📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 জাহিলিয়াতের নোংরামি পরিত্যাগের নির্দেশ দিতেন

📄 জাহিলিয়াতের নোংরামি পরিত্যাগের নির্দেশ দিতেন


আবু মালিক আশজায়ি (রাহিমাহুল্লাহ) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'কোনো ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে তাকে সালাত শেখাতেন। অতঃপর এই কালিমাসমূহের মাধ্যমে দোয়া করার নির্দেশ দিতেন:

اللهُمَّ اغْفِرْ لِي، وَارْحَمْنِي، وَاهْدِنِي، وَعَافِنِي وَارْزُقْنِي

“হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করুন, আমার প্রতি রহম করুন, আমাকে হিদায়াত দান করুন, আমাকে নিরাপদ রাখুন এবং আমাকে রিজিক দান করুন।"২৪

উসাইম বিন কুলাইব (রাহিমাহুল্লাহ) তার পিতা থেকে, তিনি তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন, 'তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গিয়ে বললেন, "আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি।" তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:

أَلْقِ عَنْكَ شَعْرَ الْكُفْرِ وَاخْتَتِنْ

"তুমি কুফর অবস্থার চুল ফেলে দাও এবং খতনা করো।”২৫

টিকাঃ
২৩. সুনানুত তিরমিজি: ২/৫০২, তুহফাতুল আহওয়াজি: ২/১৪০।
২৪. সহিহু মুসলিম: ২৬৯৭।
২৫. সুনানু আবি দাউদ: ৩৫৬।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 ইসলাম গ্রহণে সবকিছুর ওপর প্রাধান্য দিতেন

📄 ইসলাম গ্রহণে সবকিছুর ওপর প্রাধান্য দিতেন


বারা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট যুদ্ধের পোশাকে সজ্জিত এক ব্যক্তি এসে বলল, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি যুদ্ধ করব, না ইসলাম গ্রহণ করব?" তিনি বললেন, "প্রথমে ইসলাম গ্রহণ করো, তারপর যুদ্ধ করো।” অতঃপর লোকটি ইসলাম গ্রহণ করে জিহাদে শরিক হলো এবং নিহত হলো। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (তার সম্পর্কে) বললেন, "আমল কম করেছে, কিন্তু প্রতিদান বেশি পেয়েছে।”২৬

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, অনেক সময় আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও করুণার কারণে অল্প আমলেও অনেক বড় প্রতিদান পাওয়া যায়। ২৭

বর্ণিত আছে যে, লোকটি ছিলেন আমর বিন সাবিত বিন ওয়াকশ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)।

আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'তিনি বললেন, "আমাকে এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে বলো, যিনি কখনো সালাত না পড়া সত্ত্বেও জান্নাতবাসী হয়েছেন।" লোকজন চিনতে না পেরে তাঁর কাছে জানতে চাইল, "কে তিনি?” তিনি বললেন, "উসাইরিম বিন আব্দুল আশহাল আমর বিন সাবিত বিন ওয়াকশ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)।"

হুসাইন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি মাহমুদ বিন লাবিদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে প্রশ্ন করলাম, "উসাইরিমের ব্যাপারটি আসলে কী ছিল?" বললেন, "তিনি প্রথমে ইসলামকে অস্বীকার করতেন, কিন্তু উহুদের সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লে তার কাছে ইসলাম স্পষ্ট হয়ে যায়। তখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। তারপর তরবারি নিয়ে রওনা হয়ে লোকজনের সাথে মিলিত হলেন। অতঃপর মানুষের ভিড়ে ঢুকে পড়ে যুদ্ধ করতে লাগলেন। যুদ্ধের একপর্যায়ে তিনি আঘাতপ্রাপ্ত হলেন।

তারপর বনি আব্দুল আশহালের লোকেরা যখন তাদের গোত্রের নিহত লোকদের খুঁজছিল, তখন তাকে দেখতে পেয়ে বলল, "হায় আল্লাহ, এ তো দেখি উসাইরিম! সে তো আমাদের সাথে আসেনি। আমরা তাকে (কাফির অবস্থায়) ছেড়ে এসেছিলাম। কারণ, সে ইসলাম অস্বীকার করত।"

তারা তার আসার কারণ জানতে চেয়ে বলল, "হে আমর, তোমাকে এখানে কীসে নিয়ে এসেছে? জাতীয়তাবোধ না ইসলামের প্রতি আগ্রহ?” তিনি জানালেন, "বরং ইসলামের প্রতি আগ্রহবোধই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ইমান এনেছি। মুসলমান হওয়ার পর আমি তরবারি নিয়ে সকালেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে রওনা হয়েছি। তারপর যুদ্ধ করেছি এবং আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছি।"

এর কিছুক্ষণ পর তাদের হাতেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তার ব্যাপারে জানানো হলে তিনি বললেন, "সে জান্নাতি।”২৮

টিকাঃ
২৬. সহিহুল বুখারি: ২৮০৮।
২৭. ফাতহুল বারি: ৬/২৫।
২৮. মুসনাদু আহমাদ: ২৩১২৩।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 নওমুসলিমদের সঙ্গে দ্বীন শিক্ষা দেওয়ার জন্য লোক প্রেরণ করতেন

📄 নওমুসলিমদের সঙ্গে দ্বীন শিক্ষা দেওয়ার জন্য লোক প্রেরণ করতেন


আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট রাল, জাকওয়ান, উসাইয়া ও বনু লিহইয়ান গোত্রের লোকজন আগমন করল। তারা ধারণা দিল যে, তারা মুসলমান হয়ে গিয়েছে এবং তাদের গোত্রের লোকদের (শিক্ষা-দীক্ষার) জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে সাহায্য চাইল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্তরজন আনসারি সাহাবি পাঠিয়ে তাদের সাহায্য করলেন।'

আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আমরা তাদের "কারি" নামে চিনতাম। তারা দিনের বেলায় কাঠ সংগ্রহ করে জীবিকা উপার্জন করতেন এবং রাতে সালাত পড়তেন।'২৯

মুহাল্লাব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এ ঘটনা থেকেই একটি কর্মপদ্ধতি জারি হয়ে গেল যে, সীমান্ত অঞ্চলের লোকদের সার্বিক সাহায্য-সহযোগিতা তাঁর (কেন্দ্রের) পক্ষ থেকে যাবে। পরবর্তী সময়ের খলিফাদের মাঝেও এই কর্মপদ্ধতি বিস্তার লাভ করে। '৩০

টিকাঃ
২৯. সহিহুল বুখারি: ৩০৬৪, সহিহু মুসলিম: ৬৭৭।
৩০. ইবনে বাত্তাল কৃত শারহু সহিহিল বুখারি: ৯/২৯০।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 নওমুসলিমদের বিভিন্ন বিষয় এড়িয়ে যেতেন

📄 নওমুসলিমদের বিভিন্ন বিষয় এড়িয়ে যেতেন


সদ্য ইসলাম গ্রহণ করা লোকদের ইসলামের ওপর অটল রাখতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের অপছন্দনীয় ও সংশয় সৃষ্টিকারী বিভিন্ন বিষয় এড়িয়ে যেতেন।

আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলাম, "হাতিমের দেয়াল কি বাইতুল্লাহর অন্তর্ভুক্ত?” তিনি বললেন, "হাঁ।”

আমি পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম, “তবে তারা কেন এটাকে বাইতুল্লাহর অন্তর্ভুক্ত করেনি?” তিনি বললেন, "তোমার সম্প্রদায়ের নিকট পর্যাপ্ত অর্থ ছিল না।” আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, "এর দরোজা উঁচুতে স্থাপিত হওয়ার কারণ কী?" তিনি বললেন:

فَعَلَ ذَاكِ قَوْمُكِ لِيُدْخِلُوا مَنْ شَاءُوا ، وَيَمْنَعُوا مَنْ شَاءُوا، وَلَوْلَا أَنَّ قَوْمَكِ حَدِيثُ عَهْدُهُمْ بِالْجَاهِلِيَّةِ فَأَخَافُ أَنْ تُنْكِرَ قُلُوبُهُمْ، أَنْ أُدْخِلَ الجَدْرَ فِي البَيْتِ، وَأَنْ أَلْصِقُ بَابَهُ فِي الْأَرْضِ

"তাও তোমার সম্প্রদায়ের কাণ্ড; যাতে তারা যাকে ইচ্ছা তাতে প্রবেশাধিকার পায় এবং যাকে ইচ্ছা প্রবেশ করতে না দেয়। তোমার কওমের জাহিলিয়াত পরিত্যাগের যুগ নিকটতম না হলে এবং আমার যদি এই আশঙ্কা না হতো যে, তাদের অন্তর পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে, তা হলে আমি অবশ্যই (হাতিমের) দেয়াল বাইতুল্লাহর অন্তর্ভুক্ত করা এবং কাবার দরোজা জমিনের সমতলে স্থাপন করার বিষয়ে বিবেচনা করতাম। "৩১

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সন্দেহ অমূলক ছিল না। কাবা ভেঙে ফেললে বাস্তবেই অনেক মানুষ তাঁকে খারাপ ভাবত। আর এ সুযোগে শয়তান তাদের অন্তরে প্রবিষ্ট ইসলাম বের করে ফেলার জন্য কুমন্ত্রণা দিত।

আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের অন্তরসমূহকে ইসলামের ওপর অটল রাখতে চাইতেন এবং ইসলামের প্রতি তাদের চিত্ত আকর্ষিত রাখার চেষ্টা করতেন। এ জন্য তিনি কাবাঘর ভেঙে তাদের অন্তরে ইসলামের প্রতি বিরূপ মনোভাব আসার সুযোগ দেননি।

তাই তিনি কাবাঘর পূর্ণরূপে নির্মাণ না করে লোকদেরকে হাতিমসহ পুরো কাবা তাওয়াফ করতে নির্দেশ দেন। এতে মানুষের মনও ঠিক থাকল আর দ্বীনের বিধান পালনেও কোনো অসুবিধা হয়নি। কেননা, কাবাঘরকে পূর্ণরূপে নির্মাণ করা ফরজ নয় এবং শরিয়তের কোনো রোকনও তার ওপর নির্ভরশীল নয়। ওয়াজিব হলো পুরো কাবাঘর তাওয়াফ করা, যা কাবাঘরকে বর্তমান অবস্থায় বাকি রাখলেও সম্ভব। ৩২

হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়:

লোকজন বুঝতে না পারার আশঙ্কা থাকলে অনেক ঐচ্ছিক বিষয় বাদ দেওয়ার অবকাশ আছে।
শাসক বা দায়িত্বশীল এমন বিষয় থেকে বিরত থাকবে, যে বিষয় মানুষকে বিদ্রোহের পথে নিয়ে যাবে অথবা তাদের দ্বীনি বা দুনিয়াবি কোনো ক্ষতি সাধন করবে।
কোনো ওয়াজিব লঙ্ঘিত হয় না, এমন বিষয়ের মাধ্যমে মানুষের অন্তরসমূহ আকর্ষিত রাখা ভালো।
অকল্যাণ বিতাড়ন ও কল্যাণ আনয়ন-এ দুই বিষয়ের মধ্যে যেটি গুরুত্বপূর্ণ তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। উভয় বিষয় একসাথে সামনে আসলে অকল্যাণের বিতাড়ন আগে করতে হবে। তবে অকল্যাণ তেমন গুরুতর না হলে প্রথমে কল্যাণ আনয়ন করা মুসতাহাব।
বিভিন্ন সাধারণ বিষয় নিয়ে স্ত্রীর সাথে কথা বলা।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশাবলি পালনের প্রতি সাহাবায়ে কিরামের প্রবল আগ্রহ।
ফায়দা: ইবনে কাসির (রাহিমাহুল্লাহ) খালা উম্মুল মুমিনিন আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'অতঃপর আব্দুল্লাহ বিন জুবাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যেভাবে বর্ণনা করেছেন, সে ভিত্তির ওপর কাবা নির্মাণ করেন। আল্লাহ তাঁকে উত্তম বিনিময় দান করুন।

অতঃপর ৭৩ হিজরিতে যখন হাজ্জাজ বিন ইউসুফ (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁকে পরাজিত করেন, তখন তিনি উত্তর পার্শ্বের দেয়াল ভেঙে দেন এবং পাথরকে বাইরে নিয়ে আসেন; যেমনটি প্রথমে ছিল। আর ভগ্ন কঙ্করগুলো কাবার অভ্যন্তরে সাজিয়ে রেখে দরোজাকে উঁচু করে দেন এবং পশ্চিমের দরোজা বন্ধ করে দেন।

এখনো তার আলামত বিদ্যমান আছে। তিনি এমনটি করেছিলেন আব্দুল মালিক বিন মারওয়ানের নির্দেশে। তখন তার নিকট এ সম্পর্কিত হাদিস পৌঁছায়নি। যখন তার নিকট হাদিস পৌঁছাল, তখন তিনি বললেন, যা হওয়ার হয়ে গেছে। এখন এটাকে এভাবে রেখে দেওয়াই ভালো মনে করছি।

এরপরে ইবনে মানসুর আল-মাহদি (রাহিমাহুল্লাহ) আব্দুল্লাহ বিন জুবাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ভিত্তি অনুযায়ী কাবাঘর নির্মাণ করতে চাইলে ইমাম মালিক বিন আনাস (রাহিমাহুল্লাহ) তা না করার পরামর্শ দিলেন। তিনি বললেন, "আমার ভালো মনে হচ্ছে না যে, রাজা-বাদশারা এটাকে একটা খেলা বানিয়ে নেবে। তারা নিজ নিজ মতানুসারে কাবা নির্মাণ করতে থাকবে। কেউ আব্দুল্লাহ বিন জুবাইরের মত গ্রহণ করবে, কেউ আব্দুল মালিক বিন মারওয়ানের মত গ্রহণ করবে, আরেকজন এসে অন্য মত গ্রহণ করবে। এভাবে বিষয়টি একটি খেলায় পরিণত হবে। আল্লাহই ভালো জানেন। "৩৩

জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'আব্দুল্লাহ বিন উবাই বলল, “আল্লাহর কসম, আমরা মদিনায় ফিরে গেলে সেখান থেকে সবল লোকেরা অবশ্যই দুর্বল লোকদের বের করে দেবে!"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কানে এ কথা পৌঁছালে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) দাঁড়িয়ে বললেন, "আমাকে অনুমতি দিন, আমি এ মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দেবো।”

তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:

دَعْهُ ، لَا يَتَحَدَّثُ النَّاسُ أَنَّ مُحَمَّدًا يَقْتُلُ أَصْحَابَهُ

"বাদ দাও, মানুষ যেন বলার সুযোগ না পায় যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ সাথিদের হত্যা করে।"৩৪

জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'হুনাইন থেকে ফেরার পথে "জিইরানা” নামক স্থানে এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসলো। তখন বিলাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাপড়ে রুপা ছিল, সেখান থেকে নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের দান করছিলেন। লোকটি বলল, "হে মুহাম্মাদ, ইনসাফ করুন।" তখন তিনি বললেন:

وَيْلَكَ وَمَنْ يَعْدِلُ إِذَا لَمْ أَكُنْ أَعْدِلُ؟ لَقَدْ خِبْتَ وَخَسِرْتَ إِنْ لَمْ أَكُنْ أَعْدِلُ

"তোমার অমঙ্গল হোক! আমি ইনসাফ না করলে আর কে করবে? আমি যদি ইনসাফ না করতাম, তবে তুমি ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হতে!"

উমর বিন খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, এই মুনাফিককে হত্যা করার অনুমতি দিন আমাকে।"

রাসولুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:

مَعَاذَ اللَّهِ، أَنْ يَتَحَدَّثَ النَّاسُ أَنِّي أَقْتُلُ أَصْحَابِي

"আল্লাহর পানাহ! তখন মানুষ বলতে শুরু করবে যে, আমি নিজ সাথিদের হত্যা করি।"৩৫

এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ধৈর্য ও সহনশীলতার প্রমাণ পাওয়া যায়।

এ ছাড়াও এ হাদিস প্রমাণ করে, বড় ক্ষতি ও ফিতনার আশঙ্কা থাকলে ছোট ছোট সমস্যায় ছাড় যাওয়াই শ্রেয়।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের মন তাঁর প্রতি আকৃষ্ট রাখতে চেষ্টা করতেন এবং বেদুইন ও মুনাফিকদের অশুভ ও অসংলগ্ন আচরণের ওপর ধৈর্যধারণ করতেন। যাতে মুসলমানদের শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং ইসলামের দাওয়াত পূর্ণতা লাভ করে। নওমুসলিমদের অন্তরে ইমান পোক্ত হয় এবং অন্যরা ইসলামের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। এর জন্য তিনি অনেক মাল-সম্পদও দান করতেন।

এই কারণে তিনি মুনাফিকদের মারতেন না। এটি ছাড়াও মুনাফিকদের না মারার আরেকটি কারণ হলো, তারা মুখে মুসলমান হওয়ার দাবি করত। তাই প্রকাশ্য বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে তাদের ক্ষমা করে দেওয়া হতো এবং তাদের গোপন অবস্থার হিসাব-নিকাশ আল্লাহর কাছে সোপর্দ করা হতো। এ ছাড়াও তাদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবিদের মধ্যে গণ্য করা হতো এবং তারা পার্থিব স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে বা জাতীয়তার চেতনায় তাড়িত হয়ে, অথবা দম্ভও অহমিকা প্রকাশ করার জন্য তাঁর সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করত।

কাজি ইয়াজ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'উলামায়ে কিরামের মাঝে এ বিষয়ে মতানৈক্য আছে যে, মুনাফিকদের ক্ষমা করে দেওয়া ও তাদের সাথে যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়ার বিধানটি এখনো বহাল আছে, নাকি ইসলাম বিজয়ী হওয়ার পর এবং আয়াত : جَاهِدِ الْكُفَّارَ وَالْمُنَافِقِينَ )"কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করুন।"৩৬) নাজিল হওয়ার পর রহিত হয়ে গিয়েছে?'

কেউ কেউ বলেন, "তাদের তখন ক্ষমা করে দেওয়া হতো, যখন তাদের মুনাফিকি প্রকাশ না পেত। যখন তা প্রকাশ পেত, তখন তাদের হত্যা করা হতো। "৩৭

মুনাফিক বলা হয় ওই ব্যক্তিকে, যার কুফর ও নিফাক গোপন থাকে। তাই দুনিয়াবি বিষয়ে তার সাথে কাফিরদের মতো ব্যবহার করা হয় না; বরং মুসলমানদের মতো ব্যবহার করা হয়। কারণ, ইসলামের ঘোষণা দিয়ে সে নিজের জানমালের নিরাপত্তা লাভ করে নিয়েছে। এটাই সেই ঢাল, যার সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে আলোচনা করেছেন:

اتَّخَذُوا أَيْمَانَهُمْ جُنَّةً فَصَدُّوا عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ إِنَّهُمْ سَاءَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ

'তারা তাদের শপথসমূহকে ঢালরূপে ব্যবহার করে। অতঃপর তারা আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করে। তারা যা করছে, তা খুবই মন্দ। '৩৮

ইমাম শাফিয়ি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'অর্থাৎ তারা মৃত্যুদণ্ড থেকে বাঁচার ইমানকে ঢালরূপে ব্যবহার করে। তাই তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো না এবং তাদের প্রকাশ্য ইসলামের কারণে তাদের ওপর মুমিনদের বিধিবিধান প্রয়োগ করা হতো।

কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের গোপন অবস্থা সম্পর্কে পূর্ণরূপে অবগত আছেন বিধায় তিনি তাদের জন্য জাহান্নামের সর্বনিকৃষ্ট স্তরকে আবশ্যক করে রেখেছেন। '৩৯

ইবনে কাসির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এ জন্যই জাহহাক বিন মুজাহিম (রাহিমাহুল্লাহ) এ আয়াতকে اتَّخَذُوا إِيْمَانَهُمْ جُنَّةٌ )তারা তাদের ইমানকে ঢালরূপে ব্যবহার করে) এভাবে পড়তেন। অর্থাৎ তারা নিজেদের বাহ্যিক ইমানকে মৃত্যুদণ্ড থেকে বাঁচার উপায় ' হিসেবে অবলম্বন করে। তবে অধিকাংশ উলামায়ে কিরাম এখানে إِيمَانِ -এর স্থলে أَيْمَانِ-এর يَمِينِ) বহুবচন, অর্থ: শপথ) পড়েন। '৪০'

এ জন্যই মুনাফিকদের ওপর তাদের কঠিন কুফরি সত্ত্বেও মুরতাদদের বিধান প্রয়োগ করা হয় না। বরং দুনিয়াতে তাদের ওপর মুসলমানদের বিধান প্রয়োগ করা হয়।

আবু সাইদ খুদরি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'একদা আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলাম। তখন তিনি কিছু একটা বণ্টন করছিলেন। এ সময় তাঁর কাছে জুল খুয়াইসিরা নামক বনু তামিমের এক লোক এসে বলল, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, ইনসাফ করুন।" তিনি বললেন:

وَيْلَكَ وَمَنْ يَعْدِلُ إِذَا لَمْ أَكُنْ أَعْدِلُ؟ لَقَدْ خِبْتَ وَخَسِرْتَ إِنْ لَمْ أَكُنْ أَعْدِلُ

"তোমার অমঙ্গল হোক! আমি ইনসাফ না করলে আর কে করবে? আমি যদি ইনসাফ না করতাম, তবে তুমি ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হতে!"

তখন উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমাকে এই মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দেওয়ার অনুমতি দিন।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:

دَعْهُ، فَإِنَّ لَهُ أَصْحَابًا يَحْقِرُ أَحَدُكُمْ صَلَاتَهُ مَعَ صَلَاتِهِمْ، وَصِيَامَهُ مَعَ صِيَامِهِمْ، يَقْرَءُونَ القُرْآنَ لَا يُجَاوِزُ تَرَاقِيَهُمْ، يَمْرُقُونَ مِنَ الدِّينِ كَمَا يَمْرُقُ السَّهْمُ مِنَ الرَّمِيَّةِ

"বাদ দাও, তার এমন কিছু সঙ্গী আছে, যাদের সালাতের সামনে তোমাদের যে কেউ নিজের সালাতকে তুচ্ছ মনে করবে এবং তাদের রোজার সামনে নিজের রোজাকে নিম্নমানের মনে করবে। তারা কুরআন পাঠ করে, কিন্তু কুরআন তাদের কণ্ঠনালি অতিক্রম করে না। তারা দ্বীন থেকে এমনভাবে (দ্রুত) বেরিয়ে যাবে, যেভাবে ধনুক থেকে তির বের হয়ে যায়।"৪১

সহিহাইনের অপর এক বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:

إِنِّي لَمْ أُومَرْ أَنْ أَنْقُبَ عَنْ قُلُوبِ النَّاسِ وَلَا أَشُقَّ بُطُونَهُمْ

'আমাকে মানুষের হৃদয় ছিদ্র করে এবং পেট বিদীর্ণ করে (ইমানের উপস্থিতি) দেখার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়নি। '৪২

আরেক বর্ণনায় এসেছে:

مَعَاذَ اللَّهِ، أَنْ يَتَحَدَّثَ النَّاسُ أَنِّي أَقْتُلُ أَصْحَابِي

'আল্লাহর পানাহ! তখন মানুষ বলতে শুরু করবে যে, আমি নিজ সাথিদের হত্যা করি। '৪৩

হাফিজ ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বললেন, 'হাদিস থেকে বাহ্যিকভাবে বোঝা যায় যে, তাকে হত্যা না করার কারণ হলো, তার উল্লেখিত গুণাবলির সঙ্গী-সাথি রয়েছে। কিন্তু সে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে যে ধৃষ্টতা ও ঔদ্ধত্য দেখিয়েছে, তার ফলে তাকে হত্যা করতে কোনো বাধা ছিল না। তবুও তাকে হত্যা না করার কারণ হলো, তিনি তাদের চিত্ত আকর্ষণ করতে চেয়েছেন; যেমনটি ইমাম বুখারি (রাহিমাহুল্লাহ) বুঝেছেন। অর্থাৎ যেহেতু তারা ইসলাম প্রকাশ করার পাশাপাশি অধিকহারে ইবাদতও করে, তাই তাদের হত্যার অনুমতি দেওয়া হলে অন্যান্য মানুষ ইসলাম গ্রহণ করতে দ্বিধা করবে। '৪৪

টিকাঃ
৩১. সহিহুল বুখারি: ৭২৪৩।
৩২. আল-মুনতাকা শারহুল মুয়াত্তা: ২/২৮২।
৩৩. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৮/২৭৫।
৩৪. সহিহুল বুখারি: ৪৯০৫, সহিহু মুসলিম: ২৫৮৪।
৩৫. সহিহুল বুখারি: ৩১৩৮, সহিহু মুসলিম: ১০৬৩।
৩৬. সুরা আত-তাওবা, ৯: ৭৩
৩৭. ইমাম নববি কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৬/১৩৯।
৩৮. সুরা আল-মুনাফিকুন, ৬৩: ২।
৩৯. আহকামুল কুরআন: ১/২৯৯-৩০০।
৪০. তাফসিরু ইবনি কাসির: ৮/১৫০।
৪১. সহিহুল বুখারি: ৩৬১০, সহিহু মুসলিম ১০৬৪।
৪২. সহিহুল বুখারি: ৪৩৫১, সহিহু মুসলিম: ১০৬৪।
৪৩. সহিহু মুসলিম: ১০৬৩।
৪৪. ফাতহুল বারি: ১২/২৯৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00