📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 কখনো উত্তর দিয়ে দ্রুত আমলের আদেশ দিতেন

📄 কখনো উত্তর দিয়ে দ্রুত আমলের আদেশ দিতেন


ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'একবার নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবায় বললেন, “কোনো নারী মাহরাম ব্যতীত সফর করবে না।"

তখন এক লোক দাঁড়িয়ে বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল, আমার স্ত্রী হজের উদ্দেশ্যে একাকী বেরিয়ে গেছে। আর এদিকে আমি অমুক অমুক যুদ্ধে যাওয়ার জন্য নাম লিখিয়েছি। এখন করণীয় কী?" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি এক্ষুণি রওনা হও, অতঃপর তোমার স্ত্রীর সাথে হজ করো।"১৪৪

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সাহাবির প্রশ্নের জবাব দিলেন এবং তাকে আদেশ দিলেন তৎক্ষণাৎ তার স্ত্রীর সাথে হজ করার জন্য বেরিয়ে পড়তে। এ হাদিসের মাঝে উহ্য বার্তাটি হচ্ছে, কোনো মহিলার জন্য মাহরাম ছাড়া সফর করা জায়িজ নয়।

টিকাঃ
১৪৪. সহিহুল বুখারি: ১৮৬২, সহিহু মুসলিম ১৩৪১।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 অপূর্ণ ভাষায় সংক্ষেপে উত্তর প্রদান করতেন

📄 অপূর্ণ ভাষায় সংক্ষেপে উত্তর প্রদান করতেন


ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'এক ব্যক্তি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জানতে চাইল, "একজন মুহরিম কী কাপড় পরবে?"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন:

لَا يَلْبَسُ القَمِيصَ، وَلَا العِمَامَةَ، وَلَا السَّرَاوِيلَ، وَلَا البُرْنُسَ، وَلَا ثَوْبًا مَسَّهُ الوَرْسُ أَوِ الزَّعْفَرَانُ، فَإِنْ لَمْ يَجِدِ النَّعْلَيْنِ فَلْيَلْبَسِ الخُفَّيْنِ، وَلْيَقْطَعْهُمَا حَتَّى يَكُونَا تَحْتَ الكَعْبَيْنِ

"মুহরিম সেলাই করা জামা পরবে না। পাগড়ি, পায়জামা, বুরনুস১৪৫, হলুদ বা জাফরানরাঙা কাপড় ও মোজা পরবে না। যদি জুতো না থাকে, তবে মোজার পায়ের গিঁট থেকে নিচের অংশ রেখে ওপরের অংশ কেটে মোজা পরবে। "১৪৬

দেখুন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে মুহরিমের পরিধেয় সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেগুলো পরিধান থেকে বিরত থাকতে হবে, সেগুলোর নাম বললেন। কারণ, অপরিধেয় বস্তু সীমিত, আর পরিধেয় বস্তু অসংখ্য।

ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আলিমগণ বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জবাবটা অলংকারপূর্ণ। কারণ, মুহরিম পরিধান করতে পারবে না-এমন বস্তু সীমিত। তাই সেগুলো স্পষ্ট করে বলে দেওয়া সহজ। অন্যদিকে পরিধান করতে পারবে-এমন বস্তু অসংখ্য। সেগুলোর প্রত্যেকটির নাম নিতে গেলে বাক্য অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে, যা অলংকারশাস্ত্রের বিপরীত। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এই এই বস্তু পরা যাবে না। এ ছাড়া যা আছে, তা পরা যাবে। '১৪৭

টিকাঃ
১৪৫. মাথাওয়ালা একপ্রকার ঢিলা কোট।
১৪৬. সহিহুল বুখারি: ১৩১, সহিহু মুসলিম: ১১৭৭।
১৪৭. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৮/৭৩।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 সারগর্ভ ভাষায় উত্তর দিতেন

📄 সারগর্ভ ভাষায় উত্তর দিতেন


এমন সারগর্ভ ভাষায় উত্তর দিতেন, যাতে প্রশ্নকর্তার বিস্তারিত জিজ্ঞেস করার দরকার না পড়ে। আবু মুসা আশআরি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'এক ব্যক্তি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, "হে আল্লাহর রাসুল, এক ব্যক্তি গনিমত পাওয়ার জন্য কিতাল করে, আরেকজন সুনামের জন্য কিতাল করে, অন্যজন নিজের মর্যাদার জন্য কিতাল করে, এদের মধ্যে কে আল্লাহর রাস্তায় কিতালকারী?”

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব দিলেন:

مَنْ قَاتَلَ لِتَكُونَ كَلِمَةُ اللَّهِ هِيَ الْعُلْيَا فَهُوَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ

"যে ব্যক্তি আল্লাহর কালিমাকে সমুন্নত করার জন্য কিতাল করে, তার কিতালই আল্লাহর রাস্তায় কিতাল বলে পরিগণিত হয়। "১৪৮

হাফিজ ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এ হাদিসটি জাওয়ামিউল কালিম তথা সারগর্ভময় বাণীর একটি। কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রশ্নের উত্তরে এমন সারগর্ভময় উত্তর দিলেন, যার পরে এ বিষয়ে আর কোনো প্রশ্নই বাকি থাকে না।'১৪৯

তিনি আরও বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ জবাবটাতে সর্বোচ্চ পর্যায়ের বালাগাত ও ইজাজের (অলংকারশাস্ত্র ও সংক্ষিপ্তায়ন পদ্ধতি) ব্যবহার লক্ষণীয়। কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি এভাবে উত্তর দিতেন যে, তুমি যা উল্লেখ করলে সেগুলোর একটাও আল্লাহর রাস্তায় পরিগণিত নয়। তখন এই তিন প্রকারের কিতাল ব্যতীত বাকি সব আল্লাহর রাস্তায় পরিগণিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকত; অথচ বিষয়টি এমন নয়। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে উত্তর না দিয়ে সারগর্ভময় একটি বাক্যে উত্তর দিলেন-যার ফলে কিতালের বিষয়ে একজন মুজাহিদের লক্ষ্য সুনির্ধারিত হয়ে যায়। '১৫০

ইবনে বাত্তাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'প্রশ্নকারী সাহাবি যে শব্দ উচ্চারণ করেছেন, সে শব্দ ব্যবহার করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দেননি। কারণ, রাগ ও অহমিকা কখনো কখনো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যও হয়। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সারগর্ভময় শব্দে উত্তর দিলেন। এভাবে তিনি একদিকে সকল সন্দেহ-সংশয়ের পথ বন্ধ করে দিলেন এবং অপরদিকে বিষয়টিকে সবার বোধগম্য করে তুললেন। '১৫১

আবু মুসা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'একবার নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ও মুআজ বিন জাবাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে ইয়ামানে পাঠালেন। আমি তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমাদের দেশে যব থেকে একপ্রকার মদ তৈরি হয়। এ মদের নাম মিজর। আবার মধু থেকে এক ধরনের মদ প্রস্তুত হয়, যার নাম বিতউ। এগুলোর হুকুম কী?"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "প্রতিটি নেশাজাতীয় দ্রব্যই হারাম। "১৫২

টিকাঃ
১৪৮. সহিহুল বুখারি: ১২৩, সহিহু মুসলিম ১৯০৪।
১৪৯. ফাতহুল বারি: ১/১৯৭।
১৫০. ফাতহুল বারি: ৮/৪০৬।
১৫১. শারহু সহিহিল বুখারি: ১/২০৩।
১৫২. সহিহুল বুখারি: ৪৩৪৩, সহিহু মুসলিম: ১৭৩৩।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 রূঢ় ভাষায় করা প্রশ্নের উত্তরে ধৈর্যধারণ করতেন

📄 রূঢ় ভাষায় করা প্রশ্নের উত্তরে ধৈর্যধারণ করতেন


আনাস বিন মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'কিছু বিষয় সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করার ব্যাপারে আমাদের নিষেধ করা হয়েছিল, তাই আমরা আশা করতাম যে, সে বিষয়টি যদি কোনো বুদ্ধিমান বেদুইন এসে জিজ্ঞেস করে, তবে আমরাও উপকৃত হতাম তা শুনে।'

একদিন আমরা মসজিদে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পাশে বসা ছিলাম, ইত্যবসরে এক বেদুইন সাহাবি১৫৩ উটে চড়ে আসলেন। মসজিদে প্রবেশ করে উটকে বসালেন। এরপর উটটিকে একটি খুঁটিতে বেঁধে রেখে বললেন, "আপনাদের মাঝে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে?"

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন সকলের অগ্রভাগে হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। আমরা বললাম, "সুন্দর অবয়ববিশিষ্ট হেলান দেওয়া এ মানুষটি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।" লোকটি এসে তাঁর উদ্দেশে বললেন:

হে আব্দুল মুত্তালিবের সন্তান!

তোমার আহ্বানের উত্তর দেওয়া হলো।

আমি আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করব। জিজ্ঞাসাগুলো আপনার জন্য কঠিন হতে পারে। তাই আপনি আমার ওপর রাগ করবেন না যেন!

তোমার প্রশ্ন জিজ্ঞেস করো।

হে মুহাম্মাদ, আপনি আমাদের নিকট রাসুল হয়ে এসেছেন। দূত হয়ে এসেছেন। এক লোক বলল যে, আপনি নাকি বলেন, আল্লাহ আপনাকে আমাদের নিকট প্রেরণ করেছেন?

সে লোকটি সত্য বলেছে।

তাহলে বলুন, আসমানের সৃষ্টিকর্তা কে?

আল্লাহ।

কে এ পাহাড়গুলো প্রতিস্থাপিত করেছেন আর তাতে যা সৃষ্টি করার, তা সৃষ্টি করেছেন?

আল্লাহ।

যে আল্লাহ আসমান-জমিন সৃষ্টি করেছেন, জমিনের ওপর পাহাড় প্রতিস্থাপন করেছেন-সে আল্লাহর কসম খেয়ে বলছি, তিনিই কি আপনাকে রাসুল করে পাঠিয়েছেন?

হাঁ।

আপনার দূত আরও বলেছে, "আমাদের ওপর প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ।"

সে সত্য বলেছে।

যে আল্লাহ আপনাকে রাসুল করে পাঠিয়েছেন- তাঁর শপথ করে বলছি, তিনিই কি আপনাকে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের আদেশ দিয়েছেন?

হাঁ।

আপনার দূত আরও বলেছে, "আমাদের সম্পদে জাকাত ফরজ।"

সে সত্য বলেছে।

যে আল্লাহ আপনাকে রাসুল করে পাঠিয়েছেন-তাঁর শপথ করে বলছি, তিনিই কি আপনাকে জাকাতের আদেশ দিয়েছেন?

হাঁ।

আপনার দূত আরও বলেছে, “প্রতি বছর রমাজান মাসের রোজা আমাদের ওপর ফরজ।"

সে সত্য বলেছে।

যে আল্লাহ আপনাকে রাসুল করে পাঠিয়েছেন-তাঁর শপথ করে বলছি, তিনিই কি আপনাকে রোজার আদেশ দিয়েছেন?

হাঁ।

আপনার দূত আরও বলেছে, "আমাদের যারা সামর্থ্যবান, তাদের ওপর বাইতুল্লাহর হজ করা ফরজ।"

সে সত্য বলেছে।

এরপর লোকটি ফিরে গেলেন। যাওয়ার আগে বলে গেলেন, "সে সত্তার শপথ করে বলছি-যিনি আপনাকে প্রেরণ করেছেন, আমি এর ওপর কোনো কিছু বাড়াবও না, কোনো কিছু কমাবও না।" এ বলে তিনি চলে গেলেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যদি সে সত্য বলে থাকে, তবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। "১৫৪

ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'বেদুইন সাহাবির প্রশ্ন করার ধরনটি অপূর্ব। তার প্রশ্ন চয়ন ও ধারাবাহিকতার রীতিটি চমৎকার। তিনি প্রথমে সৃষ্টির রূপকার সম্পর্কে প্রশ্ন করলেন। জানতে চাইলেন তিনি কে। এরপর সৃষ্টিকর্তার নামে কসম করে এ বিষয়ের সত্যায়ন করলেন যে, সৃষ্টিজগতে সৃষ্টিকর্তার একজন দূত থাকবেন অবশ্যই।

এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রিসালাত সম্পর্কে জানলেন। রিসালাত সম্পর্কে জানার পর, রিসালাতের সত্যতার ওপর কসম করে পরের প্রশ্নটি করলেন। এভাবে একটা ধারাবাহিকতা ধরে তিনি প্রশ্ন করে গেলেন।

ধারাবাহিকতা ধরে রেখে প্রশ্ন করার এ যোগ্যতা একজন জ্ঞান-গম্ভীর মানুষের মাঝেই পাওয়া সম্ভব। সবশেষে তার ইমানের চাহিদা ছিল তিনি বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে ও নিশ্চিত করে কিছু বলবেন। অবশেষে সে বেদুইন সাহাবি সেটাও করলেন। তারপর ফিরে গেলেন।'

কাজি ইয়াজ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, এ লোকটি ইসলাম গ্রহণের পরেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসেছিলেন। তিনি নিজের বিষয়টি সাব্যস্ত করতে ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটবর্তী হতে এসেছিলেন। আল্লাহই অধিক জ্ঞাত। '১৫৫

টিকাঃ
১৫৩. বেদুইন সে সাহাবি ছিলেন, জিমাম বিন সালাবা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)।
১৫৪. সহিহুল বুখারি: ৬৩৩, সহিহু মুসলিম: ১২।
১৫৫. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১/১৭১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00