📄 অনুপকারী প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে উপকারী বিষয়টি জানিয়ে দিতেন
বর্ণিত হয়েছে যে, 'এক লোক জিজ্ঞেস করল, "কিয়ামত কখন হবে?"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, "তোমার জন্য ধ্বংস! কিয়ামতের জন্য কী প্রস্তুতি গ্রহণ করেছ?"...' -হাদিসটি পূর্বে বর্ণিত হয়েছে (দেখুন, ৮৬ পৃষ্ঠায় আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত হাদিসটি)।
📄 প্রশ্নকারী তাঁকে সংশোধন করে দিলে সংশোধন গ্রহণ করতেন
খাওলা বিনতে সালাবা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহর কসম, সুরা মুজাদালার শুরুর আয়াতগুলো আমার ও আওস বিন সামিত (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা নাজিল করেছেন।
আমি ছিলাম আওসের স্ত্রী। তিনি বৃদ্ধ ছিলেন। মাঝে মাঝে তিনি মন্দ আচরণ করতেন এবং রাগের বশবর্তী হয়ে পড়তেন। একদিন তিনি আমার কাছে আসলে আমি তার কোনো ভুলের সংশোধন করে দিলাম। এতে তিনি রাগান্বিত হয়ে পড়লেন এবং বলে বসলেন, "তুমি আমার কাছে আমার মায়ের পিঠের মতো।" এ কথা বলে আওস আমার কাছ থেকে চলে গেলেন। তারপর নিজ গোত্রের সভার স্থানে গিয়ে কিছু সময় কাটিয়ে আসলেন। অতঃপর আমার কাছে এসে আমার নিকটবর্তী হতে চাইলেন। আমি তখন বললাম, "কক্ষনো না! যার হাতে খাওলার প্রাণ-তাঁর কসম করে বলছি, আপনি আমার কাছে আসবেন না। আপনি যা বলার বলেছেন। আমাদের বিষয়টি আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মীমাংসা করা পর্যন্ত আপনি আমার নিকট আসবেন না।" আমার কথায় কোনো ফল হলো না। আওস আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আমি সাধ্যমতো তাকে প্রতিরোধ করলাম। একজন মহিলা যে রকম স্বাভাবিকভাবে কোনো দুর্বল বৃদ্ধের ওপর বিজয়ী হয়, আমিও সেভাবে বিজয়ী হলাম। তাকে সরিয়ে দিলাম আমার ওপর থেকে। এরপর ঘর থেকে বেরিয়ে আমার এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে তার কাপড় ধার নিলাম। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গিয়ে উপস্থিত হলাম। তাঁর সামনে বসলাম। ঘটনার বিবরণ দিলাম তাঁর কাছে। আমি আওসের মন্দ স্বভাবের ব্যাপারে তাঁর নিকট অভিযোগ করলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, "খাওলা, তোমার চাচাতো ভাই (স্বামী) বুড়ো মানুষ। তার ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো।"
আমি তখন বললাম, "আল্লাহর কসম, যতক্ষণ এ ব্যাপারে কুরআন (আয়াত) নাজিল হবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি ক্ষান্ত হব না।" এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কাপড়ে ঢেকে দেওয়া হলো। ওহি নাজিলের সময় যেভাবে তাকে কাপড়ে ঢেকে দেওয়া হয়, সেভাবে। এরপর যখন তিনি স্বাভাবিক হলেন, তখন বললেন, “হে খাওলা, তোমার ও তোমার স্বামীর ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বিধান নাজিল করেছেন।" এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিলাওয়াত করলেন:
قَدْ سَمِعَ اللهُ قَوْلَ الَّتِي تُجَادِلُكَ فِي زَوْجِهَا وَتَشْتَكِي إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ يَسْمَعُ تَحَاوُرَكُمَا إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرُ - الَّذِينَ يُظَاهِرُونَ مِنْكُمْ مِنْ نِسَائِهِمْ مَا هُنَّ أُمَّهَاتِهِمْ إِنْ أُمَّهَاتُهُمْ إِلَّا اللَّائِي وَلَدْنَهُمْ وَإِنَّهُمْ لَيَقُولُونَ مُنْكَرًا مِنَ الْقَوْلِ وَزُورًا وَإِنَّ اللَّهَ لَعَفُوٌّ غَفُورُ - وَالَّذِينَ يُظَاهِرُونَ مِنْ نِسَائِهِمْ ثُمَّ يَعُودُونَ لِمَا قَالُوا فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَتَمَاسًا ذَلِكُمْ تُوعَظُونَ بِهِ وَاللهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ - فَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَصِيَامُ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَتَمَاسًا فَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَإِطْعَامُ سِتِّينَ مِسْكِينًا ذَلِكَ لِتُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ وَلِلْكَافِرِينَ عَذَابٌ أَلِيمٌ
"যে নারী তার স্বামীর বিষয়ে আপনার সাথে বাদানুবাদ করছে এবং অভিযোগ পেশ করছে আল্লাহর দরবারে, আল্লাহ তার কথা শুনেছেন। আল্লাহ আপনাদের উভয়ের কথাবার্তা শুনেন। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু শুনেন, সবকিছু দেখেন। তোমাদের মধ্যে যারা তাদের স্ত্রীগণকে মাতা বলে ফেলে, তাদের স্ত্রীগণ তাদের মাতা নয়। তাদের মাতা কেবল তারাই, যারা তাদের জন্ম দিয়েছে। তারা তো অসমীচীন ও ভিত্তিহীন কথাই বলে। নিশ্চয় আল্লাহ মার্জনাকারী, ক্ষমাশীল। যারা তাদের স্ত্রীদের মাতা বলে ফেলে, অতঃপর নিজেদের উক্তি প্রত্যাহার করে, তাদের কাফফারা হলো, একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি দাস মুক্ত করবে। এটা তোমাদের জন্য উপদেশ। আল্লাহ খবর রাখেন তোমরা যা করো। আর যে ব্যক্তির দাসমুক্তির সামর্থ্য নেই, সে একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে ধারাবাহিকভাবে দুই মাস রোজা রাখবে। যে এতেও অক্ষম হয়, সে ষাটজন মিসকিনকে আহার করাবে। এটা এ জন্য, যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো। এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তি। আর কাফিরদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আজাব।"২১৯
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, "তার কাছে যাও, তাকে বলো একটি দাস মুক্ত করতে।"
আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর কসম, তার সে সামর্থ্য নেই।"
তাহলে সে ধারাবাহিক দুই মাস রোজা রাখবে।
আল্লাহর শপথ, হে আল্লাহর রাসুল, তিনি তো বেশ বৃদ্ধ। রোজা রাখার সামর্থ্যও তার নেই।
তাহলে সে যেন এক অসাক খেজুর ষাটজন মিসকিনকে খাওয়ায়।
আল্লাহর শপথ, হে আল্লাহর রাসুল, তার এমন সামর্থ্যও নেই।
তাহলে আমি তাকে এক আরক পরিমাণ খেজুর দিয়ে সাহায্য করব।
খাওলা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, তখন আমি বললাম, "হে আল্লাহর রাসুল, আমিও তাকে এক আরক খেজুর দিয়ে সাহায্য করব।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমার এ সিদ্ধান্ত যথার্থ ও উত্তম হয়েছে। এবার গিয়ে তার পক্ষ থেকে সাদাকা করে দাও। আর তোমার স্বামীর ব্যাপারে কল্যাণকামী হও।"
খাওলা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'এরপর আমি তেমনই করলাম, যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ করেছেন। '২২০
আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'সকল প্রশংসা সে আল্লাহর, যিনি সকল কণ্ঠস্বর শুনতে পান অনায়াসে। খাওলা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে নিজের স্বামীর ব্যাপারে অভিযোগ করলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর কথোপকথন আমি শুনতে পাইনি। তখন আমি ঘরের এক কোণে ছিলাম। তখন সুরা মুজাদালার প্রাথমিক আয়াতগুলো অবতীর্ণ হলো। '২২১
টিকাঃ
২১৯. সুরা আল-মুজাদালা, ৫৮: ১-৪
২২০. মুসনাদু আহমাদ ২৬৭৭৪, সুনানু আবি দাউদ: ২২১৪।
২২১. সুনানুন নাসায়ি ৩৪৬০, সুনানু ইবনি মাজাহ: ১৮৮।
📄 প্রশ্নকারী পূর্ণরূপে উপকৃত হওয়ার স্বার্থে অধিক প্রশ্নে বিরক্ত হতেন না
আবু কাসির সুহাইমি (রাহিমাহুল্লাহ) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'একবার আমি আবু জার (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে বললাম, "আমাকে এমন একটি আমলের কথা বলুন, যে আমল করলে মুমিন জান্নাতে প্রবেশ করবে।"
তিনি বললেন, “আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ প্রশ্নটি করলে তিনি উত্তর দিলেন, "আল্লাহর প্রতি ইমান।" তারপর আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলাম, "ইমানের সাথে কোন আমল?"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আল্লাহ-প্রদত্ত রিজিক হতে সামান্য হলেও দান করা।"
- যদি কারও কাছে কিছুই না থাকে?
- তাহলে সে মুখে ভালো কিছু বলবে।
যদি সে অক্ষম হয়?
– তাহলে সে কোনো দুর্বলকে সাহায্য করবে।
যদি সে নিজেই দুর্বল হয়, তার কিছু করার শক্তি না থাকে?
তাহলে সে কোনো বোধহীন ব্যক্তির জন্য কাজ করে দেবে।
- যদি সে নিজেই বোধহীন হয়?
আবু জার (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, এ প্রশ্নের পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার দিকে তাকালেন এবং বললেন, “তুমি তো দেখছি, তোমার সাথির জন্য কল্যাণের কিছুই রাখবে না? যদি সে এমন হয়, তবে তাকে যে মানুষ কষ্ট দেয়, তাকে ক্ষমা করে দেবে।"
এরপর আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললাম, “হে আল্লাহর রাসুল, এ কথাটি সহজ করে বললে ভালো হয়।
এবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যার হাতে আমার প্রাণ-তাঁর শপথ, যে ব্যক্তি কোনো কিছু করে আল্লাহর নিকট থাকা প্রতিদানের আশা করবে, কিয়ামতের দিন সে পুণ্যকর্ম তার হাত ধরে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে।"২২২
হাফিজ ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে মুমিনদের জন্য এ হাদিসটি উত্তম সংশোধনী। এ হাদিস থেকে আমরা শিখতে পাই, মুফতিগণ ফতোয়া দেওয়ার সময়, শিক্ষকগণ ছাত্রদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় অধিক প্রশ্ন আসলেও ধীরেসুস্থে তার জবাব দিয়ে যাবেন। এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন ও মাসআলা যত বেশিই আসুক না কেন, আর তার উত্তর যত লম্বাই হোক না কেন, ধীরেসুস্থে তাদের উত্তর দিয়ে যেতে হবে।'২২৩
টিকাঃ
২২২. সহিহু ইবনি হিব্বান ৩৭৪, সহিহ লি-গাইরিহি। হাদিসটি সংক্ষিপ্তরূপে সহিহুল বুখারি (হাদিস: ২৫১৮) ও সহিহু মুসলিম (হাদিস: ৮৪)-এ এসেছে।
২২৩. ফাতহুল বারি: ৫/১৪৯।
📄 মিথ্যে থুথবা দেওয়ার সময়ও প্রশ্নের উত্তর দিতেন
ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বরে খুতবা দিচ্ছিলেন। এমন সময় এক লোক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গুইসাপ খাওয়া সম্পর্কে জানতে চাইলেন।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, "আমি এ প্রাণী খাই না এবং হারামও বলি না।"২২৪
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, গুইসাপ খাওয়া বৈধ। কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা হারাম বলেননি, তা হালাল। যে জিনিস খাওয়া আদতে বৈধ, সে জিনিস রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম না খাওয়ার কারণে হারাম হওয়া বোঝায় না। হতে পারে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপছন্দ করার কারণে বা অন্য কোনো কারণে গুইসাপ খেতেন না। ২২৫
টিকাঃ
২২৪. সহিহুল বুখারি: ৫৫৩৬, সহিহু মুসলিম: ১৯৪৩।
২২৫. তারহুত তাসরিব: ৬/৩।