📄 রূঢ় ভাষায় করা প্রশ্নের উত্তরে ধৈর্যধারণ করতেন
আনাস বিন মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'কিছু বিষয় সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করার ব্যাপারে আমাদের নিষেধ করা হয়েছিল, তাই আমরা আশা করতাম যে, সে বিষয়টি যদি কোনো বুদ্ধিমান বেদুইন এসে জিজ্ঞেস করে, তবে আমরাও উপকৃত হতাম তা শুনে।'
একদিন আমরা মসজিদে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পাশে বসা ছিলাম, ইত্যবসরে এক বেদুইন সাহাবি১৫৩ উটে চড়ে আসলেন। মসজিদে প্রবেশ করে উটকে বসালেন। এরপর উটটিকে একটি খুঁটিতে বেঁধে রেখে বললেন, "আপনাদের মাঝে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে?"
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন সকলের অগ্রভাগে হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। আমরা বললাম, "সুন্দর অবয়ববিশিষ্ট হেলান দেওয়া এ মানুষটি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।" লোকটি এসে তাঁর উদ্দেশে বললেন:
হে আব্দুল মুত্তালিবের সন্তান!
তোমার আহ্বানের উত্তর দেওয়া হলো।
আমি আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করব। জিজ্ঞাসাগুলো আপনার জন্য কঠিন হতে পারে। তাই আপনি আমার ওপর রাগ করবেন না যেন!
তোমার প্রশ্ন জিজ্ঞেস করো।
হে মুহাম্মাদ, আপনি আমাদের নিকট রাসুল হয়ে এসেছেন। দূত হয়ে এসেছেন। এক লোক বলল যে, আপনি নাকি বলেন, আল্লাহ আপনাকে আমাদের নিকট প্রেরণ করেছেন?
সে লোকটি সত্য বলেছে।
তাহলে বলুন, আসমানের সৃষ্টিকর্তা কে?
আল্লাহ।
কে এ পাহাড়গুলো প্রতিস্থাপিত করেছেন আর তাতে যা সৃষ্টি করার, তা সৃষ্টি করেছেন?
আল্লাহ।
যে আল্লাহ আসমান-জমিন সৃষ্টি করেছেন, জমিনের ওপর পাহাড় প্রতিস্থাপন করেছেন-সে আল্লাহর কসম খেয়ে বলছি, তিনিই কি আপনাকে রাসুল করে পাঠিয়েছেন?
হাঁ।
আপনার দূত আরও বলেছে, "আমাদের ওপর প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ।"
সে সত্য বলেছে।
যে আল্লাহ আপনাকে রাসুল করে পাঠিয়েছেন- তাঁর শপথ করে বলছি, তিনিই কি আপনাকে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের আদেশ দিয়েছেন?
হাঁ।
আপনার দূত আরও বলেছে, "আমাদের সম্পদে জাকাত ফরজ।"
সে সত্য বলেছে।
যে আল্লাহ আপনাকে রাসুল করে পাঠিয়েছেন-তাঁর শপথ করে বলছি, তিনিই কি আপনাকে জাকাতের আদেশ দিয়েছেন?
হাঁ।
আপনার দূত আরও বলেছে, “প্রতি বছর রমাজান মাসের রোজা আমাদের ওপর ফরজ।"
সে সত্য বলেছে।
যে আল্লাহ আপনাকে রাসুল করে পাঠিয়েছেন-তাঁর শপথ করে বলছি, তিনিই কি আপনাকে রোজার আদেশ দিয়েছেন?
হাঁ।
আপনার দূত আরও বলেছে, "আমাদের যারা সামর্থ্যবান, তাদের ওপর বাইতুল্লাহর হজ করা ফরজ।"
সে সত্য বলেছে।
এরপর লোকটি ফিরে গেলেন। যাওয়ার আগে বলে গেলেন, "সে সত্তার শপথ করে বলছি-যিনি আপনাকে প্রেরণ করেছেন, আমি এর ওপর কোনো কিছু বাড়াবও না, কোনো কিছু কমাবও না।" এ বলে তিনি চলে গেলেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যদি সে সত্য বলে থাকে, তবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। "১৫৪
ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'বেদুইন সাহাবির প্রশ্ন করার ধরনটি অপূর্ব। তার প্রশ্ন চয়ন ও ধারাবাহিকতার রীতিটি চমৎকার। তিনি প্রথমে সৃষ্টির রূপকার সম্পর্কে প্রশ্ন করলেন। জানতে চাইলেন তিনি কে। এরপর সৃষ্টিকর্তার নামে কসম করে এ বিষয়ের সত্যায়ন করলেন যে, সৃষ্টিজগতে সৃষ্টিকর্তার একজন দূত থাকবেন অবশ্যই।
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রিসালাত সম্পর্কে জানলেন। রিসালাত সম্পর্কে জানার পর, রিসালাতের সত্যতার ওপর কসম করে পরের প্রশ্নটি করলেন। এভাবে একটা ধারাবাহিকতা ধরে তিনি প্রশ্ন করে গেলেন।
ধারাবাহিকতা ধরে রেখে প্রশ্ন করার এ যোগ্যতা একজন জ্ঞান-গম্ভীর মানুষের মাঝেই পাওয়া সম্ভব। সবশেষে তার ইমানের চাহিদা ছিল তিনি বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে ও নিশ্চিত করে কিছু বলবেন। অবশেষে সে বেদুইন সাহাবি সেটাও করলেন। তারপর ফিরে গেলেন।'
কাজি ইয়াজ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, এ লোকটি ইসলাম গ্রহণের পরেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসেছিলেন। তিনি নিজের বিষয়টি সাব্যস্ত করতে ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটবর্তী হতে এসেছিলেন। আল্লাহই অধিক জ্ঞাত। '১৫৫
টিকাঃ
১৫৩. বেদুইন সে সাহাবি ছিলেন, জিমাম বিন সালাবা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)।
১৫৪. সহিহুল বুখারি: ৬৩৩, সহিহু মুসলিম: ১২।
১৫৫. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১/১৭১।
📄 আদব শেখানোর জন্য কখনো প্রশ্নকারীর প্রতি সাড়া দিতেন না
আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'একদিন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের উদ্দেশে কথা বলছিলেন। এমন সময় এক বেদুইন এসে বললেন, “কিয়ামত কখন হবে?"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে বেদুইনের কথার উত্তর না দিয়ে আগের মতো কথা বলতে থাকলেন।
তখন একজন মন্তব্য করলেন, "তিনি শুনেছেন, তবে এ কথাটি অপছন্দ করেছেন বিধায় উত্তর দেননি।"
আরেকজন ১৫৬ বললেন, "বরং তিনি শুনেনইনি।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বক্তব্য শেষ করে জিজ্ঞেস করলেন, "কিয়ামত সম্পর্কে জানতে চাইল কে?"
বেদুইন বললেন, "আমি হে আল্লাহর রাসুল।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যখন আমানত বিনষ্ট হবে, তখন তোমরা কিয়ামতের অপেক্ষায় থেকো।"
লোকটি আবার জিজ্ঞেস করলেন, "আমানতের বিনষ্টতা কীভাবে হবে?"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, "যখন অযোগ্যকে নেতৃত্ব দেওয়া হবে, তখন তোমরা কিয়ামতের অপেক্ষায় থেকো। "১৫৭
এ হাদিসের ওপর ইমাম বুখারি (রাহিমাহুল্লাহ) সহিহ বুখারিতে (১/১৪২) একটি পরিচ্ছেদ সন্নিবেশ করেছেন। পরিচ্ছেদের নাম দিয়েছেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য কথায় লিপ্ত থাকা অবস্থায় কোনো সাহাবি কোনো ইলম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে আগের কথা শেষ করতেন, এরপর প্রশ্নকর্তার উত্তর দিতেন।'
হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়:
আলিম ও তালিবে ইলমের প্রতি এ হাদিসটি একটি সতর্কবাণী। কোনো জিজ্ঞাসু তালিবে ইলম যদি আলিমের চলমান কথার মাঝখানে প্রশ্ন করে বসে, তখন প্রশ্নকারীকে ধমক না দেওয়াই হচ্ছে নিয়ম। করণীয় হচ্ছে, প্রথমত প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে প্রশ্নকারীকে উপেক্ষা করা। আগের কথা শেষ হলে তখন প্রশ্নকারীর জবাব দেওয়া। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শিক্ষা এমনই। তিনি কথা শেষ করে প্রশ্নকারীর জবাব দিলেন। তার প্রতি দয়ার্দ্র হলেন। কারণ, প্রশ্নকারী ছিলেন একজন বেদুইন। আর বেদুইনরা একটু রূঢ় প্রকৃতির হয়ে থাকে।
কোনো প্রশ্ন ও তার উত্তর যদি নির্দিষ্টও না হয়, তবুও গুরুত্ব সহকারে প্রশ্নকারীর প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
তালিবে ইলমের জন্য শিক্ষা হচ্ছে, যখন আলিম অন্য কারও বিষয়ে ব্যস্ত থাকেন, তখন তাকে প্রশ্ন না করা। কারণ, যারা আগে জিজ্ঞেস করেছেন, তারা অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত।
সে সকল বিষয় অগ্রগণ্য, সে সকল বিষয় আগে শিখতে হবে। ফতোয়া, বিধিবিধান ইত্যাদি জানার ক্ষেত্রে একই হুকুম।
আলিম উত্তর দেওয়ার পর শ্রোতা যদি না বোঝে, তবে পুনরায় জিজ্ঞেস করতে হবে। যতক্ষণ না বিষয়টি তার নিকট স্পষ্ট হয়ে যায়। যেমন: এ সাহাবি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উত্তরের পর আবার বললেন, 'আমানত বিনষ্ট কীভাবে হবে?'
হাদিসে এ বিষয়েরও ইঙ্গিত আছে যে, ইলম শেখার একটি পদ্ধতি হচ্ছে, প্রশ্ন ও উত্তর। তাই তো বলা হয়, 'সুন্দর প্রশ্ন ইলমের অর্ধেক।'
ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ), ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) প্রমুখ এ হাদিসের ভিত্তিতে বলেন, 'খুতবা দেওয়ার সময় যদি কেউ প্রশ্ন করে, তবে খুতবা বন্ধ করে তার উত্তর দেওয়ার আবশ্যকতা নেই; বরং খুতবা শেষ করে তার প্রশ্নের উত্তর দেবে।
তবে অধিকাংশ আলিম প্রশ্ন-উত্তরের মাসআলায় খুতবাকে দুভাগে বিভক্ত করেছেন। এক. ওয়াজিব খুতবা। এ সময়ে কেউ প্রশ্ন করলে উত্তর দিতে হবে খুতবা শেষে। দুই. ওয়াজিব নয়, এমন খুতবা। এ সময়ে কেউ প্রশ্ন করলে তার উত্তর তখনই দেওয়া যাবে।
তবে এ ক্ষেত্রে খুতবার (বক্তব্যের) মাঝে বিরতি নেওয়া উত্তম। যদি বিষয়টি দ্বীনি কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হয়ে থাকে; বিশেষ করে যদি প্রশ্নকারীর সাথে বিষয়টি সম্পৃক্ত হয়, তবে প্রশ্নের জবাব দেওয়া মুসতাহাব। প্রথমে প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে, এরপর খুতবা শেষ করতে হবে-পরিস্থিতি যদি এমন না হয়, তবে খুতবা শেষে উত্তর দেওয়া যথেষ্ট। '১৫৮
আবু রিফাআ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গেলাম। তিনি তখন খুতবা দিচ্ছিলেন। আমি বললাম, "হে আল্লাহর রাসুল, এক ভিনদেশি (অর্থাৎ আবু রিফাআ) আপনার কাছে দ্বীন সম্পর্কে জানতে এসেছে। সে জানে না, তার দ্বীন কী।"
আবু রিফাআ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলে চললেন। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবা থামিয়ে আমার কাছে আসলেন। অতঃপর তিনি একটি চেয়ার আনালেন। আমার ধারণা চেয়ারের খুঁটিগুলো লোহার তৈরি ছিল।
অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চেয়ারে বসে আমাকে তা শেখালেন, যা তাঁকে আল্লাহ শিখিয়েছেন। অতঃপর ফিরে গিয়ে বাকি খুতবা সমাপ্ত করলেন। '১৫৯
ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এ হাদিসে প্রশ্নকারীর তৎক্ষণাৎ জবাব দেওয়া এবং অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়ার শিক্ষা পাওয়া যায়। সম্ভবত আবু রিফাআ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ইমান ও দ্বীনের মৌলিক বিষয়াদি সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন বিধায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবা বন্ধ করে তৎক্ষণাৎ তাকে ইমান ও দ্বীনের বিষয়ে শিক্ষা দিলেন।
আলিমগণ এ ব্যাপারে একমত যে, কেউ যদি ইমান ও ইসলামে প্রবেশের পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে আসে, তবে তৎক্ষণাৎ তার প্রশ্নে সাড়া দেওয়া ফরজ।
আবু রিফাআ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর প্রত্যুত্তর দেওয়ার সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চেয়ারে বসেছিলেন। যাতে বাকিরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা শুনতে পারেন। প্রত্যক্ষ করতে পারেন তাঁর মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিত্ব।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে খুতবার সময় আবু রিফাআ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে ইমান ও দ্বীনের মূল ভিত্তি শেখালেন, এ খুতবাটির ক্ষেত্রে তিনটি সম্ভাবনা রয়েছে। এক, হয়তো খুতবাটি জুমআর খুতবা ছিল না। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবার মাঝখানে লম্বা সময় বিরতি দিয়েছিলেন। দুই, হয়তো খুতবাটি জুমআর ছিল। আবু রিফাআর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পর তিনি পুনরায় নতুন করে খুতবা শুরু করেছিলেন। তিন. সম্ভবত খুতবার মাঝখানে লম্বা বিরতি দেওয়া হয়নি। '১৬০
টিকাঃ
১৫৬. 'সাহাবিদের মাঝে এ দ্বিধার কারণ হচ্ছে, একজন লোকের প্রশ্নের উত্তর দেননি; বরং তিনি প্রশ্নকারীর প্রতি তাকানওনি; বরং এ বিষয়ে তিনি ছিলেন নির্লিপ্ত। ...এ থেকে বোঝা যায়, কারও প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কেবল উল্লিখিত দুটি ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং কখনো অন্যদের সাথে কথাগুলো পূর্ণ করা পর্যন্ত পরবর্তী সময়ে কৃত প্রশ্নের উত্তর দিতে দেরি করারও অবকাশ আছে। দেখুন, ফাতহুল বারি: ১/১৪৩।
১৫৭. সহিহুল বুখারি: ৫৯।
১৫৮. ফাতহুল বারি: ১/১৪২।
১৫৯. সহিহু মুসলিম: ৮৭৬।
১৬০. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৬/১৬৬।
📄 কাজের মাধ্যমে প্রশ্নের উত্তর দিতেন
এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে ফজর সালাতের ওয়াক্ত সম্পর্কে জানতে চাইলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন না।
পরবর্তী দিন ফজর উদিত হলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের প্রথম সময়ে সালাত পড়ালেন। এর পরের দিন চারদিক ফরসা হয়ে গেলে ফজরের শেষ সময়ে সালাত পড়ালেন। এরপর বললেন, "সালাতের সময় সম্পর্কে জানতে চাওয়া ব্যক্তিটি কোথায়?” লোকটি বললেন, "আমিই সে, হে আল্লাহর রাসুল।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এ দুই সময়ের মাঝেই ফজরের ওয়াক্ত।"১৬১
আবু ওয়ালিদ সুলাইমান আল-বাজি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'সালাতের ওয়াক্ত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদিও মুখেই বলে দিতে পারতেন, কিন্তু তিনি মুখে না বলে সরাসরি দেখিয়ে দিলেন। যাতে এ সাহাবি বিষয়টি স্পষ্ট বুঝতে পারেন। আর একজন শিক্ষার্থীর জন্য এটি অত্যন্ত উপকারী। শেখার জন্য সরাসরি দেখিয়ে দেওয়ার এ পদ্ধতি শিক্ষার্থীর জন্য অধিক সহজ। '১৬২
টিকাঃ
১৬১. সুনানুন নাসায়ি ৫৪৪, মুসনাদু আহমাদ: ১১৭০৯।
১৬২. আল-মুনতাকা শারহুল মুয়াত্তা: ১/৬।
📄 নারী-বিষয়ক প্রশ্নসমূহের উত্তর দিতেন
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতেন এবং মাসআলা জানার জন্য প্রশ্ন করতে গিয়ে লজ্জা না পাওয়ার প্রতি উৎসাহ দিতেন।
উম্মে সালামা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'উম্মে সুলাইম (রাদিয়াল্লাহু আনহা) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলেন। বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল, নিশ্চয় আল্লাহ সত্য বলতে লজ্জা করেন না। (তাই আমি আপনার কাছে জানতে চাইছি যে,) মহিলাদের স্বপ্নদোষ হলে কি গোসল করতে হবে?"
উম্মে সুলাইম (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর কথা আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর কাছে মন্দ ঠেকল। তাই তিনি উম্মে সুলাইম (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-কে বলে বসলেন, "ধূলিমলিন হোক তোমার হাত! ১৬৩ নারী কি তাদের লজ্জা-শরম খুইয়ে ফেলেছে!"
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর উদ্দেশে বললেন, "বরং তোমার হাত ধূলিমলিন হোক! ১৬৪ হাঁ, উম্মে সুলাইম, তুমি যখন পানি দেখবে, তখন গোসল করবে।"
এদিকে উম্মে সালামা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-ও লজ্জায় নিজের মুখ ঢেকে নিলেন। বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল, মহিলাদেরও কি স্বপ্নদোষ হয়?"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হাঁ। ধূলিমলিন হোক তোমার হাত! স্বপ্নদোষের ব্যাপারটি যদি মহিলাদের ক্ষেত্রে সত্য না হয়, তবে জন্ম নেওয়া সন্তানের সাথে মায়ের সাথে মিল হয় কীভাবে!"১৬৫
হাদিস থেকে বোঝা যায়:
* লজ্জা যেন দ্বীন শিক্ষায় বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। ইলম অর্জনের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ানো লজ্জা নিন্দনীয়। কিন্তু যদি লজ্জা সম্মান ও মাহাত্ম্যের উদ্দেশ্যে হয়, তবে তা উত্তম; যেমনটি উম্মে সালামা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর কর্মে দেখা গেছে। তিনি লজ্জায় মুখ ঢেকে তার প্রশ্নটি করেছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি সম্মানার্থে তিনি লজ্জায় মুখ ঢেকেছিলেন। ১৬৬
টিকাঃ
১৬৩. যদিও تربت يمينك শব্দবন্ধটি ধমকের অর্থে আসে। তবে প্রায়োগিক ক্ষেত্রে ধমক দেওয়া বোঝায় না।
১৬৪. অর্থাৎ বরং তুমিই এমন ধমকযুক্ত কথার উপযুক্ত। কারণ, সে তো তার দ্বীনের জ্ঞান জানতে প্রশ্ন করেছে। এ জ্ঞান জানা তার জন্য ওয়াজিবও। তাই সে তিরস্কারের পাত্রী নয়; বরং এ পরিস্থিতিতে তুমিই তিরস্কারের পাত্রী। কারণ, তুমিই তো বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে ভুল করলে এবং তাকে তিরস্কার করে বসলে।
১৬৫. সহিহুল বুখারি: ১৩০, সহিহু মুসলিম: ৩১৩।
১৬৬. ইবনে বাত্তাল কৃত শারহু সহিহিল বুখারি: ১/২২৩।