📄 আবু হুরাইরা -এর মায়ের জন্য দোয়া করলেন
আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আমার মা মুশরিক ছিলেন। আমি তাকে প্রতিনিয়ত ইসলামের দাওয়াত দিতাম। একদিন তাকে দাওয়াত দিতে গেলে তিনি আমাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ব্যাপারে অপছন্দনীয় কিছু কথা বলে ফেললেন। তখন আমি কেঁদে কেঁদে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসলাম। বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি প্রতিদিন আমার মাকে ইসলামের দাওয়াত দিই, কিন্তু তিনি অস্বীকার করেন। আজও যথারীতি তাকে দাওয়াত দিতে গেলে তিনি আপনার ব্যাপারে অসংলগ্ন কথা বলেছেন। তাই আপনি দোয়া করুন, যেন আল্লাহ তাআলা আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মাকে হিদায়াত দান করেন।"
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া করলেন:
اللهُمَّ اهْدِ أُمَّ أَبِي هُرَيْرَةَ
“হে আল্লাহ, আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মাকে হিদায়াত দান করুন।"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া করায় আমি আনন্দচিত্তে বাড়ির উদ্দেশে বের হলাম। বাড়ির দরোজার নিকট পৌঁছে দেখি, তা বন্ধ। আমার মা আমার পায়ের শব্দ শুনতে পেয়ে বললেন, "আবু হুরাইরা, তুমি ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকো।” আমি পানির শব্দ শুনতে পেলাম। তিনি গোসল করে দ্রুত কাপড়-চোপড় ও ওড়না পরিধান করে দরোজা খুলে দিলেন। তারপর বললেন, "হে আবু হুরাইরা, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই এবং আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসুল।"
তখন আমি খুশিতে কাঁদতে কাঁদতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে ফিরে এলাম। বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, সুসংবাদ গ্রহণ করুন! আল্লাহ আপনার দোয়া কবুল করে নিয়েছেন এবং আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মাকে হিদায়াত দান করেছেন।" তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর প্রশংসা করলেন ও তাঁর গুণকীর্তন করে বললেন, "ভালো হয়েছে।"
আমি বললাম, “ইয়া রাসুলাল্লাহ, আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, যেন আমি ও আমার মা মুমিনদের কাছে প্রিয় হয়ে উঠি এবং আমাদের কাছে তারাও প্রিয় হয়ে ওঠে।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া করলেন:
اللهُمَّ حَبِّبْ عُبَيْدَكَ هَذَا - يَعْنِي أَبَا هُرَيْرَةَ - وَأُمَّهُ إِلَى عِبَادِكَ الْمُؤْمِنِينَ، وَحَبِّبْ إِلَيْهِمِ الْمُؤْمِنِينَ
“হে আল্লাহ, আপনার এই ছোট বান্দা আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও তার মাকে আপনার মুমিন বান্দাদের নিকট প্রিয় করে তুলুন এবং তাদের নিকট মুমিনদের প্রিয় করে তুলুন।"
এরপর থেকে এমন কোনো মুমিন সৃষ্টি হয়নি, যে আমার ব্যাপারে শোনার পর কিংবা আমাকে দেখার পর আমাকে ভালোবাসেনি। '১৬
টিকাঃ
১৬. সহিহু মুসলিম: ২৪৯১।
📄 দাওস গোত্রের হিদায়াতের জন্য দোয়া করলেন
আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'তুফাইল বিন আমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বললেন, "দাওস গোত্র নষ্ট হয়ে গেছে। তারা পাপী, তারা অস্বীকারকারী। অতএব, আপনি তাদের জন্য বদদোয়া করুন।"
তখন লোকজন ধারণা করতে শুরু করলেন, এই বুঝি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জন্য বদদোয়া করতে যাচ্ছেন। কিন্তু তিনি দোয়ায় বললেন:
اللهُمَّ اهْدِ دَوْسًا وَأْتِ بِهِمْ
“হে আল্লাহ, দাওস গোত্রকে হিদায়াত দান করুন এবং তাদের (হকের পথে) নিয়ে আসুন।"১৭
ইমাম বুখারি (রাহিমাহুল্লাহ) এই হাদিসের অধ্যায়ের নাম রেখেছেন, 'আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে মুশরিকদের জন্য হিদায়াতের দোয়া'-সম্পর্কিত অধ্যায়।
টিকাঃ
১৭. সহিহুল বুখারি: ২৯৩৭, সহিহু মুসলিম: ২৫২৪।
📄 মানুষের ইসলাম গ্রহণে আনন্দিত হয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন
আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'একটি ইহুদি ছেলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সেবা করত। একদিন সে অসুস্থ হয়ে পড়ল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখতে গেলেন। তিনি তার শিয়রে বসে বললেন, "মুসলমান হয়ে যাও।” ছেলেটি তার পাশে থাকা পিতার দিকে তাকাল। পিতা বলল, "আবুল কাসিমের কথা মেনে নাও।” তখন সে ইসলাম গ্রহণ করল। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওখান থেকে এই বলতে বলতে বের হলেন:
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَنْقَذَهُ بِي مِنَ النَّارِ
"সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি আমার মাধ্যমে তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়েছেন।”১৯
আর ইতিপূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি যে, আদি বিন হাতিম (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও ইকরামা বিন আবু জাহেল (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ইসলাম গ্রহণ করার কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনন্দিত হয়েছিলেন।
টিকাঃ
১৮. ফাতহুল বারি: ৬/১০৮।
১৯. সহিহুল বুখারি: ১৩৫৬, সুনানু আবি দাউদ: ৩০৯৫।
📄 ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে মুশরিকের সাথে ঘনিষ্ঠতা করতেন
হুয়াইতিব বিন আব্দুল উজ্জা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'মক্কা-বিজয়ের পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন নগরীতে প্রবেশ করলেন, তখন আমি প্রচণ্ড ভয় পেলাম। তাই আমি বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলাম এবং পরিবারের সদস্যদের আলাদা আলাদা করে বিভিন্ন নিরাপদ জায়গায় রেখে আসলাম। তারপর আমি আওফের বাড়িতে গেলাম। সেখানে আবু জার গিফারি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর সামনে পড়লাম। তাঁর সাথে আমার বন্ধুত্ব ছিল ঠিকই, কিন্তু এখন আর তা নেই। তাঁকে দেখতেই আমি পালাতে উদ্যত হলাম। তিনি বললেন, "হে আবু মুহাম্মাদ।” আমি বললাম, "জি, বলুন।” তিনি বললেন, "কী হলো তোমার?" আমি বললাম, "ভয় পাচ্ছি।” তিনি বললেন, "তোমার ভয় পেতে হবে না, তুমি আল্লাহর নিরাপত্তায় নিরাপদ।" তখন আমি তাঁর কাছে ফিরে গিয়ে তাঁকে সালাম করলাম। তিনি বললেন, "বাড়িতে ফিরে যাও।” আমি বললাম, "বাড়িতে যাওয়ার তো উপায় নেই। আল্লাহর কসম, আমার তো মনে হচ্ছে, বাড়িতে যাওয়ার পথেই আমি (মুসলমান সৈন্যদের হাতে) মারা পড়ব অথবা তারা আমার বাড়িতে ঢুকে আমাকে মেরে ফেলবে। তা ছাড়া আমার পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে আছে।" তিনি বললেন, "তাদের এক জায়গায় একত্র করো; আমি গিয়ে তোমাকে তোমার বাড়িতে পৌঁছিয়ে দিয়ে আসব।"
তিনি আমার সাথে চললেন আর ঘোষণা করতে লাগলেন, হুয়াইতিব আমার নিরাপত্তায় আছে, তার ওপর যেন আক্রমণ করা না হয়। তিনি বলেন, "এরপর আমার শঙ্কা কেটে গেল এবং আমি আমার পরিবারের সদস্যদের তাদের নিজ নিজ বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসলাম।"
অতঃপর আবু জার (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আমার কাছে এসে বললেন, "হে আবু মুহাম্মাদ, আর কতদিন এভাবে থাকবে? পুরো দেশ তো চষে বেড়ালে এবং অনেক কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলে! এখানো অনেক কল্যাণ বাকি আছে, তাই বলছিলাম কি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গিয়ে ইসলাম কবুল করে নাও। এতে তুমি সম্পূর্ণ নিরাপদ হয়ে যাবে। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন সর্বাধিক সদাচারী, সর্বাধিক সম্পর্ক রক্ষাকারী ও সর্বাধিক সহনশীল ব্যক্তি। তাঁর ভদ্রতা ও সম্মানবোধের কারণে তুমি তাঁর নিকট ভদ্রজনোচিত আচরণ ও সম্মান পাবে।” আমি বললাম, "ঠিক আছে, আমাকে নিয়ে চলুন। আমি আপনার সাথে যাব।"
তখন আমি তার সাথে বের হয়ে বাতহা নামক জায়গায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে মিলিত হলাম। তাঁর নিকট আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ছিলেন। আমি তাঁকে সালাম দিলে তিনি সালামের উত্তর দিলেন। তারপর আমি বললাম, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো মাবুদ নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসুল।” তখন রাসولুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি তোমাকে হিদায়াত দান করেছেন।"
তিনি বলেন, 'আমি ইসলাম গ্রহণ করায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনন্দিত হলেন। অতঃপর আমি তাঁর সাথে হুনাইন ও তায়িফের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। তিনি হুনাইন যুদ্ধের যুদ্ধলব্ধ সম্পদ থেকে আমাকে একশটি উট দান করেছেন।'২০
টিকাঃ
২০. মুসতাদরাকুল হাকিম: ৬১৩০।