📄 নওমুসলিমদের আর্থিক সাহায্য প্রদান করতেন
আনাস বিন মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'কেউ ইসলাম কবুল করার কথা বলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে কিছু চাইলে তিনি অবশ্যই দান করতেন। তো এক ব্যক্তি তাঁর কাছে (ইসলাম গ্রহণ করার কথা বলে কিছু চাইতে) আসলে তিনি তাকে এত অধিক ছাগল দিলেন যে, সেগুলো দ্বারা দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থান ভরে যাবে। সে তার কওমের নিকট ফিরে গিয়ে বলল, “হে আমার গোত্র, তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এত বেশি দান করেন যে, তাঁর অভাবের কোনো ভয় নেই।" আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'কোনো মানুষ প্রথম প্রথম টাকা-পয়সা পাওয়ার উদ্দেশ্যে ইসলাম কবুল করলেও কিছুদিন পর ইসলামই তার কাছে দুনিয়া ও দুনিয়ার সকল বস্তু থেকে প্রিয় হয়ে উঠত। '৪৫
অর্থাৎ প্রথম প্রথম পার্থিব স্বার্থ অর্জনের জন্য ইসলাম প্রকাশ করলেও কিছুদিন যেতে না যেতেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বরকত ও ইসলামের নুর তার অন্তরে ইমানের মূলতত্ত্ব ফুটিয়ে তুলত। তার অন্তরে ইমান দৃঢ়ভাবে বসে যেত। ফলে ইসলাম তার কাছে দুনিয়া ও দুনিয়ার সকল বস্তু থেকে প্রিয় হয়ে উঠত।৪৬
অনুরূপভাবে তিনি ইসলাম গ্রহণ করতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকা ও দুর্বল ইমানের মুসলমানদের অর্থ-সম্পদ দান করতেন। যেমন তিনি ইরশাদ করেন :
إِنِّي أُعْطِي قُرَيْشًا أَتَأَلَّفَهُمْ، لِأَنَّهُمْ حَدِيثُ عَهْدٍ بِجَاهِلِيَّةٍ
'আমি কুরাইশদেরকে তাদের মন জয় করার জন্য দান করে থাকি। কারণ, তারা সদ্য জাহিলিয়াত পরিত্যাগ করেছে। '৪৭
টিকাঃ
৪৫. সহিহু মুসলিম: ২৩১২।
৪৬. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৮/২১।
৪৭. সহিহুল বুখারি: ৩১৪৬, সহিহু মুসলিম: ১০৫৯।
📄 নির্যাতিত হওয়ার আশঙ্কায় ইসলাম গোপন রাখার পরামর্শ দিতেন
আবু জার (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আমি গিফার গোত্রের একজন মানুষ। আমরা জানতে পেলাম, মক্কায় এক ব্যক্তি আত্মপ্রকাশ করে নিজেকে নবি বলে দাবি করছেন। আমি আমার ভাইকে বললাম, "তুমি মক্কায় গিয়ে ওই ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ ও আলোচনা করে বিস্তারিত খোঁজখবর নিয়ে এসো।" সে রওনা হয়ে গেল এবং মক্কার ওই লোকটির সঙ্গে সাক্ষাৎ ও আলাপ-আলোচনা করে ফিরে আসলে আমি জিজ্ঞেস করলাম, "কী খবর নিয়ে এলে?" সে বলল, "আল্লাহর কসম, আমি একজন মহান ব্যক্তিকে দেখেছি, যিনি সৎ কাজের আদেশ করেন এবং মন্দ কাজ হতে নিষেধ করেন।" আমি বললাম, "তোমার খবরে আমি সন্তুষ্ট হতে পারলাম না।"
'অতঃপর আমি একটি ছড়ি ও এক পাত্র খাবার নিয়ে মক্কার দিকে রওনা হলাম। মক্কায় পৌঁছে আমার অবস্থা দাঁড়াল এমন যে, তিনি আমার পরিচিত নন, কারও নিকট জিজ্ঞেস করাও আমি সমীচীন মনে করছিলাম না। তাই আমি জমজমের পানি পান করে মসজিদে থাকতে লাগলাম। একদিন সন্ধ্যাবেলা আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আমার নিকট দিয়ে গমনকালে আমার প্রতি ইশারা করে বললেন, "মনে হয় লোকটি বিদেশি।" আমি বললাম, "হাঁ।” তিনি বললেন, "আমার সঙ্গে আমার বাড়িতে চলো।” পথে তিনি আমাকে কোনোকিছু জিজ্ঞেস করেননি। আর আমিও ইচ্ছা করে কোনোকিছু বলিনি। তাঁর বাড়িতে রাত্রিযাপন করে ভোরবেলায় আবার মসজিদে গেলাম, যাতে ওই ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে পারি। কিন্তু ওখানে এমন কোনো লোক ছিল না, যে ওই ব্যক্তি সম্পর্কে কিছু বলবে। ওই দিনও আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আমার নিকট দিয়ে চলার সময় বললেন, “এখনো কি লোকটি তার গন্তব্যস্থল ঠিক করতে পারেনি?" আমি বললাম, "না।” তিনি বললেন, "আমার সঙ্গে চলো।" পথিমধ্যে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, "বলো, তোমার ব্যাপার কী? কেন এ শহরে এসেছ?" আমি বললাম, “যদি আপনি আমার বিষয়টি গোপন রাখার আশ্বাস দেন, তাহলে তা আপনাকে বলতে পারি।" তিনি বললেন, "নিশ্চয়ই আমি গোপন করব।" আমি বললাম, "আমরা জানতে পেরেছি, এখানে এমন এক লোকের আবির্ভাব হয়েছে, যিনি নিজেকে নবি বলে দাবি করেন। আমি তাঁর সঙ্গে বিস্তারিত আলাপ-আলোচনা করার জন্য আমার ভাইকে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু সে ফেরত গিয়ে আমাকে সন্তোষজনক কোনোকিছু বলতে পারেনি। তাই নিজে দেখা করার ইচ্ছা নিয়ে এখানে আগমন করেছি।" আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, "তুমি সঠিক পথপ্রদর্শক পেয়েছ। আমি এখনই তাঁর কাছে উপস্থিত হওয়ার জন্য রওনা হয়েছি। তুমি আমাকে অনুসরণ করো এবং আমি যে গৃহে প্রবেশ করব, তুমিও সে গৃহে প্রবেশ করবে। রাস্তায় যদি তোমার জন্য বিপদজনক কোনো লোক দেখতে পাই, তবে আমি জুতো ঠিক করার অজুহাতে দেয়ালের পার্শ্বে সরে দাঁড়াব, যেন আমি জুতো ঠিক করছি। কিন্তু তুমি চলতেই থাকবে।"
আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) পথ চলতে শুরু করলেন। আমিও তাঁর অনুসরণ করে চলতে লাগলাম। তিনি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট প্রবেশ করলে আমিও তাঁর সঙ্গে ঢুকে পড়লাম। আমি বললাম, "আমার নিকট ইসলাম পেশ করুন।" তিনি পেশ করলেন। আর আমি মুসলিম হয়ে গেলাম। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
يَا أَبَا ذَرٍّ، اكْتُمْ هَذَا الأَمْرَ، وَارْجِعْ إِلَى بَلَدِكَ، فَإِذَا بَلَغَكَ ظُهُورُنَا فَأَقْبِلْ
“হে আবু জার, এখনকার মতো তোমার ইসলাম গ্রহণ গোপন রেখে তোমার দেশে চলে যাও। যখন আমাদের বিজয়ের খবর জানতে পাবে, তখন এসো।"
আমি বললাম, “যে আল্লাহ, আপনাকে সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন-তাঁর শপথ, আমি কাফির-মুশরিকদের সামনে উচ্চকণ্ঠে তাওহিদের বাণী ঘোষণা করব।"
বর্ণনাকারী বলেন, 'এই কথা বলে তিনি মসজিদে হারামে গমন করলেন। সেখানে কুরাইশের লোকজন উপস্থিত ছিল। তিনি বললেন, "হে কুরাইশগণ, আমি নিশ্চিতভাবে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসুল।” এতদশ্রবণে কুরাইশ লোকেরা বলে উঠল, “ধর এই ধর্মত্যাগী লোকটিকে।”
তারা আমার দিকে এগিয়ে আসলো এবং হত্যার উদ্দেশ্যে আমাকে নির্মমভাবে প্রহার করতে লাগল। তখন আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আমার নিকট পৌঁছে আমাকে ঘিরে রাখলেন। অতঃপর তিনি কুরাইশদের উদ্দেশ্য করে বললেন, "তোমাদের বিপদ অবশ্যম্ভাবী। তোমরা গিফার বংশের জনৈক ব্যক্তিকে হত্যা করতে উদ্যোগী হয়েছ; অথচ তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের কাফেলাকে গিফার গোত্রের নিকট দিয়ে যাতায়াত করতে হয়।"
এ কথা শুনে তারা সরে পড়ল। পরদিন ভোরবেলা কাবাগৃহে উপস্থিত হয়ে গতদিনের মতোই আমি আমার ইসলাম গ্রহণের পূর্ণ ঘোষণা দিলাম। কুরাইশগণ বলে উঠল, “ধর এই ধর্মত্যাগী লোকটিকে!” এ বলে গতদিনের মতো আজও তারা নির্মমভাবে আমাকে মারধর করতে লাগল। সেদিনও আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এসে আমাকে রক্ষা করলেন এবং কুরাইশদের উদ্দেশ্য করে প্রথম দিনের মতো বক্তব্য রাখলেন। '৪৮
টিকাঃ
৪৮. সহিহুল বুখারি: ৩৫২২, সহিহু মুসলিম: ২৪৭৩।
📄 আমর বিন আব্বাসাকে গোপন রাখার পরামর্শ দিয়েছেন
আমর বিন আবাসা সুলামি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি প্রাক-ইসলাম যুগে সকল মানুষকে পথভ্রষ্ট বলে ধারণা করতাম। তারা কোনো ধর্মের ওপর ছিল না। তারা সবাই মূর্তিপূজা করত। তখন আমি মক্কায় এমন এক ব্যক্তির কথা শুনলাম, যিনি বিভিন্ন সংবাদ বর্ণনা করেন। আমি বাহনের ওপর আরোহণ করে তাঁর নিকট এলাম এবং জানতে পারলাম যে, তিনি জনসমাবেশ থেকে নিজেকে দূরে রাখেন। তাঁর কওম তাঁর ওপর নির্যাতন করে। আমি কৌশলে মক্কায় তাঁর নিকট পৌঁছালাম এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, "আপনার পরিচয় কী?"
তিনি বললেন, "আমি নবি।" আমি বললাম, "নবি কী?” তিনি বললেন, "আল্লাহ আমাকে প্রেরণ করেছেন।" আমি জিজ্ঞেস করলাম, "আল্লাহ আপনাকে কী দিয়ে প্রেরণ করেছেন?" তিনি বললেন, "আমাকে আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করতে, দেব-দেবী ও মূর্তি ভেঙে ফেলতে, আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করতে এবং শিরক বিলুপ্ত করতে প্রেরণ করেছেন।" আমি জিজ্ঞেস করলাম, "এ ব্যাপারে আপনার সঙ্গে কারা আছে?” তিনি বললেন, “স্বাধীন ও কৃতদাস উভয় শ্রেণির লোক। তখন মুমিনদের মধ্যে তাঁর কাছে আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও বিলাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ছিলেন।” আমি বললাম, "আমিও আপনার অনুসারী হতে চাই।" তিনি বললেন:
إِنَّكَ لَا تَسْتَطِيعُ ذَلِكَ يَوْمَكَ هَذَا، أَلَا تَرَى حَالِي وَحَالَ النَّاسِ، وَلَكِنِ ارْجِعْ إِلَى أَهْلِكَ فَإِذَا سَمِعْتَ بِي قَدْ ظَهَرْتُ فَأْتِنِي
"বর্তমান পরিস্থিতিতে তুমি তা পারবে না। তুমি তো আমার ও লোকজনের অবস্থা দেখতেই পাচ্ছ। তুমি বরং পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে যাও। যখন আমি বিজয় লাভ করেছি বলে শুনতে পাবে, তখন আমার কাছে এসো।"
আমি পরিবারের কাছে চলে গেলাম। ইতিমধ্যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরত করে মদিনায় গমন করলেন। তখন আমি পরিবারের সাথে অবস্থান করছিলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় গমন করার পর থেকে আমি সর্বদা এ বিষয়ে খোঁজখবর নিতে লাগলাম এবং মানুষজনের কাছে খবর নিতে লাগলাম। সে সময় একদল মদিনাবাসী আমার কাছে আসলো।
তাদের জিজ্ঞেস করলাম, "যে ব্যক্তি মদিনায় আগমন করেছেন, তিনি কী করছেন, তাঁর অবস্থা কী?” তারা জানাল যে, “লোকজন অতি দ্রুত তাঁর অনুসারী হচ্ছে; অথচ তাঁর কওম তাঁকে হত্যা করতে চেয়েছিল, কিন্তু তারা সফল হয়নি।"
এ কথা শোনার পর আমি মদিনায় গেলাম এবং তাঁর কাছে উপস্থিত হলাম। তাঁকে বললাম, “ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমাকে চিনতে পেরেছেন?" তিনি বললেন, “হাঁ, তুমি সেই ব্যক্তি, যে আমার সাথে মক্কায় সাক্ষাৎ করেছিলে।"
আমি বললাম, "জি, আমি সেই ব্যক্তি।" আমি আবার বললাম, “হে আল্লাহর নবি, আল্লাহ তাআলা আপনাকে যা কিছু শিখিয়েছেন আর যা কিছু আমি জানি না, তা আমাকে শিক্ষা দিন। আর আমাকে সালাত সম্পর্কে বলুন!"
তিনি বললেন, "তুমি ফজরের সালাত আদায় করবে। এরপর সূর্য উদিত হয়ে পরিষ্কারভাবে ওপরে না ওঠা পর্যন্ত তুমি সালাত থেকে বিরত থাকবে। কেননা, সূর্য যখন উদিত হয়, তখন সেটা উদিত হয় শয়তানের দুই শিংয়ের মাঝখান দিয়ে। সে সময়ে কাফিররা তাকে সিজদা করে। এরপর সালাত আদায় করতে পারবে তিরের ছায়া তার সমান না হওয়া পর্যন্ত। কারণ, সে সময় সালাতে ফেরেশতাগণ উপস্থিত থাকেন। এরপর সালাত থেকে বিরত থাকবে। কেননা, এ সময়ে জাহান্নামকে উত্তপ্ত করা হয়। এরপর যখন ছায়ায় পরিবর্তন শুরু হয়, তখন আসর পর্যন্ত সালাত পড়তে পারবে। কারণ, ফেরেশতাগণ তখন সালাতে উপস্থিত থাকেন। তারপর সালাত হতে বিরত থাকবে সূর্য অস্তমিত হওয়া পর্যন্ত। কেননা, সূর্য শয়তানের দুই শিংয়ের মধ্য দিয়ে অস্ত যায়। সে সময় কাফিররা তাকে সিজদা করে।"
তিনি বলেন, আমি বললাম, “ইয়া রাসুলাল্লাহ, অজু সম্পর্কে বলুন।” তিনি বললেন, “তোমাদের কোনো ব্যক্তির কাছে যখন অজুর পানি পেশ করা হয়, এরপর সে কুলি করে, নাকে পানি দেয় এবং তা পরিষ্কার করে, তখন তার মুখমণ্ডলের মুখ-গহ্বর ও নাকের সকল গুনাহ ঝরে যায়। তারপর যখন সে আল্লাহ তাআলার নির্দেশ অনুসারে মুখমণ্ডল ধৌত করে, তখন মুখমণ্ডলের চারিদিক থেকে সকল গুনাহ পানির সাথে ঝরে যায়। এরপর যখন দুই হাত কনুই পর্যন্ত ধৌত করে, তখন তার উভয় হাতের গুনাহসমূহ আঙুল বেয়ে পানির সাথে ঝরে পড়ে। এরপর উভয় পা গোড়ালি পর্যন্ত ধৌত করলে উভয় পায়ের গুনাহগুলো পায়ের আঙুল বেয়ে পানির সাথে ঝরে পড়ে। এরপর যদি সে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করে, আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করে এবং আল্লাহর জন্য মন খুলে যথাযথভাবে সালাত আদায় করে, তাহলে সে ওই দিনের মতো সম্পূর্ণ গুনাহমুক্ত হয়ে যাবে, যেদিন তার মা তাকে প্রসব করেছিল। "৪৯
টিকাঃ
৪৯. সহিহু মুসলিম: ৮৩২।
📄 পূর্বের সকল অপরাধ মাফ হওয়ার সুসংবাদ দিতেন
হাবিব বিন আবু আওস (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমর বিন আস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আমাকে নিজ মুখে বলেছেন যে, আমরা আহজাবের যুদ্ধে পরিখার নিকট থেকে যখন ফিরে আসছিলাম, তখন আমার মান-সম্মান বোঝে এবং আমার কথা শোনে-এমন কতিপয় কুরাইশ লোককে এক জায়গায় একত্র করলাম। তাদের বললাম, "তোমরা অবশ্যই জানো যে, আমরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উত্তরোত্তর উন্নতি করতে দেখতে পাচ্ছি, যা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তাই এই মুহূর্তে আমি একটা বিষয় ভাবছি, সে সম্পর্কে তোমাদের অভিমত জানতে চাই।"
তারা বলল, "আপনি কী ভাবছেন?"
বললাম, "আমি নাজ্জাশির সাথে মিলিত হয়ে তার পাশে থাকার কথা ভাবছি। কারণ, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি আমাদের কওমের ওপর বিজয়ী হয়, তখন আমরা নাজ্জাশির কাছে থাকব। তখন নাজ্জাশির অধীনে থাকায় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অধীনস্থ হওয়া থেকে বেঁচে যেতে পারব। আর যদি আমাদের কওম বিজয়ী হয়, তখন যেহেতু আমরা তাদের পরিচিত মানুষ, তাই তারা আমাদের সাথে ভালো আচরণই করবে।”
তারা বলল, "এ তো খুব সুন্দর অভিমত!"
তখন তাদের বললাম, "তাহলে তোমরা নাজ্জাশিকে দেওয়ার জন্য হাদিয়া সংগ্রহ করো। আমাদের ভূমি থেকে তার জন্য সবচেয়ে প্রিয় হাদিয়া হবে প্রক্রিয়াজাত চামড়া।” অতঃপর আমরা তার জন্য অনেক প্রক্রিয়াজাত চামড়া সংগ্রহ করলাম। তারপর বের হয়ে একসময় তার কাছে চলে গেলাম। আমরা রাজকক্ষে প্রবেশ করব- এমন সময় আমর বিন উমাইয়া দামরি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আসলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জাফর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও তার সাথিদের বিষয়ে কথা বলতে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি নাজ্জাশির দরবারে প্রবেশ করে কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে আসলেন।
তখন আমি আমার সঙ্গীদের বললাম, "এ হচ্ছে আমর বিন উমাইয়া দামরি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)। আমি যখন নাজ্জাশির দরবারে প্রবেশ করব, তখন একে আমার কাছে সোপর্দ করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করব। তিনি তাকে আমার হাতে তুলে দিলে আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেবো। যদি আমি তা করতে পারি, তখন কুরাইশরা দেখতে পাবে যে, আমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দূতকে হত্যা করে তাদের দায়িত্ব আদায় করে দিয়েছি।"
অতঃপর আমি তার দরবারে প্রবেশ করলাম এবং তাকে সিজদা করলাম, যা আমি আগে থেকে করতাম। তিনি বললেন, "স্বাগতম হে বন্ধু, তোমার দেশ থেকে আমার জন্য কোনো হাদিয়া এনেছ?"
আমি বললাম, "জি, জাহাঁপনা। আপনার জন্য অনেক চামড়া এনেছি।”
অতঃপর সেগুলো তার সামনে পেশ করা হলে তিনি খুব পছন্দ করলেন।
অতঃপর আমি বললাম, “জাহাপনা, আমি দেখলাম যে, আপনার এখান থেকে এক ব্যক্তি বের হয়েছে। সে আমাদের শত্রুর দূত। সুতরাং তাকে আমার হাতে তুলে দিন, যেন আমি তাকে হত্যা করতে পারি। কারণ, সে আমাদের অনেক মর্যাদাবান ও ভালো মানুষদের ওপর আঘাত করেছে।"
আমার কথা শুনে তিনি খুব রাগান্বিত হয়ে গেলেন। তারপর তার হাত লম্বা করে নাকের ওপর সজোরে একটা আঘাত করলেন। আমার মনে হলো, তিনি বুঝি নাকটি ভেঙেই ফেলেছেন। ওই সময় আমার জন্য যদি জমিন বিদীর্ণ হয়ে যেত, তখন আমি লজ্জায় মাটির ভেতর ঢুকে যেতাম।
আমি বললাম, “জাহাঁপনা, আপনার কাছে ওই লোককে আমার হাতে তুলে দেওয়ার অনুরোধ করাটা বোধহয় আপনার অপছন্দ হয়েছে?"
তিনি বললেন, "তুমি কি এমন ব্যক্তির দূতকে হত্যা করতে চাচ্ছ, যার কাছে সেই মহান ফেরেশতা আগমন করেন, যিনি মুসা (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট আগমন করতেন?"
আমি বললাম, “জাহাপনা, তিনি কি এমনই?”
তিনি বললেন, "আফসোস তোমার জন্য, হে আমর! আমার কথা মেনে নাও এবং তাঁর অনুসারী হয়ে যাও। আল্লাহর কসম, তিনি সত্যের ওপর আছেন এবং আল্লাহ তাআলা তাঁকে বিরোধীদের ওপর এমনভাবে বিজয়ী করবেন, যেভাবে মুসা (আলাইহিস সালাম)-কে ফিরআওন ও তার সৈন্যদলের ওপর বিজয়ী করেছিলেন।"
আমি বললাম, "তাহলে আমাকে ইসলামের ওপর বাইআত করান।"
তিনি সম্মত হলেন এবং তার হাত প্রসারিত করে আমাকে ইসলামের ওপর বাইআত করিয়ে নিলেন। অতঃপর আমি পরিবর্তিত সিদ্ধান্ত নিয়ে আমার সঙ্গীদের কাছে গেলাম, কিন্তু ইসলামের কথা তাদের থেকে গোপন রাখলাম।
অতঃপর মুসলমান হওয়ার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লাম। পথে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর সাথে দেখা হলো। সময়টি ছিল মক্কা-বিজয়ের পূর্বে। তিনি মক্কা থেকে কোথাও যাচ্ছিলেন। আমি বললাম, “কোথায় যাচ্ছেন, হে আবু সুলাইমান?” তিনি বললেন, "আল্লাহর কসম, আমার কাছে সত্য প্রকাশিত হয়েছে। ওই লোকটি (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নবি। তাই আমি ইসলাম গ্রহণ করতে যাচ্ছি। তো আপনি কোথায় যাচ্ছেন?"
আমি বললাম, "আল্লাহর কসম, আমিও ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যেই এসেছি।"
অতঃপর আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গেলাম। প্রথমে খালিদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং বাইআত হলেন। অতঃপর আমি কাছে গেলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার দিকে হাত প্রসারিত করলেন।
তখন আমি বললাম, “ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি এই শর্তে আপনার হাতে বাইআত হব যে, আপনি আমার পূর্বের সকল অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
يَا عَمْرُو بَايِعْ، فَإِنَّ الْإِسْلَامَ يَجُبُّ مَا كَانَ قَبْلَهُ، وَإِنَّ الْهِجْرَةَ تَجُبُّ مَا كَانَ قَبْلَهَا
"আমর, বাইআত হয়ে যাও। কারণ, ইসলাম তার পূর্বের সকল গুনাহ মিটিয়ে দেয় এবং হিজরত তার পূর্বের সকল গুনাহ মুছে দেয়।"
তারপর বাইআত হয়ে সেখান থেকে চলে আসলাম।'
আমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আল্লাহর কসম, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সবচেয়ে বেশি লজ্জা পেতাম। লজ্জার কারণে তাঁর দিকে কখনো পূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে তাকাইনি এবং তাঁর কাছে কখনো নিজের মনের ইচ্ছা নিয়ে গমন করিনি।' এমন অবস্থাতেই তিনি আল্লাহর সাথে মিলিত হয়েছেন। ৫০
টিকাঃ
৫০. মুসনাদু আহমাদ: ১৭৩২৩।