📄 কাজের মাধ্যমে প্রশ্নের উত্তর দিতেন
এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে ফজর সালাতের ওয়াক্ত সম্পর্কে জানতে চাইলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন না।
পরবর্তী দিন ফজর উদিত হলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের প্রথম সময়ে সালাত পড়ালেন। এর পরের দিন চারদিক ফরসা হয়ে গেলে ফজরের শেষ সময়ে সালাত পড়ালেন। এরপর বললেন, "সালাতের সময় সম্পর্কে জানতে চাওয়া ব্যক্তিটি কোথায়?” লোকটি বললেন, "আমিই সে, হে আল্লাহর রাসুল।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এ দুই সময়ের মাঝেই ফজরের ওয়াক্ত।"১৬১
আবু ওয়ালিদ সুলাইমান আল-বাজি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'সালাতের ওয়াক্ত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদিও মুখেই বলে দিতে পারতেন, কিন্তু তিনি মুখে না বলে সরাসরি দেখিয়ে দিলেন। যাতে এ সাহাবি বিষয়টি স্পষ্ট বুঝতে পারেন। আর একজন শিক্ষার্থীর জন্য এটি অত্যন্ত উপকারী। শেখার জন্য সরাসরি দেখিয়ে দেওয়ার এ পদ্ধতি শিক্ষার্থীর জন্য অধিক সহজ। '১৬২
টিকাঃ
১৬১. সুনানুন নাসায়ি ৫৪৪, মুসনাদু আহমাদ: ১১৭০৯।
১৬২. আল-মুনতাকা শারহুল মুয়াত্তা: ১/৬।
📄 নারী-বিষয়ক প্রশ্নসমূহের উত্তর দিতেন
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতেন এবং মাসআলা জানার জন্য প্রশ্ন করতে গিয়ে লজ্জা না পাওয়ার প্রতি উৎসাহ দিতেন।
উম্মে সালামা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'উম্মে সুলাইম (রাদিয়াল্লাহু আনহা) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলেন। বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল, নিশ্চয় আল্লাহ সত্য বলতে লজ্জা করেন না। (তাই আমি আপনার কাছে জানতে চাইছি যে,) মহিলাদের স্বপ্নদোষ হলে কি গোসল করতে হবে?"
উম্মে সুলাইম (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর কথা আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর কাছে মন্দ ঠেকল। তাই তিনি উম্মে সুলাইম (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-কে বলে বসলেন, "ধূলিমলিন হোক তোমার হাত! ১৬৩ নারী কি তাদের লজ্জা-শরম খুইয়ে ফেলেছে!"
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর উদ্দেশে বললেন, "বরং তোমার হাত ধূলিমলিন হোক! ১৬৪ হাঁ, উম্মে সুলাইম, তুমি যখন পানি দেখবে, তখন গোসল করবে।"
এদিকে উম্মে সালামা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-ও লজ্জায় নিজের মুখ ঢেকে নিলেন। বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল, মহিলাদেরও কি স্বপ্নদোষ হয়?"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হাঁ। ধূলিমলিন হোক তোমার হাত! স্বপ্নদোষের ব্যাপারটি যদি মহিলাদের ক্ষেত্রে সত্য না হয়, তবে জন্ম নেওয়া সন্তানের সাথে মায়ের সাথে মিল হয় কীভাবে!"১৬৫
হাদিস থেকে বোঝা যায়:
* লজ্জা যেন দ্বীন শিক্ষায় বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। ইলম অর্জনের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ানো লজ্জা নিন্দনীয়। কিন্তু যদি লজ্জা সম্মান ও মাহাত্ম্যের উদ্দেশ্যে হয়, তবে তা উত্তম; যেমনটি উম্মে সালামা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর কর্মে দেখা গেছে। তিনি লজ্জায় মুখ ঢেকে তার প্রশ্নটি করেছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি সম্মানার্থে তিনি লজ্জায় মুখ ঢেকেছিলেন। ১৬৬
টিকাঃ
১৬৩. যদিও تربت يمينك শব্দবন্ধটি ধমকের অর্থে আসে। তবে প্রায়োগিক ক্ষেত্রে ধমক দেওয়া বোঝায় না।
১৬৪. অর্থাৎ বরং তুমিই এমন ধমকযুক্ত কথার উপযুক্ত। কারণ, সে তো তার দ্বীনের জ্ঞান জানতে প্রশ্ন করেছে। এ জ্ঞান জানা তার জন্য ওয়াজিবও। তাই সে তিরস্কারের পাত্রী নয়; বরং এ পরিস্থিতিতে তুমিই তিরস্কারের পাত্রী। কারণ, তুমিই তো বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে ভুল করলে এবং তাকে তিরস্কার করে বসলে।
১৬৫. সহিহুল বুখারি: ১৩০, সহিহু মুসলিম: ৩১৩।
১৬৬. ইবনে বাত্তাল কৃত শারহু সহিহিল বুখারি: ১/২২৩।
📄 মহিলাদের বিবিধ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় লজ্জাবনত থাকতেন
আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, 'এক মহিলা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে ঋতুস্রাব-পরবর্তী গোসল সম্পর্কে জানতে চাইলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে গোসলের পদ্ধতি শিখিয়ে দিয়ে বললেন, "এক টুকরো সুগন্ধিবিশিষ্ট কাপড় ১৬৮ নেবে এবং এ দিয়ে পবিত্র হবে।"
মহিলাটি জিজ্ঞেস করল, "কীভাবে আমি পবিত্র হব?"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "সে কাপড়ের টুকরো দিয়ে পবিত্র হবে।"
"কীভাবে?" মহিলাটি আবার জানতে চাইল।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "সুবহানাল্লাহ! সেই কাপড়ের টুকরো দিয়ে পবিত্র হবে।"
আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'এতটুকু বলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেকে যেন গুটিয়ে নিলেন। এদিকে আমি মহিলাকে টান দিলাম আমার কাছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা তাকে বোঝাতে চাইলেন, তাকে বুঝিয়ে দিলাম। বললাম, "এভাবে তুমি রক্তের দাগ মুছে ফেলবে।"১৬৯
হাদিস থেকে বোঝা যায়:
* সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজে নিষেধ, সত্যের আদেশ করা ও সত্য প্রতিষ্ঠিত করার সামনে প্রতিবন্ধক লজ্জা শরিয়ত অনুমোদিত নয়। ১৬৭
* মহিলাদের হায়িজের গোসলের সময় সুগন্ধিময় কিছু নিয়ে তা তুলা বা এ জাতীয় কিছুতে ঢেলে, এটি দিয়ে রক্তের দাগ মোছা মুসতাহাব।
* আশ্চর্যান্বিত হলে সুবহানাল্লাহ বলা। এ ঘটনায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আশ্চর্য হওয়ার কারণ ছিল, একটি পরিষ্কার বিষয়, যা বুঝতে এতটুকু চিন্তারও দরকার পড়ে না, সে বিষয়টা একজন মহিলার নিকট এত অবোধগম্য কী করে হতে পারে!
* সতরসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কিনায়া (ইঙ্গিতবাচক) শব্দ ব্যবহার করে কথা বলা মুসতাহাব।
* সতরসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কিনায়া শব্দ ব্যবহার করা শরিয়তের একটি নীতি। প্রয়োজন ছাড়া এ বিষয়ে স্পষ্ট করে বলা যাবে না। এর কিছু উদাহরণ হচ্ছে-
وَاللَّذَانِ يَأْتِيَانِهَا مِنكُمْ فَآذُوهُمَا
'আর তোমাদের মধ্য হতে যে দুজন (নর-নারী) এই কাজ (ব্যভিচার) করবে, তাদেরকে তোমরা শাস্তি দেবে। '১৭০
أُحِلَّ لَكُمْ لَيْلَةَ الصِّيَامِ الرَّفَثُ إِلَى نِسَائِكُمْ
'রমাজানের রাতে তোমাদের বিবিগণের নিকট গমন করা তোমাদের জন্য বৈধ করা হয়েছে। '১৭১
نِسَاؤُكُمْ حَرْثٌ لَّكُمْ فَأْتُوا حَرْثَكُمْ أَنَّى شِئْتُمْ
'তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের শস্যখেত। সুতরাং তোমরা তোমাদের শস্যখেতে যে প্রকারে ইচ্ছে গমন করো। '১৭২
এভাবে অন্যান্য আয়াতে সতরসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো রূপক শব্দে বর্ণিত হয়েছে।
গোপনীয় বিষয়গুলোতে এ রকম সাধারণ উপস্থাপন ও ইঙ্গিতে বলা কথাই যথেষ্ট।
* মহিলাদের গোপন বিষয়াদি সম্পর্কে তারা আলিমদের নিকট প্রশ্ন করতে পারবে।
* কেউ প্রশ্নের উত্তর না বুঝলে, বারবার জিজ্ঞেস করতে পারবে।
* আলিম কোনো কথা খুলে বলতে লজ্জা পেলে, কেউ যদি সেটা বুঝে থাকে, সে প্রশ্নকারীকে আলিমের কথার ব্যাখ্যা করে দেবে।
* উচ্চমানের ব্যক্তির উপস্থিতিতে তার চেয়ে নিম্নমানের ব্যক্তি থেকে জ্ঞান অর্জন করা বৈধ।
* আলিম ভিন্ন কেউ যদি দায়িত্ব নিয়ে বুঝিয়ে দেন, সে ক্ষেত্রে যিনি বোঝানোর দায়িত্ব নিলেন, তার সকল কথা শ্রোতাকে বুঝতে হবে এমনটা শর্ত নয়।
* যিনি শিখতে আগ্রহী, তার প্রতি কোমল আচরণ করে তাকে শেখাতে হবে। সে যদি না বুঝে, তবে তাকে মাজুর (অপারগ) ধরা হবে।
* নিজের গোপনীয় বিষয় লুকোনো মানুষের নিকট কাম্য-যদিও মহিলাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি সৃষ্টিগত। তাই তাদেরকে সুগন্ধিযুক্ত কাপড় ব্যবহার করে উৎকট গন্ধটা দূর করতে হবে।
এ হাদিস থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মহান চরিত্র, তাঁর উন্নত ধৈর্য ও লজ্জার প্রমাণ পাওয়া যায়। ১৭৩
টিকাঃ
১৬৭. আল-মুনতাকা শারহুল মুয়াত্তা: ৭/২১৩।
১৬৮. فرصة : অর্থাৎ পশমি কাপড় বা তুলা বা পশমযুক্ত পরিধেয় চামড়ার টুকরো। সুগন্ধি শব্দের ব্যবহারের উদ্দেশ্য হচ্ছে, কাপড়টি যেন সুগন্ধময় হয়। দেখুন, ফাতহুল বারি: ১/৪১৬।
১৬৯. সহিহুল বুখারি: ৩১৪, সহিহু মুসলিম: ৩৩২।
১৭০. সুরা আন-নিসা, ৪: ১৬।
১৭১. সুরা আল-বাকারা, ২: ১৮৭।
১৭২. সুরা আল-বাকারা, ২: ২২৩।
১৭৩. ফাতহুল বারি: ১/৪১৬, আইনি কৃত শারহু সুনানি আবি দাউদ: ২/১১১।
📄 ‘উনদুল হাকিম’-এর ভিত্তিতে বাস্তবতা বুঝিয়ে দিতেন
আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, (আমি ফরসা কিন্তু) আমার একটি কালো ছেলে জন্মেছে (তাই আমি সন্তানটি আমার বলে স্বীকার করতে সংশয় বোধ করছি)।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমার কি উট আছে?” লোকটি বললেন, "জি, আছে।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তার রং কী?" লোকটি উত্তর দিলেন, "লাল।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "সেগুলোর মধ্যে কি ছাই বর্ণের কোনো উট আছে?" লোকটি বললেন, "জি, আছে।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তাহলে এটা কোথা থেকে আসলো?" তিনি উত্তর দিলেন, "হয়তো পূর্বপুরুষদের রক্তধারায় এমনটি হয়েছে।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমার ছেলের কালো রংটাও হয়তো পূর্বপুরুষদের রক্তধারার কারণে হয়েছে।"১৭৪
ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'লোকটি স্ত্রীর ওপর অপবাদ আরোপ করার উদ্দেশ্যে এমনটা বলেননি; বরং নিজের সংশয়ের কারণে তিনি বিষয়টি জানতে এসেছিলেন। যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদাহরণ যোগ করে তাকে বুঝিয়ে দিলেন, তিনি অকুণ্ঠচিত্তে তা মেনে নিলেন। '১৭৫
হাদিস থেকে বোঝা যায়:
* বিছানাসংশ্লিষ্ট বিষয়টি এ হাদিস থেকে মীমাংসিত হয়ে যায়। বাবা-ছেলের রং যদি ভিন্নও হয়, তবুও এ কথা বলার সুযোগ নেই যে, স্ত্রী কোনো ধরনের মন্দকর্মে লিপ্ত হয়েছে। কারণ, কেউ যদি ফরসা হয়, তবে তার কালো বর্ণের ছেলে জন্ম নেওয়া সম্ভব। একইভাবে বাবা কালো বর্ণের হলে, তার ফরসা ছেলে জন্ম হওয়াও সম্ভব।
* কেবল ছেলের গায়ের রং ভিন্ন ধরনের হওয়ার কারণে কোনো বাবা নিজের ছেলেকে অস্বীকার করা জায়িজ নয়।
* বংশ সংরক্ষণের গুরুত্ব।
* নেতিবাচক ধারণা পোষণের ওপর ভর্ৎসনা।
* কিয়াসের প্রামাণ্যতা।
* উদাহরণ দিয়ে বোঝালে প্রশ্নকারী দ্রুত বুঝতে সক্ষম হয়। ১৭৬
টিকাঃ
১৭৪. সহিহুল বুখারি: ৫৩০৫, সহিহু মুসলিম: ১৫০০।
১৭৫. ফাতহুল বারি: ৯/৪৪৪।
১৭৬. ফাতহুল বারি: ৯/৪৪৪, ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১০/১৩৪।