📄 উত্তরের অতিরিক্ত প্রয়োজনীয় বিষয়ও জানিয়ে দিতেন
কখনো দেখা গেছে একটি বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে, কিন্তু আরেকটি প্রশ্ন করার দরকার ছিল, সেটি করা হয়নি। এমন অবস্থা হলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই সে বিষয়টি সাহাবিদের বলে দিতেন। যাতে সে বিষয়টিতে উপকার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পাওয়া যায়। অথবা কখনো দেখা গেছে প্রশ্নকারীর জন্য প্রশ্নকৃত বিষয়টি জানা যেমন প্রয়োজন, সাথে অন্য বিষয়টিও জানা প্রয়োজন, তখন তিনি সে বিষয়টিও জানিয়ে দিতেন।
আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'একবার এক লোক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জানতে চাইলেন, "হে আল্লাহর রাসুল, আমরা সমুদ্রে ভ্রমণ করি। নিজেদের সাথে সামান্য কিছু পানি নিয়ে যেতে পারি। এখন সমস্যা হচ্ছে, যদি সে পানি দিয়ে অজু করে ফেলি, তবে পান করার মতো পানি থাকে না। আমরা কি সমুদ্রের পানি দিয়ে অজু করতে পারব?" রাসولুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
هُوَ الطَهُورُ مَاؤُه وَالحِلُّ مَيْتَتُهُ
"সমুদ্রের পানি পবিত্র। আর সমুদ্রের মৃত (মাছ) হালাল।"১৩৩
রাফিয়ি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন, যে ব্যক্তি সমুদ্রের পানি দিয়ে অজু করার ব্যাপারে সন্দিহান, সে ব্যক্তি সমুদ্রের মাছ খাওয়ার ব্যাপারেও সন্দিহান হবে। অজু নিয়ে সে যেমন সমস্যায় পড়েছে, খাওয়া নিয়েও হয়তো সে সমস্যায় পড়বে। তাই অজুর মাসআলা বলার সাথে সাথে সমুদ্রের মাছ খাওয়ার বিষয়টিও তিনি জানিয়ে দিলেন। '১৩৪
ইবনে আরাবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'ফতোয়া দেওয়ার এটি অতিসুন্দর একটি পদ্ধতি। জিজ্ঞাসাকারী যেন পূর্ণ উপকৃত হতে পারে, সে জন্য প্রশ্নের আসল জবাবের সাথে প্রয়োজনীয় বিষয়টিও উল্লেখ করে দেওয়া উচিত। যাতে যে বিষয়ে এখনো জিজ্ঞেস করা হয়নি, সেটার ইলমও জিজ্ঞাসাকারী শিখে নিতে পারে। অনেক সময় এমন পদ্ধতিতে জিজ্ঞাসার জবাব দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে, যেমনটা এ ঘটনাটিতে ছিল। কারণ, যে ব্যক্তি সমুদ্রের পানির পবিত্রতার ব্যাপারে দ্বিধান্বিত থাকে, সে ব্যক্তি সমুদ্রের মাছ হালাল-হারাম হওয়ার ব্যাপারে সন্দিহান থাকার সম্ভাবনা তো বলাই বাহুল্য। '১৩৫
টিকাঃ
১৩৩. সুনানু আবি দাউদ: ৮৩, সুনানুত তিরমিজি: ৬৯, সুনানুন নাসায়ি: ৩৩২।
১৩৪. তুহফাতুল আহওয়াজি: ১/১৮৮।
১৩৫. ফাইজুল কাদির: ৩/২১৫।
📄 শ্রোতার বুঝতে কষ্ট হলে স্পষ্ট করে বলতেন
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন সাহাবিদের উদ্দেশে বললেন, "যার অন্তরে সরিষা পরিমাণ অহংকার আছে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" এক সাহাবি জিজ্ঞেস করলেন, "মানুষ তো চায় যে, তার পরনের জামাটা সুন্দর হোক। তার জুতোটা সুন্দর হোক। (তাহলে সেটাও কি অহংকারের অন্তর্ভুক্ত?)”
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
إِنَّ اللَّهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ، الْكِبْرُ بَطَرُ الْحَقِّ، وَغَمْطُ النَّاسِ
"নিশ্চয় আল্লাহ সুন্দর। তিনি সৌন্দর্য ভালোবাসেন। অহংকার হলো সত্যকে ঢেকে রাখা এবং মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করা।"১৩৬
'সত্যকে ঢেকে রাখা': অর্থাৎ অহংকারবশত সত্যের বিপক্ষে যাওয়া এবং সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা
'মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করা' অর্থাৎ মানুষকে তুচ্ছ মনে করা। ১৩৭
লক্ষ করুন, প্রথমত, প্রশ্নকারী সাহাবির উত্তরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর 'না' বলাটাই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়টি পরিষ্কার করতে চাইলেন। তাই তিনি স্পষ্ট করে দিলেন যে, সুন্দর পোশাক ও জুতো পরার প্রতি তার এ আগ্রহটা শরয়িভাবে কাম্য এবং পছন্দনীয়।
দ্বিতীয়ত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অহংকারের প্রকৃত তত্ত্ব বুঝিয়ে দিলেন। বললেন যে, সত্যকে ঢেকে রাখা এবং মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করাই হচ্ছে অহংকার।
এ দুটি বিষয় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রশ্নকারীকে অতিরিক্ত বলেছেন। কারণ, এ দুটির প্রয়োজন ছিল।
টিকাঃ
১৩৬. সহিহু মুসলিম: ৯১।
১৩৭. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১/১৯৪, ফাতহুল বারি: ১৭/২৪১।
📄 কখনো প্রশ্নের জবাবে উৎসহমূলক কথা বলতেন
আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'এক মহিলা তার বাচ্চাকে উঁচুতে তুলে ধরলেন এবং বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল, এ শিশুর জন্য কি হজ আছে?"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব দিলেন, "হাঁ। তার হজের সাওয়াব তোমার খাতায় লিপিবদ্ধ করা হবে।"১৩৮
টিকাঃ
১৩৮. সহিহু মুসলিম: ১৩৩৬।
📄 বাস্তবতা বোঝার জন্য কখনো বিস্তারিত ঘটনা জানতে চাইতেন
নুমান বিন বশির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমাকে কিছু সম্পদ দান করার জন্য আমার মা আমার বাবাকে অনুরোধ করলেন। আমার বাবা রাজি হলেন এবং আমাকে কিছু সম্পদ দান করলেন। কিন্তু মা বললেন, "যতক্ষণ না নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়টির সাক্ষী হন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি সন্তুষ্ট হব না।"
তখন আমি সবেমাত্র কিশোর। বাবা আমার হাত ধরে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে নিয়ে এলেন। বললেন, "এই ছেলের মা বিনতে রওয়াহা আমার কাছে অনুরোধ করেছে, যেন আমি এ ছেলেকে কিছু সম্পদ দিই।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, "এ ছাড়া তোমার কি আর কোনো সন্তান আছে?"
জি আছে।
তাদের প্রত্যেককে কি সে পরিমাণ সম্পদ দিচ্ছ, যে পরিমাণ সম্পদ একে দিচ্ছ?
না।
তাহলে আমাকে সাক্ষী বানিয়ো না। আমি কোনো জুলুমের সাক্ষী হই না।'১৩৯
অন্য বর্ণনায় এসেছে, 'পরিশেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যেভাবে তোমার সকল সন্তানের ওপর তোমার হক রয়েছে যে, তারা সবাই তোমার সাথে সদ্ব্যবহার করবে, অনুরূপভাবে তোমার ওপর তাদের হক রয়েছে যে, তুমি তাদের মাঝে সমতাবিধান করবে। "১৪০
বাস্তবতা বুঝে তারপর উত্তর দেওয়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শ। তিনি প্রশ্নকর্তার বাস্তব অবস্থা বোঝার পর তবেই তার প্রশ্নের স্পষ্টভাবে উত্তর দিতেন। এ বিষয়ে আরেকটি উদাহরণ উল্লেখ করছি।
সাবিত বিন দাহহাক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবদ্দশায় এক ব্যক্তি বুওয়ানাহ১৪১ নামক স্থানে উট জবাই করবে বলে মানত করল। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, "আমি বুওয়ানায় উট জবাই করব বলে মানত করেছি।"
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “সেখানে কি জাহিলি যুগে পূজা করা হতো, এমন কোনো মূর্তি আছে?"
সাহাবিগণ বললেন, "না।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "সেখানে কি জাহিলি যুগের কোনো উৎসব পালন করা হয়?"
সাহাবিগণ বললেন, "না।"
রাসولুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তাহলে তুমি তোমার মানত পূরণ করো। আর কোনো পাপ কাজের মানত করলে তা পূরণ করা যাবে না। মানুষ যা করার সামর্থ্য রাখে না, (এমন কাজের মানত করলে) সে মানতও পূর্ণ করা আবশ্যক নয়। "১৪২
লোকটি বুওয়ানাহ নামক স্থানে উট জবাই করার মানত করেছিল। কিন্তু এখানে প্রশ্ন ওঠে যে, কেন এ স্থানটিকেই বেছে নেওয়া হলো? স্বাভাবিকভাবেই এ ক্ষেত্রে বিস্তারিত জানা আবশ্যক হয়ে পড়ে। হতে পারে সেখানে জাহিলি যুগে কোনো অনুষ্ঠান হতো বা সেখানে জাহিলি যুগে কোনো মূর্তি ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে সব জেনে নিলেন, তারপর উত্তর দিলেন। অবস্থাদৃষ্টে প্রমাণিত হচ্ছে, যদি এগুলোর কোনো একটিতে উক্ত স্থানটি বিশেষায়িত হতো, তবে সেখানে উট জবাই করার মানত পূরণ করা জায়িজ হতো না। ১৪৩
টিকাঃ
১৩৯. সহিহুল বুখারি: ২৬৫০, সহিহু মুসলিম: ১৬২৩।
১৪০. সুনানু আবি দাউদ: ৩৫৪২।
১৪১. ইয়ানবু-এর পেছনে অবস্থিত টিলা। বলা হয়, শাম ও দিয়ারে বাকর-এর মধ্যবর্তী স্থানটির নাম বুওয়ানাহ। আবার অন্যরা বলেন, মক্কার পাদদেশে, ইয়ালামলামের কাছাকাছি অবস্থিত এ জায়গাটি। দেখুন, মুজামুল বুলদান: ১/৫০৫।
১৪২. সুনানু আবি দাউদ: ২৩১৩।
১৪৩. আত-তামহিদ লি-শারহি কিতাবিত তাওহিদ: ১/১৫৫।