সালাত আদায় করব-ইত্যাদি সকল দায়িত্ব আদায় করব। ২০০

টিকাঃ
২৩০. সহিহু মুসলিম: ১৮৪৬।
২৩১. তুহফাতুল আহওয়াজি: ৬/৩৬৮।
২৩২. এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। আমির যখন প্রজার ওপর জুলুম করে, তখন আমিরের আনুগত্য করার হুকুম অটুট থাকে। কিন্তু যদি আমির আল্লাহর শরিয়ত প্রতিষ্ঠা না করে, আল্লাহর শরিয়তের স্থলে অন্য কিছুকে বসায়, আমিরের মাঝে যদি কুফরে বাওয়াহ বা প্রকাশ্য কুফর দেখা দেয়, তবে মুসলিমদের ওপর আমিরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা ওয়াজিব হয়ে পড়ে। (-সম্পাদক)
২৩৩. শারহু রিয়াজিস সালিহিন: ৩/৬৬৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00